📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 বদরের পথে রাসূলুল্লাহ্ (সা)

📄 বদরের পথে রাসূলুল্লাহ্ (সা)


রাসূলুল্লাহ্ (সা) মদীনা থেকে মক্কার পথ ধরে চলতে লাগলেন এবং মদীনার বাইরের পার্বত্য পথ ধরে পর্যায়ক্রমে 'আকীক, যুল-হুলায়ফা, উলাতুল জায়শ, তুরবান, মালাল, গামীসুল হাম্মাম, পরে সাখীরাতুল ইয়ামাম ও সাইয়ালা হয়ে ফজজুর রাওহাতে পৌঁছেন। এরপর তিনি (সা) শানুকায় পৌঁছে সমতল রাস্তা ধরে চলতে লাগলেন।
সেখান থেকে তিনি (সা) আরকুয-যাবিয়া নামক স্থানে পৌঁছলে এক বেদুঈনের সাথে তাঁদের দেখা হল। তাঁরা তাকে কুরায়שদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। কিন্তু তাঁরা তার থেকে কোন খবর পেলেন না। তখন ঐ বেদুঈনকে বলা হল: তুমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে সালাম কর। তখন সে জিজ্ঞেস করল:
"তোমাদের মধ্যে কি আল্লাহ্র রাসূল আছেন? বলা হল: হ্যাঁ। এরপর সে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে সালাম করে বলল: আপনি যদি আল্লাহর রাসূল হয়ে থাকেন, তাহলে বলুন তো আমার এই উষ্ট্রীর গর্ভে কি আছে? তখন সালামা ইব্‌ন সুলামা (রা) তাকে বললেন: 'তুমি এ কথা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে জিজ্ঞেস করো না। আমার কাছে এস। আমি তোমাকে বলে দিচ্ছি। তুমি ঐ উষ্ট্রীটির সাথে সংগম করেছিলে। তাই এর পেটে তোমার ঔরসের একটা উটের বাচ্চা আছে।' রাসূলুল্লাহ্ (সা) ঐ সাহাবীকে বললেন: তুমি চুপ কর। তুমি লোকটার সাথে অশ্লীল কথা বলেছ। এ কথা বলে তিনি (সা) সালামা (রা) থেকে তাঁর মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) রাওহার সাজাজ নামক কূপের নিকট গিয়ে যাত্রা বিরতি করলেন। সেখান থেকে আবার রওয়ানা হলেন। একটা মোড়ে পৌঁছে তিনি (সা) মক্কার পথ বামে ছেড়ে নাযিয়াকে ডানদিকে রেখে, বদর অভিমুখে চলতে লাগলেন। বদরের নিকটবর্তী একটি জায়গায় পৌঁছে তিনি রাহকান নামক একটি উপত্যকা আড়াআড়িভাবে পাড়ি দিলেন। এই উপত্যকাটি নাযিয়া ও সাফ্রা গিরিপথের মাঝখানে অবস্থিত। এরপর তিনি (সা) সাফরার নিকট পৌঁছলেন। এখানে পৌঁছে তিনি (সা) বাস্বাস ইবন আমর জুহানী ও 'আদি ইব্‌ন আবূ যাগবা (রা) জুহানীকে আবূ সুফইয়ান ও অন্যদের সম্পর্কে খোঁজ-খবর দিতে বদর এলাকায় পাঠালেন। তাদেরকে পাঠানোর পর রাসূলুল্লাহ্ (সা) রওয়ানা হলেন। যখন দুই পর্বতের মধ্যবর্তী জনপদ সাফরার কাছে উপস্থিত হলেন, তখন তিনি পর্বতদ্বয়ের নাম জিজ্ঞেস করলেন। তাঁরা বললেন: একটির নাম মুসাল্লাহ্, অপরটির নাম মুখখ্য। এরপর তিনি (সা) সেখানকার অধিবাসীদের সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তখন তাঁকে বলা হল: তারা হল বনু গাফ্ফারের দু'টি শাখা-বনূ নার এবং বনূ হুরাক। এই নাম দুটো শুনে তিনি (সা) বিরক্তি প্রকাশ করলেন এবং এই দুই পর্বতের মাঝখান দিয়ে যেতে চাইলেন না। বস্তুত তিনি (সা) এ পর্বতদ্বয়ের এবং এর অধিবাসীদের নামকে অশুভ হিসাবে গণ্য করলেন।' এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) উভয় পর্বত এবং সাফরা জনপদটি বামে রেখে, ডানদিকের যাফ্রান নামক উপত্যকা আড়াআড়ি পাড়ি দিয়ে অপর পারে গিয়ে যাত্রা বিরতি করল।

টিকা:
১. এর অর্থ এ নয় যে, রাসূলুল্লাহ (সা) কোন শুভাশুভ বা মঙ্গলামঙ্গল সংক্রান্ত কুসংস্কারের প্রশ্রয় দিয়েছেন; বরং তিনি শুধু খারাপ নামের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করেছেন।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আনসার সাহাবীদের কাছে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পরামর্শ চাওয়

📄 আনসার সাহাবীদের কাছে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পরামর্শ চাওয়


এই সময় তিনি জানতে পারলেন যে, কুরায়শ গোত্র তাদের বাণিজ্য কাফেলাকে রক্ষা করতে সদলবলে মক্কা থেকে যাত্রা করেছে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এ খবর তাঁর সাহাবীদের জানালেন এবং এ মুহূর্তে তাঁদের কি করা উচিত, সে সম্পর্কে তাঁদের পরামর্শ চাইলেন। সর্বপ্রথম আবু বকর সিদ্দীক (রা) উঠে দাঁড়ালেন এবং তাঁর মতামত অত্যন্ত চমৎকারভাবে ব্যক্ত করলেন। তারপর দাঁড়ালেন উমর ইবন খাত্তাব (রা) এবং তিনিও চমৎকারভাবে নিজের বক্তব্য পেশ করল। এরপর মিকদাদ ইবন আমর (রা) উঠে বললেন: "ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আল্লাহ্ আপনাকে যা করতে নির্দেশ দেন, আপনি তা-ই করুন। আমরা আপনার সঙ্গে আছি। আল্লাহ্র কসম! বনূ ইসরাঈল যেমন মূসা (আ)-কে বলেছিল: তুমি আর তোমার রব গিয়ে যুদ্ধ কর, আমরা এখানে বসে রইলাম, আমরা সে রকম কথা আপনাকে বলব না, বরং আমরা বলব: আপনি এবং আপনার রব যুদ্ধে যান আমরাও আপনার ও আপনার রবের সহযোদ্ধা হয়ে যুদ্ধ করব। সেই মহান আল্লাহর শপথ! যিনি আপনাকে সত্য বিধান দিয়ে পাঠিয়েছেন, আপনি যদি আমাদের নিয়ে সুদূর ইয়ামানের (মতান্তরে আবিসিনিয়ার) বারকুল গিমাদেও যান, তাহলেও আমরা আপনার সঙ্গী হয়ে সেখানে যাব।" রাসূলুল্লাহ্ (সা) মিকদাদ (রা)-কে ধন্যবাদ দিলেন এবং তাঁর কল্যাণের জন্য দু'আ করলেন।
এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) আনসারদের সম্বোধন করে বললেন: "তোমরা আমাকে পরামর্শ দাও।" আনসারদের এত গুরুত্ব দানের কারণ ছিল এই যে, তাঁরা ছিলেন মুসলমানদের সাহায্যকারী। তাঁরা যখন আকাবাতে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে-বায়'আত গ্রহণ করেছিলেন, তখন তাঁরা বলেছিলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আপনি যতদিন আমাদের আবাসভূমিতে না যাবেন, ততদিন আমরা আপনার দায়দায়িত্ব বহন করতে অপারগ। যখন আপনি আমাদের কাছে যাবেন, তখন আপনি আমাদের দায়িত্বে থাকবেন। আমরা আমাদের ছেলেমেয়ে ও স্ত্রীদের যেভাবে সব রকমের বিপদ থেকে রক্ষা করে থাকি, ঠিক সেইভাবে আপনাকে রক্ষা করব।" এজন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা) আশংকা করেছিলেন যে, আনসাররা হয়তো মনে করতে পারে যে, মদীনায় রাসূলুল্লাহ্ (সা) শত্রুদ্বারা আক্রান্ত হলেই কেবল তাঁদের উপর তাঁর সাহায্য করার ও তাঁকে রক্ষা করার দায়িত্ব বর্তায়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁদের আবাসভূমির বাইরে কোন শত্রুর বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে যেতে চাইলে, তাঁর সাথে যাওয়া তাঁদের দায়িত্ব নয়। এ প্রেক্ষিতে যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) আনসারদের কাছে পরামর্শ চাইলেন, তখন সা'দ ইব্‌ন মু'আয (রা) তাঁকে বললেন: "ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আপনি বোধহয় আমাদের মতামত জানতে চাইছেন।” তিনি (সা) বললেন: হ্যাঁ। সা'দ (রা) বললেন: "আমরা তো আপনার প্রতি ঈমান এনেছি এবং আপনার দাওয়াতকে সত্য বলে মেনে নিয়েছি। আমরা সাক্ষ্য দিয়েছি যে, আপনি যে বিধান নিয়ে এসেছেন, তা পরম সত্য। আর এই প্রত্যয়ের ভিত্তিতেই আমরা আপনার কাছে অংগীকার ও প্রতিশ্রুতি দিয়েছি যে, আমরা আপনার নির্দেশ মানব ও আপনার আনুগত্য করব। ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! তাই আপনি যা ভালো মনে করেন, তা-ই করুন। আমরা আপনার সঙ্গে আছি এবং থাকব। আল্লাহর কসম! আপনি যদি আমাদের নিয়ে সমুদ্রের পাড়ে যান এবং তাতে ঝাঁপ দেন, তবে আমরাও আপনার সঙ্গে তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ব। আমাদের একটি লোকও আপনাকে ছেড়ে পেছনে থাকবে না। আগামীকাল যদি আপনি আমাদের সঙ্গে নিয়ে শত্রুর মুকাবিলা করতে চান, তবে তাতেও আমাদের আপত্তি নেই। আমরা যুদ্ধে ধৈর্যশীল এবং শত্রুর মুকাবিলায় অবিচল। আশা করি, আল্লাহ্ আপনাকে আমাদের এমন কৃতিত্ব দেখবার সুযোগ দেবেন যাতে আপনার চোখ জুড়িযে যাবে। আপনি আল্লাহর রহমতের উপর নির্ভর করে আমাদের নিয়ে এগিয়ে চলুন।"
সা'দ (রা)-এর বক্তব্য শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা) খুশি হলেন এবং খুবই উৎসাহিত বোধ করলেন। তারপর বললেন: ঠিক আছে। তোমরা বেরিয়ে পড়। আল্লাহ্ আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, দুই দলের একদল আমাদের আয়ত্তাধীন হবে।' আল্লাহর কসম! শত্রুরা যে যেখানে মারা যাবে, আমি তাদের সে স্থানগুলো এখন দেখতে পাচ্ছি।
এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) যাফ্রান থেকে রওয়ানা হলেন। আসাফির নামক উঁচু পার্বত্য পথ ও দাব্বা নামক নিম্নভূমি অতিক্রম করে হিনান নামক বিরাট পার্বত্য এলাকা ডানে রেখে বদরের কাছাকাছি গিয়ে থামলেন। এরপর তিনি (সা) তাঁর সাহাবীদের একজনকে সাথে নিয়ে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে বেরিয়ে পড়লেন। ইবন হিশামের মতে তিনি ছিলেন আবু বকর সিদ্দীক (রা)। তাঁরা কিছুদূর গিয়ে আরবের জনৈক বৃদ্ধের সাক্ষাৎ পেলেন। তাঁরা বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করলেন: সে কুরায়শ গোত্রের কোন তৎপরতার কথা জানে কিনা, কিংবা মুহাম্মদ ও তাঁর সহচরদের কোন খবর রাখে কিনা? বৃদ্ধ বলল তোমরা কারা বল। তা নাহলে বলব না। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: "আমরা যা জানতে চেয়েছি, সেটা আগে বল। তারপর আমরা আমাদের পরিচয় দেব।" বৃদ্ধ বলল: "খবরের বিনিময়ে পরিচয়?" তিনি বললেন: হ্যাঁ। তখন বৃদ্ধ বলল: "শুনেছি মুহাম্মদ ও তাঁর সহচররা অমুক দিন যাত্রা শুরু করেছেন। এটা সত্য হলে, তাদের এখন অমুক জাগায় থাকার কথা। আর আমি এও খবর পেয়েছি যে, কুরায়শরা অমুক দিন বের হয়েছে। এখবর যদি সঠিক হয়, তবে তারা আজ অমুক স্থানে রয়েছে। বস্তুত কুরায়שরা তখন সেখানেই ছিল, বৃদ্ধ লোকটি যে স্থানের কথা বলেছিল। বৃদ্ধ তার খবর দেওয়া শেষ করে জিজ্ঞেস করল তোমরা কোথা থেকে এসেছ? রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: আমরা পানি থেকে এসেছি। এ কথা বলে তিনি বৃদ্ধের কাছ থেকে চলে আসলেন।
রাবী বলেন: বৃদ্ধ লোকটি নিজে নিজে বলতে লাগল যে, "আমরা পানি পান থেকে এসেছি" -এর তাৎপর্য কি? ইরাকের পানি থেকে?
ইবন হিশাম বলেন: এ বৃদ্ধ লোকটি ছিল সুফইয়ান যামরী।
ইবন ইসহাক বলেন: এরপর রাসূল (সা) তাঁর সাহাবীদের নিকট ফিরে গেলেন। সন্ধ্যার সময় তিনি আলী ইব্‌ন আবূ তালিব, যুবায়র ইব্‌ন আওয়াম ও সা'দ ইব্‌ন আবু ওয়াক্কাস (রা)-কে একদল সাহাবীসহ বদরের জলাশয়ের কাছে তথ্য অনুসন্ধানের জন্য পাঠালেন। সেখানে তাঁরা কুরায়ש গোত্রের একপাল পানি বহনকারী উট দেখতে পেলেন এবং তার মধ্যে হাজ্জাজ গোত্রের গোলাম আসলাম এবং বনূ 'আস ইব্‌ন সাঈদের গোলাম আবু ইয়াসার 'আরীযকে দেখতে পেলেন। তারা ঐ লোক দুটিকে সাথে নিয়ে এলেন এবং জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলেন। এসময় রাসূলুল্লাহ্ (সা) দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করছিলেন। তাঁরা তাদের জিজ্ঞেস করলেন: তোমরা কারা? তারা বলল: আমরা কুরায়শ গোত্রের পানি সরবরাহকারী। তারা আমাদের খাবার পানি নিতে এখানে পাঠিয়েছে। মুসলমানরা তাদের কথা বিশ্বাস করলেন না। তাদের ধারণা ছিল, এরা আবূ সুফইয়ানের লোক। এরপর তাঁরা তাদের কিছু মারপিট করলেন। প্রচণ্ড পিটুনি খেয়ে তারা বলল যে, আমরা আবূ সুফইয়ানের লোক। এরপর সাহাবীরা তাদের আর কোন কিছু জিজ্ঞেস করলেন না।
ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সা) সালাত শেষ করে বললেন: ওরা যখন সত্য বলল, তখন তোমরা ওদের প্রহার করলে। যখন মিথ্যা বলল, তখন তোমরা জিজ্ঞাসাবাদ থেকে বিরত হলে! আল্লাহ্র কসম! এরা নিশ্চয়ই কুরায়শের লোক। তখন নবী (সা) নিজে তাদের জিজ্ঞেস করা শুরু করলেন: ওহে যুবকদ্বয়, তোমরা আমাকে কুরায়শের খবর বল। তখন তারা উভয়ে বলল: আল্লাহর কসম! ঐ যে দূরে বালুর টিলাটা দেখছেন, ওর পেছনে তারা রয়েছে। ঐ টিলার নাম ছিল আকানকাল। পরে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের জিজ্ঞেস করলেন ওরা সংখ্যায় কত? আসলাম ও আরীদ বলল: অনেক। রাসূলুল্লাহ্ (সা) পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন: তাদের সাজসরঞ্জাম কিরূপ? তারা বললেন: আমরা জানি না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন ওরা প্রতিদিন কয়টা উট যবেহ করে? তারা বলল: কোনদিন নয়টা, কোনদিন দশটা। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তাহলে ওদের সংখ্যা নয় শো থেকে হাজারের মধ্যে হবে। তারপর তিনি (সা) তাদের জিজ্ঞেস করলেন: কুরায়ש নেতাদের মধ্য থেকে কে কে এসেছে? তারা বলল 'উতবা ইব্‌ন রবী'আ, শায়বা ইন্ন রবী'আ, আবুল বুখারী ইব্‌ন হিশাম, হাকীম ইব্‌ন হিযাম, নাওফাল ইব্‌ খুয়ায়লিদ, হারিস ইব্‌ন 'আমির ইবন নাওফাল, তুআয়মা ইব্‌ন আদী ইবন নাওফাল, নযর ইন্ন হারিস, যাম্'আ ইব্‌ন আসওয়াদ, আবু জাহল ইব্‌ন হিশাম, উমায়্যা ইব্‌ন খালফ, হাজ্জাজের দুইপুত্র নবীহ ও মুনাব্বিহ, সুহায়ল ইব্‌ন Amr, Amr ইব্‌ন আব্দে 'উদ। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) মুসলমানদের লক্ষ্য করে বললেন: মক্কা তার কলিজার টুকরোগুলো তোমাদের মুকাবিলায় পাঠিয়েছে।
ইবন ইসহাক বলেন: ইতিপূর্বে বাস্বাস্ ইব্‌ন Amr ও আদী ইব্‌ন আবূ যাগবা (রা) টহল দিতে দিতে বদর প্রান্তরে এসে থেমেছিলেন। তারা জলাশয়ের নিকবর্তী একটি টিলার কাছে গিয়ে উট থেকে নামলেন এবং একটা মশকে করে খাবার পানি নিলেন। তখন মাজদী ইব্‌ন Amr জুহানী জলাশয়ের পাশেই ছিল। জলাশয়ের কাছে অজ্ঞাত লোকদের দুটো বাঁদী ছিল। তাদের একজন অপরজনকে তার পাওনা পরিশোধ করতে বলল। তখন ঋণগ্রস্ত বাঁদীটি বলল: কাফেলা কাল কিংবা পরশুই আসবে। তখন আমি তাদের কাজ করে তোমার পাওনা দিয়ে দেব। মাজদী বলল তুমি ঠিকই বলেছ। তারপর সে উভয়ের বিবাদ মিটিয়ে দিল। 'আদী ও বাস্বাস্ (রা) এ কথোপকথন শুনে তাঁদের উটে চড়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট ফিরে গেলেন এবং যা তারা শুনলেন, তা তাঁকে জানালেন।

টিকা:
১. একদল আবূ সুফইয়ানের বাণিজ্য কাফেলা, অন্যদল আবূ জাহলের নেতৃত্বে কাফিরদের সশস্ত্র বাহিনী।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আবু সুফইয়ানের বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে নিরাপদে চলে যাওয়া

📄 আবু সুফইয়ানের বাণিজ্য কাফেলা নিয়ে নিরাপদে চলে যাওয়া


এদিকে আবূ সুফইয়ান ইব্‌ন হাব সতর্কতার খাতিরে কাফেলা পেছনে রেখে নিজে আগে আগে এল। সে জলাশয়ের কাছে গিয়ে মাজদী ইব্‌ন 'আমরকে জিজ্ঞেস করল: কারো আনাগোনা টের পেয়েছ কি? সে বলল: সন্দেহজনক কাউকে দেখিনি। তবে দু'জন উট সওয়ারকে দেখলাম এ টিলাটার কাছে এসে উট থেকে নামল। তারপর মশকে পানি ভরে নিয়ে চলে গেল। এ কথা শুনে আবু সুফইয়ান বাস্বাস্ ও 'আদী (রা)-এর উট বসাবার জায়গাটিতে উপস্থিত হল। সেখানে তাদের উটদ্বয়ের খানিকটা গোবর পেয়ে তা তুলে নিয়ে সেটা ভেঙ্গে ফেলল। তার ভেতরে সে কতকগুলো খেজুরের আঁটি পেল। ঐ আঁটি দেখে সে বলল: আল্লাহ্র কসম! এটা ইয়াসরিবের পশুর গোবর। সে দ্রুতবেগে নিজের কাফেলার কাছে ছুটে গেল। সে কাফেলাকে ভিন্নপথে পরিচালিত করল এবং বদর প্রান্তর বামে রেখে, সমুদ্র কিনারের পথ ধরে দ্রুত চলে গেল।
ওদিকে কুরায়শরা অগ্রসর হয়ে জুহফাতে যাত্রা বিরতি করল। তখন তাদের দলের জুহায়ম ইব্‌ন সাল্‌ত ইব্‌ন মাখরামা ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিব ইব্‌ন 'আব্দ মানাফ স্বপ্নে দেখল, যেন একটি লোক ঘোড়ার পিঠে চড়ে এসে থামল। তার সাথে একটা উটও ছিল। তারপর সে বলল: উত্তবা ইব্‌ন রবী'আ, শায়বা ইব্‌ন রবী'আ, আবুল হাকাম ইব্‌ন হিশাম (আবু জাহল), উমাইয়া ইব্‌ন খাল্‌ফ এবং অমুক অমুক নিহত হয়েছে। এভাবে বদরের যুদ্ধে কুরায়শের যে সব নেতা নিহত হয়েছিল, তাদের নাম সে উল্লেখ করল। এরপর আমি দেখলাম, সে ব্যক্তি তার উটটিকে রক্তাক্ত করে কুরায়শ বাহিনীর মধ্যে ছেড়ে দিল। বাহিনীর কোন একটি শিবিরও অবশিষ্ট থাকল না, যাকে সে নিজের রক্তে রঞ্জিত করল না। জুহায়ম ইব্‌ন সাল্‌ত তার এই স্বপ্নের বিষয় আবূ জাহলের কাছে বর্ণনা করলে সে বলল: এ দেখি মুত্তালিব গোষ্ঠীর আর এক নবী! যদি মুকাবিলা হয় তবে কালই জানা যাবে কে নিহত হয়।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আবূ জাহলের হঠকারিতা

📄 আবূ জাহলের হঠকারিতা


ইবন ইসহাক বলেন: আবু সুফইয়ান যখন নিশ্চিত হল যে, তার কাফেলাকে সে বাঁচিয়ে নিয়ে এসেছে, তখন সে কুরায়ש বাহিনীর কাছে এ মর্মে বার্তা পাঠাল যে, তোমরা তো তোমাদের বাণিজ্যিক কাফেলা, লোকজন ও ধনসম্পদকে রক্ষা করার জন্যই এসেছিলে। এখন এগুলোকে আল্লাহ্ রক্ষা করেছেন। কাজেই তোমরা ফিরে যাও। কিন্তু আবূ জাহল ইব্‌ন হিশাম বলল: আল্লাহ্র কসম! বদরে না গিয়ে ফিরব না। ওখানে তিন দিন থাকব, পশু যবেহ করে খাওয়াব, মদ পান করাব, গায়িকারা বাদ্য বাজিয়ে গান গাইবে, আরবে আমাদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়বে। আমাদের সমাবেশ ও আভিযানের কথা প্রচারিত হবে; ফলে তাদের মনে আমাদের ভীতি ও প্রতাপ চিরদিনের জন্য বদ্ধমূল হয়ে যাবে। অতএব তোমরা চল।
উল্লেখ্য যে, বদরের প্রান্তরে প্রতি বছর একটি মেলা বসত এবং তা ছিল আরবের বিখ্যাত মেলা! আর এই যুদ্ধের সময়টাও ছিল মেলার মওসুম।
আনাস ইব্‌ন শুরায়ক ইব্‌ন Amr ইব্‌ন ওয়াহব সাকাফী, যে ছিল বনূ যুহার মিত্র, সে জুহফাতে থাকাকালীন সময়ে তাদের বলল : হে বনু যুহরা! তোমরা তো তোমাদের বন্ধু মাগ্রামা ইবন নাওফাল এবং তার সম্পদ রক্ষার জন্য বের হয়েছিলে; আল্লাহ্ যখন তাকে ও তার সম্পদকে রক্ষা করেছেন, তখন তোমরা ফিরে যাও। এর জন্য যদি কেউ তোমাদের উপর ভীরুতার দুর্নাম চাপায়, তবে সেটা আমার উপর চাপিয়ে দিও। কারণ তোমাদের ক্ষতির যখন কোন আশংকা নেই, তখন তোমাদের যুদ্ধের জন্য যাওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। তোমরা আবূ জাহল যা বলে, তার অনুসরণ করবে না। অবশেষে তারা ফিরে যায় এবং বদর যুদ্ধে বন্ যুহরার কেউ উপস্থিত থাকল না। তাদের সকলেই আখনাসের কথা মেনে নিল। আর আখনাস ছিল তাদের মধ্যে সর্বজনমান্য ব্যক্তি।
আর বনূ যুহরার যে কয়জন গিয়েছিল, সকলে ফিরে এসেছিল। কুরায়শ গোত্রের প্রতিটি শাখা থেকে এ যুদ্ধে কিছু না কিছু লোক অংশগ্রহণ করেছিল। তবে বনূ আদী ইব্‌ন কা'ব ও বনূ যুহরা এতে অংশগ্রহণ করেনি। এ অভিযানে তালিব ইব্‌ন আবু তালিব কুরায়שদের সঙ্গে ছিল। তাকে তাদের কেউ বিদ্রুপ করে বলল : তোমরা বনু হাশিমীরা আমাদের সাথে এলেও তোমাদের মন রয়েছে মুহাম্মদের সাথে। এ কথা শুনে তালিব যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করে মক্কায় ফিরে যায়।
আর সে কবিতায় বলে : ইয়া আল্লাহ্! যদি তালিব এমন দলের সাথে যুদ্ধে বের হয়, যারা আমার বিরোধী; তাহলে তুমি তাদের ওদের মত কর, যাদের মাল লুণ্ঠিত হয়েছে। তারা যেন বিজয়ী না হয়ে পরাজিত হয়।
ইবন ইসহাক বলেন : এরপর কুরায়ש বাহিনী তাদের আয়োজন ও প্রস্তুতি অব্যাহত রাখল। তারা বদর প্রান্তরের অপেক্ষাকৃত দূরবর্তী মরুময় টিলার অপর পাশে গিয়ে তাঁবু ফেলল এবং মুসলমানরা বদর প্রান্তরে তাদের ছাউনি স্থাপন করল। এ সময়ে আল্লাহ্ প্রবল বৃষ্টি বর্ষণ করলেন। প্রান্তরের মাটি ছিল নরম ভিজা। রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও তাঁর সাহাবীরা পর্যাপ্ত বৃষ্টি পেলেন, যার ফলে তাদের যমীন শক্ত হয়ে গেল। ফলে চলাচলে তাদের কোন অসুবিধার সৃষ্টি হল না। পক্ষান্তরে কুরায়শ পক্ষের মাটি এত স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেল যে, তাদের চলাচল কঠিন হয়ে গেল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) মুসলিম বাহিনীকে আরো বেশি পানি আছে এমন জায়গায় সারিয়ে নিলেন।
ইবন ইসহাক বলেন : বনু সালমার কিছু লোক আমাকে জানিয়েছেন যে, হুবাব ইব্‌ন মুনযির ইবন জামূহ (রা) বলেছিলেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! এই জায়গাটা কি আপনি আল্লাহ্র নির্দেশেই বাছাই করেছেন, যার থেকে আমরা একচুলও এদিক-ওদিক সরতে পারি না, না এটা আপনার নিজের রণ-কৌশলগত অভিমত? তিনি বললেন : "এটা নেহাৎ একটা রণকৌশল এবং আমার নিজস্ব অভিমত।" তিনি বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! এ জায়গা ভাল নয়। অতএব আপনি সবাইকে নিয়ে এখান থেকে এগিয়ে যান। আমরা ঐ কূপের কাছে গিয়ে ছাউনি স্থাপন করব, যা কুরায়שদের অতি নিকটে। এরপর আমরা সেই জায়গার আশেপাশে যে কূপ আছে, তা বন্ধ করে দেব। সেখানে একটি হাওয তৈরি করে তাতে পানি ভরে রাখব। পরে আমরা শত্রুপক্ষের সাথে লড়াই করব। তখন আমরা পানি পান করতে পারব, কিন্তু ওরা পারবে না। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তুমি ঠিকই বলেছ। এরপর তিনি সবাইকে নিয়ে উঠলেন এবং কুরায়শদের নিকটে অবস্থিত কূপের কাছে পৌছলেন, আর সেখানে তাঁবু ফেললেন। তারপর নবী (সা)-এর নির্দেশে অন্যান্য কূপ বন্ধ করে দেওয়া হল। তিনি যে কূপের কাছে তাঁবু ফেললেন, তার কাছে একটি হাওয তৈরি করে পানি ভরে রাখলেন এবং তাতে পানির পাত্র ফেলে রাখলেন।
ইবন ইসহাক বলেন: সা'দ ইব্‌ন মু'আয বললেন হে আল্লাহর নবী! আপনি আমাদের অনুমতি দিন, আমরা আপনার জন্য একটা সুরক্ষিত তাঁবু বানাই, আপনি তার ভেতরে থাকবেন। আমরা আপনার কাছে আপনার সওয়ারী জন্তুগুলো প্রস্তুত রাখব। তারপর আমরা শত্রুর মুকাবিলা করব। আল্লাহ্ যদি আমাদের শত্রুদের বিরুদ্ধে বিজয়ী করেন, তাহলে আমাদের আশা পূরণ হবে। আর যদি তা না হয়, তবে আপনি আপনার সওয়ারী জন্তুর পিঠে চড়ে অন্য مسلمانوں কাছে চলে যাবেন। হে আল্লাহর নবী! বহু সংখ্যক মুসলমান, যারা আমাদের চেয়ে আপনাকে কম ভালোবাসেন না, তারা শুধু এ জন্য আসতে পারেননি যে, আপনি যুদ্ধে যাবেন তা তারা জানেন না। তারা যদি এটা জানতেন, তাহলে তারা অবশ্যই আপনার সঙ্গে জিহাদে শরীক হতেন। আল্লাহ্ তাদের দ্বারা আপনাকে রক্ষা করবেন। তারা আপনার কল্যাণকামী হবেন এবং আপনার সঙ্গী হয়ে জিহাদে অংশগ্রহণ করবেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) সা'দ-এর কথা শুনে খুশি হলেন এবং তাঁর জন্য দু'আ করলেন। তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জন্য সুরক্ষিত তাঁবু তৈরি করা হল এবং তিনি তার মধ্যে অবস্থান করতে লাগলেন।
ইন্ন ইসহাক বলেন: সকালবেলা কুরায়শ বাহিনী তাদের অবস্থান থেকে বেরিয়ে এল। তাদের নামতে দেখেই রাসূলুল্লাহ্ (সা) দু'আ করলেন: "ইয়া আল্লাহ্! এই সেই কুরায়ש, যারা অহংকারের সাথে আপনার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও আপনার রাসূলকে অস্বীকার করে, আজ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে। হে আল্লাহ্! আপনি যে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি আমাকে দিয়েছেন, আমি তার প্রার্থী। হে আল্লাহ্! আজ সকালেই ওদেরকে ধ্বংস করে দিন।"
একটা লাল উটের পিঠে চড়া উত্তা ইব্‌ন রবী'আকে দেখে রাসূলুল্লাহ (সা) মন্তব্য করলেন: গোটা কুরায়শ গোত্রের কোন ব্যক্তির মধ্যে যদি কিছুমাত্র শুভবুদ্ধি থেকে থাকে, তবে এই লোকটার মধ্যে তা আছে। লোকেরা যদি তার কথা শোনে, তাহলে তারা সঠিক পথের সন্ধান পাবে।
কুরায়শ বাহিনী বদরের ময়দানে যাওয়ার সময় পথিমধ্যে খুফাফ ইব্‌ন আয়মা ইব্‌ন রাহাযা গিফারী তার ছেলের মাধ্যমে কয়েকটি যবেহ করা জন্তু তাদের জন্য উপহার স্বরূপ পাঠিয়ে দিল এবং বলল: তোমাদের প্রয়োজন থাকলে আমরা কিছু অস্ত্র ও যোদ্ধা দিয়ে সাহায্য করতে পারি। এর জবাবে কুরায়শ নেতারা তার ছেলের মাধ্যমে বলে পাঠাল: আত্মীয়তার খাতিরে তোমার যা করণীয় ছিল, তা'তুমি করেছ, আমার জীবনের কসম! এখন আমরা যে যুদ্ধে যাচ্ছি, তা যদি মানুষের বিরুদ্ধে হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের শক্তির কোন কমতি নেই। আর যদি মুহাম্মদের কথামত এ যুদ্ধ আল্লাহর বিরুদ্ধে হয়ে থাকে, তা হলে আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করার শক্তি কারো নেই।
এরপর সবাই যখন ময়দানে নামল, তখন কুরায়শের একটি দল সামনে অগ্রসর হয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বানানো হাওযের পানি নিতে লাগল। তাদের মধ্যে হাকীম ইব্‌ন হিযامও ছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) সাহাবীদের বললেন: ওদেরকে বাধা দিও না। বস্তুত সেদিন ঐ হাওয থেকে যে-ই পানি পান করেছে, সে-ই নিহত হয়েছে। একমাত্র হাকীম ইব্‌ন হিযাম ছাড়া। সে নিহত হয়নি। পরে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ভালো মুসলমান হন। এ ঘটনাকে তিনি আজীবন মনে রেখেছিলেন। কখনো জোরদার কসম খেতে হলে তিনি বলতেন: সেই মহান সত্তার কসম! যিনি আমাকে বদর যুদ্ধের দিন ধ্বংস থেকে রক্ষা করেছেন।
ইবন ইসহাক বলেন: যখন কুরায়শরা নিশ্চিত হয়ে তাদের শিবিরে অবস্থান গ্রহণ করল, তখন তারা উমায়র ইব্‌ন ওয়াহব জুমাহীকে মুসলিম বাহিনীর সংখ্যা নির্ণয় করতে পাঠাল। সে ঘোড়ায় চড়ে মুসলিম বাহিনীর চারপাশ দিয়ে একটা চক্কর দিয়ে ফিরে গিয়ে বলল: তিন'শর সামান্য কিছু বেশি বা কম হতে পারে। তবে আমাকে আর একটু সময় দাও, দেখ আমি ওদের কোন গুপ্ত ঘাঁটি বা সাহায্যকারী আছে কিনা। এরপর সে সমস্ত প্রান্তর ঘুরে দেখল। কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না। অবশেষে সে ফিরে গিয়ে বলল: কোন কিছুর সন্ধান পেলাম না। তবে তাদের হাবভাব দেখে মনে হয়, তারা একেবারে মরণপণ করে এসেছে। ইয়াসরিবের উটগুলো সুনিশ্চিত মৃত্যু বহন করে এনেছে। ওরা এমন একটা দল, যাদের তরবারিই একমাত্র সহায় ও রক্ষক। আল্লাহ্ কসম! আমি নিশ্চিত যে, ওদের একজন নিহত হলে, তার বদলায় তোমাদের একজন নিহত হবেই। তারা কুরায়শের মধ্য থেকে যখন তাদের সম-সংখ্যক মানুষকে হত্যা করবে, তখন তা আর আমাদের জন্য কল্যাণকর হবে না। কাজেই তোমরা এখনো ভেবে দেখ।
হাকীম ইব্‌ন হিযাম এ কথা শুনে কুরায়ש বাহিনীর নেতাদের কাছে গেল। প্রথমে সে উত্তা ইন্ন রাবী'আকে গিয়ে বলল: “হে ওয়ালীদের পিতা! আপনি কুরায়শের একজন প্রবীণ নেতা। আপনাকে সবাই মানে। আপনি কি এমন একটা কাজ করতে রাযী হবেন, যা করলে আপনি চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন? সে বলল হাকীম, তুমি কি বলতে চাচ্ছ? হাকীম বলল: আপনি কুরায়শ বাহিনীকে ফিরিয়ে নিয়ে যান এবং আপনার মিত্র Amr ইব্‌ন হাযরামীর হত্যাকাণ্ড ব্যাপারটা মিটিয়ে দেয়ার দায়িত্ব নিন। উত্তা বলল: তা আমি করতে রাযী। সে ব্যাপারে আমি তোমার অনুরোধ রাখতে প্রস্তুত। হাযরামী আমার মিত্র এবং তার রক্তপণ আদায় করার এবং তার সম্পদের ক্ষতিপূরণ করে দেওয়ার দায়িত্ব আমার। তুমি আবূ জাহলের কাছে যাও। আমি মনে করি, কুরায়শের বিনাযুদ্ধে ফিরিয়ে নেয়ার প্রশ্নে সে ছাড়া আর কেউ বিরোধিতা করবে না। এরপর উত্তা দাঁড়িয়ে কুরায়ש বাহিনীর উদ্দেশ্যে নিম্নরূপ ভাষণ দিল:
"আল্লাহ্র কসম! হে কুরায়ש জনতা! মুহাম্মদ ও তাঁর সংগীদের সাথে লড়াই করে তোমাদের কোন লাভ হবে না। আজ যদি তোমরা তাঁকে হত্যা করতে সক্ষম হও, তা হলে তোমাদের ভেতরে কোন সদ্ভাব থাকবে না। একজন আর একজনের মুখ দেখা পসন্দ করবে না। কেননা সে তার চাচাতো ভাই, খালাতো ভাই কিংবা অন্য কোন না কোন আত্মীয়ের হত্যাকারী বলে চিহ্নিত হবে। সুতরাং চল আমরা ফিরে যাই এবং মুহাম্মদ ও তাঁর সহচরদের পথ থেকে সরে দাঁড়াই। তাদের ব্যাপারটা তোমরা আরব জনগণের উপর ছেড়ে দাও। যদি তারা তাঁকে হত্যা করে, তা হলে তো তোমাদের উদ্দেশ্যই সিদ্ধ হবে। আর তা না হলে মুহাম্মদের কাছে আমরা অন্তত নির্দোষ থাকব।"
হাকীম বলেন: তারপর আমি আবু জাহলের কাছে গেলাম এবং দেখলাম যে, সে তার বর্ম সিন্দুক থেকে বের করে পরিষ্কার করছে। সে তাকে বলল: "হে আবুল হাকাম! উত্তা আমাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছে। এরপর আমি উত্ত্বা আমাকে যা বলেছিলেন, তা তাকে জানালাম। আবু জাহল বলল: আল্লাহ্র শপথ! উদ্বার মাথা তখন থেকে খারাপ হয়ে গেছে, যখন সে মুহাম্মদ এবং তাঁর সংগীদের দেখেছে। আল্লাহ্র কসম! এটা কখনো হতে পারে না। যতক্ষণ আল্লাহ্ আমাদের ও মুহাম্মদের ব্যাপারে চূড়ান্ত ফায়সালা না করে দেন, ততক্ষণ আমরা ফিরে যাব না। উত্তা যা বলেছে, ওটা তার মনের কথা নয়। যেহেতু মুহাম্মদ ও তাঁর অনুচররা সংখ্যায় খুব নগণ্য এবং তাদের ভেতরে তার ছেলেও রয়েছে। যুদ্ধ হলে তার ছেলের জীবন বিপন্ন হবে ভেবে সে এ কথা বলেছে।" এরপর আবু জাহল নিহত Amr ইব্‌ন হাযরামীর ভাই আমির ইবন হাযরামীর কাছে খবর পাঠাল যে,
"তোমার মিত্র উত্ত্বা কুরায়ש বাহিনীকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চায়। অথচ তোমার ভাইয়ের হত্যার বদলার ব্যাপারটা তোমার নাগালের মধ্যে রয়েছে। সুতরাং তুমি উঠ এবং ভাইয়ের হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের প্রতিশ্রুতির কথা কুরায়ש বাহিনীকে স্মরণ করিয়ে দাও।"
আমির ইবন হাযরামী উঠে দাঁড়াল এবং তার ভাইয়ের হত্যার ঘটনা বর্ণনা করার পর সে হায় Amr, হায় Amr বলে চীৎকার করতে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে যুদ্ধের উত্তেজনা সৃষ্টি হল এবং সন্ধির সমস্ত রাস্তা বন্ধ হয়ে গেল। তারা যে যুদ্ধের অভিপ্রায়ে মক্কা থেকে বের হয়েছিল, তার জন্য তারা সবাই প্রস্তুত হয়ে গেল। ফলে উত্ত্বা যে শুভ উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল, সে তা নস্যাৎ করে দিল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00