📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 বদর যুদ্ধে ফেরেশতাদের উপস্থিতি

📄 বদর যুদ্ধে ফেরেশতাদের উপস্থিতি


ইবন ইসহাক বলেন: আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবূ বকর (রা) ইবন আব্বাস (রা) থেকে আমার কাছে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: বনু গিফারের এক ব্যক্তি আমাকে বলেছেন যে, বদরের দিন আমি ও আমার এক চাচাতো ভাই বদরের পার্শ্ববর্তী একটি পাহাড়ে উঠে বদর যুদ্ধের দৃশ্য দেখছিলাম যে, কারা হারে ও কারা জেতে। তখনও আমরা ছিলাম মুশরিক। আমরা লুটেরাদের সাথী হয়ে লুটতরাজ করার অপেক্ষায় ছিলাম। আমরা পাহাড়ে থাকা অবস্থায় এক টুকরো মেঘ আমাদের কাছে এল। আমরা সেই মেঘের ভেতর ঘোড়ার ডাক শুনতে পেলাম। আর জনৈক ব্যক্তিকে বলতে শুনলাম: হায়যুম! সামনে এগিয়ে যাও। এ সময় আমার চাচাতো ভাইয়ের হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সে মারা যায়। আমিও মরার উপক্রম হয়ে কোন রকমে বেঁচে যাই।
ইবন ইসহাক বলেন: আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবূ বকর বনূ সাঈদার জনৈক ব্যক্তি সূত্রে আমার কাছে আবু উসায়দ মালিক ইব্‌ন রবী'আ থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। বৃদ্ধ বয়সে অন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তিনি বলতেন: আজ যদি আমার দৃষ্টিশক্তি থাকত এবং আমি বদর প্রান্তরে থাকতাম, তাহলে আমি তোমাদের সেই গিরিপথটি দেখাতাম, যেখান থেকে ফেরেশতারা বেরিয়ে এসেছিল। এ ব্যাপারে আমার কোন সংশয় ও সন্দেহ নেই।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার পিতা ইসহাক ইব্‌ন ইয়াসার বনু মাযিন ইব্‌ন নাজ্জারের কতিপয় ব্যক্তির বরাতে আবূ দাউদ মাযিনী (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি বদর যুদ্ধে শরীক ছিলেন। তিনি বলেন: বদর যুদ্ধের দিন আমি এক মুশরিককে হত্যা করার জন্য তাকে ধাওয়া-করলাম। হঠাৎ দেখলাম যে, আমার তরবারির আঘাত তার শরীরে লাগার আগেই, ধড় থেকে তার মাথা পড়ে গেল। ফলে আমি স্পষ্টই বুঝতে পারলাম যে, আমি ছাড়া অন্য কেউ তাকে হত্যা করেছে।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন হারিসের আযাদকৃত গোলাম মিকসাম থেকে জনৈক নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আব্বাস (রা) সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: বদর যুদ্ধের দিন ফেরেশতারা সাদা পাগড়ী এবং হুনায়ন যুদ্ধের দিন তাঁরা লাল পাগড়ী পরিহিত ছিলেন। আর তাদের পাগড়ীর পিছনের অংশ তাদের পিঠের উপর ঝুলে ছিল।
ইব্‌ন হিশام বলেন: আমার কাছে জনৈক জ্ঞানী ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন যে, আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা) বলেছেন: পাগড়ী হল আরবদের তাজ। আর বদর যুদ্ধের দিন ফেরেশতারা সাদা পাগড়ী পরিহিত ছিলেন, যা তারা তাদের পিঠের দিকে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। তবে জিব্রীল (আ) হলুদ পাগড়ী পরে ছিলেন।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে মিকসাম সূত্রে ইব্‌ন আব্বাস (রা) থেকে জনৈক নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: ফেরেশতারা বদর ছাড়া অন্য কোন যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন নি। তবে তারা অন্যান্য যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর সংখ্যা বৃদ্ধি ও সাহায্যকারী হিসাবে অংশ গ্রহণ করতেন। তাঁরা কাউকে হত্যা করতেন না।

টিকা:
১. হায়যুম হল-জিব্রীল (আ)-এর ঘোড়ার নাম।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আবু জাহলের হত্যা

📄 আবু জাহলের হত্যা


ইবন ইসহাক বলেন: বদর যুদ্ধের দিন আবু জাহল যুদ্ধ করতে করতে এবং যুদ্ধ উন্মাদনা সৃষ্টিকারী এ কবিতা আবৃত্তি করতে করতে সামনে এগিয়ে আসে:
(কবিতা) “যে যুদ্ধে বারবার মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়, এরূপ যুদ্ধও আমার থেকে প্রতিশোধ নিতে পারে না। আমি দু'বছর বয়সের যুবক পুরুষ উটের মত শক্তিশালী, আর আমার মাতা আমাকে এ ধরনের কাজের জন্যই জন্ম দিয়েছে।"
ইবন হিশাম বলেন: বদর যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাহাবীদের মুখে উচ্চারিত হচ্ছিল: আহাদ, আহাদ, অর্থাৎ আল্লাহ্ এক, আল্লাহ্ এক।
ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন দুশমনদের মুকাবিলা থেকে মুক্ত হলেন, তখন তিনি নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে আবু জাহল ইব্‌ন হিশামকে অনুসন্ধান করতে বললেন। যুদ্ধের ময়দানে যে মুসলিম সৈনিকের সাথে সর্বপ্রথম আবু জাহলের সাক্ষাৎহয়, তিনি হলেন বনূ সালামার মু'আয ইব্‌ন Amr ইবন জামূহ। তিনি বলেন, আবু জাহলের যখন খোঁজাখুঁজি হচ্ছিল, তখন আমি শুনলাম, সে একটি ঝোপের ভেতরে লুকিয়ে আছে। তাই আমি সিদ্ধান্ত নিলাম, যেভাবেই হোক তাকে খুঁজে বের করব-ই। আমি যখন তার কাছে পৌঁছলাম, তখন তার উপর আক্রমণ চালিয়ে তার পা কেটে ফেললাম। তখন তার ছেলে ইকরামা আমাকে আঘাত করে আমার হাত কেটে ফেলল হাতখানা কেবল চামড়ার সাথে ঝুলছিল। এতে আমার যুদ্ধ করতে অসুবিধা হচ্ছিল। অগত্যা ঝুলন্ত হাতখানা পা দিয়ে চেপে ধরে টান দিয়ে ছিড়ে ফেললাম। ইবন ইসহাক বলেন: এই বীর মুহাজিদ উসমান (রা)-এর যুগ পর্যন্ত জীবিত ছিলেন।
মুআয বলেন: এরপর মুয়াওয়ায ইব্‌ন আফরা এসে আর এক আঘাত করে আবূ জাহলকে ধরাশায়ী করল। মুয়াওয়ায (রা) পরে লড়াই করে বদরেই শহীদ হন। আবদুল্লাহ্ ইবন মাসউদ (রা) বলেন: আমি যখন আবু জাহলকে ময়দানে শায়িত দেখলাম, তখনো সে বেঁচে ছিল। সে ইতিপূর্বে আমাকে মক্কায় অপদস্থ করেছিল। আমি তার ঘাড়ে পা দিয়ে চেপে ধরলাম এবং বললাম: হে আল্লাহর দুশমন! আল্লাহ্ তোকে অপদস্থ করেছেন তো? সে বলল, যাকে তোমরা প্রায় হত্যা করেছ, তার আর অপদস্থ হবার প্রশ্ন উঠে নাকি? আমাকে বল, আজ কাদের জয় হচ্ছে? আমি বললাম "জয় হচ্ছে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের।" ইব্‌ন্ন ইসহাক বলেন: ইব্‌ন মাসউদ (রা) বলতেন: আবু জাহল মৃত্যুর পূর্বে আমাকে বলেছিলেন, হে মেষের রাখাল! তুই অনেক দুর্লভ মর্যাদা লাভ করেছিস। তিনি বলেন: তারপর আমি তার মাথা কেটে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে নিয়ে গেলাম এবং বললাম: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! এই যে আল্লাহ্র দুশমন আবূ জাহলের মাথা। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: সত্যি নাকি? আমি বললাম: আল্লাহ্র কসম! সত্যি তাই। এরপর তার মাথাটা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সামনে রেখে দিলাম। তিনি তা দেখে আল্লাহ্র প্রশংসা ও শোকর করলেন।
ইব্‌ন হিশام বলেন: উমর ইবন খাত্তাব (রা) একবার সাঈদ ইব্‌ন আস (রা)-কে বললেন, যখন তিনি তাঁর পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন: "মনে হয়, তোমার মনে এরূপ ধারণা বিদ্যমান যে, আমি তোমার পিতা আসকে হত্যা করেছি। যদি তা করে থাকতাম, তবে সে জন্য তোমার কাছে কোনরূপ ওযর পেশ করতাম না। আসলে আমি আমার মামা 'আস ইব্‌ন মুগীরাকে হত্যা করেছিলাম। তোমার আব্বাও আমার সামনে পড়েছিল। তবে সে ক্ষিপ্ত ষাঁড়ের মত আমার দিকে এগিয়ে আসায় আমি দ্রুত সেখান থেকে সরে পড়ি। এরপর তাকে তার চাচাতো ভাই আলী (রা) হত্যা করেন।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 উকাশা ইব্‌ন মিহসানের ঘটনা

📄 উকাশা ইব্‌ন মিহসানের ঘটনা


ইবন ইসহাক বলেন: উকাশা ইব্‌ন মিহসান ইব্‌ন হারসান আসাদী বদরের দিন যুদ্ধ করতে করতে তাঁর তরবারি তাঁর হাতে ভেঙ্গে যায়। তখন তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে চলে আসলে তিনি তাকে একটি গাছের শেকড় দিয়ে বললেন: যাও, এটি দিয়ে যুদ্ধ কর। উকাশা সেটি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর হাত থেকে নিয়ে যেই নাড়া দিলেন, অমনি তা একটি চকচকে ধারালো লম্বা তরবারিতে পরিণত হল। मुसलमानों পরিপূর্ণ বিজয় হওয়া পর্যন্ত তিনি সেই তরবারি দিয়ে যুদ্ধ চালালেন। ঐ তরবারিটার নাম দেওয়া হয়েছিল 'আল-আওন' অর্থাৎ সাহায্য। এই তরবারি নিয়ে উকাশা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে বহু যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। আবূ বকর (রা)-এর খিলাফত আমলে মুরতাদদের বিরুদ্ধে জিহাদে অংশ নিয়ে তিনি তুলায়হা ইব্‌ খুয়ায়লিদ আসাদীর হাতে শহীদ হন। এ সময়ও সে তরবারিটি তাঁর কাছে ছিল। তুলায়হা এ সম্পর্কে বলে:
"ঐ লোকদের সম্পর্কে তোমাদের ধারণা কি, যখন তোমরা তাদের হত্যা করছ? যদিও তারা ইসলাম কবুল করেনি, তবুও কি তারা মানুষ (বাহাদুর) নয়? যদি তারা মহিলা হত, অথবা তাদের সংখ্যা দশের কম হত, তবে তারা বিষাদগ্রস্ত হত (কিন্তু ব্যাপারটি তো এরূপ নয়)। কাজেই, তোমরা আমার পুত্র হিবালকে হত্যা করে বিনা প্রতিশোধে কখনো যেতে পারবে না। আমি আমার হামালা নাম্নী-ঘোটকীর বৃক্ষকে এ ধরনের লোকদের মুকাবিলার জন্য অনেক কষ্ট দিয়েছি। নিঃসন্দেহে এ ঘোটকী অস্ত্রসজ্জিত নেতাদের বারবার মুকাবিলার জন্য আহবান করে। কোনদিন তাকে তুমি পোশাকের মাঝে নিরাপদ, আবার কোনদিন তাকে পোশাকবিহীন অবস্থায় দেখতে পাবে। সেই সন্ধ্যার কথা স্মরণ কর, যখন আমি ইব্‌ন আকরাম এবং উকাশা গানামীকে যুদ্ধের ময়দানে হত্যা করেছিলাম।
ইবন ইসহাক বলেন: বদর যুদ্ধের পর এক পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: আমার উম্মত থেকে সত্তর হাজার লোক কিয়ামতের দিন পূর্ণিমার চাঁদের মত উজ্জ্বল চেহারা নিয়ে বেহেস্তে যাবে। তখন উকাশা বললেন ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আপনি দু'আ করুন, যেন আল্লাহ্ আমাকে এঁদের অন্তর্ভুক্ত করেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তুমি তাদেরই একজন। অথবা তিনি বলেছিলেন: ইয়া আল্লাহ্! আপনি একে তাদের অন্তর্ভুক্ত করুন। এ কথা শুনে জনৈক আনসারী সাহাবী দাঁড়িয়ে বললেন ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আমার জন্যও আল্লাহ্ কাছে দু'আ করুন, যেন তিনি আমাকেও তাদের অন্তর্ভুক্ত করেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তোমার আগে উকাশা এ সম্মান অর্জন করেছে এবং এই দু'আ কার্যকর হয়েছে।
আর একবার রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: আরবের শ্রেষ্ঠ ঘোড় সওয়ার যোদ্ধা আমাদের কাছে রয়েছে। সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! সেই লোকটি কে? তিনি বললেন: উকাশা ইব্‌ন মিহসান। এ সময় উকাশার সগোত্রীয় সাহাবী যিরার ইব্‌ন আযওয়ার আসাদী বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! এই ব্যক্তি তো আমাদের গোত্রের লোক। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: সে তোমাদের নয়; বরং মৈত্রী সূত্রে সে আমাদের লোক।
ইবন হিশাম বলেন: যুদ্ধের ময়দানে আবু বকর (রা) তাঁর ছেলে আবদুর রহমানকে ডেকে বলেন: “ওহে দূরাত্মা, আমার জিনিসপত্র কোথায়?" সেদিন আবদুর রহমান মুশরিকদের সাথে যুদ্ধে এসেছিল। আবদুর রহমান বলে: তেজী ঘোড়া, হাতিয়ার এবং বিভ্রান্ত বৃদ্ধদের হত্যাকারী তরবারি ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 বদর কূপে মুশরিকদের লাশ নিক্ষেপ

📄 বদর কূপে মুশরিকদের লাশ নিক্ষেপ


ইবন ইসহাক বলেন: ইয়াযীদ ইব্‌ন্ন রুমান উরওয়া ইন্ন খুবায়র সূত্রে আয়েশা (রা) থেকে আমার কাছে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নির্দেশমত নিহত মুশরিকদের বদর কূপে নিক্ষেপ করা হল। তবে উমাইয়া ইব্‌ন খালফের লাশ কূপে নিক্ষেপ করা হল না। কেননা তার লাশ তার বর্মের মধ্যে ফুলে ফেঁপে আটকে গিয়েছিল।
সাহাবীগণ তার লাশ সরাবার জন্য চেষ্টা করলে তার গোস্ত ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে লাগল। এ অবস্থা দেখে তাঁরা তাকে যেমন ছিল তেমনভাবে রেখে মাটি ও পাথর চাপা দিলেন। কুয়ার মধ্যে লাশগুলো নিক্ষেপ করার পর রাসূলুল্লাহ্ দাঁড়িয়ে বললেন:
হে কূপের অধিবাসীগণ! তোমাদের রব তোমাদের জন্য যা ওয়াদা করেছিলেন, তা কি তোমরা সত্য পেয়েছ? আমার সঙ্গে আমার রব যা ওয়াদা করেছিলেন, তা আমি সত্য পেয়েছি। রাবী বলেন: তখন সাহাবীগণ বলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আপনি কি মৃতদের সাথে কথা বলছেন? তখন তিনি তাদের বললেন: তারা এখন ভালভাবে জেনেছে যে, তাদের রব তাদের সাথে যে ওয়াদা করেছিলেন, তা সত্য।
ইবন ইসহাক বলেন: হামিদ তবীল আনাস ইবন মালিক (রা) থেকে আমার কাছে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাহাবীগণ তাঁকে মধ্যরাতে এরূপ বলতে শোনেন: হে কূপবাসীরা! হে উতবা ইব্‌ন রবী'আ, হে শায়বা ইব্‌ন রবী'আ, হে উমাইয়া ইব্‌ন খালফ, হে আবু জাহল ইব্‌ন হিশাম! এভাবে তিনি কূপের মধ্যকার সকলের নাম উল্লেখ করে বলেন: তোমাদের রব তোমাদের কাছে যে ওয়াদা করেছিলেন, তা কি সত্য পেয়েছ? আমার রবের প্রতিশ্রুতি আমি সত্য পেয়েছি। তখন মুসলমানগণ বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! মরে পচে যাওয়া ঐসব লোককে আপনি সম্বোধন করছেন? রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: আমি যা বলছি, তা তোমরা তাদের চাইতে বেশি শুনছ না। কিন্তু তারা আমার কথার জবাব দিতে পারছে না।
ইবন ইসহাক বলেন: কোন কোন বিজ্ঞজন আমাকে বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এ কথাগুলোও বলেছিলেন: হে কুয়ার অধিবাসীরা। তোমরা তোমাদের নবীর সঙ্গে আত্মীয় হিসাবেও জঘন্যতম আচরণ করেছিলে। তোমরা আমাকে প্রত্যাখ্যান করেছিলে কিন্তু দেশবাসী আমাকে মেনে নিয়েছে। তোমরা আমাকে আমার জন্মভূমি থেকে বহিষ্কার করেছিলে, কিন্তু অন্য লোকেরা আমাকে আশ্রয় দিয়েছে। তোমরা আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলে, কিন্তু অন্য লোকেরা আমাকে সাহায্য করেছিল। তারপর তিনি বললেন: তোমাদের রব তোমাদের সঙ্গে যা ওয়াদা করেছিলেন, তা কি তোমরা সত্য পেয়েছ? এ সম্পর্কে কবি হাসান ইব্‌ন সাবিত (রা) বলেন:
"আমি টিলার উপর অবস্থিত যয়নবের আবাসস্থল এমনভাবে চিনলাম, যেমন খারাপ কাগজের উপর হস্তাক্ষর চেনা যায়। সে বাসগৃহের উপর বাতাস প্রবাহিত হয় এবং তার উপর কালমেঘ প্রচুর পরিমাণে বৃষ্টি বর্ষণ করে। তার চিহ্ন পুরাতন হয়ে গেছে এবং তা বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। এখানেই এক সময় আমার প্রেমিকা বসবাস করত। সব সময় সে বাসগৃহের কথা স্মরণ রাখার অভ্যাস পরিহার কর এবং নিজের ব্যথিত হৃদয়ের বেদনা প্রশমিত কর। ঐ সমস্ত কল্পকাহিনী বাদ দিয়ে সত্য ঘটনা শোনাও, যা শোনাতে কোন আপত্তি নেই। শুনিয়ে দাও যে, সর্বশক্তিমান আল্লাহ্ বদর যুদ্ধে আমাদের মুশরিকদের মুকাবিলায় বিজয়ী করেছেন। সেদিন তাদের দলকে হেরা পর্বতের মত মনে হচ্ছিল, কিন্তু তার ভিত অপরাহ্নে ঝুঁকে পড়ল। আমরা এমন এক বাহিনী নিয়ে তাদের মুকাবিলা করেছি, যাদের যুবক ও বৃদ্ধ সকলে জঙ্গলের সিংহের মত ছিলেন। এঁরা যুদ্ধের লেলিহান শিখার মধ্যে মুহাম্মদ (সা)-কে হিফাযত করেন। তাঁদের হাতে ছিল বাঁটওয়ালা তরবারি এবং মোটা মোটা গিরাবিশিষ্ট বল্লম। বনূ আওসের সর্দারদের সত্য দীনের ব্যাপারে বনূ নাজ্জার সাহায্য করেছে। আর আমরা আবূ জাহলকে ধরাশায়ী করেছি এবং উতবাকে মাটির উপর ফেলে রেখেছি। আর শায়বাকে আমরা এমন লোকদের মধ্যে নিক্ষেপ করেছি, যদি তাদের বংশ পরিচয় দেওয়া হয়, তবে তারা সম্ভ্রান্ত বংশের লোক হিসাবে পরিগণিত হবে; (কিন্তু আক্ষেপ! এখন তাদের বংশ পরিচয় কে জিজ্ঞেস করবে?) আমরা যখন তাদের সবাইকে কূপের মধ্যে নিক্ষেপ করলাম, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের সম্বোধন করে বলেন: তোমাদের কি জানা ছিল না যে, আমার কথা সত্য ছিল; আর আল্লাহ্র নির্দেশ হৃদয়কে প্রভাবিত করে। কিন্তু তারা কিছুই বলল না, যদি তারা কথা বলত তবে অবশ্যই বলত যে, আপনি সত্যই বলেছিলেন এবং আপনার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল।"
ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন মুশরিকদের লাশ কূপের মধ্যে নিক্ষেপ করার নির্দেশ দেন, তখন উত্তা ইন্ন রবী'আর লাশ টেনে কূপের কাছে আনা হল। এ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার ছেলে আবু হুযায়ফার (যিনি ইতিপূর্বে ইসলাম গ্রহণ করে মুসলিম বাহিনীর পক্ষে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন) মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলেন যে, সে মর্মাহত এবং তার চেহারার রং পরিবর্তন হয়ে গেছে। তখন নবী (সা) বললেন: সম্ভবত তোমার পিতার অবস্থা দেখে তোমার অন্তরে কিছু ভাবান্তর সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বললেন: না, আল্লাহর কসম, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আমি আমার পিতার কুফরী ও হত্যার ব্যাপারে কখনো সন্দেহ করিনি; তবে আমি আমার পিতাকে যথেষ্ট জ্ঞানী, বুদ্ধিমান, সহিষ্ণু এবং উন্নত গুণের অধিকারী বলে জানতাম। সে জন্য আশা করেছিলেনাম যে, এসব গুণ-বৈশিষ্ট্য আমার পিতাকে ইসলামের পথে নিয়ে যাবে। কিন্তু আমি যখন দেখলাম যে, আমার পিতা শেষ পর্যন্ত কুফরী নিয়েই মারা গেল, তখন আমার মনের আশা পূর্ণ না হওয়ায় আমি মর্মাহত হলাম। একথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর কল্যাণের জন্য দু'আ করলেন এবং তাঁর প্রশংসা করলেন।
ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কায় থাকাকালে কতিপয় যুবক ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তিনি হিজরত করে মদীনায় যাওয়ার পর তাদের বাপ-দাদা ও বংশের লোকেরা তাদের বন্দী করে রাখে এবং দীন-ইসলাম পরিত্যাগের জন্য তাদের উপর নির্যাতন চালায়। ফলে তারা ইসলাম ত্যাগে বাধ্য হয়। পরে তারা তাদের গোত্রের লোকদের সাথে বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে এবং সকলে মারা যায়। তাদের সম্পর্কে সূরা নিসার এই আয়াত নাযিল হয়:
"যারা নিজেদের উপর যুলুম করে, তাদের প্রাণ গ্রহণের সময় ফেরেশতাগণ বলে, "তোমরা কী অবস্থায় ছিলে?" তারা বলে "দুনিয়ায় আমরা অসহায় ছিলাম।" ফেরেশতারা বলে, দুনিয়া কি এমন প্রশস্ত ছিল না, যেখানে তোমরা হিজরত করতে? এদেরই আবাসস্থল জাহান্নাম আর তা কত মন্দ আবাস!" (৪: ৯৭)
এসব যুবকের পরিচয় হচ্ছে বনূ আসাদ ইব্‌ন আবদুল উয্যা ইব্‌ন কুসাই-এর হারিস ইব্‌ন যাম'আ ইব্‌ন আসওয়াদ ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিব ইব্‌ন আসাদ; বনূ মাখযূমের আবু কায়স ইব্‌ন ফাকিহ ইব্‌ন মুগীরা ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ ইবন উমর ইব্‌ন মাখযূম; আবূ কায়স ইব্‌ন ওয়ালীদ ইবন মুগীরা ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ ইবন উমর ইব্‌ন মাখযূম আর বনূ যুমাহের আলী ইব্‌ন উমাইয়া ইব্‌ন খাল্‌ল্ফ ইব্‌ন ওয়াহব হুযাফা ইব্‌ন যুমাহ এবং বনূ সাহমের আস ইব্‌ন মুনাব্বিহ ইব্‌ন হাজ্জাজ ইব্‌ন আমির ইবন হুযায়ফা ইবন সা'দ ইব্‌ন সাহম।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00