📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 মদীনায় প্রত্যাবর্তন

📄 মদীনায় প্রত্যাবর্তন


এরপর রাসূলুল্লাহ (সা) সদলবলে মুশরিক যুদ্ধবন্দীদের সাথে নিয়ে মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হলেন। যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে উব্বা ইব্‌ন আবূ মুয়াইত ও নাযর ইবন হারিসও ছিল। তিনি মুশরিকদের কাছ থেকে পাওয়া গনীমতের জিনিসপত্রও সাথে নিয়ে চললেন। তিনি আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন কা'বকে গনীমতের মাল সংরক্ষণের দায়িত্বে নিযুক্ত করলেন। এ সময় مسلمانوں মধ্য থেকে আদী ইব্‌ন আবু জাবা (রা) নামক কবি রণোদ্দীপনামূলক নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করেন:
"হে বাস্বাস! যু-তাল্হা নামক স্থানে এ কাফেলার রাত্রি যাপনের কোন অবকাশ নেই। কাজেই উটদের চলার জন্য প্রস্তুত রাখ এবং গুমায়র প্রান্তরেও থামার কোন অবকাশ নেই। এ ধরনের লোকদের বাহনগুলোকে অনুপযুক্ত স্থানে থামিয়ে অসম্মানিত করা যায় না। কাজেই সে উটগুলোকে নিয়ে রাস্তায় চলাই বুদ্ধিমানের কাজ। আল্লাহ্ তো আমাদের সাহায্য করেছেন, আর আখনাস পালিয়ে গেছে।"
রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাফরা গিরিপথ থেকে বেরিয়ে উক্ত গিরিপথ ও নাযিয়ার মধ্যবর্তী সায়র নামক বালুর টিলার উপর এক বড় গাছের কাছে অবতরণ করলেন। সেখানে বসে তিনি مسلمانوں মধ্যে গনীমতের মাল সমভাবে বন্টন করলেন। এরপর নবী (সা) যাত্রা করে যখন রাওহা নামক স্থানে পৌঁছেন, তখন মুসলমানগণ রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের আল্লাহ্ যে বিজয় দান করেছেন, সেজন্য অভিনন্দন জানাতে লাগলেন। তখন সালামা ইব্‌ন সুলামা (রা) বললেন: তোমরা কি জন্য আমাদের মুবারকবাদ দিচ্ছ? আল্লাহ্র কসম! আমরা তো কতকগুলো ঝানু বৃদ্ধ লোকের সাথেই যুদ্ধ করে এলাম। তারা কুরবানীর উটের মত হীনবল হয়ে গিয়েছিল। আমরা তাদের যবেহ করে রেখে আসলাম। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা) মুচকি হেসে বললেন: ভাতিজা, ওরাই তো এক সময় হর্তাকর্তা ছিল।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 নাযর ও উকবার হত্যা

📄 নাযর ও উকবার হত্যা


ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন সাফরা নামক স্থানে ছিলেন, তখন নাযর ইন্ন হারিস নিহত হয়। আলী ইব্‌ন আবু তালিব (রা) তাকে হত্যা করেন। এরপর তিনি (সা) সেখান থেকে বের হয়ে যখন আরকু যাবিয়াতে পৌছেন, তখন উব্বা ইব্‌ন আবূ মুয়াইত নিহত হয়। তাকে বনূ আজলানের আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন সালামা (রা) বন্দী করেছিলেন। হত্যার নির্দেশ দেয়ার পর উকবা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে জিজ্ঞেস করল: হে মুহাম্মদ! আমার ছেলেমেয়েদের দেখাশুনার জন্য কে রইল? তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: আগুন। এরপর বনু Amr ইব্‌ন আওফের আসিম ইন্ন সাবিত ইব্‌ন আবূ আফলাহ আনসারী (রা) উকবাকে হত্যা করলেন। এ স্থানে ফারওয়া ইবন Amr বায়াযীর আযাদকৃত গোলাম আবূ হিন্দ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তখন তার সাথে এক ব্যাগ 'হায়স' (পণির, খেজুর ও ঘি মিশ্রিত এক ধরনের খাবার) ছিল। তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি, তবে পরবর্তী সকল যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে শরীক হন। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চিকিৎসায় শিংগা লাগাতেন। তখন তিনি (রা) বললেন: আবূ হিন্দ একজন আনসারী। তোমরা তার বিয়ের ব্যবস্থা কর। সাহাবীরা নবী (সা)-এর নির্দেশ পালন করেন এবং এবং তার বিয়ের ব্যবস্থা করেন।
ইবন ইসহাক বলেন: এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) যাত্রা শুরু করেন এবং তিনি যুদ্ধবন্দীদের মদীনায় পৌঁছার একদিন আগেই সেখানে পৌঁছলেন। তবে ইবন ইসহাক আরো বলেন: ইয়াহইয়া ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবদুর রহমান ইব্‌ন আস'আদ ইব্‌ন যারারা সূত্রে আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবু বকর (রা) আমাকে জানিয়েছেন যে, তিনি বলেছেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) যুদ্ধবন্দীদের সাথেই মদীনায় পৌঁছেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর স্ত্রী সাওদা বিন্ত যামআ (রা), আওফ ও মুয়াওয়ায (রা), যারা বদর যুদ্ধে শহীদ হন, তাদের মা আফ্রা (রা) ও তার পরিবারের লোকদের কাছে শোকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য উপস্থিত ছিলেন। এ ঘটনা পর্দার আয়াত নাযিল হওয়ার আগের। উম্মুল মু'মিনীন সাওদ্বা (রা) বলতেন: আল্লাহ্র কসম! আমি তখনো আফরা পরিবারে ছিলাম। তখন জানলাম যে, যুদ্ধবন্দীদের নিয়ে আসা হয়েছে। আমি তখন আমার বাড়িতে ফিরে গেলাম। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তখন সেখানে ছিলেন। দেখলাম, পিঠমোড়া দিয়ে বাঁধা অবস্থায় একটি কক্ষে রয়েছে আবু ইয়াযীদ সুহায়ল ইব্‌ন Amr! আল্লাহর কসম! আবু ইয়াযীদকে এ অবস্থায় দেখে আমি আত্মসম্বরণ করতে পারলাম না। বললাম: হে আবু ইয়াযীদ! তোমরা আত্মসমর্পণ করলে কেন? সম্মানের সাথে মরতে পারলে না? তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাকে বললেন: হে সাওদা! তুমি কি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে উস্কানি দিচ্ছ? আমি অনুতপ্ত হয়ে বললাম: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)। আমি আবূ ইয়াযীদকে পিঠমোড়া দিয়ে বাঁধা দেখে নিজকে সম্বরণ করতে পারিনি, তাই এরূপ বলে ফেলেছি।
ইব্‌ন ইসহাক বলেন: মদীনায় পৌছে রাসূলুল্লাহ্ (সা) যুদ্ধবন্দীদের সাহাবীদের মধ্যে বন্টন করে দেন এবং বলেন: তোমরা কয়েদীদের সাথে ভাল ব্যবহারের কথা স্মরণ রাখবে। রাবী বলেন: সাহাবী মুস'আব ইবন উমায়র (রা)-এর সহোদর ভাই আবূ আযীয ইবন উমায়র ইব্‌ন হাশিম বন্দীদের মধ্যে ছিল। আবূ আযীয বলে : এ সময় আমার ভাই মুস'আব আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন জনৈক আনসার সাহাবী আমাকে বন্দী করে রেখেছিল। আমার ভাই আনসারকে বলেন : একে শক্ত করে বেঁধে রাখ, এর মা বিত্তশালী। সে ফিয়া দিয়ে একে ছাড়িয়ে নেবে। আবূ আযীয আরো বলে : বদর প্রান্তর থেকে বন্দী হয়ে আসার সময় আমি আনসারদের সঙ্গে ছিলাম। তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নির্দেশমত খাবার সময় আমাকে রুটি খেতে দিতেন এবং নিজেরা খেজুর খেতেন। তিনি আরো বলেন : আমি লজ্জার খাতিরে রুটি তাদের কাছে ফিরিয়ে দিতাম; কিন্তু তারা তা স্পর্শ না করে আমার কাছে ফেরত পাঠাতেন।
ইব্‌ন হিশام বলেন: আবূ আযীয ছিল নাযর ইবন হারিসের পরেই কুরায়শ বাহিনীর পতাকাবাহী সেনাধ্যক্ষ। মুস'আব (রা) যখন তার ভাই আবূ আযীযকে বন্দীকারী আনসার সাহাবী আবূ ইয়াসার (রা)-কে শক্ত করে তার হাত বাধার জন্য বলেন, তখন সে মুস'আব (রা)-কে জিজ্ঞেস করে: হে আমার ভাই! আমার ব্যাপারে এরূপ করার কি নির্দেশ পেয়েছেন? তখন মুস'আব (রা) বলেন: তুমি আমার ভাই নও; সে আমার ভাই।
এরপর আবূ আযীযের মা মুসলমানদের কাছে জানতে চায় যে, কত অধিক ফিদয়ার বিনিময়ে কুরায়ש বন্দীকে ছাড়া হচ্ছে? তখন তাকে বলা হল: চার হাজার দিরহাম। সে অনুযায়ী তার মা চার হাজার দিরহাম ফিদয়া স্বরূপ পাঠিয়ে তাকে মুক্ত করে নেয়।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 পরাজয়ের সংবাদ

📄 পরাজয়ের সংবাদ


ইবন ইসহাক বলেন: এদিকে হায়সুমান ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ খুযাঈ কুরায়শের শোচনীয় পরাজয়ের দুঃসংবাদ নিয়ে সর্বপ্রথম মক্কায় উপনীত হল। লোকেরা জিজ্ঞেস করল: সেখানকার খবর কি? সে বলল: উত্তবা ইব্‌ন রবী'আ, শায়বা ইব্‌ন রবীআ, আবুল হাকাম ইব্‌ন হিশام, উমায়া ইব্‌ন খাল্‌ফ, যামআ ইব্‌ন আস্তয়াদ, নবীহ ও মুনাব্বিহ ইব্‌ন হাজ্জাজ, আবুল বাখতারী ইন্ন হিশাম-এরা সবাই নিহত হয়েছে। হায়সুমান যখন নিহত কুরায়শ নেতাদের নাম এক এক করে বলছিল, তখন হাতীমে বসে থাকা সাফওয়ান ইবন উমায়্যা বলল: আল্লাহর কসম! যদি তার জ্ঞানবুদ্ধি ঠিক থেকে থাকে, তবে তোমরা একে আমার সম্পর্কে জিজ্ঞেস কর। তখন তারা তাকে জিজ্ঞেস করল: আচ্ছা সাফওয়ান ইবন উমায়‍্যার খবর কি? সে বলল: সেতো হাতীমের মধ্যে বসে আছে। আল্লাহর কসম! আমি তার বাপ ও ভাইকে স্বচক্ষে নিহত হতে দেখেছি।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 মক্কার ঘরে ঘরে আর্তনাদ

📄 মক্কার ঘরে ঘরে আর্তনাদ


ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আযাদকৃত গোলাম আবূ রাফি বলেন, আমি এক সময় আব্বাস ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিবের গোলাম ছিলাম। এই পরিবারে ইসলাম প্রবেশ করেছিল। আব্বাস, তাঁর স্ত্রী উম্মুল ফযল ও আমি ইসলাম গ্রহণ করেছিলাম। আব্বাস কুরায়שদের ভয় পেতেন এবং তাদের বিরোধিতা করা অপসন্দ করতেন এবং নিজের মুসলমান হওয়ার ব্যাপারটা তিনি গোপন রাখতেন। তাঁর অনেক সম্পদ ছিল এবং বহু লোককে তিনি অর্থ দিয়ে রেখেছিলেন। আবু লাহাব বদর যুদ্ধে নিজে অংশগ্রহণ না করে, সে তার পরিবর্তে আসী ইবন হিশام ইবন্ মুগীরাকে পাঠিয়েছিল। অন্য লোকেরাও এরূপ করেছিল। যে নিজে যায়নি, সে তার বদলে অন্য একজনকে পাঠিয়েছিল। আবু লাহাব যখন বদরের পরাজয়ের কথা জানল, তখন আল্লাহ্ তাকে ভীষণ অপমানিত করলেন। কিন্তু আমরা সম্মানিত ও অনুপ্রাণিত বোধ করেছিলাম। আমি দুর্বল ছিলাম। তীর বানাবার কাজ করতাম। যমযমের পাশে অবস্থিত তাঁবুতে বসে সেগুলো ঠিক করতাম। একদিন আমি ঐ কক্ষে বসে কাজ করছিলাম। তখন আব্বাসের স্ত্রী উম্মুল ফযল আমার কাছেই বসা ছিলেন। আমরা কুরায়শের পরাজয়ের খবরে আনন্দিত হয়েছিলাম। এ সময় আবু লাহাব শোচনীয় অবস্থায় পা হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে এসে তাঁবুর এক কোণে আমার দিকে পিঠ দিয়ে বসল। হঠাৎ শাবূ সুফইয়ান ইবন হারিস ইবন আবদুল মুত্তালিব সেখানে এল। তখন আবু লাহাব তাকে বলল: আমার কাছে এস। তুমি তো সব খবর জান। ফলে সে সেখানে তার পাশে বসে পড়ল এবং অন্য লোকেরা তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। আবু লাহাব জিজ্ঞেস করল: বাবা! তুমি তাদের খবর আমাকে বল। সে বলল: আল্লাহ্র কসম! আমরা যেন সেখানে শত্রুদের কাছে নিজেদের সোপর্দ করেছি। তারা যেমন খুশি আমাদের বধ করেছে ও বন্দী করেছে। আমি আমাদের লোকদের ভর্ৎসনা করিনি। কারণ আমরা আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে ধূসর বর্ণের ঘোড়ার উপর অসংখ্য ফর্সা রঙের সিপাহী দেখেছি। যারা কাউকে রেহাই দেয়নি এবং কেউ তাদের সামনে টিকে থাকতে পারেনি। আমি বললাম: "তারা নিশ্চয়ই ফেরেশতা ছিলেন।" এ কথা বলামাত্রই আবু লাহাব আমার মুখে প্রচণ্ড এক থাপ্পড় মারল। আমিও এর বদলা নিলাম। এরপর সে আমাকে উপরে উঠিয়ে যমীনে আছাড় দিল এবং আমার শরীরের ওপর বসে আমাকে মারতে লাগল। আর আমি ছিলাম একজন দুর্বল ব্যক্তি। এ সময় উম্মুল ফযল তাঁবুর একটি খুঁটি নিয়ে আবু লাহাবের দিকে এগিয়ে গেলেন এবং খুঁটি দিয়ে আঘাত করে তার মাথা ফাটিয়ে দিলেন। তিনি বললেন: আবূ রাফি'র মনিব এখানে নেই বলে তাকে দুর্বল ভেবেছ?
এরপর আবু লাহাব সেখান থেকে উঠে অপমানিত হয়ে বেরিয়ে গেল। আল্লাহ্র কসম! তারপর তার শরীরে বড় বড় ফোস্কা দেখা দিল এবং তাতেই সে সাত দিনের মধ্যেই মারা গেল।
ইবন ইসহাক বলেন: কুরায়ש গোত্র তাদের নিতহদের জন্য খুবই বিলাপ করল। কিন্তু অচিরেই সংযত হয়ে বলতে লাগল বেশি বিলাপ করো না। মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গীরা এ খবর জানলে উল্লসিত হবে, আর বন্দীদের মুক্তির জন্য কাউকে পাঠাবে না এখন কিছু বিলম্ব কর। অন্যথায় মুহাম্মদ ও তাঁর সঙ্গীরা কড়াকড়ির সাথে মুক্তিপণ আদায় করবে। আসওয়াদ ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিব, তার দুই ছেলে-যাময়া' ইব্‌ন আসওয়াদ এবং আকীল ইব্‌ন আসওয়াদ এবং এক নাতি-হারিস ইব্‌ন যাম'আকে হারিয়েছিল। সে তার সন্তানদের বিয়োগ ব্যথায় কাঁদতে চাচ্ছিল। এ সময় গভীর রাতে সে এক শোকাহত নারীর কান্নার শব্দ শুনল। অন্ধ আসওয়াদ তার এক ভৃত্যকে বলল : "যাও তো, দেখে এস, এখন উচ্চস্বরে বিলাপ করার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে কিনা? দেখতো, কুরায়שরা তাদের নিহতদের জন্য কাঁদছে কিনা? তা হলে আমিও যামআর জন্য কাঁদব। কেননা আমার কলিজা জ্বলে যাচ্ছে।" গোলাম ফিরে এসে বলল: এক মহিলা তার উট হারিয়ে কাঁদছে। এ কথা শুনে আসওয়াদ একটি কবিতা আবৃত্তি করে বিলাপ করল। ঐ কবিতার অনুবাদ নিম্নরূপ:
"ঐ মহিলা একটি উটের জন্য এমন করে রাত জেগে বিলাপ করছে, এ কেমন কথা? হে মহিলা! তুমি জওয়ান উট হারানোর জন্য কেঁদো না, বরং বদরের মর্মান্তিক ঘটনা স্মরণ করে কাঁদো, যেদিন আমাদের ভাগ্যের বিপর্যয় ঘটেছে। তুমি কাঁদো বদর যুদ্ধে নিহত নেতাদের স্মরণে-বনূ হুসায়ন, বনূ মাখযূম এবং আবুল ওয়ালীদের লোকদের জন্য। যদি তুমি কাঁদতেই চাও, তবে আকীল এবং বীর কেশরী হারিসের জন্য কাঁদো। এঁদের জন্য কাঁদতেই থাক, কাঁদায় বিরতি দিও না। আবূ হাকীমার তো কোন সমকক্ষই ছিল না। জেনে রাখ! ওদের মৃত্যুর পর এমন সব লোক নেতা হয়েছে, যদি বদর যুদ্ধ সংঘটিত না হত, তবে এরা কখনো নেতা হতে পারত না।"
ইবন ইসহাক বলেন: বদর যুদ্ধের বন্দীদের মধ্যে আবূ ওদা'আ ইব্‌ন্ন যবীরা সাহমীও ছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: মক্কায় তার একটা চতুর ছেলে আছে, যে ব্যবসায়ী ও বিত্তশালী। মনে হয় সে তার পিতাকে মুক্তিপণের বিনিময়ে ছাড়িয়ে নেয়ার জন্য এসেছে।
ওদিক কুরায়שরা বলাবলি করেছিল যে, তোমরা তোমাদের বন্দীদের ফিদয়া দিয়ে ছাড়িয়ে আনার ব্যাপারে তাড়াহুড়া করবে না, তাতে মুহাম্মদ এবং তাঁর সাথীরা কঠোর হবে। এদিকে মুত্তালিব ইব্‌ন আবূ ওদা'আ - যার কথা রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছিলেন, বলল : তোমরা ঠিকই বলেছ। তাড়াহুড়া করা ঠিক হবে না। কিন্তু সে গোপনে গভীর রাতে মক্কা থেকে বেরিয়ে গেল এবং মদীনায় পৌঁছে চার হাজার দিরহাম দিয়ে তার পিতাকে ছাড়িয়ে নিয়ে গেল। এরপর কুরায়שরা তাদের বন্দীদের মুক্তির জন্য লোক পাঠাল। তখন মিকরায ইবন হাফস ইব্‌ন আখয়াফ-সুহায়ল ইব্‌ন আমরের মুক্তির জন্য এল। তাকে বনূ সালিম ইব্‌ন আওসের মালিক ইব্‌ন দাখশام (রা) বন্দী করেছিলেন। তিনি বলেন, আমি সুহায়লকে বন্দী করেছি। তার পরিবর্তে অন্য কাউকে বন্দী করতে আমি পসন্দ করিনি। বনু খিন্ন্দাফের এ কথা জানা আছে যে, সুহায়লই সে গোত্রের সাহসী পুরুষ। যখন যুলুমের বিনিময় গ্রহণের সময় আসে, তখন একমাত্র সাহসী যুবকই এর প্রতিশোধ নিতে পারে। আমি তাকে তরবারি দিয়ে আঘাত করলে সে ঝুঁকে পড়ে এবং আমি ঐ ঠোঁটকাটার সঙ্গে যুদ্ধ করতে বাধ্য হই (উল্লেখ্য যে, সুহায়লের নীচের ঠোঁট কাটা ছিল)।
ইবন ইসহাক বলেন: উমর (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আপনি অনুমতি দিলে আমি সুহায়লের সামনের উপর-নীচের দুটো করে দাঁত উপড়ে ফেলব। যাতে তার জিহবা বেরিয়ে আসে এবং আপনার বিরুদ্ধে আর বক্তৃতা দিতে না পারে। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: আমি তার মুখ বিকৃত করব না। তা হলে নবী হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ্ আমার মুখ বিকৃত করবেন। ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) উমর (রা)-কে এ কথাও বলেছিলেন যে, এক সময় সুহায়ল এমন ভূমিকাও পালন করতে পারে যা তেমন নিন্দনীয় নয়। এ ভূমিকার কথা পরে উল্লেখ করা হবে (হুদায়বিয়ার সন্ধির সময় কুরায়শ পক্ষের প্রধান আলোচক ছিল এই সুহায়ল ইব্‌ন Amr)। ইবন ইসহাক বলেন: যখন মিকরায তাদের সঙ্গে সুহায়লের মুক্তির ব্যাপারে কথাবার্তা বলে তাদের সন্তুষ্টই করল, তখন তাঁরা বললেন: যা দেওয়ার আমাদের দিয়ে দাও। সে বলল: তার পরিবর্তে আমাকে বন্দী করে রাখুন। আর তাকে ছেড়ে দিন, যাতে সে আপনাদের কাছে তার ফিয়া পাঠাতে পারে। তখন তারা সুহায়লকে ছেড়ে দিলেন এবং মিকরাযকে বন্দী হিসাবে রেখে দিলেন। এ সময় মিকরায বলে: আমি সে যুবককে ছাড়াবার জন্য আটটি দামী উট দিয়েছি, জরিমানা গোলামরা নয়, শরীফরা আদায় করে থাকেন। আমি আমার হাতকে বন্দী রাখলাম। অথচ নিজকে বন্দী রাখার পরিবর্তে মাল বন্ধক রাখা সহজ ছিল। কিন্তু আমি অপমানিত হওয়াকে ভয় করেছি। আমি বললাম: সুহায়ল আমাদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তি। এজন্য আমাদের বাচ্চাদের জন্য তাকে নিয়ে যাও। যাতে আমি আশার আলো দেখতে পারি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00