📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দু'আ

📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দু'আ


ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) কাতার ঠিক করে তাঁর তাঁবুতে ফিরে গেলেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে আবু বকর সিদ্দীক (রা) ছাড়া আর কেউ ছিলেন না। এ সময় তিনি আল্লাহর কাছে প্রতিশ্রুত সাহায্যপ্রাপ্তির জন্য দু'আ করছিলেন। তিনি বলছিলেন: ইয়া আল্লাহ্! আজ যদি আপনি এ দলকে ধ্বংস করেন, তা হলে আপনার ইবাদত করার জন্য পৃথিবীতে কেউ থাকবে না। এ সময় আবূ বকর (রা) বললেন: হে আল্লাহর নবী! আপনি কম দু'আ করুন। কারণ আল্লাহ্ আপনাকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তা তিনি অবশ্যই পূরণ করবেন।
এ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর তাঁবুর মধ্যে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েন। এরপর তিনি জাগ্রত হয়ে বলেন: "হে আবুবকর। সুসংবাদ গ্রহণ কর। আল্লাহর সাহায্য এসে গেছে। এই তো জিবরীল, তিনি ঘোড়ার লাগাম ধরে আছেন, আর তাঁর ঘোড়ার সামনের দাঁতগুলো ধূলাময়লাযুক্ত।"

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 মুসলমানদের মধ্যে প্রথম শহীদ

📄 মুসলমানদের মধ্যে প্রথম শহীদ


ইবন ইসহাক বলেন: এ সময় কাফিরদের পক্ষ থেকে একটি তীর এসে উমর ইবন খাত্তাব (রা)-এর আযাদকৃত গোলাম ‘মিহজা’-এর শরীরে বিদ্ধ হয়। ফলে তিনি শহীদ হন। ইনি হলেন বদর যুদ্ধে مسلمانوں মধ্যে প্রথম শহীদ। এরপর আদী ইব্‌ন নাজ্জার গোত্রের হারিসা ইব্‌ন সুরাকা নামক সাহাবীর প্রতি তীর নিক্ষিপ্ত হয়। এ সময় তিনি হাওযে পানি পান করছিলেন। নিক্ষিপ্ত তীর তাঁর গলায় বিদ্ধ হলে তিনিও শহীদ হন।
ইবন ইসহাক বলেন: এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) মুহাহিদ বাহিনীর দিকে এগিয়ে গেলেন এবং তাঁদের যুদ্ধের জন্য অনুপ্রাণিত করে বললেন: "ঐ মহান সত্তার কসম, যাঁর হাতে মুহাম্মদের জীবন! আজ যে ব্যক্তি কাফিরদের বিরুদ্ধে সবরের সঙ্গে, সাওয়াবের প্রত্যাশায় যুদ্ধ করবে এবং সামনে অগ্রসব হবে, কোন অবস্থায় পিছু হটবে না, এমতাবস্থায় যদি সে শহীদ হয়, তবে আল্লাহ্ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন।" এ সময় সালামা গোত্রের উমর ইবন হুমাম (রা) হাতে কয়েকটি খোরমা নিয়ে খাচ্ছিলেন। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কথা শুনেই বললেন: বাহ্! বাহ! আমি দেখছি যে, আমার এবং জান্নাতের মাঝে এতটুকু ব্যবধান রয়েছে যে, আমি কাফিরদের হাতে শহীদ হয়ে যাই।
রাবী বলেন: এই বলেই তিনি তাঁর হাত থেকে খোরমাগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে তরবারি নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে লিপ্ত হলেন এবং শহীদ না হওয়া পর্যন্ত যুদ্ধ করলেন।
ইবন ইসহাক বলেন: যুদ্ধের ময়দানে এক পর্যায়ে আওফ ইন্ন হারিস (রা) বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আল্লাহ্ তাঁর বান্দার উপর কোন্ কাজে বেশি খুশি হন? তিনি বললেন: যখন সে বর্মহীন হয়ে তার দুশমনদের উপর সর্বাত্মকভাবে আক্রমণ করে। এ কথা শুনে তিনি নিজের শরীর থেকে বর্ম খুলে ফেলে দিলেন; এরপর তাঁর তরবারি নিয়ে কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হলেন।
ইবন ইসহাক বলেন: দুই পক্ষে যখন ঘোরতর যুদ্ধ শুরু হল, তখন আবু জাহল এইরূপ দু'আ করল: “হে আল্লাহ! আমাদের মধ্যে যে আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করেছে এবং এক অজানা ধর্ম নিয়ে এসেছে, তাকে তুমি আজ সকালে ধ্বংস করে দাও." এভাবে সে নিজেই নিজের ধ্বংসের দরজা উন্মোচন করে।
ইবন ইসহাক বলেন: এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) এক মুঠ কাঁকর হাতে কুরায়শদের প্রতি মুখ করে "তাদের মুখ বিকৃত হয়ে যাক" বলে তাদের প্রতি তা নিক্ষেপ করলেন।
এরপর তিনি সাহাবীদের প্রতি নির্দেশ দিলেন: জোর হামলা চালাও। অল্পক্ষণের মধ্যেই কুরায়শ বাহিনীর চরম পরাজয় ঘটল। আল্লাহ্ مسلمانوں হাতে বড় বড় কুরায়ש নেতাকে হত্যা করালেন এবং তাদের অনেক নেতাকে বন্দী করালেন। যখন মুসলিম মুজাহিদরা কাফিরদের বন্দী করছিলেন, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁবুতে অবস্থান করছিলেন। এ সময় সা'দ ইব্‌ন মুআয (রা) একদল আনসার সাহাবী নিয়ে তার তাঁবুর সামনে তলোয়ার হাতে পাহারা দিচ্ছিলেন, যাতে শত্রুরা তাঁর উপর হামলা না করতে পারে। মুসলিম মুজাহিদুদের কাফিরদের বন্দী করতে দেখে সা'দ ইব্‌ন মুআয (রা)-এর চেহারায় অসন্তুষ্টি ফুটে উঠল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁকে লক্ষ্য করে বললেন: হে সা'দ! আল্লাহর কসম! আমার মনে হচ্ছে, মুসলিম মুজাহিদদের এ কাজে তুমি খুশি নও? তিনি বললেন: হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আজ মুশরিকদের খতম করার প্রথম সুযোগ আল্লাহ্ দিয়েছিলেন। আজ ওদের বন্দী করার চেয়ে বেশি করে হত্যা করাই ছিল আমার কাছে পসন্দনীয় কাজ।
ইবন ইসহাক বলেন: ইব্‌ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত আছে যে, এ দিন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর সাহাবীদের বলেছিলেন: আমি জানি যে, বনু হাশিমসহ আর কিছু লোককে কুরায়ש নেতারা জোর-জবরদস্তি করে যুদ্ধে নিয়ে এসেছে। আমাদের সাথে যুদ্ধ করার কোন প্রয়োজন তারা অনুভব করে না। কাজেই বনু হাশিমের কেউ তোমাদের সামনে পড়লে তাকে হত্যা করো না। আবুল বুহতারী ইব্‌ন হিশাম ইবন হারিস ইব্‌ন আসাদ-কে কেউ পেলে হত্যা করো না। কেননা তাকে জবরদস্তিভাবে যুদ্ধে আনা হয়েছে। আর আব্বাস ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিব কারো সামনে পড়লে তাকেও হত্যা করো না। কেননা তাকেও জোর করে যুদ্ধে আনা হয়েছে। এ কথা শুনে মুসলিম বাহিনীর আবু হুযায়ফা (রা) বললেন: আমরা আমাদের বাপ, ভাই, পুত্র ও আত্মীয়-স্বজনকে হত্যা করব, আর আব্বাসকে কেন ছেড়ে দেব? আল্লাহর কসম! আমার সামনে পড়লে আমি তাকে তরবারি দিয়ে আঘাত করবই। এ সংবাদ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে পৌছুলে তিনি উমর (রা)-কে বললেন: ওহে আবূ হাম্স! আল্লাহ্র রাসূলের চাচার উপর কি তরবারি চালানো যায়? উমর (রা) বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আমাকে অনুমতি দিন, আমি তরবারি দিয়ে তার গর্দান উড়িয়ে দেই। আল্লাহর কসম! আমি নিশ্চিত যে, আবূ হুযায়ফা মুনাফিক হয়ে গেছে। এ ঘটনার জন্য পরবর্তীকালে আবু হুযায়ফা প্রায়ই আফসোস করে বলতেন: বদর যুদ্ধের দিন আমার ঐ কথাটা বলার জন্য কি শাস্তি হয়, তাই ভেবে আমি শংকিত। শাহাদাত লাভের দ্বারা এর কাফ্ফ্ফারা না হওয়া পর্যন্ত আমার এ ভীতি দূর হবে না। পরবর্তীকালে ইয়ামামার যুদ্ধে তিনি শহীদ হন।
ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) আবুল বুহতারীকে হত্যা করতে নিষেধ করেছিলেন, তার কারণ এই যে, সে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মক্কায় থাকাকালে তাঁর বিরোধিতায় অন্যদের তুলনায় অধিক সংযত ছিল। সে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে কষ্ট দিত না। আর তার থেকে এমন কোন কাজ প্রকাশ পায়নি, যা রাসূলুল্লাহ্ (সা) অপসন্দ করতেন। আর বনু হাশিম ও বনূ মুত্তালিবকে আবূ তালিবের গিরিসংকটে অন্তরীণ রেখে যে নির্দেশনামা কুরায়শ নেতারা জারী করেছিল, সে নির্দেশনামা ছিন্নকারী নেতাদের মধ্যে আবুল বুহ্তারী ছিল অন্যতম। এরপর মুজাযযার ইব্‌ন যিয়াদ বালাবী (রা) নামক এক মুসলিম যোদ্ধার সংগে রণাঙ্গণে আবুল বৃহত্তারীর সাক্ষাৎ হল। তিনি আবুল বুহ্তারীকে বললেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) তোমাকে হত্যা করতে আমাদের নিষেধ করেছেন। তখন আবুল বুহাবীর সাথে তার এক বন্ধুও ছিল। সেও মক্কা থেকে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে একই উটের পিঠে চড়ে বদরের ময়দানে এসেছিল। তার নাম ছিল জুনাদা ইব্‌ন মুলায়হা। তখন আবুল বুহ্তারী বলল: আর আমার বন্ধুর কি হবে? মুজাযযার (রা) তাকে বললেন: আল্লাহ্র কসম! আমরা তোমার বন্ধুকে কিছুতেই ছাড়ব না। রাসূলুল্লাহ্ (সা) শুধু তোমাকে ছাড়তে বলেছেন। তখন আবুল বুত্তারী বলল: আল্লাহ্র কসম! তা হলে আমরা দু'জনই মরব। নচেৎ মক্কার মহিলারা বলবে যে, আমি বাঁচার লোভে নিজের সহযোদ্ধা বন্ধুকে অসহায় ছেড়ে দিয়েছি। এরপর যখন মুজাযযার (রা) আবুল বুহ্তারীকে মুকাবিলার জন্য আহ্বান করল এবং যুদ্ধ ছাড়া বিকল্প আর কিছুই রইল না, তখন আবুল বুহারী রণ-উদ্দীপক কবিতার অংশ আবৃত্তি করল: একজন সম্ভ্রান্ত মহিলার সন্তান কখনো তার বন্ধুকে অসহায়ভাবে তার শত্রুর হাতে সমর্পণ করবে না; হয় সে নিজে মারা যাবে, নয়তো তার বন্ধুর জন্য বাঁচার কোন পথ বের করবে। এরপর মুজাযযার (রা) এবং আবুল বুত্তারীর মধ্যে লড়াই হলে মুজাযযার (রা) তাকে হত্যা করেন।
মুজায্যার (রা) আবুল বুহত্তারীর হত্যা সম্পর্কে বলেন (কবিতা): "যদি তুমি আমার বংশ সম্পর্কে না জান বা ভুলে থাক, তবে তুমি আমার বংশ সম্পর্কে ভালভাবে জেনে রাখ যে, আমি বালাবী সম্প্রদায়ের লোক। যারা ইয়াযানে তৈরি তীর দ্বারা যুদ্ধ করে থাকে এবং প্রতিপক্ষের নেতারা পরাভূত না হওয়া পর্যন্ত তারা তাদের উপর আঘাত হানতে থাকে। বৃহত্তারীর সন্তানদের ইয়াতীম হওয়ার সংবাদ জানিয়ে দাও কিংবা আমার সন্তানদের এ ধরনের সুসংবাদ শুনিয়ে দাও। আমি সেই ব্যক্তি, যার সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে যে, আমার আসল বংশ হল-বালাবী গোত্র। আমি তীর দিয়ে ততক্ষণ যুদ্ধ করি, যতক্ষণ না তা বাঁকা হয়ে যায়। আমি আমার প্রতিদ্বন্দ্বীকে প্রাচ্যের তৈরি তরবারি দিয়ে হত্যা করি। আর আমি মৃত্যুর জন্য ঐ উষ্ট্রীর মত ছটফট করি, যার স্তনে দুধ জমাট বেঁধে গেছে। তুমি মুজায্যার-কে বেহুদা কথা বলতে দেখবে না (অর্থাৎ আমি যা বলি, তা বাস্তবে করে থাকি)।
ইবন ইসহাক বলেন: এরপর মুজায্যার (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে এসে বললেন: "ঐ যাতের কসম! যিনি আপনাকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, আমি তাকে বন্দী করে আপনার কাছে আনার জন্য অনেক চেষ্টা করেছি, কিন্তু সে আমার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাকে শ্রেয় মনে করে। ফলে আমি তার সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হই এবং তাকে হত্যা করি।"
ইব্‌ন হিশামে বলেন: আবুল বুহ্তারীর নাম হল- 'আস ইব্‌ন হিশাম ইব্‌ন হারিস ইব্‌ন আসাদ।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 উমাইয়া ইব্‌ন খালফের হত্যা

📄 উমাইয়া ইব্‌ন খালফের হত্যা


ইবন ইসহাক বলেন: আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ বলেন, উমাইয়া ইন্ন খাল্‌ল্ফ মক্কায় আমার বন্ধু ছিল। আমি মুসলমান হওয়ার পর যখন আমার আগের নাম আব্দ Amr বদলে আবদুর রহমান রাখলাম, তখন উমাইয়া আমাকে বলল তুমি তোমার বাপ-মার রাখা নামটা বাদ দিলে? আমি বললামঃ হ্যাঁ। সে বললঃ আমি রহমানকে জানি না। কাজেই তুমি তোমার এমন একটা নাম রাখ, যে নামে আমি তোমাকে ডাকতে পারি। তোমার অবস্থা এই যে, আমি যদি তোমাকে তোমার আগের নামে ডাকি, তবে সে ডাকে তুমি সাড়া দাও না। আর আমার অবস্থা এই যে, তোমাকে আমি এমন নামে ডাকতে প্রস্তুত নই, যে নামের সাথে আমার পরিচয় নেই। আবদুর রহমান (রা) বলেনঃ বস্তুত সে যখন আমাকে আব্দ Amr বলে ডাকত, তখন সে ডাকে আমি সাড়া দিতাম না। এরপর আমি তাকে বললামঃ হে আবু আলী! তোমার পসন্দ মত একটা নাম নির্ধারণ করে নাও। তখন সে বললঃ তা হলে তোমার নাম হল-আব্দ ইলাহ। তখন আমি বললামঃ ঠিক আছে। এরপর আমি যখনই তার পাশ দিয়ে যেতাম, তখন সে বলত: হে আবদ ইলাহ্! আমি তার এ ডাকে সাড়া দিতাম এবং তার সাথে কথা বলতাম।
বদরের যুদ্ধের দিন আমি যখন তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন সে তার ছেলে আলী ইব্‌ন উমাইয়ার হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিল। এ সময় আমার সঙ্গে কয়েকটি লৌহবর্ম ছিল, যা আমি নিহত শত্রুর থেকে পেয়েছিলাম। এগুলো নিয়ে যাওয়ার সময় সে আমাকে দেখে আব্দ Amr বলে ডাক দিলে আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম না। এরপর সে আমাকে আব্দ ইলাহ্ বলে ডাকলে আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম। তখন সে আমাকে বললঃ তুমি আমার ব্যাপারে কি চিন্তা করছ? তোমার সঙ্গে যে বর্মগুলো আছে তার চাইতে আমি তোমার জন্য উত্তম না? আমি বললাম হ্যাঁ, আল্লাহর কসম! এতো খুশির কথা। তখন বর্ম ফেলে দিয়ে উমাইয়া এবং তার ছেলের হাত ধরলাম। তখন সে বললঃ আজকের দিনের মত আর কোনদিন আমি দেখিনি। তোমাদের কি দুগ্ধবতী উটের প্রয়োজন নেই? আবদুর রহমান (রা) বলেনঃ এরপর আমি এদের দু'জনকে নিয়ে চললাম। এ সময় উমাইয়া ইব্‌ন খাল্‌ফ আমাকে জিজ্ঞেস করলঃ ঐ ব্যক্তি কে, যে তার বুকে উটপাখির পালক লাগিয়ে রেখেছে? আমি বললামঃ তিনি হলেন হামযা ইব্‌ন আবদুর মুত্তালিব (রা)। তখন সে বললঃ এতো সেই ব্যক্তি, যে আমাদের অনেক ক্ষতি করেছে। আবদুর রহমান (রা) বলেনঃ আল্লাহ্র কসম! এরপর আমি তাদের উভয়কে যখন টেনে নিয়ে যাচ্ছিলাম, তখন হঠাৎ বিলাল (রা) তাকে আমার সঙ্গে দেখলেন। আর এ ছিল সে ব্যক্তি, যে বিলাল (রা)-কে ইসলাম পরিত্যাগ করার জন্য বিভিন্নভাবে নির্যাতন করত। তাকে মরুভূমিতে নিয়ে যেত এবং তপ্ত বালুর উপর শুইয়ে বুকের উপর পাথর চাপা দিয়ে রেখে বলত: তুমি এ অবস্থায় থাকবে, নয় মুহাম্মদের দীন পরিত্যাগ করবে। এ সময় বিলাল (রা) 'আহাদ', 'আহাদ' বলতেন। যখন বিলাল (রা) তাকে দেখলেন, তখন তিনি বলে উঠলেনঃ এই তো কুফরীর মূল হোতা-উমাইয়া ইব্‌ন খালফ। সে বেঁচে গেলে আমার বাঁচা অর্থহীন। আবদুর রহমান ইব্‌ন আওফ বলেন, আমি বললামঃ হে বিলাল! তুমি আমার বন্দীদ্বয় সম্পর্কে এরূপ বলছ? তখন বিলাল (রা) বললেনঃ “সে বেঁচে গেলে আমার বাঁচার কোন অর্থ হয় না।”
এরপর বিলাল (রা) চিৎকার করে বললেনঃ হে আল্লাহ্র দীনের সাহায্যকারীরা! এই তো কুফরীর মূল নায়ক, উমাইয়া ইব্‌ন খাল্‌ফ সে বেঁচে গেলে আমার বাঁচা অর্থহীন। আবদুর রহমান (রা) বলেন: এরপর লোকেরা আমাদের ঘিরে ফেলল। আর আমি উমাইয়াকে বাঁচাবার চেষ্টা করছিলাম। ইতিমধ্যে একজন মুজাহিদ তার তরবারি বের করে উমাইয়ার ছেলের পায়ে আঘাত করলে সে পড়ে গেল। তা দেখে উমাইয়া এমন জোরে চিৎকার করল যে, আমি অমন চিৎকার আর কখনো শুনিনি। আমি বললাম: উমাইয়া তুমি নিজের চিন্তা কর। তোমার নিস্তার নেই। আল্লাহ্র কসম! আমি তোমাকে রক্ষা করতে পারব না। অবশেষে লোকেরা তাদের উভয়কে তরবারির আঘাতে টুকরো টুকরো করে ফেলেন। পরে আবদুর রহমান (রা) বলতেন: আল্লাহ্ বিলালের উপর রহম করুন। আমি বর্ম ফেলে দিয়ে যাকে গ্রেফতার করলাম, তাকে সে হত্যা করল।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 বদর যুদ্ধে ফেরেশতাদের উপস্থিতি

📄 বদর যুদ্ধে ফেরেশতাদের উপস্থিতি


ইবন ইসহাক বলেন: আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবূ বকর (রা) ইবন আব্বাস (রা) থেকে আমার কাছে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: বনু গিফারের এক ব্যক্তি আমাকে বলেছেন যে, বদরের দিন আমি ও আমার এক চাচাতো ভাই বদরের পার্শ্ববর্তী একটি পাহাড়ে উঠে বদর যুদ্ধের দৃশ্য দেখছিলাম যে, কারা হারে ও কারা জেতে। তখনও আমরা ছিলাম মুশরিক। আমরা লুটেরাদের সাথী হয়ে লুটতরাজ করার অপেক্ষায় ছিলাম। আমরা পাহাড়ে থাকা অবস্থায় এক টুকরো মেঘ আমাদের কাছে এল। আমরা সেই মেঘের ভেতর ঘোড়ার ডাক শুনতে পেলাম। আর জনৈক ব্যক্তিকে বলতে শুনলাম: হায়যুম! সামনে এগিয়ে যাও। এ সময় আমার চাচাতো ভাইয়ের হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সে মারা যায়। আমিও মরার উপক্রম হয়ে কোন রকমে বেঁচে যাই।
ইবন ইসহাক বলেন: আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবূ বকর বনূ সাঈদার জনৈক ব্যক্তি সূত্রে আমার কাছে আবু উসায়দ মালিক ইব্‌ন রবী'আ থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন। বৃদ্ধ বয়সে অন্ধ হয়ে যাওয়ার পর তিনি বলতেন: আজ যদি আমার দৃষ্টিশক্তি থাকত এবং আমি বদর প্রান্তরে থাকতাম, তাহলে আমি তোমাদের সেই গিরিপথটি দেখাতাম, যেখান থেকে ফেরেশতারা বেরিয়ে এসেছিল। এ ব্যাপারে আমার কোন সংশয় ও সন্দেহ নেই।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার পিতা ইসহাক ইব্‌ন ইয়াসার বনু মাযিন ইব্‌ন নাজ্জারের কতিপয় ব্যক্তির বরাতে আবূ দাউদ মাযিনী (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন, যিনি বদর যুদ্ধে শরীক ছিলেন। তিনি বলেন: বদর যুদ্ধের দিন আমি এক মুশরিককে হত্যা করার জন্য তাকে ধাওয়া-করলাম। হঠাৎ দেখলাম যে, আমার তরবারির আঘাত তার শরীরে লাগার আগেই, ধড় থেকে তার মাথা পড়ে গেল। ফলে আমি স্পষ্টই বুঝতে পারলাম যে, আমি ছাড়া অন্য কেউ তাকে হত্যা করেছে।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন হারিসের আযাদকৃত গোলাম মিকসাম থেকে জনৈক নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আব্বাস (রা) সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: বদর যুদ্ধের দিন ফেরেশতারা সাদা পাগড়ী এবং হুনায়ন যুদ্ধের দিন তাঁরা লাল পাগড়ী পরিহিত ছিলেন। আর তাদের পাগড়ীর পিছনের অংশ তাদের পিঠের উপর ঝুলে ছিল।
ইব্‌ন হিশام বলেন: আমার কাছে জনৈক জ্ঞানী ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন যে, আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা) বলেছেন: পাগড়ী হল আরবদের তাজ। আর বদর যুদ্ধের দিন ফেরেশতারা সাদা পাগড়ী পরিহিত ছিলেন, যা তারা তাদের পিঠের দিকে ঝুলিয়ে রেখেছিলেন। তবে জিব্রীল (আ) হলুদ পাগড়ী পরে ছিলেন।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে মিকসাম সূত্রে ইব্‌ন আব্বাস (রা) থেকে জনৈক নির্ভরযোগ্য ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: ফেরেশতারা বদর ছাড়া অন্য কোন যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন নি। তবে তারা অন্যান্য যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর সংখ্যা বৃদ্ধি ও সাহায্যকারী হিসাবে অংশ গ্রহণ করতেন। তাঁরা কাউকে হত্যা করতেন না।

টিকা:
১. হায়যুম হল-জিব্রীল (আ)-এর ঘোড়ার নাম।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00