📄 আবূ জাহলের হঠকারিতা
ইবন ইসহাক বলেন: আবু সুফইয়ান যখন নিশ্চিত হল যে, তার কাফেলাকে সে বাঁচিয়ে নিয়ে এসেছে, তখন সে কুরায়ש বাহিনীর কাছে এ মর্মে বার্তা পাঠাল যে, তোমরা তো তোমাদের বাণিজ্যিক কাফেলা, লোকজন ও ধনসম্পদকে রক্ষা করার জন্যই এসেছিলে। এখন এগুলোকে আল্লাহ্ রক্ষা করেছেন। কাজেই তোমরা ফিরে যাও। কিন্তু আবূ জাহল ইব্ন হিশাম বলল: আল্লাহ্র কসম! বদরে না গিয়ে ফিরব না। ওখানে তিন দিন থাকব, পশু যবেহ করে খাওয়াব, মদ পান করাব, গায়িকারা বাদ্য বাজিয়ে গান গাইবে, আরবে আমাদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়বে। আমাদের সমাবেশ ও আভিযানের কথা প্রচারিত হবে; ফলে তাদের মনে আমাদের ভীতি ও প্রতাপ চিরদিনের জন্য বদ্ধমূল হয়ে যাবে। অতএব তোমরা চল।
উল্লেখ্য যে, বদরের প্রান্তরে প্রতি বছর একটি মেলা বসত এবং তা ছিল আরবের বিখ্যাত মেলা! আর এই যুদ্ধের সময়টাও ছিল মেলার মওসুম।
আনাস ইব্ন শুরায়ক ইব্ন Amr ইব্ন ওয়াহব সাকাফী, যে ছিল বনূ যুহার মিত্র, সে জুহফাতে থাকাকালীন সময়ে তাদের বলল : হে বনু যুহরা! তোমরা তো তোমাদের বন্ধু মাগ্রামা ইবন নাওফাল এবং তার সম্পদ রক্ষার জন্য বের হয়েছিলে; আল্লাহ্ যখন তাকে ও তার সম্পদকে রক্ষা করেছেন, তখন তোমরা ফিরে যাও। এর জন্য যদি কেউ তোমাদের উপর ভীরুতার দুর্নাম চাপায়, তবে সেটা আমার উপর চাপিয়ে দিও। কারণ তোমাদের ক্ষতির যখন কোন আশংকা নেই, তখন তোমাদের যুদ্ধের জন্য যাওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। তোমরা আবূ জাহল যা বলে, তার অনুসরণ করবে না। অবশেষে তারা ফিরে যায় এবং বদর যুদ্ধে বন্ যুহরার কেউ উপস্থিত থাকল না। তাদের সকলেই আখনাসের কথা মেনে নিল। আর আখনাস ছিল তাদের মধ্যে সর্বজনমান্য ব্যক্তি।
আর বনূ যুহরার যে কয়জন গিয়েছিল, সকলে ফিরে এসেছিল। কুরায়শ গোত্রের প্রতিটি শাখা থেকে এ যুদ্ধে কিছু না কিছু লোক অংশগ্রহণ করেছিল। তবে বনূ আদী ইব্ন কা'ব ও বনূ যুহরা এতে অংশগ্রহণ করেনি। এ অভিযানে তালিব ইব্ন আবু তালিব কুরায়שদের সঙ্গে ছিল। তাকে তাদের কেউ বিদ্রুপ করে বলল : তোমরা বনু হাশিমীরা আমাদের সাথে এলেও তোমাদের মন রয়েছে মুহাম্মদের সাথে। এ কথা শুনে তালিব যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করে মক্কায় ফিরে যায়।
আর সে কবিতায় বলে : ইয়া আল্লাহ্! যদি তালিব এমন দলের সাথে যুদ্ধে বের হয়, যারা আমার বিরোধী; তাহলে তুমি তাদের ওদের মত কর, যাদের মাল লুণ্ঠিত হয়েছে। তারা যেন বিজয়ী না হয়ে পরাজিত হয়।
ইবন ইসহাক বলেন : এরপর কুরায়ש বাহিনী তাদের আয়োজন ও প্রস্তুতি অব্যাহত রাখল। তারা বদর প্রান্তরের অপেক্ষাকৃত দূরবর্তী মরুময় টিলার অপর পাশে গিয়ে তাঁবু ফেলল এবং মুসলমানরা বদর প্রান্তরে তাদের ছাউনি স্থাপন করল। এ সময়ে আল্লাহ্ প্রবল বৃষ্টি বর্ষণ করলেন। প্রান্তরের মাটি ছিল নরম ভিজা। রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও তাঁর সাহাবীরা পর্যাপ্ত বৃষ্টি পেলেন, যার ফলে তাদের যমীন শক্ত হয়ে গেল। ফলে চলাচলে তাদের কোন অসুবিধার সৃষ্টি হল না। পক্ষান্তরে কুরায়শ পক্ষের মাটি এত স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেল যে, তাদের চলাচল কঠিন হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) মুসলিম বাহিনীকে আরো বেশি পানি আছে এমন জায়গায় সারিয়ে নিলেন।
ইবন ইসহাক বলেন : বনু সালমার কিছু লোক আমাকে জানিয়েছেন যে, হুবাব ইব্ন মুনযির ইবন জামূহ (রা) বলেছিলেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! এই জায়গাটা কি আপনি আল্লাহ্র নির্দেশেই বাছাই করেছেন, যার থেকে আমরা একচুলও এদিক-ওদিক সরতে পারি না, না এটা আপনার নিজের রণ-কৌশলগত অভিমত? তিনি বললেন : "এটা নেহাৎ একটা রণকৌশল এবং আমার নিজস্ব অভিমত।" তিনি বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! এ জায়গা ভাল নয়। অতএব আপনি সবাইকে নিয়ে এখান থেকে এগিয়ে যান। আমরা ঐ কূপের কাছে গিয়ে ছাউনি স্থাপন করব, যা কুরায়שদের অতি নিকটে। এরপর আমরা সেই জায়গার আশেপাশে যে কূপ আছে, তা বন্ধ করে দেব। সেখানে একটি হাওয তৈরি করে তাতে পানি ভরে রাখব। পরে আমরা শত্রুপক্ষের সাথে লড়াই করব। তখন আমরা পানি পান করতে পারব, কিন্তু ওরা পারবে না। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তুমি ঠিকই বলেছ। এরপর তিনি সবাইকে নিয়ে উঠলেন এবং কুরায়শদের নিকটে অবস্থিত কূপের কাছে পৌছলেন, আর সেখানে তাঁবু ফেললেন। তারপর নবী (সা)-এর নির্দেশে অন্যান্য কূপ বন্ধ করে দেওয়া হল। তিনি যে কূপের কাছে তাঁবু ফেললেন, তার কাছে একটি হাওয তৈরি করে পানি ভরে রাখলেন এবং তাতে পানির পাত্র ফেলে রাখলেন।
ইবন ইসহাক বলেন: সা'দ ইব্ন মু'আয বললেন হে আল্লাহর নবী! আপনি আমাদের অনুমতি দিন, আমরা আপনার জন্য একটা সুরক্ষিত তাঁবু বানাই, আপনি তার ভেতরে থাকবেন। আমরা আপনার কাছে আপনার সওয়ারী জন্তুগুলো প্রস্তুত রাখব। তারপর আমরা শত্রুর মুকাবিলা করব। আল্লাহ্ যদি আমাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে বিজয়ী করেন, তাহলে আমাদের আশা পূরণ হবে। আর যদি তা না হয়, তবে আপনি আপনার সওয়ারী জন্তুর পিঠে চড়ে অন্য مسلمانوں কাছে চলে যাবেন। হে আল্লাহর নবী! বহু সংখ্যক মুসলমান, যারা আমাদের চেয়ে আপনাকে কম ভালোবাসেন না, তারা শুধু এ জন্য আসতে পারেননি যে, আপনি যুদ্ধে যাবেন তা তারা জানেন না। তারা যদি এটা জানতেন, তাহলে তারা অবশ্যই আপনার সঙ্গে জিহাদে শরীক হতেন। আল্লাহ্ তাদের দ্বারা আপনাকে রক্ষা করবেন। তারা আপনার কল্যাণকামী হবেন এবং আপনার সঙ্গী হয়ে জিহাদে অংশগ্রহণ করবেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) সা'দ-এর কথা শুনে খুশি হলেন এবং তাঁর জন্য দু'আ করলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জন্য সুরক্ষিত তাঁবু তৈরি করা হল এবং তিনি তার মধ্যে অবস্থান করতে লাগলেন।
ইন্ন ইসহাক বলেন: সকালবেলা কুরায়শ বাহিনী তাদের অবস্থান থেকে বেরিয়ে এল। তাদের নামতে দেখেই রাসূলুল্লাহ্ (সা) দু'আ করলেন: "ইয়া আল্লাহ্! এই সেই কুরায়ש, যারা অহংকারের সাথে আপনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও আপনার রাসূলকে অস্বীকার করে, আজ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। হে আল্লাহ্! আপনি যে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি আমাকে দিয়েছেন, আমি তার প্রার্থী। হে আল্লাহ্! আজ সকালেই ওদেরকে ধ্বংস করে দিন।"
একটা লাল উটের পিঠে চড়া উত্তা ইব্ন রবী'আকে দেখে রাসূলুল্লাহ (সা) মন্তব্য করলেন: গোটা কুরায়শ গোত্রের কোন ব্যক্তির মধ্যে যদি কিছুমাত্র শুভবুদ্ধি থেকে থাকে, তবে এই লোকটার মধ্যে তা আছে। লোকেরা যদি তার কথা শোনে, তাহলে তারা সঠিক পথের সন্ধান পাবে।
কুরায়শ বাহিনী বদরের ময়দানে যাওয়ার সময় পথিমধ্যে খুফাফ ইব্ন আয়মা ইব্ন রাহাযা গিফারী তার ছেলের মাধ্যমে কয়েকটি যবেহ করা জন্তু তাদের জন্য উপহার স্বরূপ পাঠিয়ে দিল এবং বলল: তোমাদের প্রয়োজন থাকলে আমরা কিছু অস্ত্র ও যোদ্ধা দিয়ে সাহায্য করতে পারি। এর জবাবে কুরায়শ নেতারা তার ছেলের মাধ্যমে বলে পাঠাল: আত্মীয়তার খাতিরে তোমার যা করণীয় ছিল, তা'তুমি করেছ, আমার জীবনের কসম! এখন আমরা যে যুদ্ধে যাচ্ছি, তা যদি মানুষের বিরুদ্ধে হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের শক্তির কোন কমতি নেই। আর যদি মুহাম্মদের কথামত এ যুদ্ধ আল্লাহর বিরুদ্ধে হয়ে থাকে, তা হলে আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করার শক্তি কারো নেই।
এরপর সবাই যখন ময়দানে নামল, তখন কুরায়শের একটি দল সামনে অগ্রসর হয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বানানো হাওযের পানি নিতে লাগল। তাদের মধ্যে হাকীম ইব্ন হিযامও ছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাহাবীদের বললেন: ওদেরকে বাধা দিও না। বস্তুত সেদিন ঐ হাওয থেকে যে-ই পানি পান করেছে, সে-ই নিহত হয়েছে। একমাত্র হাকীম ইব্ন হিযাম ছাড়া। সে নিহত হয়নি। পরে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ভালো মুসলমান হন। এ ঘটনাকে তিনি আজীবন মনে রেখেছিলেন। কখনো জোরদার কসম খেতে হলে তিনি বলতেন: সেই মহান সত্তার কসম! যিনি আমাকে বদর যুদ্ধের দিন ধ্বংস থেকে রক্ষা করেছেন।
ইবন ইসহাক বলেন: যখন কুরায়শরা নিশ্চিত হয়ে তাদের শিবিরে অবস্থান গ্রহণ করল, তখন তারা উমায়র ইব্ন ওয়াহব জুমাহীকে মুসলিম বাহিনীর সংখ্যা নির্ণয় করতে পাঠাল। সে ঘোড়ায় চড়ে মুসলিম বাহিনীর চারপাশ দিয়ে একটা চক্কর দিয়ে ফিরে গিয়ে বলল: তিন'শর সামান্য কিছু বেশি বা কম হতে পারে। তবে আমাকে আর একটু সময় দাও, দেখ আমি ওদের কোন গুপ্ত ঘাঁটি বা সাহায্যকারী আছে কিনা। এরপর সে সমস্ত প্রান্তর ঘুরে দেখল। কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না। অবশেষে সে ফিরে গিয়ে বলল: কোন কিছুর সন্ধান পেলাম না। তবে তাদের হাবভাব দেখে মনে হয়, তারা একেবারে মরণপণ করে এসেছে। ইয়াসরিবের উটগুলো সুনিশ্চিত মৃত্যু বহন করে এনেছে। ওরা এমন একটা দল, যাদের তরবারিই একমাত্র সহায় ও রক্ষক। আল্লাহ্ কসম! আমি নিশ্চিত যে, ওদের একজন নিহত হলে, তার বদলায় তোমাদের একজন নিহত হবেই। তারা কুরায়শের মধ্য থেকে যখন তাদের সম-সংখ্যক মানুষকে হত্যা করবে, তখন তা আর আমাদের জন্য কল্যাণকর হবে না। কাজেই তোমরা এখনো ভেবে দেখ।
হাকীম ইব্ন হিযাম এ কথা শুনে কুরায়ש বাহিনীর নেতাদের কাছে গেল। প্রথমে সে উত্তা ইন্ন রাবী'আকে গিয়ে বলল: “হে ওয়ালীদের পিতা! আপনি কুরায়শের একজন প্রবীণ নেতা। আপনাকে সবাই মানে। আপনি কি এমন একটা কাজ করতে রাযী হবেন, যা করলে আপনি চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন? সে বলল হাকীম, তুমি কি বলতে চাচ্ছ? হাকীম বলল: আপনি কুরায়শ বাহিনীকে ফিরিয়ে নিয়ে যান এবং আপনার মিত্র Amr ইব্ন হাযরামীর হত্যাকাণ্ড ব্যাপারটা মিটিয়ে দেয়ার দায়িত্ব নিন। উত্তা বলল: তা আমি করতে রাযী। সে ব্যাপারে আমি তোমার অনুরোধ রাখতে প্রস্তুত। হাযরামী আমার মিত্র এবং তার রক্তপণ আদায় করার এবং তার সম্পদের ক্ষতিপূরণ করে দেওয়ার দায়িত্ব আমার। তুমি আবূ জাহলের কাছে যাও। আমি মনে করি, কুরায়শের বিনাযুদ্ধে ফিরিয়ে নেয়ার প্রশ্নে সে ছাড়া আর কেউ বিরোধিতা করবে না। এরপর উত্তা দাঁড়িয়ে কুরায়ש বাহিনীর উদ্দেশ্যে নিম্নরূপ ভাষণ দিল:
"আল্লাহ্র কসম! হে কুরায়ש জনতা! মুহাম্মদ ও তাঁর সংগীদের সাথে লড়াই করে তোমাদের কোন লাভ হবে না। আজ যদি তোমরা তাঁকে হত্যা করতে সক্ষম হও, তা হলে তোমাদের ভেতরে কোন সদ্ভাব থাকবে না। একজন আর একজনের মুখ দেখা পসন্দ করবে না। কেননা সে তার চাচাতো ভাই, খালাতো ভাই কিংবা অন্য কোন না কোন আত্মীয়ের হত্যাকারী বলে চিহ্নিত হবে। সুতরাং চল আমরা ফিরে যাই এবং মুহাম্মদ ও তাঁর সহচরদের পথ থেকে সরে দাঁড়াই। তাদের ব্যাপারটা তোমরা আরব জনগণের উপর ছেড়ে দাও। যদি তারা তাঁকে হত্যা করে, তা হলে তো তোমাদের উদ্দেশ্যই সিদ্ধ হবে। আর তা না হলে মুহাম্মদের কাছে আমরা অন্তত নির্দোষ থাকব।"
হাকীম বলেন: তারপর আমি আবু জাহলের কাছে গেলাম এবং দেখলাম যে, সে তার বর্ম সিন্দুক থেকে বের করে পরিষ্কার করছে। সে তাকে বলল: "হে আবুল হাকাম! উত্তা আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছে। এরপর আমি উত্ত্বা আমাকে যা বলেছিলেন, তা তাকে জানালাম। আবু জাহল বলল: আল্লাহ্র শপথ! উদ্বার মাথা তখন থেকে খারাপ হয়ে গেছে, যখন সে মুহাম্মদ এবং তাঁর সংগীদের দেখেছে। আল্লাহ্র কসম! এটা কখনো হতে পারে না। যতক্ষণ আল্লাহ্ আমাদের ও মুহাম্মদের ব্যাপারে চূড়ান্ত ফায়সালা না করে দেন, ততক্ষণ আমরা ফিরে যাব না। উত্তা যা বলেছে, ওটা তার মনের কথা নয়। যেহেতু মুহাম্মদ ও তাঁর অনুচররা সংখ্যায় খুব নগণ্য এবং তাদের ভেতরে তার ছেলেও রয়েছে। যুদ্ধ হলে তার ছেলের জীবন বিপন্ন হবে ভেবে সে এ কথা বলেছে।" এরপর আবু জাহল নিহত Amr ইব্ন হাযরামীর ভাই আমির ইবন হাযরামীর কাছে খবর পাঠাল যে,
"তোমার মিত্র উত্ত্বা কুরায়ש বাহিনীকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায়। অথচ তোমার ভাইয়ের হত্যার বদলার ব্যাপারটা তোমার নাগালের মধ্যে রয়েছে। সুতরাং তুমি উঠ এবং ভাইয়ের হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের প্রতিশ্রুতির কথা কুরায়ש বাহিনীকে স্মরণ করিয়ে দাও।"
আমির ইবন হাযরামী উঠে দাঁড়াল এবং তার ভাইয়ের হত্যার ঘটনা বর্ণনা করার পর সে হায় Amr, হায় Amr বলে চীৎকার করতে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধের উত্তেজনা সৃষ্টি হল এবং সন্ধির সমস্ত রাস্তা বন্ধ হয়ে গেল। তারা যে যুদ্ধের অভিপ্রায়ে মক্কা থেকে বের হয়েছিল, তার জন্য তারা সবাই প্রস্তুত হয়ে গেল। ফলে উত্ত্বা যে শুভ উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল, সে তা নস্যাৎ করে দিল।
📄 আসওয়াদ ইব্ন আবদুল আসাদ মাখযুমীর হত্যা
উত্ত্বা যখন আবূ জাহেলের এ উক্তি শুনল যে, 'উদ্বার মাথা খারাপ হয়ে গেছে, তখন সে বলল: অচিরেই সে ভীরু জানতে পারবে, আমার মাথা খারাপ হয়েছে, না তার মাথা খারাপ হয়েছে। এরপর উত্ত্বা তার মাথার পরিধানের জন্য লৌহ শিরস্ত্রাণ খোঁজ করল। কিন্তু তার মাথা বড় ছিল। গোটা সেনাদলের মধ্যে খোঁজ করে তার মাথায় পরিধানের মত কোন লৌহ শিরস্ত্রাণ পাওয়া গেল না। ফলে সে তার মাথায় চাদর বেঁধে নিল।
ইবন ইসহাক বলেন: আসওয়াদ ইব্ন আবদুল আসাদ মাখযূমী ছিল কুরায়শ বংশের একজন দুশ্চরিত্র ও গুন্ডা স্বভাবের লোক। সে বের হয়ে বলল: আল্লাহর কসম! আমি অবশ্যই مسلمانوں হাওয থেকে পানি পান করব, কিংবা তা ভেঙে ফেলব। আর প্রয়োজন হলে এর জন্য মারাও যাব। এই বলে সে ময়দানে নামলে হামযা ইব্ন আবদুল মুত্তলিব (রা) তার দিকে অগ্রসর হলেন। যখন তারা মুখোমুখি হল, তখন হামযা (রা) আসওয়াদের পায়ে তরবারির আঘাত হানলেন। এতে তার পা কেটে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। এ সময় সে হাওযের কাছেই ছিল। সে চিৎ হয়ে পড়ে গেল এবং তার পা থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটল। এরপর সে হামাগুড়ি দিয়ে হাওযের দিকে এগুলো এবং নিজের প্রতিজ্ঞা রক্ষা করার জন্য হাওযের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল। হামযা (রা) তার পশ্চাদ্ধাবন করলেন এবং হাওযের মধ্যেই তাকে তরবারির আঘাতে হত্যা করলেন।
📄 দ্বন্দ্বযুদ্ধের জন্য উদ্বার আহবান
এরপর ময়দানে অবতীর্ণ হল উত্ত্বা ইব্ন রবী'আ। তার ভাই শায়বা ও ছেলে ওয়ালীদ তার সঙ্গে এল। কুরায়ש বাহিনীর ব্যূহ ছেড়ে সামনে গিয়ে সে হুংকার ছেড়ে দ্বন্দ্ব যুদ্ধের আহবান জানালে আনসারদের মধ্য হতে তিনজন যুবক-আওফ ও মুআববিয ইবন হারিস এবং আবদুল্লাহ ইব্ন রওয়াহা তাদের মুকাবিলায় এগিয়ে গেলেন। কুরায়ש যোদ্ধারা জিজ্ঞেস করল: তোমরা কারা? তাঁরা বললেন: আমরা আনসার। তারা বলল: তোমাদের দিয়ে আমাদের কোন প্রয়োজন নেই। তারপর তাদের একজন চিৎকার করে বলল: হে মুহাম্মদ, আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে যারা আমাদের সমকক্ষ, তাদেরকে পাঠাও। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) উবায়দা ইবন হারিস, হামযা ও আলী (রা)-কে তাদের মুকাবিলায় যাওয়ার জন্য নির্দেশ দিলেন। তারা গিয়ে নিজ নিজ পরিচয় দিলে প্রতিপক্ষ খুশি হয়ে বলল ঠিক আছে। এবার মর্যাদাসম্পন্ন প্রতিপক্ষ মিলে গেছে। মুসলিম বাহিনীর মধ্যে সব চাইতে বয়স্ক মুজাহিদ উবায়দা উত্তা ইব্ন রবী'আর বিরুদ্ধে, হামযা শায়বার বিরুদ্ধে এবং আলী ওয়ালীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে দিলেন। হামযা শায়বাকে এবং আলী ওয়ালীদকে পাল্টা আঘাত হানার সুযোগই দিলেন না। প্রথম আঘাতেই তাদের হত্যা করলেন। আর উবায়দা ও উত্ত্বা উভয়ে একটি করে আঘাত বিনিময় করে, একে অপরকে আহত করলেন। হামযা ও আলী দ্রুত ছুটে গিয়ে নিজ নিজ তরবারির আঘাতে উত্তাকে হত্যা করলেন। এরপর তারা উবায়দাকে কাঁধে তুলে নিয়ে মুসলিম বাহিনীর মধ্যে পৌছে দিলেন।
📄 রাসূলুল্লাহ (সা) কর্তৃক ইব্ন্ন গাযীয়াকে গুঁতা দেওয়া
ইবন ইসহাক বলেন: এরপর উভয় পক্ষের সৈন্যদের মধ্যে ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি হল এবং একদল অপর দলের নিকটবর্তী হল। ইতিপূর্বে রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাহাবীদের এরূপ নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, তাঁর হুকুম না পাওয়া পর্যন্ত তারা যেন আক্রমণ না করেন। তিনি এও বলেন: কুরায়ש পক্ষ তোমাদের ঘিরে ফেললে তীর নিক্ষেপ করে তাদেরকে হাটিয়ে দিও। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এ সময় মুসলিম বাহিনীকে সারিবদ্ধ করে আবু বকর সিদ্দীকসহ তাঁর তাঁবুতে অবস্থান করছিলেন। আর বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল হিজরী দ্বিতীয় সনের ১৭ই রমযান জুমু'আর দিন সকাল বেলা, মুতাবিক ১৩ই মার্চ, ৬২৪ খ্রিস্টাব্দে।
ইবন ইসহাক বলেন: বদর যুদ্ধের দিন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর সাহাবীদের কাতার ঠিক করেন। এ সময় তাঁর হাতে একটি তীর ছিল, যা দিয়ে তিনি কাতার ঠিক করছিলেন। যখন তিনি আদী ইব্ন নাজ্জার গোত্রের মিত্র, সাওয়াদ ইব্ন গাযীয়ার পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন, তখন সে তার কাতার থেকে সামনে এসেছিল। এ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা) তীর দিয়ে তার পেটে গুঁতা দিয়ে বললেন: হে সাওয়াদ! তুমি কাতারে ঠিক হয়ে দাঁড়াও।
তখন সাওয়াদ (রা) বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আপনি আমাকে কষ্ট দিলেন? অথচ আল্লাহ্ আপনাকে সত্য ও ন্যায়সহ প্রেরণ করেছেন? আপনি আমাকে এর প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ দিন। এ সময় রাসূলাল্লাহ্ (সা) তাঁর পবিত্র পেটের কাপড় সরিয়ে নিলেন এবং তাঁকে প্রতিশোধ নিতে বললেন। তখন সাওয়াদ নবী (সা)-কে জড়িয়ে ধরে তাঁর পেটে চুমা খেলেন। তখন রাসূলাল্লাহ্ (সা) তাকে জিজ্ঞেস করেন: হে সাওয়াদ! তুমি কেন এরূপ করলে? সাওয়াদ বললেন: ইয়া রাসূলুল্লাহ্ (সা)! আমাদের সামনে যে ভয়াবহ অবস্থা। তাতো আপনি দেখছেন। তাই আমার মনে এরূপ আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয় যে, জীবনের এ শেষ মুহূর্তে আমার শরীর আপনার পবিত্র শরীরের স্পর্শে ধন্য হোক।
এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর কল্যাণের জন্য দু'আ করলেন।