📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যাত্রা
ইবন ইসহাক বলেন: রমযান মাসের কিছু দিন অতিবাহিত হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর সাহাবীদের নিয়ে বের হলেন। ইবন হিশাম বলেন: সে দিন ছিল রমযানের আট তারিখ, সোমবার। রাসূলুল্লাহ্ (সা) প্রথমত আবদুল্লাহ্ ইব্ন উম্মু মাকতুম (রা)-কে লোকদের নিয়ে সালাতে ইমামতি করার দায়িত্বে রেখে যান। এরপর তিনি (সা) 'রাওহা' থেকে আবু লুবাবা (রা)-কে মদীনার অস্থায়ী শাসক বানিয়ে ফেরত পাঠান।
📄 বদর যুদ্ধে মুসলমানদের উটের সংখ্যা
ইবন ইসহাক বলেন: এ সময়ে তিনি মুস'আব ইবন উমায়র ইবন হাশিম ইব্ন আব্দ মানাফ ইব্ন আবদুদ্দার (রা)-এর হাতে একটি সাদা পতাকা তুলে দেন। ইবন ইসহাক আরো বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সামনে দু'টি কাল পতাকা ছিল। এর একটি ছিল আলী ইব্ন আবূ তালিব (রা)-এর হাতে, এ পতাকার নাম ছিল উকাব বা ঈগল। আর অপরটি ছিল জনৈক আনসারী সাহাবীর হাতে।
ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বাহিনীতে সেদিন সত্তরটি উট ছিল। তারা পালাক্রমে এগুলোতে আরোহণ করতে লাগলেন, রাসূল (সা), আলী ও মারসাদ একটি উটের পিঠে পালাক্রমে চড়তে লাগলেন। আর হামযা, যায়দ ইব্ন হারিসা, আবু কাশা ও আনাসা (রা) চড়লেন আর একটিতে। আর একটিতে চড়তে লাগলেন আবু বকর, উমর ও আবদুর রহমান ইব্ন আওফ (রা)।
ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর সেনাবাহিনীর পশ্চাৎভাগে বনূ মাযিন ইব্ন নাজ্জারের সদস্য কায়স ইব্ন আবূ সা'সা'আকে নিযুক্ত করেন।
ইবন হিশামের বর্ণনা অনুযায়ী আনসারদের পতাকা ছিল সা'দ ইব্ন মু'আয (রা)-এর হাতে।
📄 বদরের পথে রাসূলুল্লাহ্ (সা)
রাসূলুল্লাহ্ (সা) মদীনা থেকে মক্কার পথ ধরে চলতে লাগলেন এবং মদীনার বাইরের পার্বত্য পথ ধরে পর্যায়ক্রমে 'আকীক, যুল-হুলায়ফা, উলাতুল জায়শ, তুরবান, মালাল, গামীসুল হাম্মাম, পরে সাখীরাতুল ইয়ামাম ও সাইয়ালা হয়ে ফজজুর রাওহাতে পৌঁছেন। এরপর তিনি (সা) শানুকায় পৌঁছে সমতল রাস্তা ধরে চলতে লাগলেন।
সেখান থেকে তিনি (সা) আরকুয-যাবিয়া নামক স্থানে পৌঁছলে এক বেদুঈনের সাথে তাঁদের দেখা হল। তাঁরা তাকে কুরায়שদের সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন। কিন্তু তাঁরা তার থেকে কোন খবর পেলেন না। তখন ঐ বেদুঈনকে বলা হল: তুমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে সালাম কর। তখন সে জিজ্ঞেস করল:
"তোমাদের মধ্যে কি আল্লাহ্র রাসূল আছেন? বলা হল: হ্যাঁ। এরপর সে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে সালাম করে বলল: আপনি যদি আল্লাহর রাসূল হয়ে থাকেন, তাহলে বলুন তো আমার এই উষ্ট্রীর গর্ভে কি আছে? তখন সালামা ইব্ন সুলামা (রা) তাকে বললেন: 'তুমি এ কথা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে জিজ্ঞেস করো না। আমার কাছে এস। আমি তোমাকে বলে দিচ্ছি। তুমি ঐ উষ্ট্রীটির সাথে সংগম করেছিলে। তাই এর পেটে তোমার ঔরসের একটা উটের বাচ্চা আছে।' রাসূলুল্লাহ্ (সা) ঐ সাহাবীকে বললেন: তুমি চুপ কর। তুমি লোকটার সাথে অশ্লীল কথা বলেছ। এ কথা বলে তিনি (সা) সালামা (রা) থেকে তাঁর মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) রাওহার সাজাজ নামক কূপের নিকট গিয়ে যাত্রা বিরতি করলেন। সেখান থেকে আবার রওয়ানা হলেন। একটা মোড়ে পৌঁছে তিনি (সা) মক্কার পথ বামে ছেড়ে নাযিয়াকে ডানদিকে রেখে, বদর অভিমুখে চলতে লাগলেন। বদরের নিকটবর্তী একটি জায়গায় পৌঁছে তিনি রাহকান নামক একটি উপত্যকা আড়াআড়িভাবে পাড়ি দিলেন। এই উপত্যকাটি নাযিয়া ও সাফ্রা গিরিপথের মাঝখানে অবস্থিত। এরপর তিনি (সা) সাফরার নিকট পৌঁছলেন। এখানে পৌঁছে তিনি (সা) বাস্বাস ইবন আমর জুহানী ও 'আদি ইব্ন আবূ যাগবা (রা) জুহানীকে আবূ সুফইয়ান ও অন্যদের সম্পর্কে খোঁজ-খবর দিতে বদর এলাকায় পাঠালেন। তাদেরকে পাঠানোর পর রাসূলুল্লাহ্ (সা) রওয়ানা হলেন। যখন দুই পর্বতের মধ্যবর্তী জনপদ সাফরার কাছে উপস্থিত হলেন, তখন তিনি পর্বতদ্বয়ের নাম জিজ্ঞেস করলেন। তাঁরা বললেন: একটির নাম মুসাল্লাহ্, অপরটির নাম মুখখ্য। এরপর তিনি (সা) সেখানকার অধিবাসীদের সম্পর্কে জানতে চাইলেন। তখন তাঁকে বলা হল: তারা হল বনু গাফ্ফারের দু'টি শাখা-বনূ নার এবং বনূ হুরাক। এই নাম দুটো শুনে তিনি (সা) বিরক্তি প্রকাশ করলেন এবং এই দুই পর্বতের মাঝখান দিয়ে যেতে চাইলেন না। বস্তুত তিনি (সা) এ পর্বতদ্বয়ের এবং এর অধিবাসীদের নামকে অশুভ হিসাবে গণ্য করলেন।' এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) উভয় পর্বত এবং সাফরা জনপদটি বামে রেখে, ডানদিকের যাফ্রান নামক উপত্যকা আড়াআড়ি পাড়ি দিয়ে অপর পারে গিয়ে যাত্রা বিরতি করল।
টিকা:
১. এর অর্থ এ নয় যে, রাসূলুল্লাহ (সা) কোন শুভাশুভ বা মঙ্গলামঙ্গল সংক্রান্ত কুসংস্কারের প্রশ্রয় দিয়েছেন; বরং তিনি শুধু খারাপ নামের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করেছেন।
📄 আনসার সাহাবীদের কাছে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পরামর্শ চাওয়
এই সময় তিনি জানতে পারলেন যে, কুরায়শ গোত্র তাদের বাণিজ্য কাফেলাকে রক্ষা করতে সদলবলে মক্কা থেকে যাত্রা করেছে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) এ খবর তাঁর সাহাবীদের জানালেন এবং এ মুহূর্তে তাঁদের কি করা উচিত, সে সম্পর্কে তাঁদের পরামর্শ চাইলেন। সর্বপ্রথম আবু বকর সিদ্দীক (রা) উঠে দাঁড়ালেন এবং তাঁর মতামত অত্যন্ত চমৎকারভাবে ব্যক্ত করলেন। তারপর দাঁড়ালেন উমর ইবন খাত্তাব (রা) এবং তিনিও চমৎকারভাবে নিজের বক্তব্য পেশ করল। এরপর মিকদাদ ইবন আমর (রা) উঠে বললেন: "ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আল্লাহ্ আপনাকে যা করতে নির্দেশ দেন, আপনি তা-ই করুন। আমরা আপনার সঙ্গে আছি। আল্লাহ্র কসম! বনূ ইসরাঈল যেমন মূসা (আ)-কে বলেছিল: তুমি আর তোমার রব গিয়ে যুদ্ধ কর, আমরা এখানে বসে রইলাম, আমরা সে রকম কথা আপনাকে বলব না, বরং আমরা বলব: আপনি এবং আপনার রব যুদ্ধে যান আমরাও আপনার ও আপনার রবের সহযোদ্ধা হয়ে যুদ্ধ করব। সেই মহান আল্লাহর শপথ! যিনি আপনাকে সত্য বিধান দিয়ে পাঠিয়েছেন, আপনি যদি আমাদের নিয়ে সুদূর ইয়ামানের (মতান্তরে আবিসিনিয়ার) বারকুল গিমাদেও যান, তাহলেও আমরা আপনার সঙ্গী হয়ে সেখানে যাব।" রাসূলুল্লাহ্ (সা) মিকদাদ (রা)-কে ধন্যবাদ দিলেন এবং তাঁর কল্যাণের জন্য দু'আ করলেন।
এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) আনসারদের সম্বোধন করে বললেন: "তোমরা আমাকে পরামর্শ দাও।" আনসারদের এত গুরুত্ব দানের কারণ ছিল এই যে, তাঁরা ছিলেন মুসলমানদের সাহায্যকারী। তাঁরা যখন আকাবাতে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে-বায়'আত গ্রহণ করেছিলেন, তখন তাঁরা বলেছিলেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আপনি যতদিন আমাদের আবাসভূমিতে না যাবেন, ততদিন আমরা আপনার দায়দায়িত্ব বহন করতে অপারগ। যখন আপনি আমাদের কাছে যাবেন, তখন আপনি আমাদের দায়িত্বে থাকবেন। আমরা আমাদের ছেলেমেয়ে ও স্ত্রীদের যেভাবে সব রকমের বিপদ থেকে রক্ষা করে থাকি, ঠিক সেইভাবে আপনাকে রক্ষা করব।" এজন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা) আশংকা করেছিলেন যে, আনসাররা হয়তো মনে করতে পারে যে, মদীনায় রাসূলুল্লাহ্ (সা) শত্রুদ্বারা আক্রান্ত হলেই কেবল তাঁদের উপর তাঁর সাহায্য করার ও তাঁকে রক্ষা করার দায়িত্ব বর্তায়। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁদের আবাসভূমির বাইরে কোন শত্রুর বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে যেতে চাইলে, তাঁর সাথে যাওয়া তাঁদের দায়িত্ব নয়। এ প্রেক্ষিতে যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) আনসারদের কাছে পরামর্শ চাইলেন, তখন সা'দ ইব্ন মু'আয (রা) তাঁকে বললেন: "ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আপনি বোধহয় আমাদের মতামত জানতে চাইছেন।” তিনি (সা) বললেন: হ্যাঁ। সা'দ (রা) বললেন: "আমরা তো আপনার প্রতি ঈমান এনেছি এবং আপনার দাওয়াতকে সত্য বলে মেনে নিয়েছি। আমরা সাক্ষ্য দিয়েছি যে, আপনি যে বিধান নিয়ে এসেছেন, তা পরম সত্য। আর এই প্রত্যয়ের ভিত্তিতেই আমরা আপনার কাছে অংগীকার ও প্রতিশ্রুতি দিয়েছি যে, আমরা আপনার নির্দেশ মানব ও আপনার আনুগত্য করব। ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! তাই আপনি যা ভালো মনে করেন, তা-ই করুন। আমরা আপনার সঙ্গে আছি এবং থাকব। আল্লাহর কসম! আপনি যদি আমাদের নিয়ে সমুদ্রের পাড়ে যান এবং তাতে ঝাঁপ দেন, তবে আমরাও আপনার সঙ্গে তাতে ঝাঁপিয়ে পড়ব। আমাদের একটি লোকও আপনাকে ছেড়ে পেছনে থাকবে না। আগামীকাল যদি আপনি আমাদের সঙ্গে নিয়ে শত্রুর মুকাবিলা করতে চান, তবে তাতেও আমাদের আপত্তি নেই। আমরা যুদ্ধে ধৈর্যশীল এবং শত্রুর মুকাবিলায় অবিচল। আশা করি, আল্লাহ্ আপনাকে আমাদের এমন কৃতিত্ব দেখবার সুযোগ দেবেন যাতে আপনার চোখ জুড়িযে যাবে। আপনি আল্লাহর রহমতের উপর নির্ভর করে আমাদের নিয়ে এগিয়ে চলুন।"
সা'দ (রা)-এর বক্তব্য শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা) খুশি হলেন এবং খুবই উৎসাহিত বোধ করলেন। তারপর বললেন: ঠিক আছে। তোমরা বেরিয়ে পড়। আল্লাহ্ আমাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, দুই দলের একদল আমাদের আয়ত্তাধীন হবে।' আল্লাহর কসম! শত্রুরা যে যেখানে মারা যাবে, আমি তাদের সে স্থানগুলো এখন দেখতে পাচ্ছি।
এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) যাফ্রান থেকে রওয়ানা হলেন। আসাফির নামক উঁচু পার্বত্য পথ ও দাব্বা নামক নিম্নভূমি অতিক্রম করে হিনান নামক বিরাট পার্বত্য এলাকা ডানে রেখে বদরের কাছাকাছি গিয়ে থামলেন। এরপর তিনি (সা) তাঁর সাহাবীদের একজনকে সাথে নিয়ে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে বেরিয়ে পড়লেন। ইবন হিশামের মতে তিনি ছিলেন আবু বকর সিদ্দীক (রা)। তাঁরা কিছুদূর গিয়ে আরবের জনৈক বৃদ্ধের সাক্ষাৎ পেলেন। তাঁরা বৃদ্ধকে জিজ্ঞেস করলেন: সে কুরায়শ গোত্রের কোন তৎপরতার কথা জানে কিনা, কিংবা মুহাম্মদ ও তাঁর সহচরদের কোন খবর রাখে কিনা? বৃদ্ধ বলল তোমরা কারা বল। তা নাহলে বলব না। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: "আমরা যা জানতে চেয়েছি, সেটা আগে বল। তারপর আমরা আমাদের পরিচয় দেব।" বৃদ্ধ বলল: "খবরের বিনিময়ে পরিচয়?" তিনি বললেন: হ্যাঁ। তখন বৃদ্ধ বলল: "শুনেছি মুহাম্মদ ও তাঁর সহচররা অমুক দিন যাত্রা শুরু করেছেন। এটা সত্য হলে, তাদের এখন অমুক জাগায় থাকার কথা। আর আমি এও খবর পেয়েছি যে, কুরায়শরা অমুক দিন বের হয়েছে। এখবর যদি সঠিক হয়, তবে তারা আজ অমুক স্থানে রয়েছে। বস্তুত কুরায়שরা তখন সেখানেই ছিল, বৃদ্ধ লোকটি যে স্থানের কথা বলেছিল। বৃদ্ধ তার খবর দেওয়া শেষ করে জিজ্ঞেস করল তোমরা কোথা থেকে এসেছ? রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: আমরা পানি থেকে এসেছি। এ কথা বলে তিনি বৃদ্ধের কাছ থেকে চলে আসলেন।
রাবী বলেন: বৃদ্ধ লোকটি নিজে নিজে বলতে লাগল যে, "আমরা পানি পান থেকে এসেছি" -এর তাৎপর্য কি? ইরাকের পানি থেকে?
ইবন হিশাম বলেন: এ বৃদ্ধ লোকটি ছিল সুফইয়ান যামরী।
ইবন ইসহাক বলেন: এরপর রাসূল (সা) তাঁর সাহাবীদের নিকট ফিরে গেলেন। সন্ধ্যার সময় তিনি আলী ইব্ন আবূ তালিব, যুবায়র ইব্ন আওয়াম ও সা'দ ইব্ন আবু ওয়াক্কাস (রা)-কে একদল সাহাবীসহ বদরের জলাশয়ের কাছে তথ্য অনুসন্ধানের জন্য পাঠালেন। সেখানে তাঁরা কুরায়ש গোত্রের একপাল পানি বহনকারী উট দেখতে পেলেন এবং তার মধ্যে হাজ্জাজ গোত্রের গোলাম আসলাম এবং বনূ 'আস ইব্ন সাঈদের গোলাম আবু ইয়াসার 'আরীযকে দেখতে পেলেন। তারা ঐ লোক দুটিকে সাথে নিয়ে এলেন এবং জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলেন। এসময় রাসূলুল্লাহ্ (সা) দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করছিলেন। তাঁরা তাদের জিজ্ঞেস করলেন: তোমরা কারা? তারা বলল: আমরা কুরায়শ গোত্রের পানি সরবরাহকারী। তারা আমাদের খাবার পানি নিতে এখানে পাঠিয়েছে। মুসলমানরা তাদের কথা বিশ্বাস করলেন না। তাদের ধারণা ছিল, এরা আবূ সুফইয়ানের লোক। এরপর তাঁরা তাদের কিছু মারপিট করলেন। প্রচণ্ড পিটুনি খেয়ে তারা বলল যে, আমরা আবূ সুফইয়ানের লোক। এরপর সাহাবীরা তাদের আর কোন কিছু জিজ্ঞেস করলেন না।
ইতিমধ্যে রাসূলুল্লাহ্ (সা) সালাত শেষ করে বললেন: ওরা যখন সত্য বলল, তখন তোমরা ওদের প্রহার করলে। যখন মিথ্যা বলল, তখন তোমরা জিজ্ঞাসাবাদ থেকে বিরত হলে! আল্লাহ্র কসম! এরা নিশ্চয়ই কুরায়শের লোক। তখন নবী (সা) নিজে তাদের জিজ্ঞেস করা শুরু করলেন: ওহে যুবকদ্বয়, তোমরা আমাকে কুরায়শের খবর বল। তখন তারা উভয়ে বলল: আল্লাহর কসম! ঐ যে দূরে বালুর টিলাটা দেখছেন, ওর পেছনে তারা রয়েছে। ঐ টিলার নাম ছিল আকানকাল। পরে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের জিজ্ঞেস করলেন ওরা সংখ্যায় কত? আসলাম ও আরীদ বলল: অনেক। রাসূলুল্লাহ্ (সা) পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন: তাদের সাজসরঞ্জাম কিরূপ? তারা বললেন: আমরা জানি না। তিনি জিজ্ঞেস করলেন ওরা প্রতিদিন কয়টা উট যবেহ করে? তারা বলল: কোনদিন নয়টা, কোনদিন দশটা। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তাহলে ওদের সংখ্যা নয় শো থেকে হাজারের মধ্যে হবে। তারপর তিনি (সা) তাদের জিজ্ঞেস করলেন: কুরায়ש নেতাদের মধ্য থেকে কে কে এসেছে? তারা বলল 'উতবা ইব্ন রবী'আ, শায়বা ইন্ন রবী'আ, আবুল বুখারী ইব্ন হিশাম, হাকীম ইব্ন হিযাম, নাওফাল ইব্ খুয়ায়লিদ, হারিস ইব্ন 'আমির ইবন নাওফাল, তুআয়মা ইব্ন আদী ইবন নাওফাল, নযর ইন্ন হারিস, যাম্'আ ইব্ন আসওয়াদ, আবু জাহল ইব্ন হিশাম, উমায়্যা ইব্ন খালফ, হাজ্জাজের দুইপুত্র নবীহ ও মুনাব্বিহ, সুহায়ল ইব্ন Amr, Amr ইব্ন আব্দে 'উদ। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) মুসলমানদের লক্ষ্য করে বললেন: মক্কা তার কলিজার টুকরোগুলো তোমাদের মুকাবিলায় পাঠিয়েছে।
ইবন ইসহাক বলেন: ইতিপূর্বে বাস্বাস্ ইব্ন Amr ও আদী ইব্ন আবূ যাগবা (রা) টহল দিতে দিতে বদর প্রান্তরে এসে থেমেছিলেন। তারা জলাশয়ের নিকবর্তী একটি টিলার কাছে গিয়ে উট থেকে নামলেন এবং একটা মশকে করে খাবার পানি নিলেন। তখন মাজদী ইব্ন Amr জুহানী জলাশয়ের পাশেই ছিল। জলাশয়ের কাছে অজ্ঞাত লোকদের দুটো বাঁদী ছিল। তাদের একজন অপরজনকে তার পাওনা পরিশোধ করতে বলল। তখন ঋণগ্রস্ত বাঁদীটি বলল: কাফেলা কাল কিংবা পরশুই আসবে। তখন আমি তাদের কাজ করে তোমার পাওনা দিয়ে দেব। মাজদী বলল তুমি ঠিকই বলেছ। তারপর সে উভয়ের বিবাদ মিটিয়ে দিল। 'আদী ও বাস্বাস্ (রা) এ কথোপকথন শুনে তাঁদের উটে চড়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট ফিরে গেলেন এবং যা তারা শুনলেন, তা তাঁকে জানালেন।
টিকা:
১. একদল আবূ সুফইয়ানের বাণিজ্য কাফেলা, অন্যদল আবূ জাহলের নেতৃত্বে কাফিরদের সশস্ত্র বাহিনী।