📄 পারস্পরিক অভিসম্পাতের প্রস্তাব গ্রহণ করা থেকে খ্রিস্টানদের পিঠটান
রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে যখন ঈসা (আ) সম্পর্কে অকাট্য ও নির্ভুল তথ্য আসে এবং খ্রিস্টানরা তা মানতে অস্বীকার করে, তখন তিনি আল্লাহ্র নির্দেশক্রমে তাদের পারস্পরিক অভিসম্পাতের জন্য প্রস্তাব দেন। তখন খ্রিস্টানরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বলে: হে আবুল কাসিম! আমাদের করণীয় সম্পর্কে আমাদের একটু ভাবতে দিন। তারপর আমরা আপনার দাওয়াত সম্পর্কে কর্তব্য স্থির করে আপনার কাছে আসব। এরপর তারা তাঁর কাছ থেকে চলে গেল। তারা তাদের প্রধান উপদেষ্টা আকিবের সাথে সলা-পরামর্শে বসল। তারা তাকে বলল: হে আবদুল মাসীহ! তোমার অভিমত কি?
সে বলল: হে খ্রিস্টান সম্প্রদায়! তোমরা অবশ্যই জেনে গেছ যে, মুহাম্মদ একজন প্রেরিত নবী। তিনি তোমাদের কাছে তোমাদের নেতা ঈসা (আ) সম্পর্কে অকাট্য তথ্য নিয়ে এসেছেন। তোমরা এ কথাও জান যে, যখনই কোন জাতি কোন নবীর সঙ্গে পারস্পরিক অভিসম্পাতে লিপ্ত হয়েছে, তাদের ছোট-বড় সকলেই ধ্বংস হয়ে গেছে। সুতরাং তোমরা যদি প্রস্তাবিত এ পারস্পরিক অভিসম্পাতে লিপ্ত হও, তবে জেনে রেখ, তোমাদের সমূলে ধ্বংস করাই তাঁর উদ্দেশ্য ও অভিপ্রায়। তোমরা যদি চাও যে, তোমাদের ধর্মের প্রতি তোমাদের আনুগত্য বজায় থাকুক এবং ঈসা সম্পর্কে তোমাদের নীতি অব্যাহত থাকুক, তাহলে মুহাম্মদ (সা)-এর কাছ থেকে বিদায় নাও এবং দেশে ফিরে যাও।
এ পরামর্শ মুতাবিক প্রতিনিধি দলটি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে এসে বলল: হে আবুল কাসিম! আমরা আপনার সঙ্গে পারস্পরিক অভিশাপ বিনিময়ের এ কাজে যোগ দিতে ইচ্ছুক নই। আমরা আপনাকে আপনার ধর্মে এবং নিজেদেরকে নিজেদের ধর্মে বহাল রেখে ফিরে যেতে চাই। তবে আমাদের সাথে আপনার পসন্দসই একজন লোককে পাঠিয়ে দিন, যিনি আমাদের ধনসম্পদের বিষয়ে আমাদের মতবিরোধ নিষ্পত্তি করবেন। আমরা তাঁর কথা মেনে নেব।
📄 আবু উবায়দা (রা)-কে তাদের বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য প্রেরণ
মুহাম্মদ ইব্ন জা'ফর বলেন, তাদের কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তোমরা বিকালে আমার কাছে এস, আমি একজন বিশ্বস্ত শক্তিশালী লোককে তোমাদের সাথে পাঠাব। রাবী বলেন: উমর ইবন খাত্তাব বলতেন যে, ঐ দিন আমি নেতৃত্বলাভের যতটা অভিলাষী হয়েছিলাম, তেমন আর কখনো হইনি-এ প্রত্যাশায় যে, আমি সেই দুর্লভ গুণের অধিকারী হব। তাই আমি প্রচণ্ড গরম উপেক্ষা করে আগে থেকেই যোহরের সালাতের জন্য উপস্থিত হলাম। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমাদের নিয়ে যোহরের সালাত আদায় শেষে সালাম ফিরিয়ে ডানে-বামে তাকাতে লাগলেন। তখন আমি উঁচু হয়ে দাঁড়াতে লাগলাম, যাতে তিনি আমাকে দেখতে পান। কিন্তু তিনি দৃষ্টি ফিরাতে লাগলেন এবং এক পর্যায়ে আবূ উবায়দা ইন্ন জাররাহ (রা)-কে দেখতে পেলেন। তিনি তাঁকে ডেকে বললেন: তুমি নাজরানী খ্রিস্টান প্রতিনিধিদের সাথে যাও এবং ন্যায়সংগতভাবে তাদের বিরোধপূর্ণ বিষয় মীমাংসা করে ফিরে এস। উমর (রা) বলেন: ফলে আবু উবায়দা (রা) তাদের সাথে গেলেন।
📄 মুনাফিকদের সংবাদ
ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে আসিম ইবন উমর ইব্ন কাতাদা যা বর্ণনা করেছেন তা নিম্নরূপ: যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) মদীনায় তাশরীফ আনেন, তখন সেখানকার অধিবাসীদের নেতা ছিল আবদুল্লাহ্ ইব্ন্ন উবায় ইব্ন সালুল আওফী, যে হুবলা গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিল। আবদুল্লাহ্ এমন অবিসংবাদিত নেতা ছিল যে, তার নেতৃত্ব সম্পর্কে তার সম্প্রদায়ে কারো দ্বন্দ্ব ছিল না। ইসলামের অভ্যুদয়ের আগে মদীনার দুই গোত্র-আওস ও খাযরাজ আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবায় ছাড়া অন্য কোন ব্যক্তির একক নেতৃত্ব মেনে নেয়নি। তার সাথে আওস গোত্রের সর্বজনমান্য আর এক ব্যক্তি ছিল- আবূ আমির আব্দ আমর ইবন সায়ফী ইব্ন নু'মান। বন্ যবীআ ইবন যায়দ শাখার এ ব্যক্তি ছিল উহুদ যুদ্ধের শহীদ, যাকে ফেরেশতারা গোসল দেন, সেই হানযালার পিতা। হানযালার পিতা আবূ আমির জাহিলী যুগে সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করে গেরুয়া পোশাক পরিধান করত। সেজন্য তাকে সন্ন্যাসী বলা হত। এ দু'জন তাদের সুনাম, সুখ্যাতি ও সামাজিক অহমিকার কারণে ইসলাম কবুল করা থেকে বঞ্চিত হয়।
আবদুল্লাহ্ ইব্ন উবায়কে জাঁকজমকের সাথে মদীনার রাজা হিসাবে গ্রহণ করে নেয়ার জন্য যখন অভিষেকের আয়োজন চলছিল, তখন আল্লাহ্ তাঁর রাসূল (সা)-কে তাদের কাছে পাঠান। ফলে মদীনার অধিবাসীরা তাঁকে পরিত্যাগ করে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এতে সে ঈর্যান্বিত হয় এবং মনে করে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার রাজত্ব ছিনিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু সে যখন দেখল যে, তার গোত্র ইসলাম গ্রহণের জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, তখন সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও ইসলাম গ্রহণ করে কিন্তু তার মুনাফিকী, ভণ্ডামি ও ঈর্ষা অব্যাহত থাকে।
কিন্তু আবূ আমিরের অবস্থা ছিল ভিন্নরূপ। তার গোত্র ইসলাম গ্রহণ করতে দৃঢ়সংকল্প হয়েছে দেখে সে নিজের গোত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার এবং কুফরীর ওপর অবিচল থাকার সিদ্ধান্ত নিল। সে ইসলাম ও রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে, দশের অধিক সংখ্যক লোক নিয়ে মক্কা অভিমুখে রওয়ান হয়। (ইবন ইসহাক বলেন:) হানযালা ইব্ন আবূ আমিরের বংশের কারো বরাতে, মুহাম্মদ ইব্ন আবূ উমামা আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলেছেন: তোমরা তাকে 'রাহিব' না বলে, 'ফাসিক' বলবে।
ইবন ইসহাক বলেন: জা'ফর ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবূ হাকাম, যিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা) থেকে হাদীস শ্রবণকারী ও বর্ণনাকারী সাহাবী ছিলেন, আমাকে বলেছেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) মদীনায় এলে আবূ আমির তাঁর সঙ্গে দেখা করে বলে, তুমি যে দীন নিয়ে এসেছ তার স্বরূপ কি? রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: আমি ইবরাহীমের একত্ববাদের দীন নিয়ে এসেছি। তখন সে বলল: আমি তো সেই ধর্মের অনুসারী। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে বললেন: তুমি সেই ধর্মের অনুসারী নও। সে বলল অবশ্যই। সে আরো বলল হে মুহাম্মদ! তুমি ইবরাহীমের ধর্মে এমন অনেক জিনিস আমদানী করেছ, যা এতে ছিল না। তিনি (সা) বললেন: আমি এরূপ করিনি বরং আমি একে উজ্জ্বল পবিত্র অবস্থায় নিয়ে এসেছি। তখন সে বলল: আমাদের ভেতরে যে মিথ্যুক, তাকে আল্লাহ্ স্বদেশ থেকে বিতাড়িত, একাকী প্রবাসী অবস্থায় মৃত্যু দিক। এরদ্বারা সে আসলে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রতি কটাক্ষ করছিল। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: হ্যাঁ, যে মিথ্যুক তার সাথে আল্লাহ্ যেন এরূপ আচরণই করেন। বস্তুত আল্লাহ্র এই দুশমনেরই সেই পরিণতি হয়েছিল। প্রথমে সে মক্কায় চলে যায়। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কা বিজয় করলে সে তায়েফে চলে যায়। তায়েফবাসী ইসলাম গ্রহণ করলে সে সিরিয়ার চলে যায় এবং সেখানেই স্বদেশ থেকে বিতাড়িত নিঃসঙ্গ অবস্থায় মারা যায়।
আবু আমিরের সাথে আলকামা ইব্ন আলাসা ও কিনানা ইব্ন আব্দ ইয়ালীল নামক আরো দু'ব্যক্তি গিয়েছিল। আবু আমির মারা গেলে তারা দুজনে তার উত্তরাধিকারী হওয়ার দাবি নিয়ে রোম সাম্রাটের কাছে আবেদন জানাল। রোম সম্রাট রায় দিলেন যে, নগরবাসীর উত্তরাধিকারী হবে নগরবাসী আর যাযাবরের উত্তরাধিকারী হবে যাযাবর। উপরোক্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কিনানা ইব্ন আব্দ ইয়ালীল আবু আমিরের উত্তরাধিকারী সাব্যস্ত হয়।
আবূ আমিরের অনুসৃত নীতি সম্পর্কে, কবি কা'ব ইবন মালিক বলেন: হে আব্দ আমর, তোমার অপকর্মের মত দুষ্কৃতি থেকে আল্লাহ্ আমাকে পানাহ দিন। যদি তুমি বল: আমি তো সম্মান, প্রতিপত্তি ও খেজুর বাগানের মালিক; তবে জেনে রাখ, তুমি তো অনেক আগেই ঈমানকে কুফরীর বিনিময়ে বিক্রি করে ফেলেছ।
ইবন ইসহাক বলেন: অপরদিকে আবদুল্লাহ্ ইবন উবায় নিজ গোত্রে যে মান-মর্যাদা অবশিষ্ট ছিল, তাই নিয়েই কোন রকমে দ্বিধাদ্বন্দের মাঝে জীবন কাটাতে লাগল। শেষ পর্যন্ত ইসলাম বিজয়ী হলে অনিচ্ছ্য সত্ত্বেও সে ইসলাম কবুল করে।
ইবন ইসহাক বলেন: মুহাম্মদ ইব্ন মুসলিম যুহরী উরওয়া ইন্ন যুবায়র (রা) সূত্রে, নবী (সা)-এর স্নেহভাজন উসামা ইব্ন যায়দ ইবন হারিসা (রা)-এর বর্ণনা আমাকে শুনিয়েছেন।
তিনি বলেন: একবার রাসূলুল্লাহ্ (সা) একটি গাধার পিঠে চড়ে, যার পিঠে ফিদাকী নকশীদার 'চাদর ছিল। তিনি আমাকে তাঁর পেছনে বসিয়ে নিয়ে রুগ্ন সাহাবী সা'দ ইবন উবাদাকে দেখতে যাচ্ছিলেন। তিনি পথিমধ্যে মুজাহিম নামক দুর্গে আবদুল্লাহ্ ইবন উবায়কে দেখলেন। তার সাথে তার গোত্রের কিছু লোকও ছিল। সে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে দেখে একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) নামলেন এবং তাকে সালাম করলেন। আর স্বল্প সময়ের জন্য সেখানে বসলেন। এরপর তিনি কুরআন তিলাওয়াত করলেন এবং তাকে আল্লাহর দিকে দাওয়াত দিলেন। তিনি তাকে আল্লাহর কথা স্মরণ করালেন, সতর্ক করলেন এবং সৎকাজের জন্য সুসংবাদ শোনালেন এবং অসৎকাজের জন্য অশুভ পরিণতির ভয় দেখালেন। রাবী বলেন: সে নিশ্চুপ থেকে সব কথা শুনল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন তাঁর কথা শেষ করলেন, তখন সে বলল: জনাব! আপনার কথাগুলো যদি সত্য হয়ে থাকে, তাহলে এর চাইতে সুন্দর কথা আর হতে পারে না। আপনি নিজের বাড়িতে বসে থাকুন। যে ব্যক্তি আপনার কাছে এ সব কথা শোনার জন্য আসবে, আপনি তার কাছে এসব বলবেন। আর যে আপনার কাছে আসবে না, তাকে এসব কথা বলবেন না। আর যে আপনার কাছে আসবে না, তার কাছে গিয়ে এসব কথা বলে তাকে কষ্ট দেবেন না। রাবী বলেন: এ সময় রাসূলাল্লাহ্ (সা)-এর কাছে আবদুল্লাহ্ ইব্ন রাওয়াহা (রা)-সহ আরো কিছু মুসলমান উপস্থিত ছিলেন। আবদুল্লাহ্ ইব্ন রাওয়াহা (রা) বললেন: অবশ্যই, ইয়া রাসূলুল্লাহ্ (সা)! আপনি আমাদের এ মহান উপদেশাবলী দ্বারা উপকৃত করতে থাকুন। আপনি আমাদের মজলিসে, বাড়ি-ঘরে এসে এসব কথা শোনাতে থাকুন। আল্লাহ্র শপথ! আমরা এসব পসন্দ করি। তিনি এদিয়েই আমাদের সম্মানিত করেছেন এবং এদিকেই আমাদের হিদায়াত দান করেছেন। যখন আবদুল্লাহ্ ইবন উবায় বুঝল যে, তার বিপক্ষে কথা বলার মত লোকও সমাজে আছে, তখন সে আক্ষেপের সাথে একটি কবিতা আবৃত্তি করল। যার অর্থ এরূপ :
"যখন তোমার বন্ধু তোমার বিরোধিতা করবে, তখন তুমি অপমানিত হতেই থাকবে। তুমি যাদের দ্বন্দ্ব-যুদ্ধের জন্য আহবান করতে, তারা তোমাকে দ্বন্দ্ব-যুদ্ধের জন্য আহবান করবে। ঈগল কি নিজের ডানা ছাড়া শূন্যে উড়তে পারে? কোন দিন যদি তার ডানা কেটে দেওয়া হয়, তবে সে অবশ্যই নিচে পড়ে যাবে।"
ইবন ইসহাক বলেন: যুহরী উরওয়া ইন্ন যুবায়র সূত্রে উসামা (রা) থেকে আমার কাছে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: এরপর রাসূল (সা) সা'দ ইব্ন উবাদাকে যখন দেখতে গেলেন, তখন তাঁর চেহারায় আল্লাহ্র দুশমন আবদুল্লাহ্ ইবন উবায়ের অপ্রীতিকর আচরণের প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছিল। সা'দ (রা) বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আল্লাহ্র কসম, আমি আপনার চেহারায় এমন কিছু আলামত দেখতে পাচ্ছি, যা দেখে মনে হয়, আপনি কোন অপ্রীতিকর কথাবার্তা শুনেছেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: হ্যাঁ। এরপর ইবন উবায়-এর কথাবার্তা তাঁকে শোনালেন। তখন সা'দ (রা) বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! তার প্রতি একটু কোমলতা প্রদর্শন করুন। আল্লাহ্ শপথ! আল্লাহ্ এমন সময় আপনাকে আমাদের কাছে এনেছেন, যখন আমরা তাকে রাজমুকুট পরানোর আয়োজন করছিলাম। আল্লাহ্র শপথ! সে এ কারণে মনে করে করে যে, আপনি তার রাজত্ব ছিনিয়ে নিয়েছেন।
📄 মদীনায় মহামারী আকারে জ্বরের প্রাদুর্ভাব
ইবন ইসহাক বলেন: হিশাম ইব্ন উরওয়া ও উমর ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইব্ন উরওয়া উরওয়া ইব্ন যুবায়র (রা) সূত্রে আয়েশা (রা) থেকে আমার কাছে বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন মদীনায় আগমন করেন, তখন মদীনায় মহামারী আকারে জ্বরের প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাহাবীদের অনেকেই এ জ্বরে আক্রান্ত হন, কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর নবী (সা)-কে এ থেকে হিফাযত করেন।
আবূ বকর (রা) ও তাঁর দু'জন আযাদকৃত গোলাম আমির ইব্ন ফুহায়রা ও বিলাল (রা) তাঁর সঙ্গে একই ঘরে ছিলেন। তাঁরা সবাই জ্বরে আক্রান্ত হন। আমি তাদের পরিচর্যা করতে তাদের ঘরে প্রবেশ করলাম। তখনো আমাদের জন্য পর্দার হুকুম নাযিল হয়নি। দেখলাম যে, তাঁরা খুবই কষ্ট পাচ্ছেন। আমি আবু বকর (রা)-এর কাছে গিয়ে বললাম, আব্বা! আপনার কেমন লাগছে? তখন তিনি কবিতার একটি চরণ আবৃত্তি করলেন: "প্রত্যেকেই নিজের পরিবারের সাথে রাত কাটায় (আর আমরা স্বদেশ থেকে অনেক দূরে); অথচ মৃত্যু তার জুতোর ফিতের চেয়েও নিকটবর্তী।"
আয়েশা (রা) বলেন: আমি বললাম, আল্লাহর শপথ! আমার আব্বা কি বলছেন, তা তিনি নিজেই জানেন না। তিনি বলেন: এরপর আমি আমির ইব্ন ফুহায়রার কাছে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার কেমন লাগছে। তখন সে বলল: "মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণের আগেই মৃত্যুর সাক্ষাৎ পেলাম, কাপুরুষের মৃত্যু তো তার মাথার উপর থেকেই আপতিত হয়। প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের সাধ্য অনুযায়ী আত্মরক্ষার জন্য চেষ্টা করে, যেমন ষাঁড় তার শিং দিয়ে নিজের চামড়া রক্ষা করে।"
আয়েশা (রা) বলেন: আল্লাহ্র শপথ! আমি বললাম, আমির কি বলছে, তো সে নিজেই বুঝে না।
আর বিলাল-এর অবস্থা ছিল যে, তার জ্বর ছাড়তেই সে উঠানে শুয়ে চীৎকার করে বলত: "হায় আক্ষেপ! আমি কি একদিনও মক্কার উপকন্ঠের ফাখখে গিয়ে একটি রাত কাটাতে পারব, যেখানে আমার চারপাশে ইযখির ও জালীল নামক সুগন্ধিযুক্ত তৃণলতা থাকবে। আর কোনও দিন কি আমি মাজান্নার বাজারে এবং শামা ও তুফায়ল পর্বতের পাদদেশে বিচরণ করতে পারব?"