📄 ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের কর্মপদ্ধতি সম্পর্কে কুরআনের বক্তব্য
এরপর আল্লাহ্ তাওরাত ও ইনজীল উভয় কিতাবের অনুসারী অর্থাৎ ইয়াহুদী ও খ্রিস্টানদের স্ব-উদ্ভাবিত গুমরাহী খণ্ডন করে বলেন: যারা আল্লাহর নিদর্শন প্রত্যাখ্যান করে, অন্যায়ভাবে নবীদের হত্যা করে এবং মানুষের মাঝে যারা ন্যায়পরায়ণতার নির্দেশ দেয় তাদের হত্যা করে, আপনি তাদের মর্মন্তুদ শাস্তির সংবাদ দিন।...... বলুন: হে সার্বভৌম শক্তির মালিক আল্লাহ্! (অর্থাৎ বান্দাদের রব, যাঁর একচ্ছত্র কর্তৃত্ব তাদের উপর রয়েছে); তুমি যাকে ইচ্ছা ক্ষমতা প্রদান কর এবং যার কাছ থেকে ইচ্ছা ক্ষমতা ছিনিয়ে নাও; যাকে ইচ্ছা তুমি পরাক্রমশালী কর, আর যাকে ইচ্ছা তুমি হীন কর। কল্যাণ তোমার হাতে-ই; (অর্থাৎ তুমি ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই), তুমি সব বিষয়ে সর্বশক্তিমান, (অর্থাৎ একমাত্র তুমিই স্বীয় সর্বময় ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের বলে উপরোক্ত সব কিছু করতে সক্ষম)। "তুমি-ই রাতকে দিনে এবং দিনকে রাতে পরিণত কর; তুমি-ই মৃত থেকে জীবন্তের আবির্ভাব ঘটাও, আবার জীবন্ত হতে মৃতের আবির্ভাব ঘটাও। তুমি যাকে ইচ্ছা অপরিমিত রিযক দান কর।" অর্থাৎ 'এ কাজগুলোও তুমি ছাড়া আর কেউ করতে সক্ষম নয়। বস্তুত এসব বাণীর মধ্য দিয়ে আল্লাহ্ বলতে চাইছেন যে, নবুওয়তের প্রমাণ ও নিদর্শন হিসাবে তুলে ধরার জন্য মৃতকে জীবিত করা, রোগীকে রোগমুক্ত করা, কাদামাটি দিয়ে পাখি বানানো ও অদৃশ্য জগতের সংবাদ জানানোর ক্ষমতা যদিও আমি ঈসাকে দিয়েছি এবং এসব অলৌকিক ক্ষমতার কারণেই তারা ঈসাকে খোদা বা দেবতা মনে করে থাকে, তথাপি তাদের ভেবে দেখা উচিত যে, আমি আমার ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অনেক কিছুই ঈসাকে দেইনি। যেমন আমি কোন বাদশাহকে নবী বানাবার ক্ষমতা দেইনি, অথচ আমি যাকে ইচ্ছা তাকে নবী মনোনীত করি; দিনের শেষে রাত নিয়ে আসা এবং রাতের শেষে দিন নিয়ে আসা, মৃত থেকে জীবন্তের আবির্ভাব ঘটানো এবং জীবন্ত থেকে মৃতের আবির্ভাব ঘটানো, আর নেককার ও বদকারদের যাকে ইচ্ছা অপরিমিত রিস্ক প্রদান, এসব কাজের কোন ক্ষমতা আমি ঈসাকে দেইনি এবং এসবে তার কোন কর্তৃত্বও ছিল না। এ থেকে তারা কি এ শিক্ষা ও উপদেশ পায় না যে, তাদের জানামতে ঈসা-যিনি রাজাদের অত্যাচারের ভয়ে দেশ থেকে দেশান্তরে পালিয়ে বেড়াতেন, তিনি যদি ইলাহ্ বা খোদা হতেন, তাহলে এ সকল গুণ ও ক্ষমতা তাঁর থাকত এবং তাঁকে পালিয়ে বেড়াতে হতনা।
📄 কুরআনে মু'মিনদের জন্য নসীহত ও হুশিয়ারী
এরপর সূরা আলে-ইমরানে আল্লাহ্ মু'মিনদের উপদেশ দিয়ে ও সতর্ক করে বলেন: “হে নবী! আপনি বলুন : "তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাস" অর্থাৎ আল্লাহকে ভক্তি করা ও ভালবাসার দাবিতে তোমরা যদি সত্যবাদী হয়ে থাক, "তাহলে তোমরা আমার অনুসরণ কর। আল্লাহ্ তোমাদের ভালবাসবেন এবং তোমাদের গুনাহ্ মাফ করে দেবেন।" অর্থাৎ ইসলাম গ্রহণের আগে শিরক ও কুফরীতে লিপ্ত থাকার গুনাহ্ মাফ করে দেবেন। "আল্লাহ্ অত্যন্ত ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।" বলুন : "তোমরা আল্লাহ্ ও রাসূলের আনুগত্য কর।" কেননা তোমরা তোমাদের কিতাবে লিখিত অবস্থায় তাঁর পরিচয় জানতে পেরেছ। "যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়" (অর্থাৎ কুফরী অব্যাহত রাখে) “তবে জেনে রাখুন, আল্লাহ্ কাফিরদের পসন্দ করেন না।"
📄 ঈসার জন্ম এবং মারইয়াম ও যাকারিয়ার ব্যাপারে কুরআনের বিবরণ
এরপর নাজরানী প্রতিনিধিদলের সামনে ঈসা (আ)-এর বৃত্তান্ত তুলে ধরা হল এবং তাঁর ব্যাপারে আল্লাহ্র ব্যতিক্রমধর্মী পরিকল্পনার সূচনা কিভাবে হয়েছিল, তা বিবৃত করা হল। আল্লাহ্ বললেন : "আল্লাহ্ আদমকে, নূহকে, ইবরাহীমের বংশধর এবং ইমরানের বংশধরকে বিশ্বজগতে মনোনীত করেছেন। তারা একে অপরের বংশধর। আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।" এরপর আল্লাহ্ ইমরানের স্ত্রী এবং তাঁর কথার আলোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন : "স্মরণ কর, যখন ইমরানের স্ত্রী বলেছিলেন। "হে আমার রব! আমার গর্ভে যা আছে তা একান্ত তোমার জন্য আমি উৎসর্গ করলাম।" অর্থাৎ তাকে আমি আমার সংসারের কোন কাজে খাটাবনা, বরং সার্বক্ষণিকভাবে শুধুমাত্র আল্লাহর ইবাদতে তাকে নিয়োজিত রাখব। সুতরাং তুমি আমার নিকট থেকে তা কবুল কর, তুমি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।" এরপর যখন সে তাকে প্রসব করল, তখন তিনি বললেন : 'হে আমার রব! আমি কন্যা সন্তান প্রসব করেছি।' সে' যা প্রসব করেছে, আল্লাহ্ তা সম্যক অবগত। 'আর ছেলে তো মেয়ের মত নয়।' অর্থাৎ আমি তাকে একান্তভাবে তোমার জন্য উৎসর্গ করেছি আর ছেলে তো মেয়ের মত নয়। 'আর আমি তার নাম রেখেছি মারইয়াম। এবং অভিশপ্ত শয়তান থেকে তারও তার বংশধরদের জন্য তোমার আশ্রয় চাই।' আল্লাহ্ বলেন : "এরপর তার প্রতিপালক তাকে সাগ্রহে কবুল করলেন, তাকে উত্তমরূপে লালন-পালন করলেন এবং তিনি তাঁকে যাকারিয়ার তত্ত্বাবধানে রাখলেন।” অর্থাৎ মারইয়ামের পিতামাতার মৃত্যুর পর তাঁর তত্ত্বাবধানে রাখলেন।
ইবন হিশাম "তত্ত্বাবধানে রাখার" ব্যাখ্যা করে বলেন যে, এর অর্থ তাকে যাকারিয়ার পরিবারের সাথে যুক্ত করে দিলেন।
ইবন ইসহাক বলেন: এ সূরায় আল্লাহ্ মারইয়ামের ইয়াতীম হয়ে যাওয়ার অবস্থা বর্ণনা করেছেন, তারপর মারইয়াম ও যাকারিয়ার বৃত্তান্ত, যাকারিয়ার দু'আ, আল্লাহ্ কর্তৃক যাকারিয়াকে ইয়াহ্ইয়া নামক সন্তান দান, এরপর মারইয়ামের সংগে ফেরেশতাদের কথাবার্তার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন।
📄 মারইয়ামের অভিভাবকত্বে জুরায়য
ইবন ইসহাক বলেন: এ লটারিতে অভিভাবক বা তত্ত্বাবধায়ক হিসাবে জুরায়জ পাদ্রীর নাম ওঠে, যিনি বনূ ইসরাঈলের একজন কাঠমিস্ত্রী ছিলেন। তিনি তার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন যাকারিয়া। একবার বনু ইসরাঈলে মারাত্মক দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে যাকারিয়া মারইয়ামের তত্ত্বাবধানের দায়িত্ব পালন করতে অপারগ হন। তাই তার অভিভাবক নির্ধারণে লটারির প্রয়োজন দেখা দেয়। লটারিতে জুরায়জ দরবেশের নাম উঠলে তিনি তার অভিভাবক হয়ে যান। আল্লাহ্ বলেন: “তারা যখন বাদানুবাদ করছিল, তখনও আপনি তাদের নিকট ছিলেন না।"
নাজরানের খ্রিস্টান প্রতিনিধি দল মারইয়াম সংক্রান্ত যেসব জানা কথা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে গোপন করছিল, তা তাঁর কাছে প্রকাশ করার জন্য আল্লাহ্ একথা বলেন, যাতে তাদের কাছে স্পষ্ট হয় যে, তাদের গোপন করা বিষয় যিনি তাদের সামনে প্রকাশ করে দিলেন, তিনি অবশ্যই একজন নবী।
এরপর আল্লাহ্ বলেন: "স্মরণ কর, যখন ফেরেশতারা বললেন: 'হে মারইয়াম! আল্লাহ্ তোমাকে তাঁর পক্ষ থেকে একটি কালেমার সুসংবাদ দিচ্ছেন, তাঁর নাম মসীহ্, মারইয়াম পুত্র ঈসা।" অর্থাৎ ঈসার জন্মের ব্যাপারটি এরূপই ছিল; তোমরা যেরূপ বলে থাক, সেরূপ নয়।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ বলেন: "সে দুনিয়া ও আখিরাতে (আল্লাহ্র নিকট) সম্মানিত এবং সান্নিধ্যপ্রাপ্তদের অন্যতম হবে। সে দোলনায় থাকা অবস্থায় ও পরিণত বয়সে মানুষের সঙ্গে কথা বলবে এবং সে হবে পূণ্যবানদের একজন।" এখানে আল্লাহ্ অন্যান্য আদম সন্তানের ন্যায় তার জীবনেও বিবর্তন তথা শৈশব থেকে পরিণত বয়সে উত্তরণের কথা জানাচ্ছেন। পার্থক্য শুধু এই যে, আল্লাহ্ তাঁকে দোলনায় থাকাকালে কথা বলার ক্ষমতা দিয়েছিলেন। ঈসার নবুওয়তের নির্দশন প্রকাশ এবং আল্লাহর অসীম কুদরত সম্পর্কে মানুষকে অবহিত করা-এ উভয় উদ্দেশ্যেই এ অস্বাভাবিক ও অলৌকিক কার্যট সংঘটিত করা হয়েছিল। "সে (মারইয়াম) বলল: হে আমার রব! আমাকে কোন পুরুষ স্পর্শ করেনি, আমার সন্তান হবে কীভাবে? তিনি বললেন: এভাবেই, আল্লাহ্ যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন।” অর্থাৎ তিনি যা চান তাই করেন। আর তিনি যা সৃষ্টি করতে চান তা করেন, মানুষ হোক বা অন্য কিছু। "তিনি যখন কিছু করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন বলেন: 'হও', এবং তা হয়ে যায়।”
এরপর সেই অনাগত সন্তান ঈসার আগমনের উদ্দেশ্য কি, সে সম্পর্কে আল্লাহ্ বললেন: 'তিনি তাকে কি শিক্ষা দেবেন কিতাব, হিকমত ও তাওরাত, যা তাঁর আগে থেকেই বন্ ইসরাঈলের মাঝে চালু ছিল, আর ইনজীলেরও শিক্ষা দেবেন, আর আসমানী কিতাব যা আল্লাহ্ ঈসার ওপর নাযিল করেন। এতে উল্লেখ ছিল যে, হযরত ঈসার পরে আর একজন নবী আসবেন। "এবং তাকে বনূ ইসরাঈলের জন্য রাসূল করব, সে বলবে: আমি তোমাদের কাছে একটি নিদর্শন নিয়ে এসেছি; যা দিয়ে আমার নবুওয়ত প্রমাণিত হয়। (সেই নির্দশন হল) আমি তোমাদের জন্য মাটি দিয়ে পাখি সদৃশ আকৃতি বানাব; এরপর তাতে আমি ফুঁক দেব; ফলে আল্লাহর হুকুমে তা পাখি হয়ে যাবে।" সেই আল্লাহই আমাকে নবী হিসাবে পাঠিয়েছেন এবং তিনিই তোমাদের রব। "আর আমি জন্মান্ধ ও কুষ্ঠ ব্যাধিগ্রস্তকে নিরাময় করব এবং আল্লাহ্র হুকুমে মৃতকে জীবিত করব। তোমরা তোমাদের ঘরে যা খাও এবং যা জমা করে রাখ, তা আমি তোমাদের বলে দেব। তোমরা যদি মু'মিন হও, তবে এতে তোমাদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।"-এ মর্মে যে আমি তোমাদের কাছে আল্লাহর রাসূল হিসাবে এসেছি। -"আর আমি এসেছি, আমার আগে তাওরাতের যা রয়েছে, তার সমর্থকরূপে ও তোমাদের জন্য যা নিষিদ্ধ ছিল, তার কতককে বৈধ করতে"-অর্থাৎ এতে তোমাদের উপর আরোপিত বিধি-নিষেধের কড়াকড়ি শিথিল হবে এবং তোমাদের জীবন যাপন সহজতর হবে।"এবং আমি তোমাদের রবের নিকট থেকে তোমাদের জন্য নিদর্শন নিয়ে এসেছি। সুতরাং আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার অনুসরণ কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ আমার রব এবং তোমাদেরও রব।” অর্থাৎ কিছু লোক যে বলে, আল্লাহ্ আমার পিতা, তা মিথ্যা। তিনি আমার রব, যেমন তোমাদেরও রব। "সুতরাং তোমরা তাঁর ইবাদত করবে। এটাই ঐ সরল পথ।" অর্থাৎ এটাই সরল পথ, যে পথে চলার জন্য আমি তোমাদের উদ্বুদ্ধ করছি, আর যে পথের সন্ধান নিয়ে আমি তোমাদের কাছে এসেছি। "যখন ঈসা তাদের অবিশ্বাস করল (এবং তাঁর প্রতি শত্রুতার মনোভাব আঁচ করতে পারল), তখন সে বলল: 'আল্লাহর পথে কারা আমার সাহায্যকারী'? তখন শিষ্যরা বলল: আমরাই আল্লাহর পথে সাহায্যকারী। আমরা আল্লাহ্র উপর ঈমান এনেছি। এটাই • হাওয়ারীদের সেই উক্তি, যার কারণে তারা আল্লাহ্ বিশেষ রহমত ও অনুগ্রহ লাভ করেছিলেন। "আমরা আত্মসমর্পণকারী, আপনি এর সাক্ষী থাকুন।" আমরা তাদের মত নই, যারা আপনার সঙ্গে অহেতুক তর্ক-বির্তকে লিপ্ত হয়। "হে আমাদের রব! তুমি যা নাযিল করেছ, তাতে আমরা ঈমান এনেছি এবং আমরা এ রাসূলের অনুসরণ করেছি। সুতরাং তুমি আমাদের সাক্ষ্য বহনকারীদের অন্তর্ভুক্ত কর।" অর্থাৎ ঈসা (আ)-এর শিষ্যদের কথা ও ঈমান এরূপই ছিল।