📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 উশায়রা অভিযান

📄 উশায়রা অভিযান


ইন্ন হিশাম বলেন: এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) আবু সালমা ইব্‌ন আবদুল আসাদকে গভর্নর নিয়োগ করে কুরায়শদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বের হন।
ইবন ইসহাক বলেন: প্রথমে বনু দীনারের গিরিপথ দিয়ে এবং পরে খাব্বারের মরুভূমি অতিক্রম করে ইব্‌ন আযহারের প্রস্তরময় স্থানে একটি গাছের নিচে, যাকে 'যাতুস্-সাক' বলা হয়, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যাত্রা বিরতি করেন। সেখানে তিনি সালাত আদায় করেন। পরবর্তীকালে সেখানে তাঁর (সা) নামে একটি মসজিদ তৈরি হয়। সেখানে তাঁর জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। যা তিনি খান এবং তাঁর সঙ্গীরাও খান। এখানে রান্না-বান্নার জন্য যে চুলা নির্মিত হয়েছিল, সে স্থানটি এখনও পরিচিত। এরপর মুশতারাব নামক ঝর্ণা থেকে তাঁর জন্য খাবার পানি সংগ্রহ করা হয়। অবশেষে রাসূলুল্লাহ্ (সা) সেখান থেকে রওয়ানা হলেন এবং খালায়েক নামক স্থানকে বাঁদিকে রেখে আবদুল্লাহ্ উপত্যকার পথ ধরে অগ্রসর হলেন, যা এখনও 'শো'বা আবদুল্লাহ্' নামে পরিচিত। এরপর তিনি বামদিকের নিচু ভূমি অতিক্রম করে ইয়ালীল নামক স্থানে পৌঁছেন এবং যাবৃআ নামক মোহনায় যাত্রা বিরতি করেন। এখানকার একটি কূপ থেকে তিনি পানিপান করেন এবং মিলাল নামক মরূদ্যানের পথ ধরে সামনে চলতে থাকেন। অবশেষে তিনি সাহীরাতুল ইয়ামামের নিকট গিয়ে সাধারণের চলাচলের রাস্তায় উঠেন। তিনি (সা) সামনে অগ্রসর হয়ে ইয়াম্বু উপত্যকায় অবস্থিত আশীরা নামক স্থানে পৌঁছেন। সেখানে তিনি গোটা জুমাদিউল আউয়াল ও জুমাদিউস সানীর কয়েক দিন অবস্থান করেন। এখানে তিনি বনূ মাদলাজ ও তাদের মিত্র বনূ যামরার সংগে সন্ধি চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে মদীনায় ফিরে যান। এখানে কোন যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি। এ অভিযানের সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা) আলী (রা)-কে যা বলেছিলেন, তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে ইয়াযীদ ইব্‌ন মুহাম্মদ ইব্‌ন খায়সাম মুহারিবী সূত্র পরম্পরায় আম্মার ইব্‌ন ইয়াসির (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: আমি ও আলী আশীরা অভিযানে পরস্পরের সঙ্গী ছিলাম। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন সেখানে অবস্থান করলেন, তখন আমরা বনূ মাদলাজ গোত্রের কিছু লোককে তাদের একটি কুয়া ও খেজুরের বাগানে কাজ করতে দেখলাম। তখন আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা) আমাকে বললেন: হে আবু ইয়াক্যান! তুমি কি আমার সঙ্গে ওদের কাছে যাবে, আমরা দেখে আসব তারা কিভাবে কাজ করে? আমি বললাম: ঠিক আছে। যেতে চান তো চলুন। আম্মার বলেন: তারপর আমরা তাদের কাছে গেলাম। কিছু সময় তাদের কাজকর্ম দেখার পর আমরা নিদ্রাভিভূত হয়ে পড়লাম। তখন আমরা কয়েকটি ছোট খেজুরের চারার ছায়ায় নরম যমীনের উপর নিদ্রা গেলাম। আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ্ (সা) নিজে এসে না জাগানো পর্যন্ত আমরা জাগিনি। সেদিন তিনি আলী (রা)-এর গায়ে মাটি লেগে যাওয়ার দৃশ্য দেখে তাকে বললেন: হে আবূ তুরাব! (মাটির বাবা) তোমার এ কি দশা? তারপর তিনি বললেন: পৃথিবীর সবচেয়ে হতভাগা ব্যক্তিদ্বয় সম্পর্কে জানতে চাও কি? আমরা বললাম হ্যাঁ। ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা) অবশ্যই জানতে চাই। তিনি বললেন: তাদের দু'জনের একজন হল: সামুদ জাতির সেই ব্যক্তি, যে সালিহ আলায়হিস সালামের উটনীকে হত্যা করেছিল। আর দ্বিতীয়জন হল সেই ব্যক্তি, যে তোমার এ ঘাড়ের উপর কোপ দিয়ে তোমাকে হত্যা করবে; ফলে তোমার এ দাড়ি রক্তে রঞ্জিত হবে।
ইবন ইসহাক বলেন: কোন কোন জ্ঞানীজন আমাকে বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) আলীকে আবূ তুরাব বলে এ জন্য ডাকতেন যে, যখন তিনি তাঁর সহধর্মিণী ফাতিমার উপর কোন ব্যাপারে অসন্তুষ্ট হতেন, তখন তিনি তাঁর সঙ্গে কোন কথা বলতেন না এবং তাঁর সঙ্গে কোন অপ্রিয় আচরণ করতেন না, বরং তিনি নিজের মাথায় কিছু ধুলোবালি মেখে চুপচাপ বসে থাকতেন। রাবী বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখনই আলী (রা)-এর মাথার ধুলোবালি দেখতে পেতেন, তখনই বুঝতেন যে, তিনি ফাতিমার উপর নাখোশ হয়েছেন। এ সময় তিনি বলতেন: হে আবু তুরাব! তোমার কি হয়েছে? এ দু'টি বর্ণনার মাঝে কোন্টি সঠিক, তা আল্লাহ্-ই ভাল জানেন।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 সা'দ ইব্‌ন আবু ওয়াক্কাসের নেতৃত্বে সেনাদল প্রেরণ

📄 সা'দ ইব্‌ন আবু ওয়াক্কাসের নেতৃত্বে সেনাদল প্রেরণ


ইবন ইসহাক বলেন: এ সময়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা) সা'দ ইব্‌ন আবু ওয়াক্কাসের নেতৃত্বে আটজন মুহাজিরের একটি সেনাদল পাঠান, যাঁরা হিজাযের খাররার নামক স্থান পর্যন্ত যান এবং কোন সংঘর্ষ ছাড়াই নিরাপদে মদীনায় ফিরে আসেন। ইবন হিশাম বলেন: কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে, এ সেনাদলটি হামযা (রা)-এর সেনাদলের পরে প্রেরিত হয়েছিল।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 সাফওয়ান অভিযান বা প্রথম বদর অভিযান

📄 সাফওয়ান অভিযান বা প্রথম বদর অভিযান


ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) আশীরা অভিযান থেকে ফিরে এসে মদীনায় দশ দিনেরও কম কাটান। এ সময় কুরয ইব্‌ন জাবির ফিহরী মদীনার উপকণ্ঠে অবস্থিত চারণভূমিতে হামলা চালায়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার পিছু ধাওয়া করেন। ইবন হিশাম বলেন: এ সময়ে তিনি যায়দ ইবন হারিসা (রা)-কে মদীনায় ভারপ্রাপ্ত গভর্নর নিয়োগ করেন।
ইবন ইসহাক বলেন: তিনি তাকে ধাওয়া করতে করতে সাফওয়ান নামক উপত্যকায় গিয়ে পৌঁছেন। এ স্থানটি বদরের কাছাকাছি অবস্থিত। তাই একে প্রথম বদর অভিযানও বলা হয়। তিনি কুরয ইব্‌ন জাবিরকে ধরতে পারেননি। ফলে তিনি মদীনায় ফিরে আসেন এবং এখানেই জুমাদিউস সানীর বাকী অংশ এবং রজব ও শাবান মাস অতিবাহিত করেন।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন জাহ্শের নেতৃত্বে সেনাদল প্রেরণ

📄 আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন জাহ্শের নেতৃত্বে সেনাদল প্রেরণ


প্রথম বদর অভিযানের কিছুদিন পরই রজব মাসে রাসূলুল্লাহ্ (সা) আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন জাহ্শের নেতৃত্বে আটজন মুহাজিরের একটি সেনাদল পাঠালেন, যাদের মধ্যে কোন আনসার সাহাবী ছিলেন না। তিনি (সা) তাঁকে একখানা চিঠি লিখে দিয়ে বললেন: একটানা দু'দিন চলার আগে এ চিঠি পড়বে না। আর পড়ার পর ঐ চিঠির নির্দেশ মুতাবিক কাজ করবে এবং সঙ্গীদের কাউকে সেই কাজ করতে বাধ্য করবে না।
মুহাজিরদের মধ্য থেকে আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন জাহশ (রা)-এর সেনাদলে ছিলেন: (১) আবু হুযায়ফা ইব্‌ন উত্তা ইব্‌ন রবী'আ ইব্‌ন আবদুশ শামস; (২) আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন জাহশ, বনু আবদুশ্ শামস ও আবদুল মানাফের মিত্র এবং এ সেনাদলের নেতা; (৩) উক্বাশা ইব্‌ন মিহসান ইবন হুরসান, যিনি বনূ আসাদ ইব্‌ন খুযায়মার লোক ছিল; (৪) উত্তা ইব্‌ন গাযওয়ান ইব্‌ন জাবির যিনি বনূ নাওফালের মিত্র ছিলেন; (৫) সা'দ ইব্‌ন আবু ওয়াক্কাস, যিনি বনু যোহরা ইব্‌ন কিলাবের লোক ছিলেন; (৬) আমির ইব্‌ন রবী'আ, যিনি বনূ আদী ইব্‌ন কা'বের অন্তর্ভুক্ত আনয ইব্‌ন ওয়ায়ল শাখার লোক ছিলেন; (৭) ওয়াকিদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন মানাফ ইব্‌ন আরীন ইবন সা'লাবা ইব্‌ন ইয়ারবু', যিনি বনু তামীমের লোক ছিলেন; (৮) খালিদ ইব্‌ন বুকায়র, যিনি বনূ সা'দ ইব্‌ন লায়সের লোক ছিলেন এবং (৯) সুহায়ল ইব্‌ন বায়যা, যিনি বনু হারিস ইব্‌ন ফিহরের লোক ছিলেন। এভাবে এ সেনাদলের সদস্য সংখ্যা হয় নয়জন।
আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন জাহশ দু'দিন চলার পর চিঠিখানা খুললেন। তাতে লেখা ছিল : “এ চিঠি পড়ার পর, মক্কা ও তায়েফের মধ্যবর্তী নাখলার দিকে চলে যাও, সেখানে বসে কুরায়শের তৎপরতা পর্যবেক্ষণ কর এবং তাদের খবর আমাকে জানাও। চিঠি পড়ে আবদুল্লাহ্ বললেন : “আদেশ শিরোধার্য।”-এরপর তিনি তাঁর সংগীদের বললেন : রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাকে নাখলায় গিয়ে কুরায়শের তৎপরতা পর্যবেক্ষণ ও তাদের খবর সংগ্রহের আদেশ দিয়েছেন। আর তিনি আমাকে তোমাদের কারো উপর যবরদস্তি করতে নিষেধ করেছেন। তোমাদের মাঝে যে শহীদ হতে চায় এবং যে এটা পসন্দ করে, সে আমার সঙ্গে চলুক। আর যে এটা অপসন্দ করে, সে ফিরে যাক। আমি অবশ্যই রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নির্দেশ পালন করব। এরপর তিনি রওয়ানা হলেন এবং তাঁর সাথে তাঁর সঙ্গীরা সকলেই চললেন, কেউ পিছনে রইলেন না।
এরপর তিনি হিজাযের রাস্তা ধরে চলতে লাগলেন যখন তারা বাহরান নামক স্থানে পৌঁছলেন, তখন সা'দ ইব্‌ন আবু ওয়াক্কাস এবং উত্ত্বা ইন্ন গাযওয়ান তাদের স্ব-স্ব উট হারিয়ে ফেললেন। সেই উট খুঁজতে গিয়ে তারা পেছনে পড়ে গেলেন। আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন জাহশ ও তাঁর অবশিষ্ট সঙ্গী-সাথীরা নাখলায় গিয়ে থামলেন। এ সময় তাঁদের পাশ দিয়ে একটি কুরায়ש বাণিজ্য কাফেলা কিসমিস, চামড়া ও অন্যান্য বাণিজ্য পণ্য নিয়ে যাচ্ছিল। এ কাফেলার সদস্য ছিল: Amr ইবন হাযরামী, উসমান ইব্‌ন আবদুল্লাহ ইব্‌ন মুগীরা মাখযুমী, তার ভাই নাওফাল ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ মাখযুমী এবং হিশام ইব্‌ন মুগীরার আযাদকৃত গোলাম হাকাম ইব্‌ কায়সান। ইবন হিশাম বলেন: এ হাযরামীর নাম হল আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আব্বাদ। অন্যমতে মালিক ইব্‌ন আব্বাদ, যে বনু সাদাফের সদস্য। আর সাদাফের নাম হল Amr ইবন মালিক। সে ছিল বনূ সাকুন ইব্‌ন আশরাস ইব্‌ন কান্দার লোক। যাকে কান্দীও বলা হয়। আবদুল্লাহ্ ইবন জাহশের দলটি দেখে কুরায়শ দল ভীত হয়ে পড়ে। কেননা দলটি তাদের একেবারেই নিকটে পৌঁছে গিয়েছিল। উক্কাশা ইব্‌ন মিহ্সান গিয়ে তাদের দেখলেন। তাঁর মাথা মুন্ডানো দেখে কুরায়שরা আশ্বস্ত হল এবং তারা বলল : এরা তো উমরাকারী লোক; এদের পক্ষ থেকে তোমাদের ভয়ের কোন কারণ নেই। এ ঘটনাটি ছিল রজব মাসের শেষ দিনের। মুসলিম সেনাদল কুরায়শ কাফেলা সম্পর্কে পরামর্শ করতে বসলেন। তারা বললেন: আল্লাহ্র কসম! আজকের রাতে যদি এ কাফেলাকে ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে এরা হারাম শরীফে প্রবেশ করবে এবং তখন তাদের উপর আক্রমণ করা যাবে না। আর যদি এখন তাদের হত্যা করা হয়, তবে তাও হবে নিষিদ্ধ মাসে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড। মুসলিম বাহিনী কুরায়ש কাফেলার উপর হামলা করার ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত ও শংকিত হয়। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা সে দ্বিধাদ্বন্দু কাটিয়ে উঠলেন এবং এ মর্মে সিদ্ধান্ত নিলেন যে, কুরায়শ কাফেলার যে কয়জনকে পারা যায় হত্যা করা হবে এবং তাদের সাথে যা আছে, তা নিয়ে নেওয়া হবে। এ সিদ্ধান্ত অনুসারে ওয়াকিদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ তামীমী একটি তীর নিক্ষেপ করে Amr ইবন হাযরামীকে হত্যা করলেন এবং উসমান ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ ও হাকাম ইব্‌ন কায়সানকে বন্দী করলেন। কুরায়ש কাফেলার অপর ব্যক্তি নাওফাল ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ পালিয়ে আত্মরক্ষা করল। এরপর আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন জাহ্শ ও তাঁর সেনাদল কাফেলার উটের বহর ও বন্দী দু'জনকে নিয়ে মদীনায় রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট হাযির হলেন।
আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন জাহশের বংশধরের মধ্যে থেকে কেউ কেউ জানিয়েছেন: আবদুল্লাহ্ তাঁর সঙ্গীদের কাছে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, আমরা এই কাফেলা থেকে গনীমত হিসাবে যা পেয়েছি, এর এক-পঞ্চমাংশ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জন্য নির্দিষ্ট থাকবে। এরপর রাসূল (সা)-এর অংশ আলাদা করে গনীমতের অবশিষ্ট মাল তিনি তাঁর সঙ্গীদের মধ্যে বন্টন করে দিলেন। আর এ ছিল গনীমতের মাল থেকে খুমুস বা এক-পঞ্চমাংশ সম্পর্কে আল্লাহর বিধান নাযিল হওয়ার আগের ঘটনা।
ইবন ইসহাক বলেন: এরপর যখন তাঁরা মদীনায় রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট হাযির হলেন, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: "আমিতো তোমাদের নিষিদ্ধ মাসে যুদ্ধ করতে বলিনি।" এরপর তিনি কাফেলার উট ও দু'জন বন্দীর ব্যাপারটি মুলতবী রাখলেন এবং ঐ সম্পদ থেকে কিছু গ্রহণ করতে অস্বীকার করলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন এ কথা বললেন, তখন এতে মদীনার মুসলিম সমাজে আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন জাহশের সম্মান ও ভাবমর্যাদা ক্ষুণ্ণ হল। আর তিনি ও তাঁর দলের লোকেরা ভাবলেন যে, তাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে। মুসলমানরা তাদের এ কাজের জন্য তাদের তিরস্কার করলেন। অপরদিকে কুরায়শরা বলতে লাগল, "মুহাম্মাদ ও তাঁর সহচররা নিষিদ্ধ মাসকে হালাল করে নিয়েছে। তারা এ মাসে রক্তপাত ঘটিয়েছে, অন্যের সম্পদ লুণ্ঠন ও লোকদের বন্দী করেছে।" মক্কাতে অবস্থানকারী কিছু মুসলিম এর জবাবে বললেন: "মুসলমানরা যা কিছু করেছে, তা শাবান মাসে করেছে।" আর ইয়াহুদীরা এ ঘটনাকে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জন্য একটি অশুভ ঘটনা হিসাবে গণ্য করল। তারা বলল: Amr ইবন হাযরামীকে ওয়াকিদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ হত্যা করেছে। Amr শব্দ থেকে স্পষ্ট যে, 'যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হবে', হাযরামী শব্দ থেকে স্পষ্ট যে, 'যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী' এবং ওয়াকিদ শব্দ থেকে স্পষ্ট যে, 'যুদ্ধের লেলিহান শিখা প্রজ্বলিত হয়েছে।' এ অশুভ প্রচারণার প্রতিফল আল্লাহ্ তাদের উপর বর্তান এবং এতে তাদের কোন উপকার হয়নি। এ প্রচারণা যখন চরম আকার ধারণ করল, তখন আল্লাহ্ তাঁর রাসূলের (সা) উপর নিম্নোক্ত আয়াত নাযিল করলেন:
"পবিত্র মাসে যুদ্ধ করা সম্পর্কে লোকে আপনাকে জিজ্ঞেস করে। বলুন, এতে যুদ্ধ করা ভীষণ অন্যায়। কিন্তু আল্লাহর পথে বাধা দেওয়া, আল্লাহকে অস্বীকার করা, মাসজিদুল হারামে বাধা দেওয়া এবং এর বাসিন্দাদের এ থেকে বহিষ্কার করা আল্লাহ্র নিকট তার চাইতে অধিক অন্যায়।" অর্থাৎ যদি তোমরা নিষিদ্ধ মাসে হত্যা করে থাক, তবে তো তারা তোমাদের, আল্লাহকে অস্বীকার করার পাশাপাশি আল্লাহ্র রাস্তা থেকে এবং মসজিদে হারাম থেকে বাধা দিয়েছে। আর তোমরা এর বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও এ থেকে তোমাদের বের করে দেওয়া, তাদের মধ্যে থেকে তোমরা যাকে হত্যা করেছ, তার হত্যার চাইতে আল্লাহর নিকট এ কাজ খুবই অন্যায়! "ফিতনা হত্যার চাইতে ভীষণ অন্যায়", অর্থাৎ কাফিররা তো মুসলমানদের ঈমান আনার পর তাদের পুনরায় কুফরীতে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য তাদের উপর বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন চালাত, তাদের এ কাজ আল্লাহর নিকট হত্যার চাইতে অধিক গুনাহের কাজ। তারা সব সময় তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকবে, যতক্ষণ না তারা তোমাদের দীন থেকে ফিরিয়ে দেয়, অর্থাৎ আরো তাজ্জবের ব্যাপার এই যে, তারা এ ধরনের নিকৃষ্টতম অপরাধে অটল রয়েছে এবং তারা এ থেকে তাওবা করছে না এবং এ থেকে বিচ্ছিন্ন হচ্ছে না। কুরআনের এ স্পষ্ট বিধান যখন নাযিল হল এবং এ দিয়ে আল্লাহ্ মুসলমানদের ভয়-ভীতি ও দুশ্চিন্তা দূর করে দিলেন, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) কাফেলার উট ও বন্দীদের গ্রহণ করলেন। কুরায়שরা উসমান ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ ও হাকাম ইব্‌ন কায়সানের মুক্তিপণ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে পাঠালে তিনি বললেন: আমরা এ দু'জনের মুক্তিপণ ততক্ষণ পর্যন্ত গ্রহণ করব না, যতক্ষণ না আমাদের দু'জন সঙ্গী সা'দ ইব্‌ন আবু ওয়াক্কাস ও উত্তা ইব্‌ন গাযওয়ান ফিরে আসে। কেননা আমরা তোমাদের দ্বারা তাদের জীবন বিপন্ন হওয়ার আশংকা করছি। যদি তোমরা তাদের হত্যা করে থাক, তবে আমরাও তোমাদের এ সাথীদ্বয়কে হত্যা করব। এরপর সা'দ ও উত্তা ফিরে আসলে রাসূলুল্লাহ্ (সা) উসমান ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ ও হাকাম ইব্‌ন কায়সানকে মুক্তিপণ নিয়ে ছেড়ে দেন। এরপর হাকাম ইবন কায়সান ইসলাম গ্রহণ করেন এবং সাচ্চা মুসলমান হয়ে যান। তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছেই থেকে যান এবং বীরে মাউনার ঘটনায় তিনি শহীদ হন। আর উসমান ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ মক্কায় ফিরে যায় এবং সেখানে কাফির অবস্থায় মারা যায়। আয়াতটি নাযিল হওয়ার পর আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন জাহশ (রা) এবং তাঁর সঙ্গীদের ভয়-ভীতি ও দুশ্চিন্তা যখন দূর হল, তখন তাঁরা বিনিময়প্রাপ্তির আশা করলেন।
তাঁরা বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আমরা কি এখন আশা করতে পারি যে, যা ঘটে গেছে তা একটি অভিযান হিসাবে গণ্য হবে এবং এর বিনিময়ে আমাদের মুজাহিদদের মত পুরস্কার দেওয়া হবে? তখন আল্লাহ্ এ আয়াত নাযিল করেন:
"যারা ঈমান আনে এবং যারা আল্লাহর পথে হিজরত ও জিহাদ করে, তারাই আল্লাহর রহমত প্রত্যাশা করে। আল্লাহ্ পরম ক্ষমাশীল ও দয়ালু।" মহান আল্লাহ্ তাদের এ ব্যাপারে বড়ই আশান্বিত করলেন।
এ সম্পর্কে যুহরী ও ইয়াযীদ ইব্‌ন রূমান (র) সূত্রে 'উরওয়া ইব্‌ন যুবায়র (রা) থেকে হাদীস বর্ণিত আছে।
ইবন ইসহাক বলেন: আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন জাহশের বংশধরদের মধ্য থেকে কেউ কেউ বলেছেন যে, আল্লাহ্ তা'আলা যখন গনীমতের মাল (যুদ্ধলব্ধ সম্পদ)-কে হালাল করলেন, তখন যে বা যারা তা যুদ্ধ করে অর্জন করেছে, তাদের জন্য চার-পঞ্চমাংশ এবং আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের জন্য এক-পঞ্চমাংশ বরাদ্দ করলেন। আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন জাহশ কুরায়শ কাফেলার উটের ব্যাপারে যেরূপ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, আল্লাহ্র বিধানেও সেরূপই হল।
ইব্‌ন হিশাম বলেন: এ গনীমতই ছিল মুসলমানদের যুদ্ধ করে পাওয়া-প্রথম গনীমতের মাল। Amr ইবন হাযরামীই মুসলমানদের হাতে নিহত প্রথম ব্যক্তি এবং 'উসমান ইব্‌ন 'আবদুল্লাহ্ ও হাকাম ইবন কায়সান মুসলমানদের হাতে প্রথম যুদ্ধবন্দী।
ইবন ইসহাক বলেন: কুরায়শের লোকেরা যখন কুৎসা রটাতে লাগল যে, মুহাম্মদ ও তাঁর সহচররা নিষিদ্ধ মাসকে হালাল মনে করেছেন। এ মাসে তাঁরা রক্তপাত ঘটিয়েছেন এবং অন্যের সম্পদ কেড়ে নিয়েছেন, আর লোকদের বন্দী করেছেন, তখন আবুবকর সিদ্দীক (রা) এবং অন্য মতে আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন জাহশ (রা) নিম্নোক্ত কবিতার মাধ্যমে তার জবাব দেন:
"নিষিদ্ধ মাসে হত্যাকাণ্ডকে তোমরা বিরাট অপরাধ মনে করছ অথচ বিবেকবান লোক সুবিবেচনার আলোকে যদি বিচার করে, তবে তার চেয়ে বড় অপরাধ হল তোমাদের মুহাম্মদের দাওয়াতের বিরোধিতা করা এবং তাঁকে অস্বীকার করা। আল্লাহ্ সব কিছু দেখেন এবং এর সাক্ষী। আর আল্লাহর মসজিদ থেকে তার অধিবাসীদের এ উদ্দেশ্যে তোমাদের বের করে দেওয়া, যাতে আল্লাহ্র ঘরে আল্লাহকে সিজদাকারী কাউকে দেখা না যায়। যদি তোমরা এ হত্যাকাণ্ডের জন্য আমাদের দোষারোপ কর, আর তোমাদের কোন বিদ্রোহী ও হিংসুটে লোক এ ধরনের গুজবের মাধ্যমে ইসলামের মধ্যে অশান্তি সৃষ্টি করতে চায়, তবে শুনে রাখ, যখন ওয়াকিদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ যুদ্ধের অগ্নিশিখা প্রজ্বলিত করল, তখন আমরা নাখলা নামক স্থানে ইবন হাযরামীর রক্তে আমাদের তীর রঞ্জিত করলাম। আর উসমান ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ আমাদের হাতে বন্দী রয়েছে; রক্তমাখা শিকলে সে বাঁধা আছে।"

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00