📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 কুরায়শদের রণ প্রস্তুতি

📄 কুরায়শদের রণ প্রস্তুতি


ভয়াবহ ঘটনার কারণে আমরা কেউ কারো প্রতি মনোযোগী হতে পারলাম না। লোকজন অতিদ্রুত যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে ফেলল। তারা বলতে লাগল: মুহাম্মদ ও তাঁর সহচররা আমাদের এ কাফেলাকে কি ইন্ন হাযরামীর কাফেলার মত মনে করেছে? আল্লাহর কসম! কখনো এরূপ নয়। এবার তারা অবশ্যই অন্য রকম অভিজ্ঞতা লাভ করবে।
কুরায়শের লোকজন এবার কেউ পিছিয়ে রইল না। প্রত্যেকেই হয় নিজে যোদ্ধার বেশে ময়দানে রওয়ানা হল, নয় নিজের বদলে কাউকে পাঠাল। একমাত্র আবু লাহাব ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিব ছাড়া কুরায়শের নেতৃস্থানীয় আর কোন ব্যক্তি বাদ থাকল না। সে 'আসী ইব্‌ন হিশাম ইবন মুগীরাকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে যুদ্ধ করতে পাঠাল। 'আসীর কাছে আবু লাহাবের চার হাজার দিরহাম পাওনা ছিল। সে দারিদ্র্যের কারণে তা পরিশোধে অক্ষম হয়ে পড়েছিল। সেই পাওনা টাকার বিনিময়ে তাকে যুদ্ধে পাঠিয়ে আবু লাহাব বাড়ি বসে থাকল।
ইবন ইসহাক বলেন: আমাকে আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবূ নুজায়হ বলেছেন যে, আবু লাহাব ছাড়া আরো এক ব্যক্তি যুদ্ধে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আর সে ছিল উমাইয়া ইন্ন খালফ। সে ছিল মোটা-সোটা এক রাশভারী বৃদ্ধ। সে যুদ্ধে যাবে না শুনে 'উব্বা ইব্‌ন আবূ মু'আইত তার কাছে এল। উমাইয়া তখন মাসজিদুল হারামে তার লোকজনের সাথে বসে ছিল। 'উব্বা উমাইয়ার সামনে একটি আগুন ভর্তি পাত্র রাখল, যাতে আগরবাতি ছিল; এরপর সে তাকে বলল: হে আবু আলী, তুমি এর ঘ্রাণ নাও। কারণ তুমি তো মেয়ে মানুষ। তখন লজ্জায় ও অপমানে উত্তেজিত হয়ে উমাইয়া বলল: আল্লাহ্ তোমাকে অপদস্থ করুন এবং তোমার কাজকে অপসন্দ করুন। এরপর বুড়ো উমাইয়া যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিল এবং সকলের সাথে রওয়ানা হয়ে গেল।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 বনূ বাকর ও কুরায়শের মধ্যে যুদ্ধের কারণ

📄 বনূ বাকর ও কুরায়শের মধ্যে যুদ্ধের কারণ


ইবন ইসহাক বলেন: কুরায়শ বাহিনীর রণসজ্জা ও যুদ্ধের ময়দানে যাওয়ার প্রস্তুতি যখন সম্পন্ন হল, তখন তারা বনূ বাকর ইন্ন আব্দ মানাত ইব্‌ন্ন কিনানার সাথে তাদের অতীতে সংঘটিত যুদ্ধের কথা মনে করে চিন্তিত হয়ে পড়ল। তারা বলল: আমরা আশংকা করছি যে, বনূ বাকর পেছন দিক থেকে আমাদের উপর আক্রমণ করতে পারে।
বনু আমিরের কোন এক ব্যক্তি সাঈদ ইবন মুসায়্যাব সূত্রে আমার কাছে যা বর্ণনা করেছেন, সে প্রেক্ষিতে দেখা যায় যে, কুরায়শ এবং বনূ বাকরের মধ্যে যে যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, তার কারণ ছিল হাফস ইব্‌ন আখ্যাফের ছেলের হত্যা। যে ছিল বন্ধু মু'আয়স্ ইব্‌ন আমির ইব্‌ন লুআঈ-এর সদস্য। সে একদা একটি হারানো উটের সন্ধানে যাজনান নামক স্থানে যায়। এ সময় সে ছিল অল্প বয়সের একটি ছেলে। তার মাথায় ছিল লম্বা চুল এবং পরিধানে ছিল সুন্দর পরিপাটি পোশাক, আর তার শরীরের রং ছিল উজ্জ্বল ফর্সা। সে আমির ইব্‌ন ইয়াযীদ ইব্‌ন আমির ইব্‌ন মালূহ্-এর কাছ দিয়ে অতিক্রম করছিল, যে বনূ ইয়ামার ইব্‌ন 'আওফ ইব্‌ন কা'ব ইবন 'আমির ইব্‌ন লায়স ইব্‌ন বাকর ইব্‌ন আব্দ মানাত ইব্‌ন কিনানার লোক ছিল এবং সে যাজনানে ছিল। এ সময় সে ছিল বনূ বাকরের সরদার। সে ছেলেটিকে দেখে বিস্মিত হল এবং জিজ্ঞেস করল: হে ছেলে, তুমি কে? সে বলল: আমি হাফস ইব্‌ন আখ্যাফ কুরায়শীর ছেলে। যখন সে ফিরে চলে গেল, তখন আমির ইবন ইয়াযীদ বলল: হে বনূ বাকর! কুরায়শদের কাছে তোমাদের কোন খুন পাওনা নেই কি? তারা বলল: আল্লাহ্ কসম! অবশ্যই, তাদের কাছে আমাদের অনেক খুন পাওনা আছে। সে বলল যদি কেউ এ ছেলেটিকে তার নিজের কোন ব্যক্তির বদলে খুন করে, তবে 'সে তার নিজের খুনের পূর্ণ প্রতিশোধ নিতে পারবে।
একথা শোনার পর বনূ বাকরের এক ব্যক্তি ঐ ছেলেটির পিছু নিল এবং সে তাকে ঐ খুনের বদলায় হত্যা করল, যা কুরায়শের কাছে পাওনা ছিল। কুরায়שরা এ হত্যার ব্যাপারে কথাবার্তা বলায় আমির ইব্‌ন ইয়াযীদ বলল: হে বনু কুরায়শ! তোমাদের কাছে আমাদের অনেক খুন পাওনা আছে। এ জন্য আমরা তাকে হত্যা করেছি! এখন তোমরা যা খুশি করতে পার। যদি তোমরা চাও, তবে তোমাদের যিম্মায় যা আছে, তা আদায় করে দাও এবং আমাদের যিম্মায় যা আছে, তা আমরা আদায় করে দেব। আসলে খুনের ব্যাপার তো এরূপ যে, একজনের বদলে আরেকজনকে খুন করা হয়। এখন যদি তোমরা আমাদের যিম্মায় তোমাদের যে খুন পাওনা আছে, এর দাবি পরিহার কর; তবে আমরাও তোমাদের যিম্মায় আমাদের যে খুন পাওনা আছে, সে দাবি পরিত্যাগ করব।
বস্তুত কুরায়ש গোত্রের মধ্যে এ ছেলেটির হত্যা তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার না হওয়ায় তারা বলল: 'আচ্ছা, জানের বদলে জান।' অবশেষে তারা ছেলেটির হত্যার কথা ভুলে যায় এবং তার রক্তের বিনিময় দাবি করল না।
এ ঘটনার কিছুদিন পর ঐ ছেলের ভাই মিকরায ইব্‌ন হাফস ইব্‌ন আগ্রাফ 'মাররা-জাহ্বানের' পাশ দিয়ে অতিক্রম করেছিল। হঠাৎ সে আমির ইবন ইয়াযীদ ইব্‌ন আমির ইব্‌ন্ন মালূহকে উটের উপর আরোহিত অবস্থায় দেখল। যখন সে তাকে দেখল, তখন-ই সে তার কাছে চলে গেল। সে তার উট তার পাশে নিয়ে বসাল। এ সময় আমিরের তরবারি কোষবদ্ধ ছিল। মিক্রায তরবারি নিয়ে তার উপর হামলা করে তাকে হত্যা করল এবং সে তরবারি তার পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে দিল। তাকে মক্কায়, নিয়ে এসে, রাতের মাঝেই কা'বার পর্দার সাথে ঝুলিয়ে রাখল। সকালবেলা কুরায়שরা জেগে দেখল যে, 'আমির ইব্‌ন ইয়াযীদ ইব্‌ন আমিরের তরবারি কাবার পর্দার সাথে ঝুলছে। তখন তারা বলল: এটা তো 'আমির ইবন ইয়াযীদের তরবারি। মিকরায ইন্ন হাফস তার উপর হামলা করে তাকে হত্যা করেছে। এটাই ছিল তাদের যুদ্ধের অবস্থা।
তারা যখন তাদের এ যুদ্ধে লিপ্ত ছিল, তখন মানুষের মধ্যে ইসলাম প্রচার ও প্রসার লাভ করে। ফলে তারা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এমতাবস্থায় কুরায়שরা বদর প্রান্তরে যাওয়ার ইরাদা করে। সে সময় তাদের ও বনূ বাকরের মধ্যে যে তিক্ত সম্পর্ক ছিল, তা তাদের মনে পড়ে; ফলে তারা তাদের পক্ষ থেকে ক্ষতির আশংকা করতে থাকে। আমির ইবন ইয়াযীদ ইব্‌ন আমিরের হত্যায় মিকরায ইবন হাসের কবিতা:
"আমি যখন আমিরকে দেখলাম, তখন আমার ভাইয়ের খণ্ডিত দেহ-অংশের কথা আমার মনে পড়ল। আমি মনে মনে বললাম: এই সেই আমির, তুমি এর থেকে ভয় পেয়ো না, আর দেখ যে কোন ধরনের বাহন। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে, যদি আমি তার উপর তরবারি দিয়ে যথাযথভাবে আঘাত করতে পারি, তাহলে সে অবশ্যই হালাক হবে। আমি আমার মনকে শক্ত করলাম এবং এমন বীর যোদ্ধার উপর আঘাত করলাম, যে ছিল অভিজ্ঞ ও অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত। যখন আমরা উভয়ে মুখোমুখি হলাম, তখন একথা স্পষ্ট হয়ে গেল যে, আমি চরিত্রহীন, কাপুরুষ মা-বাপের সন্তান ছিলাম না। আমি তার থেকে প্রতিশোধ নিলাম এবং আমি প্রতিশোধ নেওয়ার কথা ভুলতে পারিনি; আর এ ধরনের প্রতিশোধের কথা কেবল অজ্ঞ লোকেরাই ভুলতে পারে।"

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 সুরাকার দায়িত্ব গ্রহণ

📄 সুরাকার দায়িত্ব গ্রহণ


ইবন ইসহাক বলেন: ইয়াযীদ ইন্ন রুমান 'উরওয়া ইন্ন যুবায়র থেকে আমার কাছে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: যখন কুরায়শরা রওয়ানা হওয়ার ইচ্ছা করল, তখন তাদের এবং বনূ বাকরের মধ্যকার খারাপ সম্পর্কের কথা মনে পড়ল। ফলে তারা তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের নিকটবর্তী হল। এ সময় ইবলীস সুরাকা ইবন মালিক ইব্‌ন জু'শাম মুদলাজীর আকৃতিতে তাদের সামনে হাযির হল, আর সুরাকা ছিল কিনানা বংশের অন্যতম সরদার। সে কুরায়শদের লক্ষ্য করে বলল: তোমরা এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর, বনূ কিনানা যদি তোমাদের উপর এমন কোন কিছু করে, যা তোমরা অপসন্দ কর, তবে এর দায়িত্ব আমি গ্রহণ করছি। এ কথা শুনে কুরায়שরা দ্রুত রওয়ানা দিল।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যাত্রা

📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যাত্রা


ইবন ইসহাক বলেন: রমযান মাসের কিছু দিন অতিবাহিত হওয়ার পর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর সাহাবীদের নিয়ে বের হলেন। ইবন হিশাম বলেন: সে দিন ছিল রমযানের আট তারিখ, সোমবার। রাসূলুল্লাহ্ (সা) প্রথমত আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন উম্মু মাকতুম (রা)-কে লোকদের নিয়ে সালাতে ইমামতি করার দায়িত্বে রেখে যান। এরপর তিনি (সা) 'রাওহা' থেকে আবু লুবাবা (রা)-কে মদীনার অস্থায়ী শাসক বানিয়ে ফেরত পাঠান।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00