📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 ইয়াহুদীদের সাথে ঘনিষ্ঠতা ও অন্তরঙ্গতা স্থাপনের বিরুদ্ধে যা নাযিল হয়

📄 ইয়াহুদীদের সাথে ঘনিষ্ঠতা ও অন্তরঙ্গতা স্থাপনের বিরুদ্ধে যা নাযিল হয়


ইবন ইসহাক বলেন: কয়েকজন মুসলমান কয়েকজন ইয়াহুদীর সাথে তাদের প্রতিবেশী ও চুক্তিবদ্ধ হওয়ার কারণে ঘনিষ্ঠতা রক্ষা করে চলতেন। আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে ইয়াহুদীদের সাথে ঘনিষ্ঠতা রক্ষা করতে বারণ করে নাযিল করলেন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لا تَتَّخِذُوا بِطَانَةً مِّنْ دُونِكُمْ لَا يَألُونَكُمْ خَبَالاً وَدُّوا مَا عَنتُمْ قَدْ بَدَتِ الْبَغْضَاءُ مِنْ أَفْوَاهِهِمْ وَمَا تُخْفِي صُدُورُهُمْ أَكْبَرُ قَدْ بَيَّنَّا لَكُمُ الْآيَتِ إِنْ كُنْتُمْ تَعْقِلُونَ . هَانْتُمْ أَولا ، تُحِبُّونَهُمْ وَلَا يُحِبُّونَكُمْ وَتُؤْمِنُونَ بِالْكِتٰبِ كُلَّه
"হে মু'মিনগণ! তোমাদের নিজেদের লোক ছাড়া অন্যদেরকে ঘনিষ্ঠ বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা তোমাদের মধ্যে অনর্থ সৃষ্টিতে একটুও কুণ্ঠাবোধ করে না। তাদের কাম্য হচ্ছে তোমাদেরকে বিব্রত রাখা। তাদের মুখ থেকে বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ ইতিমধ্যেই ঘটে গেছে, আর তাদের অন্তঃকরণ যা গোপন করে রেখেছে, তা আরো জঘন্যতম। আমরা তোমাদের জন্যে আয়াতসমূহ সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করে দিয়েছি-যদি তোমরা বুদ্ধিমান হয়ে থাক। তোমরা হচ্ছ সেসব লোক, যারা তাদের ভালবেসে থাক। কিন্তু তারা তোমাদের ভালবাসে না। আর তোমরা সমগ্র কিতাবে বিশ্বাস পোষণ করে থাক।"
অর্থাৎ তোমরা তোমাদের কিতাবে এবং তোমাদের পূর্বে নাযিলকৃত কিতাবসমূহের প্রতিও বিশ্বাস পোষণ করে থাক, অথচ তারা তোমাদের কিতাবকে অবিশ্বাস ও অগ্রাহ্য করে। সে হিসাবে তোমাদের তাদের তুলনায় বেশি বিদ্বেষ পোষণ করার কথা, অর্থাৎ তোমরাই বরং তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পোষণের অধিকতর হকদার।
وَإِذَا لَقُوكُمْ قَالُوا أَمَنَّا وَإِذَا خَلَوْا عَضُّوا عَلَيْكُمُ الْأَنَامِلَ مِنَ الْغَيْظِ قُلْ مُوتُوا بِغَيْظِكُمْ -
"তারা যখন তোমাদের সাথে সাক্ষাৎ করে, তখন বলে, আমরা ঈমান এনেছি আর যখন নিভৃতে সংগোপনে থাকে, তখন তোমাদের বিরুদ্ধে ক্রোধে অঙ্গুলি কামড়ায়। বলুন, তোরা তোদের ক্রোধ নিয়েই মর গিয়ে......।"

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আবু বকরের ইয়াহূদী শিক্ষালয়ে প্রবেশ

📄 আবু বকরের ইয়াহূদী শিক্ষালয়ে প্রবেশ


একদা আবূ বকর সিদ্দীক (রা) ইয়াহুদীদের শিক্ষালয়ে প্রবেশ করলেন। তিনি সেখানে প্রচুর লোককে এক ব্যক্তির চতুষ্পার্শ্বে সমবেত দেখতে পেলেন। ঐ ব্যক্তিটি ফানহাস নামে পরিচিত ছিল। সে ছিল তাদের একজন পণ্ডিত ও ধর্মনেতা। তার কাছে তখন আশইয়া' নামক তাদের আরেকজন ধর্মীয় পণ্ডিতও উপস্থিত ছিল। আবূ বকর ফানহাসকে উদ্দেশ করে বললেন:
"তোমার জন্যে আক্ষেপ হে ফানহাস! আল্লাহকে ভয় কর এবং ইসলাম গ্রহণ কর। আল্লাহর কসম তুমি সম্যক অবগত আছ যে, মুহাম্মদ (সা) নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূল। তিনি তাঁরই পক্ষ থেকে রাসূলরূপে তোমাদের নিকট আবির্ভূত হয়েছেন। তোমাদের কাছে রক্ষিত তাওরাত ও ইনজীলে তোমরা তাঁর কথা পেয়েছ।"
তখন জবাবে ফানহাস আবূ বকরকে লক্ষ্য করে বলল:
"আল্লাহর কসম হে আবু বকর! আমাদের আল্লাহর কাছে কোন ঠেকা নেই। পক্ষান্তরে তাঁর অবশ্যই ঠেকা আছে আমাদের কাছে। আমরা তাঁর কাছে কাকুতি-মিনতি করি না, যেমনটি তিনি করেন আমাদের কাছে। আমরা তাঁর নিকট থেকে দায়মুক্ত ও অনটনহীন, কিন্তু তিনি আমাদের দিক থেকে অনটন ও দায়মুক্ত নন। যদি তিনি আমাদের দিক থেকে অনটনমুক্তই হতেন, তবে আমাদের সম্পদ থেকে কর্জ চাইতেন না-যেমনটি তোমাদের নবী ধারণা করে থাকেন। তিনি আমাদেরকে সুদ থেকে বারণ করেন আবার নিজে তিনি তা আমাদেরকে দিয়ে থাকেন।"

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আবূ বকরের ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া

📄 আবূ বকরের ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া


তখন আবূ বকর (রা) নারাজ হলেন এবং তার গালে জোরে আঘাত হেনে বললেন: "যাঁর হাতে আমার প্রাণ সেই মহান সত্তার কসম! যদি তোদের এবং আমাদের মধ্যে চুক্তি না থাকত, তবে আমি তোর মাথায় আঘাত করতাম হে আল্লাহর দুশমন।"
রাবী বলেন, তখন ফানহাস রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে গিয়ে নালিশ করল: হে মুহাম্মদ! আপনার সাথী আমার সাথে কী দুর্ব্যবহার করেছে তা লক্ষ্য করুন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) আবূ বকরকে উদ্দেশ্য করে বললেন : তোমাকে তার সাথে এ কাজ করতে কিসে উদ্বুদ্ধ করল?
আবূ বকর (রা) আরয করলেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ! নিশ্চয়ই আল্লাহর শত্রুটি আল্লাহর ব্যাপারে জঘন্য উক্তি করেছে। তার ধারণা আল্লাহ্ অভাবগ্রস্ত, ফকীর আর তারা অভাবমুক্ত ধনিক সমাজ। সে যখন এরূপ উক্তি করল, তখন তার এ উক্তিতে আমি অসন্তুষ্ট হই এবং আল্লাহ্রই (সন্তুষ্টির) উদ্দেশ্যে তার গালে আঘাত করি। কিন্তু ফানহাস সাথে সাথে তা অস্বীকার করে বসল।
সে বলল: আমি এমন উক্তি করিনি। তখন আল্লাহ্ তা'আলা ফানহাসের কথা রদ করে আবূ বকর (রা)-এর সত্যতার প্রমাণস্বরূপ নাযিল করেন: لَقَدْ سَمِعَ اللهُ قَوْلَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ فَقِيرٌ وَنَحْنُ أَغْنِيَاءُ سَنَكْتُبُ مَا قَالُوا وَقَتْلَهُمُ الْأَنْبِيَاءَ بِغَيْرِ حَقٍّ ونَقُولُ ذُوقُوا عَذَابَ الْحَرِيقِ .
"আল্লাহ্ তা'আলা নিশ্চয়ই ঐসব লোকের উক্তি শ্রবণ করেছেন, যারা বলেছে নিশ্চয়ই আল্লাহ্ অভাবগ্রস্ত এবং আমরা ধনী। অচিরেই আমি তা লিপিবদ্ধ করে নেব যা তারা বলেছে এবং তাদের নবী-রাসূলদেরকে হত্যার ব্যাপারটিও-যা নাহকভাবে তারা করেছে, আর আমি বলব, দগ্ধকারী (আগুনের) শাস্তি ভোগ কর।" (৩: ১৮১)
আবূ বকর সিদ্দীক (রা) ও তাঁর অসন্তুষ্টি সম্পর্কে নাযিল হল:
وَلَتَسْمَعُنَّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَمِنَ الَّذِينَ أَشْرَكُوا أَذًى كَثِيرًا وَإِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ .
"তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব প্রদান করা হয়েছে এবং যারা শিরক করেছে, তাদের পক্ষ থেকে তোমরা অনেক কষ্টদায়ক বক্তব্যই শুনতে পাবে। যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর ও তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে তা হবে দৃঢ়তামূলক কাজ।" (৩: ১৮৬)

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 ইয়াহুদী পণ্ডিতদের চরিত্র

📄 ইয়াহুদী পণ্ডিতদের চরিত্র


তারপর ফানহাস এবং তার সাথী ইয়াহুদী পণ্ডিতদের বক্তব্যের জবাবে নাযিল হল : وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبَ لَتُبَيِّنُنَّهُ لِلنَّاسِ وَلَا تَكْتُمُونَهُ فَنَبَدُوهُ وَرَاءَ ظُهُورِهِمْ وَاشْتَرَاوْ بِهِ ثَمَنًا قَلِيْلاً فَبِئْسَ مَا يَشْتَرُونَ . لَا تَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَفْرَحُوْنَ بِمَا أَتَوا وَ يُحِبُّونَ أَنْ يُحْمَدُوا بِمَا لَمْ يَفْعَلُوا فَلَا تَحْسَبَنَّهُمْ بِمَفَازَةٍ مِّنَ الْعَذَابِ وَلَهُمْ عَذَابِ اليم.
"(আর স্মরণ কর সেদিনের কথা) যখন আল্লাহ্ কিতাবধারী সম্প্রদায়ের নিকট থেকে এ মর্মে অঙ্গীকার গ্রহণ করলেন যে, তোমরা অবশ্যই লোক সমক্ষে তা প্রকাশ করবে এবং তা গোপন করবে না, তারা তা তাদের পেছনে ফেলে দিল (মানে তার ভ্রুক্ষেপমাত্র করল না) এবং স্বল্প মূল্যে তা বিক্রি করে দিল, তাদের এ বিনিময় কতই না মন্দ! আর তারা যা পেয়ে আনন্দ প্রকাশ করছে এবং তারা যে যা করেনি তজ্জন্য প্রশংসিত হতে ভালবাসে। তা তাদেরকে শাস্তি থেকে নিষ্কৃতি প্রদান করবে বলে কখনো ধারণা করবে না। তাদের জন্যে রয়েছে যাতনাদায়ক শাস্তি।” (৩ : ১৮৭-১৮৮)
অর্থাৎ ফানহাস, আইয়া' প্রমুখ ইয়াহুদী পণ্ডিতবর্গ গুমরাহীকে চাকচিক্যময় করে লোকসমাজে উপস্থাপিত করে যে পার্থিব ফায়দা লুটেছে এবং এতে উল্লসিত হয়েছে, আর তারা যে গুণাবলীতে গুণান্বিত নয়, সেগুণে প্রশংসিত হতে ভালবাসে অর্থাৎ আসলে তারা পণ্ডিত নয়, কিন্তু লোকে পণ্ডিত বলে অভিহিত করুক এটা তারা কামনা করে, আর না তারা হিদায়াত ও সত্যের অনুসারী অথচ লোকে তাদেরকে তা বলুক এ কথা তারা কামনা করে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00