📄 হিজরতের তারিখ
ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) রবিউল আউয়াল মাসের বারো তারিখ সোমবার দুপুরের প্রাক্কালে প্রখর রৌদ্রের মধ্যে মদীনায় আগমন করেন। ইবন হিশামের মতেও এটিই হিজরতের তারিখ। ইবন ইসহাক বলেন: এ সময় রাসূল (সা)-এর বয়স হয়েছিল ৫৩ বছর এবং নবুওয়তের তের বছর অতিবাহিত হয়েছিল। এরপর তিনি রবিউল আউয়াল মাসের বাকী দিনগুলো, রবিউস সানী, জমাদিউল আওয়াল, জমাদিউস্ সানী, রজব, শাবান, রমযান, শওয়াল, যিলকদ, যিলহাজ্জ ও মুহাররম মাসগুলো মদীনাতেই কাটিয়ে দেন। ঐ বছর হজ্জের যাবতীয় ব্যবস্থাপনা যথারীতি মুশরিকরাই সম্পাদন করে। মদীনায় আগমনের এক বছর পর, সফর মাসের প্রথমদিকে তিনি যুদ্ধ-পরিচালনার জন্য মদীনার বাইরে যান।
📄 ওদ্দান যুদ্ধ : রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রত্যক্ষ আংশগ্রহণে সংঘটিত প্রথম যুদ্ধ
ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) মদীনা থেকে বের হয়ে কুরায়শ ও বনূ যামরার সন্ধানে ওদ্দানে গিয়ে উপস্থিত হন। একে আবওয়ার যুদ্ধও বলা হয়। এখানে বনূ যামরা তাঁর (সা) সঙ্গে সন্ধিতে আবদ্ধ হয়, আর ঐ গোত্রের পক্ষ হয়ে তাদের নেতা মাখসা ইব্ন আমর যামরী তাঁর সঙ্গে সন্ধি করেন। এ অভিযানে কারো সঙ্গে মুকাবিলা হয়নি এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) নিরাপদে মদীনায় ফিরে আসেন। এরপর সফর মাসের অংশ ও রবিউল আউয়াল মাসের প্রথমাংশ তিনি সেখানে কাটান। ইবন হিশাম বলেন: এটাই ছিল রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে সংঘটিত প্রথম যুদ্ধাভিযান।
📄 উবায়দা ইবন হারিসের অভিযান
ইবন ইসহাক বলেন: ওদ্দান অভিযানের পর মদীনায় অবস্থানকালেই রাসূলুল্লাহ্ (সা) স্বীয় চাচাতো ভাই উবায়দা ইবন হারিস ইবন মুত্তালিব ইব্ন আব্দ মানাফ ইন্ন কুসাইয়ের নেতৃত্বে ৬০ অথবা ৮০ জন অশ্বরোহী মুহাজির সেনাকে এক অভিযানে পাঠান এবং এদের মধ্যে কোন আনসার সাহাবী ছিলেন না। তাঁরা হিজাযের সানিয়াতুল মাররা পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত একটি জলাশয়ের কাছে পৌঁছলে সেখানে কুরায়শ বংশের বিপুল সংখ্যক লোকের এক সমাবেশ দেখতে পান। কিন্তু এ দু'দলের মধ্যে কোন যুদ্ধ হয়নি। তবে সা'দ ইব্ন আবু ওয়াক্কাস একটি তীর নিক্ষেপ করেন, যা ছিল ইসলামী বাহিনীর পক্ষ থেকে তীর নিক্ষেপের প্রথম ঘটনা।
এরপর মুসলিম বাহিনী কুরায়শ সমাবেশ থেকে দূরে সরে যায়। এ সময় মুসলিম বাহিনীতে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। এ সময় মুশরিকদের দল থেকে বনু যুহরার মিত্র মিকদাদ ইব্ন Amr বাহরানী ও বনু নাওফাল ইব্ন আব্দ মানাফের মিত্র উতবা ইব্ন গায়ান ইব্ন জাবির মাযনী পালিয়ে মুসলমানদের কাছে আসেন। এঁরা দু'জন মুসলমান ছিলেন, কিন্তু তাঁরা কাফিরদের সাথে সখ্যতা স্থাপনের জন্য সেখানে গিয়েছিলেন। কাফিরদের নেতা ছিল আবু জাহলের পুত্র ইকরামা। তবে ইব্ন হিশামের মতে ঐ দলের নেতা ছিল মিকরায় ইন্ন হাফস। ইবন ইসহাক বলেন: এ পরিস্থিতিতে আবু বকর (রা) উবায়দা ইবন হারিসের আভিযান সম্পর্কে একটি কবিতা আবৃত্তি করেন। ইব্ন হিশাম বলেন: অধিকাংশ কাব্য বিশারদ পণ্ডিতের মতে আবু বকর (রা) এ কবিতা আবৃত্তি করেন নি।
যা হোক, কবিতাটির অনুবাদ নিচে দেওয়া হল:
"মসৃণ যমীনের বালুময় জলাশয়ের পাশে অবস্থানকারিণী সালমার বিচ্ছেদ-বেদনায় এবং তোমার বংশের মধ্যে নতুন কোন বিপদের আশংকায়, তোমার নিদ্রা কি তিরোহিত হয়েছে? বনূ লুআঈয়ের মাঝে তুমি বিচ্ছিন্নতা দেখতে পাচ্ছ যাদের কোন উপদেশ এবং প্রেরণা দানকারীর কোন অনুপ্রেরণা কুফরী থেকে ফিরিয়ে রাখে না।
একজন সত্যবাদী নবী তাদের কাছে এলেন, কিন্তু তারা তাঁকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করল এবং তারা তাঁকে বলল: তুমি আমাদের মাঝে বেশি দিন থাকতে পারবে না। যখনই আমরা তাদের সত্যের দিকে আহবান করেছি, তখনই তারা পেছনে ফিরে গেছে এবং নিজেদের বাড়িতে গিয়ে হাঁপানো জন্তুর মত হাঁপিয়েছে। আত্মীয়তার কারণে আমরা তাদের সাথে বারবার সদ্ব্যবহার করেছি। আর পরহেযগারী পরিত্যাগ করা তাদের জন্য আদৌ কোন চিন্তার ব্যাপার নয়।
যদি তারা তাদের কুফরী ও অবাধ্যতা থেকে ফিরে আসে (তাহলে ভাল কথা), কেননা পবিত্র হালাল বস্তু অপবিত্র বস্তুর মত নয়। আর যদি তারা তাদের গুমরাহী ও বিদ্রোহিতায় অবিচল থাকে, তাহলে তাদের কাছে আল্লাহর আযাব আসতে মোটেই বিলম্ব হবে না। আমরা তো বনূ গালিবের উঁচু স্তরের লোক। সেই সুবাদে তাদের শাখা গোত্রগুলোর কাছে আমাদের ইয্যত ও সম্মান রয়েছে। আমি সন্ধ্যার সময় নর্তন-কুর্দনরত উঁচু লম্বা আকৃতির উটনী, যার পিঠের উপরে বসার আসন পুরানো হয়ে গেছে, তার প্রভুর শপথ করছি।
যে সব উট সাদা পেট ও কালো পিঠধারী হরিণের মত ক্ষিপ্র এবং যারা মক্কার চারপাশে অবস্থান করে এবং কর্দমময় জলাশয়ে পানিপান করতে আসে, যদি তারা শীঘ্র তাদের গুমরাহী থেকে ফিরে না আসে (আর আমি কোন ব্যাপারে কসম খাই, তখন তা ভংগ করি না), তবে অচিরেই তাদের উপর এমন হামলা পরিচালিত হবে, যা নারীদের পবিত্র অবস্থায় পুরুষদেরকে তাদের কাছে যাওয়া থেকে বঞ্চিত করবে। নিহত লোকদের চারপাশে পাখিরা ভিড় জমাবে এবং কাফিরদের প্রতি তা হারিস ইব্ন আবদুল মুত্তালিবের মত অনুকম্পা দেখাবে না। তুমি বন্ সাহম ও প্রত্যেক অকৃতজ্ঞ ফিতনা সৃষ্টিকারী লোকদের কাছে একটি খবর পৌছে দাও; নির্বুদ্ধিতার কারণে যদি তোমরা আমার সম্মান বিনষ্ট করতে চাও, তবে আমি তোমাদের সম্মান নষ্ট করবনা।
এর জবাবে আবদুল্লাহ্ ইব্ন যাবআরী সাহমী যে কবিতা আবৃত্তি করেন, তার অনুবাদ নীচে দেওয়া হল:
ঐ ঘরের ধ্বংসস্তূপের কাছে বসে, যা বালুর নীচে চাপা পড়ে গেছে, তুমি কি এমনভাবে কাঁদছ যে, তোমার অশ্রু অবিরাম ধারায় ঝরছে? যুগের আজব বিষয়ের মধ্যে এটিও একটি তাজ্জবের ব্যাপার; বস্তুত যুগের সকল বিষয়ই আশ্চর্যজনক, চাই তা নতুন হোক বা পুরাতন; (যা হল :) ঐ দুর্ধর্ষ সেনাবাহিনী, যা আমাদের মুকাবিলায় উবায়দা ইবন হারিসের নেতৃত্বে এ উদ্দেশ্যে এসেছে যে, আমরা যেন মক্কায় অবস্থিত উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত আমাদের মূর্তিগুলোর সামনে নত হওয়ার অভ্যাস বর্জন করি। যখন আমরা রুদায়নার তৈরি বর্শা নিয়ে সেই দুর্ধর্ষ সেনাবাহিনীর মুখোমুখি হলাম, এমন দ্রুতগামী ঘোড়ায় চড়ে যা ধূলো উড়িয়ে চলছিল। আর আমরা এমন চকচকে তরবারি নিয়ে তাদের মুকাবিলা করেছিলাম, যার পিঠের উপর যেন লবণ লাগানো, আর সে তরবারিগুলো ছিল সিংহের মত দুর্ধর্ষ সিপাহীদের হাতে। আমরা সেই তরবারির সাহায্যে অহংকারবশে যে ঘাড় বাঁকা করে, তার ঘাড় সোজা করে দেই এবং অবিলম্বে আমাদের প্রতিশোধস্পৃহাকে শান্ত করি। তারা ভয়ে ও প্রচণ্ড ত্রাসে হতোদ্যম হয়ে পড়েছিল। আর একজন দূরদর্শী সেনাপতির নির্দেশ তাদেরকে পুলকিত করে তুলেছে। তারা যদি সেই নির্দেশে পরিচালিত না হত (এবং আমাদের মুকাবিলায় আসত), তাহলে বিধবা নারীরা শুধু কেঁদেই বুক ভাসাত। আর তাদের নিহতরা এমনভাবে পড়ে থাকত যে, তাদের অনুসন্ধানকারী ও তাদের সম্পর্কে উদাসীনরা-তাদের খবর দিতে পারত। অতএব তুমি আবূ বকরকে আমার এ খবর জানিয়ে দাও যে, তুমি বনূ ফিহরের মান-ইয্যত রক্ষা করতে পারবে না। তুমি জেনে রাখ, আমার পক্ষ থেকে তুমি যে জবাব পাচ্ছ, তা একটি দৃপ্ত শপথ, যা একটা নতুন যুদ্ধের সূচনা করতে পারে।"
ইবন হিশাম বলেন: আমরা এ কবিতার একটি চরণ বাদ দিয়েছি। তবে অধিকাংশ কাব্য বিশারদ পণ্ডিতেরা এটা ইব্ন যাবআরীর কবিতা বলে স্বীকার করেন না।
ইবন ইসহাক বলেন: সা'দ ইব্ন আবূ ওয়াক্কাস তাঁর তীর নিক্ষেপ সম্পর্কে একটি কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। কবিতাটি নিম্নরূপ:
"আল্লাহ্র রাসূল (সা) কি জানতে পেরেছেন যে, আমি আমার সঙ্গীদেরকে আমার তীর দিয়ে রক্ষা করেছি? আমি তাদের প্রত্যেক প্রস্তরময় ও নরম যমীনে তাদের শত্রুদের অগ্রবর্তীদের প্রতিরোধ করতে থাকব। ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আমার পূর্বে আর কেউ দুশমনের প্রতি তীর নিক্ষেপ করেনি। বস্তুত আপনার আনীত দীন সত্য, ন্যায় ও সুবিচারের দীন। এ দ্বারা মু'মিনদের পরিত্রাণ দেওয়া হবে এবং কাফিরদের এ কারণে স্থায়ীভাবে লাঞ্ছিত করা হবে। হে আবু জাহেলের পুত্র! তোমার জন্য আফসোস, তুমিতো বিপথগামী হয়েছ। এজন্য আমার প্রতি দোষারোপ করবে না। তুমি কিছুদিন অপেক্ষা কর (এবং দেখ তোমার পরিণতি কি হয়)।"
ইব্ন হিশাম বলেন: অধিকাংশ কাব্য বিশারদ পণ্ডিতেরা এ কবিতা সা'দ ইব্ন আবূ ওয়াক্কাসের বলে স্বীকার করেন না।
ইব্ন ইসহাক বলেন: আমার নিকট এ মর্মে খবর পৌঁছেছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) নিজ হাতে মুসলমানদের মধ্য থেকে সর্বপ্রথম যার হাতে ঝাণ্ডা তুলে দেন, তিনি হল উবায়দা ইব্ন হারিস। কোন কোন ঐতিহাসিকের মতে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) আবওয়ার অভিযান থেকে ফিরে মদীনায় পৌঁছানোর আগেই আবূ উবায়দাকে ইসলামী ঝাণ্ডাসহ অভিযানে পাঠিয়েছিলেন।
টিকাঃ
১. আয়েশা (রা) বলেন: যে ব্যক্তি বলে, আবু বকর (রা) ইসলাম গ্রহণের পর কবিতা আবৃত্তি করেছেন, সে মিথ্যা বলে। (বুখারী শরীফ দ্র.)
📄 হামযার নেতৃত্বে সায়ফুল বাহরের অভিযান
এ সময়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা) হামযা ইব্ন আবদুল মুত্তালিব ইবন হাশিমের নেতৃত্বে আরো একটি সেনাদলকে সায়ফুল বাহার অভিমুখে প্রেরণ করেন। এ সেনাদলে ত্রিশজন অশ্বরোহী মুহাজির ছিলেন, কোন আনসার সাহাবী ছিলেন না। এ দলটি ঈসের উপকূল ধরে যাওয়ার সময় মক্কার তিনশো অশ্বারোহী পরিবৃত্ত অবস্থায় আবূ জাহলের মুখোমুখি হল। উভয় পক্ষের মিত্র মাজদী ইব্ন Amr জুহানী এ সময় দুই পক্ষের মধ্যে আড় হয়ে দাঁড়ায়। ফলে কোন সংঘর্ষ ছাড়াই উভয় পক্ষ পরস্পর থেকে আলাদা হয়ে যায়।
কারো কারো মতে হামযা (রা)-এর কাছেই রাসূলুল্লাহ্ (সা) প্রথম সামরিক ঝাণ্ডা তুলে দেন। আসল ব্যাপার হল উবায়দা ইবন হারিস এবং হামযার সেনাদল একই সময় প্রেরিত হয়। তাই ঘটনার দর্শকগণ সঠিকভাবে চিহ্নিত করতে পারেননি, কোন্টি আগে ঘটেছিল। অনেকে বলেন: এ সময় হামযা (রা) একটি কবিতাও আবৃত্তি করেছিলেন এবং তাতে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, তিনিই সর্ব প্রথম রাসূলুল্লাহ্ (সা) থেকে সামরিক ঝাণ্ডা লাভ করেন। এরূপ কোন কবিতা যদি হামযা (রা) বলে থাকেন, তবে আল্লাহ্ চাহেন তো, তিনি সত্যই বলেছেন। কেননা তিনি কখনো অসত্য বলতেন না। আসলে কে প্রথম ঝাণ্ডা পেয়েছেন, তা আল্লাহই ভাল জানেন। আমাদের কাছে জ্ঞানীজনদের কাছ থেকে সংগৃহীত যে তথ্য বিদ্যমান, তা হল, উবায়দা ইবন হারিসই প্রথম সামরিক ঝাণ্ডা লাভ করেছিলেন।
জনশ্রুতি অনুসারে হামযা (রা) এ সময় যে কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন, [ইব্ন হিশাম বলেন: অধিকাংশ কাব্য বিশারদ পণ্ডিতের মতে এটা হামযা (রা)-এর রচিত কবিতা নয়], তার অনুবাদ নিম্নে দেওয়া গেল:
"হে আমার জাতি! তোমরা অজ্ঞতা ও ধৃষ্টতা এবং আপন নির্বুদ্ধিতাপূর্ণ মতামত ও বাচালতা থেকে সাবধান হও। সেই সব যুলুমবাজ থেকেও সাবধানও হও, যাদের যমীন বা ফসল অন্য কারো পশু বা মানুষে কখনো মাড়ায়নি। আমরা যেন তাদের সাথে শত্রুতা করছি, অথচ আমাদের তাদের সাথে কোন শত্রুতা নেই; বরং আমরা তাদের সততা ও ন্যায়বিচারের উপদেশ দিচ্ছি। আমরা তাদের ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দেই, যা তারা গ্রহণ তো করেই না, উপরন্তু তাকে উপহাসের বস্তুতে পরিণত করে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকার কারণে শেষ পর্যন্ত আমি ফযীলত লাভের আশায় তীব্রগতিতে তাদের উপর আক্রমণ করলাম। আল্লাহ্র রাসূলের নির্দেশে আমি এই (আক্রমণের) পথ বেছে নিয়েছি। যিনি আমার হাতে সর্বপ্রথম ঝাণ্ডা দিয়েছেন এবং আমার আগে আর কারো হাতে পতাকা শোভা পায়নি। এই পতাকা ছিল সেই মহাপরাক্রান্ত, সম্মানিত আল্লাহ্ পক্ষ থেকে বিজয়ের প্রতীক—যাঁর প্রতিটি কাজ সর্বোত্তম। একদিন বিকালে শত্রুরা যেই সমবেত হয়ে রওয়ান হল, তখন আমরা সকলেই ক্রোধে ও
উত্তেজনায় ফেটে পড়ার উপক্রম হয়েছিলাম। যখন আমরা উভয় পক্ষ মুখোমুখি হলাম, অমনি তারা তাদের চলা ক্ষান্ত করল এবং আমরাও আমাদের চলা থামিয়ে দিলাম এবং আমরা একে অপরের খুবই কাছাকাছি পৌঁছে গেলাম। তখন আমরা তাদের বললাম আমাদের সম্পর্ক একমাত্র আল্লাহর সঙ্গে এবং তোমাদের সম্পর্ক কেবলমাত্র গুমরাহীর সাথে। তখন আবু জাহল বিদ্রোহী হয়ে উগ্রমূর্তি ধারণ করল। কিন্তু আল্লাহ্ আবূ জাহলের দুরভিসন্ধি বানচাল করে দিলেন। আমরা ছিলাম মাত্র ৩০ জন অশ্বারোহী, আর তারা ছিল দু'শোর অধিক। অতএব হে লুআঈ-এর বংশধর! তোমরা তোমাদের বিপথগামী লোকদের অনুসরণ করো না এবং ইসলামের সহজ পথের দিকে ফিরে এস। কেননা আমার আশংকা, তোমাদের উপর আযাব নেমে আসবে, তখন তোমরা অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহকে ডাকবে।"
তাঁর এ কবিতার জবাবে আবু জাহল একটি কবিতা আবৃত্তি করল। যা হল: "আমি এ বিদ্বেষ ও গোঁয়ার্তুমি দেখে অবাক হয়ে যাই। আর অবাক হয়ে যাই বিরোধ ও গোলযোগ পাকানোর হোতাদের দেখে। আরো অবাক হই পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্যমণ্ডিত রীতিনীতি বর্জনকারীদের দেখে, যারা ছিল সঠিক নেতৃত্ব ও আভিজাত্যের অধিকারী। এ দলটি আমাদের কাছে একটা মিথ্যা দাবি নিয়ে উপস্থিত হয়েছে, যাতে তারা আমাদের বিবেকবুদ্ধিকে বিভ্রান্ত করতে পারে। কিন্তু তাদের এ মিথ্যা দাবি কোন বিবেকবান লোকের বিবেককে বিভ্রান্ত করতে পারবে না। আমরা তাদের বললাম ওহে আমাদের স্বজাতিভুক্ত লোকগণ! তোমরা আপন জাতির ঐতিহ্যের সাথে বিরোধিতা করো না। কেননা ঐতিহ্যের বিরুদ্ধাচরণ চরম মূর্খতারই নামান্তর। কেননা যদি তোমরা এরূপ কর, তবে ক্রন্দনকারী মহিলারা হায় মুসীবত, হায় বিচ্ছেদের রোল তুলবে। আর তোমরা যা করেছ যদি তা পরিত্যাগ করে পৈতৃক ধর্মে ফিরে এস, তাহলে আমরা তো তোমাদেরই চাচাতো ভাই, অনুগ্রহ ও আনন্দের সাথে তোমাদের গ্রহণ করব। কিন্তু তারা জবাবে আমাদের বলল আমরা তো মুহাম্মাদ (সা)-কে বুদ্ধিমান ও প্রজ্ঞাবানদের পসন্দমত পেয়েছি। এভাবে তারা যখন আমাদের বিরোধিতায় অটল রইল এবং ভাল ও মন্দকাজ একত্র করল, তখন আমরা সমুদ্রের পাড় থেকে তাদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিলাম। কিন্তু মাজদী ইব্ন Amr জুহানী এবং আমার অন্য সাথীরা আমাকে এ থেকে বিরত রাখল, অথচ এরাই আমাকে তরবারি ও তীর দিয়ে সাহায্য করেছিল। এ মহানুভবতার কারণ এই যে, আমাদের মধ্যে একটা চুক্তি ছিল, যা পালন করা আমাদের জন্য জরুরী ছিল, একজন বিশ্বাসী একে দৃঢ় ও মযবৃত করেছিলেন। যদি ইব্ন Amr না থাকত, তাহলে তাদের সংগে এমন যুদ্ধ হত যে, (ফলে) যুদ্ধের ময়দানে অবস্থানরত পাখিরা উড়ে যেত এবং এর প্রতিশোধ গ্রহণের কোন আশংকাও থাকত না। কিন্তু মাজদী এমন সম্পর্কের দোহাই দিল যে, হত্যার ব্যাপারে আমাদের হাতে তরবারির বাঁট সংকুচিত হয়ে গেল। যদি আমি বেঁচে থাকি, তবে চকচকে শাণিত তরবারি নিয়ে অন্য সময় তাদের উপর হামলা করব। যে তরবারি বনূ লুআঈ ইন্ন গালিবের সাহায্যকারীদের হাতে থাকবে, দুর্ভিক্ষ ও দুর্যোগের সময় যাদের চেষ্টা সম্মানের দাবিদার।"
ইব্ন হিশাম বলেন: কাব্যবিশারদ অধিকাংশ পণ্ডিতের মতে এ কবিতা আবু জাহল কর্তৃক রচিত নয়।