📄 বদর যুদ্ধে প্রাপ্ত মালে গনীমত
এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) সৈন্যদের মধ্যে যে গনীমতের মাল ছিল, তা একত্র করার নির্দেশ দিলেন। তখন তা একত্র করা হল। গনীমতের মালের ব্যাপারে مسلمانوں মধ্যে মতভেদ দেখা দিল। যারা ঐ সম্পদ সংগ্রহ করেছিলেন তাঁরা বললেন, এ সম্পদ আমাদের প্রাপ্য। যারা শত্রুর সাথে যুদ্ধ করেছিলেন, তাঁরা বললেন: এগুলো আমাদের পাওনা। আল্লাহর কসম! আমরা যদি যুদ্ধ না করতাম, তা হলে তোমরা এগুলো সংগ্রহ করার সুযোগই পেতে না। কুরায়ש বাহিনীর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত থাকায় আমরা তোমাদের সাথে গনীমত কুড়ানোর কাজে যোগ দিতে পারিনি। আর তোমরা এগুলো সংগ্রহ করতে পেরেছ। শত্রুরা ভিন্ন পথ দিয়ে এসে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উপর হামলা করতে পারে, এই আশংকায় যারা তাঁর পাহারায় নিয়োজিত ছিলেন, তাঁরা বললেন: আল্লাহ্র কসম! তোমরা আমাদের চেয়ে এর বেশি হকদার নও। শত্রুকে আমরাও বাগে পেয়েছিলাম এবং আমরা তাদের হত্যা করতে পারতাম। আল্লাহর কসম! আমরা বিনাবাধায় গনীমতের মাল লাভের সুযোগ পেয়েছিলাম; কিন্তু শত্রুরা নতুন করে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উপর আক্রমণ চালাতে পারে, এই আশংকায় আমরা তাঁর পাহারায় নিয়োজিত ছিলাম। সুতরাং এই সম্পদে তোমাদের অধিকার আমাদের চেয়ে বেশি নয়।
ইন্ন ইসহাক বলেন: গনীমত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে উবাদা ইব্ন সামিত (রা) বলেন: আমরা যারা বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলাম, তাদের মধ্যে মালে গনীমত নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। আমাদের মতবিরোধ খারাপ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তখন আল্লাহ্ তা আমাদের হাত থেকে নিয়ে তাঁর রাসূলের হাতে সমর্পণ করেন। আর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তা সমস্ত مسلمانوں মধ্যে সমভাবে বন্টন করে দেন। এ সম্পর্কে সূরা আনফালের প্রথম আয়াতটি নাযিল হয়।
ইবন ইসহাক বলেন: মালিক ইব্ন রবী'আ বলেছেন যে, বদর যুদ্ধের দিন বনূ আইয মাখযুমীর 'মরাযযুবান' নামক তরবারিটি আমার হস্তগত হয়েছিল। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন গনীমতের প্রতিটি জিনিস জমা দেওয়ার আদেশ দিলেন তখন আমি ঐ তরবারিটিও জমা দিলাম। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে কেউ কিছু চাইলে, তিনি তা দিতে অস্বীকার করতেন না। আরকাম ইব্ন আবিল আরকাম নবী (সা)-এর এ অভ্যাস সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। ফলে তিনি তরবারিটি চাইলে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তা তাঁকে দিয়ে দেন।
📄 বিজয়ের সুসংবাদ
ইবন ইসহাক বলেন: এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) আবদুল্লাহ্ ইব্ন রওয়াহাকে মদীনার উঁচু এলাকায় مسلمانوں কাছে এবং যায়দ ইব্ন হারিসাকে মদীনার নিম্ন এলাকায় مسلمانوں কাছে বিজয়ের সুসংবাদ জানাতে পাঠালেন। উসামা ইব্ন যায়দ বলেন: আমরা যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মেয়ে ও উসমান ইব্ন আফফান (রা)-এর স্ত্রী রুকায়্যার দাফনের কাজ সম্পন্ন করছিলাম, তখন সংবাদ পেলাম যে, যায়দ ইব্ন হারিসা এসেছেন। আমি তাঁর কাছে গেলাম। দেখলাম তিনি সালাত আদায় শেষ করে বসে আছেন এবং লোকেরা তাঁকে ঘিরে ধরেছে। আর তিনি বলছিলেন: উত্ত্বা, শায়বা, আবু জাহল, যামআ ইব্ন আসওয়াদ, আবুল বাখতারী, উমাইয়া ইব্ন খাল্ল্ফ, হাজ্জাজের পুত্রদ্বয় নবীহ ও মুনাব্বিহ-এরা সবাই নিহত হয়েছে। আমি বললাম: আব্বা! ঘটনা কি সত্য? তিনি বললেন, হ্যাঁ। আল্লাহর কসম! হে আমার প্রিয় পুত্র।
📄 মদীনায় প্রত্যাবর্তন
এরপর রাসূলুল্লাহ (সা) সদলবলে মুশরিক যুদ্ধবন্দীদের সাথে নিয়ে মদীনা অভিমুখে রওয়ানা হলেন। যুদ্ধবন্দীদের মধ্যে উব্বা ইব্ন আবূ মুয়াইত ও নাযর ইবন হারিসও ছিল। তিনি মুশরিকদের কাছ থেকে পাওয়া গনীমতের জিনিসপত্রও সাথে নিয়ে চললেন। তিনি আবদুল্লাহ্ ইব্ন কা'বকে গনীমতের মাল সংরক্ষণের দায়িত্বে নিযুক্ত করলেন। এ সময় مسلمانوں মধ্য থেকে আদী ইব্ন আবু জাবা (রা) নামক কবি রণোদ্দীপনামূলক নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করেন:
"হে বাস্বাস! যু-তাল্হা নামক স্থানে এ কাফেলার রাত্রি যাপনের কোন অবকাশ নেই। কাজেই উটদের চলার জন্য প্রস্তুত রাখ এবং গুমায়র প্রান্তরেও থামার কোন অবকাশ নেই। এ ধরনের লোকদের বাহনগুলোকে অনুপযুক্ত স্থানে থামিয়ে অসম্মানিত করা যায় না। কাজেই সে উটগুলোকে নিয়ে রাস্তায় চলাই বুদ্ধিমানের কাজ। আল্লাহ্ তো আমাদের সাহায্য করেছেন, আর আখনাস পালিয়ে গেছে।"
রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাফরা গিরিপথ থেকে বেরিয়ে উক্ত গিরিপথ ও নাযিয়ার মধ্যবর্তী সায়র নামক বালুর টিলার উপর এক বড় গাছের কাছে অবতরণ করলেন। সেখানে বসে তিনি مسلمانوں মধ্যে গনীমতের মাল সমভাবে বন্টন করলেন। এরপর নবী (সা) যাত্রা করে যখন রাওহা নামক স্থানে পৌঁছেন, তখন মুসলমানগণ রাসূলুল্লাহ্ (সা) এবং তাঁর সাহাবীদের আল্লাহ্ যে বিজয় দান করেছেন, সেজন্য অভিনন্দন জানাতে লাগলেন। তখন সালামা ইব্ন সুলামা (রা) বললেন: তোমরা কি জন্য আমাদের মুবারকবাদ দিচ্ছ? আল্লাহ্র কসম! আমরা তো কতকগুলো ঝানু বৃদ্ধ লোকের সাথেই যুদ্ধ করে এলাম। তারা কুরবানীর উটের মত হীনবল হয়ে গিয়েছিল। আমরা তাদের যবেহ করে রেখে আসলাম। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা) মুচকি হেসে বললেন: ভাতিজা, ওরাই তো এক সময় হর্তাকর্তা ছিল।
📄 নাযর ও উকবার হত্যা
ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন সাফরা নামক স্থানে ছিলেন, তখন নাযর ইন্ন হারিস নিহত হয়। আলী ইব্ন আবু তালিব (রা) তাকে হত্যা করেন। এরপর তিনি (সা) সেখান থেকে বের হয়ে যখন আরকু যাবিয়াতে পৌছেন, তখন উব্বা ইব্ন আবূ মুয়াইত নিহত হয়। তাকে বনূ আজলানের আবদুল্লাহ্ ইব্ন সালামা (রা) বন্দী করেছিলেন। হত্যার নির্দেশ দেয়ার পর উকবা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে জিজ্ঞেস করল: হে মুহাম্মদ! আমার ছেলেমেয়েদের দেখাশুনার জন্য কে রইল? তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: আগুন। এরপর বনু Amr ইব্ন আওফের আসিম ইন্ন সাবিত ইব্ন আবূ আফলাহ আনসারী (রা) উকবাকে হত্যা করলেন। এ স্থানে ফারওয়া ইবন Amr বায়াযীর আযাদকৃত গোলাম আবূ হিন্দ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তখন তার সাথে এক ব্যাগ 'হায়স' (পণির, খেজুর ও ঘি মিশ্রিত এক ধরনের খাবার) ছিল। তিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পারেননি, তবে পরবর্তী সকল যুদ্ধে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে শরীক হন। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চিকিৎসায় শিংগা লাগাতেন। তখন তিনি (রা) বললেন: আবূ হিন্দ একজন আনসারী। তোমরা তার বিয়ের ব্যবস্থা কর। সাহাবীরা নবী (সা)-এর নির্দেশ পালন করেন এবং এবং তার বিয়ের ব্যবস্থা করেন।
ইবন ইসহাক বলেন: এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) যাত্রা শুরু করেন এবং তিনি যুদ্ধবন্দীদের মদীনায় পৌঁছার একদিন আগেই সেখানে পৌঁছলেন। তবে ইবন ইসহাক আরো বলেন: ইয়াহইয়া ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবদুর রহমান ইব্ন আস'আদ ইব্ন যারারা সূত্রে আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবু বকর (রা) আমাকে জানিয়েছেন যে, তিনি বলেছেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) যুদ্ধবন্দীদের সাথেই মদীনায় পৌঁছেন। এ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর স্ত্রী সাওদা বিন্ত যামআ (রা), আওফ ও মুয়াওয়ায (রা), যারা বদর যুদ্ধে শহীদ হন, তাদের মা আফ্রা (রা) ও তার পরিবারের লোকদের কাছে শোকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য উপস্থিত ছিলেন। এ ঘটনা পর্দার আয়াত নাযিল হওয়ার আগের। উম্মুল মু'মিনীন সাওদ্বা (রা) বলতেন: আল্লাহ্র কসম! আমি তখনো আফরা পরিবারে ছিলাম। তখন জানলাম যে, যুদ্ধবন্দীদের নিয়ে আসা হয়েছে। আমি তখন আমার বাড়িতে ফিরে গেলাম। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তখন সেখানে ছিলেন। দেখলাম, পিঠমোড়া দিয়ে বাঁধা অবস্থায় একটি কক্ষে রয়েছে আবু ইয়াযীদ সুহায়ল ইব্ন Amr! আল্লাহর কসম! আবু ইয়াযীদকে এ অবস্থায় দেখে আমি আত্মসম্বরণ করতে পারলাম না। বললাম: হে আবু ইয়াযীদ! তোমরা আত্মসমর্পণ করলে কেন? সম্মানের সাথে মরতে পারলে না? তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাকে বললেন: হে সাওদা! তুমি কি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের বিরুদ্ধে উস্কানি দিচ্ছ? আমি অনুতপ্ত হয়ে বললাম: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)। আমি আবূ ইয়াযীদকে পিঠমোড়া দিয়ে বাঁধা দেখে নিজকে সম্বরণ করতে পারিনি, তাই এরূপ বলে ফেলেছি।
ইব্ন ইসহাক বলেন: মদীনায় পৌছে রাসূলুল্লাহ্ (সা) যুদ্ধবন্দীদের সাহাবীদের মধ্যে বন্টন করে দেন এবং বলেন: তোমরা কয়েদীদের সাথে ভাল ব্যবহারের কথা স্মরণ রাখবে। রাবী বলেন: সাহাবী মুস'আব ইবন উমায়র (রা)-এর সহোদর ভাই আবূ আযীয ইবন উমায়র ইব্ন হাশিম বন্দীদের মধ্যে ছিল। আবূ আযীয বলে : এ সময় আমার ভাই মুস'আব আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন জনৈক আনসার সাহাবী আমাকে বন্দী করে রেখেছিল। আমার ভাই আনসারকে বলেন : একে শক্ত করে বেঁধে রাখ, এর মা বিত্তশালী। সে ফিয়া দিয়ে একে ছাড়িয়ে নেবে। আবূ আযীয আরো বলে : বদর প্রান্তর থেকে বন্দী হয়ে আসার সময় আমি আনসারদের সঙ্গে ছিলাম। তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নির্দেশমত খাবার সময় আমাকে রুটি খেতে দিতেন এবং নিজেরা খেজুর খেতেন। তিনি আরো বলেন : আমি লজ্জার খাতিরে রুটি তাদের কাছে ফিরিয়ে দিতাম; কিন্তু তারা তা স্পর্শ না করে আমার কাছে ফেরত পাঠাতেন।
ইব্ন হিশام বলেন: আবূ আযীয ছিল নাযর ইবন হারিসের পরেই কুরায়শ বাহিনীর পতাকাবাহী সেনাধ্যক্ষ। মুস'আব (রা) যখন তার ভাই আবূ আযীযকে বন্দীকারী আনসার সাহাবী আবূ ইয়াসার (রা)-কে শক্ত করে তার হাত বাধার জন্য বলেন, তখন সে মুস'আব (রা)-কে জিজ্ঞেস করে: হে আমার ভাই! আমার ব্যাপারে এরূপ করার কি নির্দেশ পেয়েছেন? তখন মুস'আব (রা) বলেন: তুমি আমার ভাই নও; সে আমার ভাই।
এরপর আবূ আযীযের মা মুসলমানদের কাছে জানতে চায় যে, কত অধিক ফিদয়ার বিনিময়ে কুরায়ש বন্দীকে ছাড়া হচ্ছে? তখন তাকে বলা হল: চার হাজার দিরহাম। সে অনুযায়ী তার মা চার হাজার দিরহাম ফিদয়া স্বরূপ পাঠিয়ে তাকে মুক্ত করে নেয়।