📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাহাবীগণের অবমাননা প্রসঙ্গে যা নাযিল হয়
ইবন ইসহাক বলেন: যখন আবদুল্লাহ্ ইব্ন সালাম, সা'লাবা ইবন সা'য়া, উসায়দ ইব্ন সা'য়া, আসাদ ইবন উবায়দ এবং তাদের সাথে একত্রে ইসলাম গ্রহণকারী ইয়াহুদীরা ইসলাম গ্রহণ করে তাঁরা ঈমান আনলেন, সত্যকে গ্রহণ করলেন, ইসলামকে ভালবাসতে লাগলেন এবং তাতে বেশ ব্যুৎপত্তিও অর্জন করলেন, তখন ইয়াহুদী ধর্মনেতারা—যারা তখনো কুফরীর মধ্যে ছিল, তারা বলতে শুরু করল:
"মুহাম্মদের প্রতি যারা ঈমান এনেছে এবং তাঁর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেছে, তারা আমাদের মধ্যকার দুষ্টলোক ব্যতীত অন্য কেউ নয়। যদি তারা সত্যই আমাদের ধর্মীয় নেতা হত, তাহলে তারা তাদের পূর্বপুরুষের ধর্ম পরিত্যাগ করে অন্য ধর্মের দিকে ধাবিত হত না।" তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাদের এ বক্তব্য সম্পর্কে নাযিল করেন:
لَيْسُوا سَوَاءً مِنْ أَهْلِ الْكِتَبِ أُمَّةٌ قَائِمَةً يَتْلُونَ أَيْتِ اللَّهِ أَنَاءَ الَّيْلِ وَهُمْ يَسْجُدُونَ .
"তারা সকলে সমান নয়। আহলি কিতাবের মধ্যে অবিচলিত একদল এমনও আছে, যারা রাতের বেলায় আল্লাহর আয়াতসমূহ তিলাওয়াত করে এবং তারা সিজদা করে।" (৩: ১১৩)
ইব্ন হিশাম বলেন: اناء الليل মানে ساعات الليل রাতের প্রহরে প্রহরে। এর একবচন انى কবি মুতাখাল্লি হাযালী যাঁর আসল নাম মালিক ইব্ন উয়ায়মার—শব্দটি এভাবে ব্যবহার করেছেন তাঁর পুত্রশোকে লিখিত মর্সিয়া কবিতায়:
حلو ومر كعطف القدح شيمته × في كل اني قضاء الليل ينتعل
আর কবি লবীদ ইব্ন রবী'আ একটি বন্য গাধার বর্ণনা দিতে গিয়েও শব্দটি ব্যবহার করেছেন এভাবে:
يطرب اناء النهار كأنه × غوى سقاه في التجار نديم
আল্লাহ্ তা'আলা ঈমান আনয়নকারী ইয়াহুদীদের সম্পর্কে উক্ত আয়াতে আরো বলেন:
يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَيَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُسَارِعُونَ فِي الْخَيْرَاتِ وَأُولَئِكَ مِنَ الصَّلِحِينَ .
"তারা আল্লাহ্ এবং আখিরাতে ঈমান রাখে এবং সৎকাজের আদেশ করে ও অসৎকাজে বারণ করে এবং কল্যাণকর কাজসমূহে প্রতিযোগিতা করে, আর তারাই সৎকর্মশীলগণের অন্তর্ভুক্ত।”
📄 ইয়াহুদীদের সাথে ঘনিষ্ঠতা ও অন্তরঙ্গতা স্থাপনের বিরুদ্ধে যা নাযিল হয়
ইবন ইসহাক বলেন: কয়েকজন মুসলমান কয়েকজন ইয়াহুদীর সাথে তাদের প্রতিবেশী ও চুক্তিবদ্ধ হওয়ার কারণে ঘনিষ্ঠতা রক্ষা করে চলতেন। আল্লাহ্ তা'আলা তাদেরকে ইয়াহুদীদের সাথে ঘনিষ্ঠতা রক্ষা করতে বারণ করে নাযিল করলেন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لا تَتَّخِذُوا بِطَانَةً مِّنْ دُونِكُمْ لَا يَألُونَكُمْ خَبَالاً وَدُّوا مَا عَنتُمْ قَدْ بَدَتِ الْبَغْضَاءُ مِنْ أَفْوَاهِهِمْ وَمَا تُخْفِي صُدُورُهُمْ أَكْبَرُ قَدْ بَيَّنَّا لَكُمُ الْآيَتِ إِنْ كُنْتُمْ تَعْقِلُونَ . هَانْتُمْ أَولا ، تُحِبُّونَهُمْ وَلَا يُحِبُّونَكُمْ وَتُؤْمِنُونَ بِالْكِتٰبِ كُلَّه
"হে মু'মিনগণ! তোমাদের নিজেদের লোক ছাড়া অন্যদেরকে ঘনিষ্ঠ বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা তোমাদের মধ্যে অনর্থ সৃষ্টিতে একটুও কুণ্ঠাবোধ করে না। তাদের কাম্য হচ্ছে তোমাদেরকে বিব্রত রাখা। তাদের মুখ থেকে বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ ইতিমধ্যেই ঘটে গেছে, আর তাদের অন্তঃকরণ যা গোপন করে রেখেছে, তা আরো জঘন্যতম। আমরা তোমাদের জন্যে আয়াতসমূহ সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করে দিয়েছি-যদি তোমরা বুদ্ধিমান হয়ে থাক। তোমরা হচ্ছ সেসব লোক, যারা তাদের ভালবেসে থাক। কিন্তু তারা তোমাদের ভালবাসে না। আর তোমরা সমগ্র কিতাবে বিশ্বাস পোষণ করে থাক।"
অর্থাৎ তোমরা তোমাদের কিতাবে এবং তোমাদের পূর্বে নাযিলকৃত কিতাবসমূহের প্রতিও বিশ্বাস পোষণ করে থাক, অথচ তারা তোমাদের কিতাবকে অবিশ্বাস ও অগ্রাহ্য করে। সে হিসাবে তোমাদের তাদের তুলনায় বেশি বিদ্বেষ পোষণ করার কথা, অর্থাৎ তোমরাই বরং তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ পোষণের অধিকতর হকদার।
وَإِذَا لَقُوكُمْ قَالُوا أَمَنَّا وَإِذَا خَلَوْا عَضُّوا عَلَيْكُمُ الْأَنَامِلَ مِنَ الْغَيْظِ قُلْ مُوتُوا بِغَيْظِكُمْ -
"তারা যখন তোমাদের সাথে সাক্ষাৎ করে, তখন বলে, আমরা ঈমান এনেছি আর যখন নিভৃতে সংগোপনে থাকে, তখন তোমাদের বিরুদ্ধে ক্রোধে অঙ্গুলি কামড়ায়। বলুন, তোরা তোদের ক্রোধ নিয়েই মর গিয়ে......।"
📄 আবু বকরের ইয়াহূদী শিক্ষালয়ে প্রবেশ
একদা আবূ বকর সিদ্দীক (রা) ইয়াহুদীদের শিক্ষালয়ে প্রবেশ করলেন। তিনি সেখানে প্রচুর লোককে এক ব্যক্তির চতুষ্পার্শ্বে সমবেত দেখতে পেলেন। ঐ ব্যক্তিটি ফানহাস নামে পরিচিত ছিল। সে ছিল তাদের একজন পণ্ডিত ও ধর্মনেতা। তার কাছে তখন আশইয়া' নামক তাদের আরেকজন ধর্মীয় পণ্ডিতও উপস্থিত ছিল। আবূ বকর ফানহাসকে উদ্দেশ করে বললেন:
"তোমার জন্যে আক্ষেপ হে ফানহাস! আল্লাহকে ভয় কর এবং ইসলাম গ্রহণ কর। আল্লাহর কসম তুমি সম্যক অবগত আছ যে, মুহাম্মদ (সা) নিশ্চয়ই আল্লাহর রাসূল। তিনি তাঁরই পক্ষ থেকে রাসূলরূপে তোমাদের নিকট আবির্ভূত হয়েছেন। তোমাদের কাছে রক্ষিত তাওরাত ও ইনজীলে তোমরা তাঁর কথা পেয়েছ।"
তখন জবাবে ফানহাস আবূ বকরকে লক্ষ্য করে বলল:
"আল্লাহর কসম হে আবু বকর! আমাদের আল্লাহর কাছে কোন ঠেকা নেই। পক্ষান্তরে তাঁর অবশ্যই ঠেকা আছে আমাদের কাছে। আমরা তাঁর কাছে কাকুতি-মিনতি করি না, যেমনটি তিনি করেন আমাদের কাছে। আমরা তাঁর নিকট থেকে দায়মুক্ত ও অনটনহীন, কিন্তু তিনি আমাদের দিক থেকে অনটন ও দায়মুক্ত নন। যদি তিনি আমাদের দিক থেকে অনটনমুক্তই হতেন, তবে আমাদের সম্পদ থেকে কর্জ চাইতেন না-যেমনটি তোমাদের নবী ধারণা করে থাকেন। তিনি আমাদেরকে সুদ থেকে বারণ করেন আবার নিজে তিনি তা আমাদেরকে দিয়ে থাকেন।"
📄 আবূ বকরের ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া
তখন আবূ বকর (রা) নারাজ হলেন এবং তার গালে জোরে আঘাত হেনে বললেন: "যাঁর হাতে আমার প্রাণ সেই মহান সত্তার কসম! যদি তোদের এবং আমাদের মধ্যে চুক্তি না থাকত, তবে আমি তোর মাথায় আঘাত করতাম হে আল্লাহর দুশমন।"
রাবী বলেন, তখন ফানহাস রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে গিয়ে নালিশ করল: হে মুহাম্মদ! আপনার সাথী আমার সাথে কী দুর্ব্যবহার করেছে তা লক্ষ্য করুন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) আবূ বকরকে উদ্দেশ্য করে বললেন : তোমাকে তার সাথে এ কাজ করতে কিসে উদ্বুদ্ধ করল?
আবূ বকর (রা) আরয করলেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ! নিশ্চয়ই আল্লাহর শত্রুটি আল্লাহর ব্যাপারে জঘন্য উক্তি করেছে। তার ধারণা আল্লাহ্ অভাবগ্রস্ত, ফকীর আর তারা অভাবমুক্ত ধনিক সমাজ। সে যখন এরূপ উক্তি করল, তখন তার এ উক্তিতে আমি অসন্তুষ্ট হই এবং আল্লাহ্রই (সন্তুষ্টির) উদ্দেশ্যে তার গালে আঘাত করি। কিন্তু ফানহাস সাথে সাথে তা অস্বীকার করে বসল।
সে বলল: আমি এমন উক্তি করিনি। তখন আল্লাহ্ তা'আলা ফানহাসের কথা রদ করে আবূ বকর (রা)-এর সত্যতার প্রমাণস্বরূপ নাযিল করেন: لَقَدْ سَمِعَ اللهُ قَوْلَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ فَقِيرٌ وَنَحْنُ أَغْنِيَاءُ سَنَكْتُبُ مَا قَالُوا وَقَتْلَهُمُ الْأَنْبِيَاءَ بِغَيْرِ حَقٍّ ونَقُولُ ذُوقُوا عَذَابَ الْحَرِيقِ .
"আল্লাহ্ তা'আলা নিশ্চয়ই ঐসব লোকের উক্তি শ্রবণ করেছেন, যারা বলেছে নিশ্চয়ই আল্লাহ্ অভাবগ্রস্ত এবং আমরা ধনী। অচিরেই আমি তা লিপিবদ্ধ করে নেব যা তারা বলেছে এবং তাদের নবী-রাসূলদেরকে হত্যার ব্যাপারটিও-যা নাহকভাবে তারা করেছে, আর আমি বলব, দগ্ধকারী (আগুনের) শাস্তি ভোগ কর।" (৩: ১৮১)
আবূ বকর সিদ্দীক (রা) ও তাঁর অসন্তুষ্টি সম্পর্কে নাযিল হল:
وَلَتَسْمَعُنَّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَمِنَ الَّذِينَ أَشْرَكُوا أَذًى كَثِيرًا وَإِنْ تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا فَإِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ .
"তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব প্রদান করা হয়েছে এবং যারা শিরক করেছে, তাদের পক্ষ থেকে তোমরা অনেক কষ্টদায়ক বক্তব্যই শুনতে পাবে। যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ কর ও তাকওয়া অবলম্বন কর, তবে তা হবে দৃঢ়তামূলক কাজ।" (৩: ১৮৬)