📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 কুষ ইব্‌ন আলকামার ইসলাম গ্রহণ

📄 কুষ ইব্‌ন আলকামার ইসলাম গ্রহণ


প্রতিনিধি দলটি যখন নাজরান থেকে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিল, তখন আবূ হারিসা তাঁর খচ্চরের পিঠে রাসূল (সা)-এর দিকে মুখ করে বসলেন। তার পাশেই বসে ছিল তার ভাই কৃয ইব্‌ন আলকামা। ইবন হিশাম বলেন: কারো কারো মতে তার নাম হল কুরয। সহসা আবূ হারিসার খচ্চরটি হোঁচট খেলে কৃয রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রতি ইঙ্গিত করে বললেন: "দূরবর্তী ব্যক্তিটি হতভাগা।" তখন আবূ হারিসা তাকে বললেন: "তুমিই বরং হতভাগা।" কৃষ বললেন কেন, হে আমার ভাই? আবূ হারিসা বললেন: আল্লাহ্র কসম, ইনিই সেই নবী, যাঁর জন্য আমরা অপেক্ষা করছিলাম। তখন কৃয তাঁকে বললেন: এ কথা জেনেও আপনি তাঁর প্রতি কেন ঈমান আনছেন না? আবু হারিসা বললেন: খ্রিস্টান সম্প্রদায় আমাকে যেভাবে সম্পদ, সম্মান ও মর্যাদা দিয়ে রেখেছে, তাতে তাদের সম্মতি না নিয়ে আমি ইসলাম গ্রহণ করতে পারছি না। খ্রিস্টানরা মুহাম্মদের বিরোধিতায় বদ্ধপরিকর। আমি যদি ইসলাম গ্রহণ করি, তবে তারা যা দিয়েছে, সেসব আমার থেকে ছিনিয়ে নেবে। কৃয ইব্‌ন আলকামা নিজের পরিবর্তিত সিদ্ধান্ত নিজের ভাইয়ের কাছে গোপন রাখেন এবং পরে ইসলাম কবুল করেন। ইব্‌ন হিশাম বলেন: আমার কাছে যে সব খবর আছে, তার মধ্যে এটি একটি যে, কৃয ইব্‌ন আলকামা নিজে আবু হারিসা সম্পর্কে এরূপ বর্ণনা করতেন।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 নাজরানের এক নেতার ছেলের ইসলাম গ্রহণ

📄 নাজরানের এক নেতার ছেলের ইসলাম গ্রহণ


ইব্‌ন হিশাম বলেন: আমি জানতে পেরেছি যে, নাজরানেরা নেতারা তাদের পূর্বপুরুষদের কাছ থেকে সীলকৃত কিছু কিতাব উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন। যখন তাদের কোন নেতা মারা যেতেন এবং অন্য লোক নেতা নির্বাচিত হতেন, তখন তিনি আগের সীল না খুলে, তার উপর নতুন সীল মেরে দিতেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সময় যিনি নেতা ছিলেন, তিনি একবার হাঁটার সময় হোঁচট খেয়ে পড়ে যান। এ সময় তাঁর ছেলে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর প্রতি উদ্দেশ্য করে বলে: দূরবর্তী ব্যক্তিটি হতভাগা। এ কথা শুনে তার পিতা বললেন: এরূপ বলো না; কারণ তিনি একজন নবী। আমাদের কাছে সংরক্ষিত কিতাবে তাঁর নাম লেখা রয়েছে। যখন তার পিতা মারা গেলেন, তখন তার ছেলে ঐ কিতাবের সীল ভেঙে তা পড়ে দেখার আগ্রহ সংবরণ করতে পারল না। সে তা খোলামাত্রই তাতে নবী (সা)-এর নাম দেখতে পেল। ফলে, সে ইসলাম গ্রহণ করল এবং একনিষ্ঠ মুসলিমান হয়ে গেল। পরবর্তীকালে ইনি হজ্জও করেছিলেন। এ ব্যক্তি রাসূল (সা)-এর প্রশংসা করে এক কবিতা আবৃত্তি করেন, যা হল: "আমার উটনীও খ্রিস্টধর্ম পরিত্যাগ করে আপনার দিকে ছুটে চলেছে, এমনকি তার পেটে সন্তান নিয়েও সে দৌড়াচ্ছে।"

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 পূর্বদিকে মুখ ফিরিয়ে তাদের সালাত আদায়

📄 পূর্বদিকে মুখ ফিরিয়ে তাদের সালাত আদায়


ইবন ইসহাক বলেন: মুহাম্মদ ইব্‌ন জা'ফর ইব্‌ন যুবায়র আমাকে জানিয়েছেন যে, এ খ্রিস্টান প্রতিনিধি দল যখন মদীনায় মসজিদে নববীতে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে উপস্থিত হল, তখন তিনি আসরের সালাত আদায় শেষ করেছিলেন। তাদের পরনে ছিল ইয়ামানী পোশাক এবং তারা বনূ হারিস ইব্‌ন কা'বের উটে সওয়ার হয়ে এসেছিল। প্রত্যক্ষদর্শী সাহাবীদের কেউ কেউ বলেছিলেন: তাদের মত আর কোন প্রতিনিধি দল আমরা আর কখনো দেখিনি। তারা যখন এসেছিল, তখন তাদের সালাতের সময় হয়েছিল। তারা মসজিদে নববীতেই পূর্বদিকে মুখ করে সালাতে দাঁড়িয়ে গেলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) সমবেত সাহাবীদের উদ্দেশ্য করে বললেন: তাদের সালাত আদায় করতে দাও। তখন তারা পূর্বদিকে মুখ ফিরিয়ে সালাত আদায় করল।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 তাদের নাম ও আকীদা

📄 তাদের নাম ও আকীদা


ইবন ইসহাক বলেন: আগন্তুকদের মধ্যে নেতৃস্থানীয় চৌদ্দজনের নাম হল:
আবদুল মাসীহ-যার উপাধি আকিব, আয়হাম-যার উপাধি সায়্যিদ, আবু হারিসা ইব্‌ন আলকামা-ইনি বনূ বকরের সদস্য; আওস, হারিস, যায়দ, কায়স, ইয়াযীদ, নাবীহ, খুয়ায়লিদ, আমর, খালিদ, আবদুল্লাহ্, ইউহান্নাস। তাদের মোট সংখ্যা ছিল ষাট। এ দলের পক্ষ থেকে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে কথা বলেন আবূ হারিসা ইব্‌ন আলকামা, আবদুল মাসীহ আকিব ও আয়হাম। এরা সকলে রোম সাম্রাজ্যের ধর্ম খ্রিস্টবাদের অনুসারী ছিল। তবে হযরত ঈসা সম্পর্কে তাদের কিছুটা মতপার্থক্য ছিল। কেউ কেউ বলত, তিনি স্বয়ং আল্লাহ্, কেউ কেউ বলত, তিনি আল্লাহ্র পুত্র। কেউ কেউ বলত, তিনি তিন খোদার তৃতীয় খোদা। ঈসা (আ) সম্পর্কে খ্রিস্টানরা এ ধরনের আকীদা পোষণ করত।
যারা তাঁকে স্বয়ং আল্লাহ্ বলে আখ্যায়িত করত, তাদের যুক্তি ছিল এই যে, তিনি মৃতদের জীবিত করতেন, রোগীদের রোগমুক্ত করতেন, অদৃশ্য সম্পর্কে খবর দিতেন এবং মাটি দিয়ে পাখির আকৃতি গঠন করে তাতে তিনি ফুঁক দিলে তা পাখি হয়ে যেত। এসবই তিনি আল্লাহ্র এ উক্তি অনুসারে করতেন যে, "তাকে আমি মানুষের জন্য একটি নিদর্শন বানাতে চাই।"
যারা তাকে আল্লাহ্র পুত্র বলে মনে করত, তাদের যুক্তি ছিল এই যে, তাঁর কোন পিতা ছিল বলে জানা যায় না, অথচ তিনি দোলনায় থাকা অবস্থায় কথা বলেছেন, যা ইতিপূর্বে আর কোন আদম সন্তান বলেনি।
পক্ষান্তরে, যারা বলত যে, হযরত 'ঈসা (আ) তিন খোদার তৃতীয়জন, তাদের যুক্তি এই যে, আল্লাহ্ তা'আলা সাধারণত এভাবে কথা বলে থাকেন যে, "আমরা সৃষ্টি করেছি", "আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি," ইত্যাদি। তিনি যদি একক হতেন, তা হলে বলতেন, "আমি সৃষ্টি করেছি", "আমি নির্দেশ দিয়েছি", "আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি" এবং "আমি করেছি"-এ ধরনের একবচন শব্দ ব্যবহার করতেন; বহু বচনের শব্দ ব্যবহার করতেন না। বস্তুত বিশ্বপ্রভু আসলে তিনজন : আল্লাহ্, মারইয়াম ও ঈসা (আ)। কুরআন তাদের এ তিনটি মতবাদই খণ্ডন করেছে। নাজরানী খ্রিস্টান প্রতিনিধি দলের সর্বোচ্চ নেতৃদ্বয় যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে কথা বললেন, তখন তিনি তাদেরকে বললেন: "তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর।" তারা বললেন: আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি। রাসূল (সা) বললেন: "তোমারা ইসলাম গ্রহণ করোনি। এখন কর।" তারা বললেন: "আমরা আপনারও আগে ইসলাম গ্রহণ করেছি।" রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: "তোমরা অসত্য বলছ। তোমাদের এ কথা যে, আল্লাহ্ পুত্র আছে, ক্রুশের পূজা করা এবং শূকর খাওয়া ইসলাম গ্রহণের পথে প্রতিবন্ধক।" তারা উভয়ে বললেন: "তা হলে ঈসার পিতা কে, হে মুহাম্মদ?" রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের এ কথার জবাব না দিয়ে চুপ করে থাকলেন।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00