📄 ইব্রাহীম (আ)-কে নিয়ে ইয়াহুদী-খ্রিস্টানদের কোন্দল
ইয়াহুদী পণ্ডিতবর্গ এবং নাজরানের খ্রিস্টানেরা যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট একত্র হল, তখন তারা পরস্পরে কলহ ও বাদানুবাদে প্রবৃত্ত হল। ইয়াহুদী পণ্ডিতেরা বলল: ইবরাহীম ইয়াহুদী বৈ আর কিছু ছিলেন না। ওদিকে নাজরানের খ্রিস্টানেরা বলল: ইবরাহীম খ্রিস্টান বৈ কিছুই ছিলেন না। তখন তাদের ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলা নাযিল করেন: يَاهْلَ الْكِتَبِ لِمَ تُحَاجُّونَ فِي إِبْرَاهِيمَ وَمَا أُنْزِلَتْ التَّوْرَةُ وَالْإِنْجِيلُ إِلَّا مِنْ بَعْدِهِ أَفَلَا تَعْقِلُونَ. هَانْتُمْ هَؤُلا ، حَاجَجْتُمْ فِيْمَا لَكُمْ بِهِ عِلْمٌ فَلِمَ تُحَاجُّونَ فِيمَا لَيْسَ لَكُمْ بِهِ عِلْمٌ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لا تَعْلَمُونَ . مَا كَانَ إِبْرَاهِيمُ يَهُودِيًّا وَلَا نَصْرًا نِيًّا وَلَكِنْ كَانَ حَنِيفًا مُّسْلِمًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ إِنَّ أولى النَّاسِ بِابْرَاهِيمَ لِلَّذِينَ اتَّبَعُوهُ وَهُذَا النَّبِيُّ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَاللَّهُ وَلِيُّ الْمُؤْمِنِينَ.
"হে কিতাবীগণ! তোমরা ইবরাহীমের ব্যাপারে কেন তর্ক করছ? অথচ তাওরাত ও ইনজীল উভয় কিতাবই তার পরেই নাযিল হয়েছিল। তোমাদের কি বুদ্ধিশুদ্ধি নেই? তোমরা তো সেই সব লোক—যে ব্যাপারে তোমাদের কিছু অবগতি আছে, সে ব্যাপারে তোমরা বাদানুবাদ করেছ। কিন্তু যে ব্যাপারে তোমাদের অবগতিমাত্র নেই, সে ব্যাপারে তোমরা তর্ক করছ কেন? আর আল্লাহই সম্যক অবগত এবং তোমরা কিছুমাত্র অবগত নও।
ইবরাহীম ইয়াহুদীও ছিলেন না, খ্রিস্টানও ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ মুসলিম আর তিনি অংশীবাদীও ছিলেন না।
ইবরাহীমের ঘনিষ্ঠতম হচ্ছে ঐ সব লোক, যারা তার অনুসরণ করেছে এবং এই নবী ও যারা ঈমান এনেছে, আর আল্লাহ্ হচ্ছেন মু'মিনদের অভিভাবক ও বন্ধু।" (৩: ৬৫-৬৮)
📄 সকালে তাদের ঈমান আনয়ন এবং সন্ধ্যায় কুফরী অবলম্বন সম্পর্কে যা নাযিল হয়
আবদুল্লাহ্ ইব্ন যায়দ, আদী ইব্ন যায়দ ও হারিস ইব্ন আওফ নিজেদের মধ্যে বলাবলি করছিল: চল আমরা সকালে মুহাম্মদ এবং তার সাথীদের প্রতি যা নাযিল করা হয়েছে, তার প্রতি ঈমান আনয়ন করি, আর সন্ধ্যায়ই তার প্রতি অবিশ্বাস ঘোষণা করি, এভাবে আমরা তাদের দীনকে তাদের চোখে সন্দেহের বস্তুতে পরিণত করব। এমনও তো হতে পারে যে, আমাদের দেখাদেখি তারাও এরূপ করতে থাকবে এবং তাদের দীন থেকে তারা সরে আসবে।
তখন আল্লাহ তা'আলা তাদের ব্যাপারে নাযিল করেন:
يَأَهْلَ الكتب لِمَ تَلْبِسُونَ الْحَقِّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُونَ الْحَقِّ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ، وَقَالَتْ طَائِفَةٌ مِّنْ أَهْلِ الكتب أمنُوا بِالَّذِي أُنْزِلَ عَلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَجْهَ النَّهَارِ وَاكْفُرُوا أُخِرَةً لَعَلَّهُمْ يَرْجِعُونَ. وَلَا تُؤْمِنُوا إِلَّا لِمَنْ تَبِعَ دِينَكُمْ قُلْ إِنَّ الهُدَى هُدَى اللهِ أَنْ يُؤْتَى أَحَدٌ مَّثْلَ مَا أَتَيْتُمْ أَوْ يُحَاجُوكُمْ عِنْدَ رَبَّكُمْ قُلْ إِنَّ الْفَضْلَ بِيَدِ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ.
"হে কিতাবীগণ! তোমরা কেন হককে বাতিলের সাথে মিশ্রিত করছ এবং হক গোপন করছ, অথচ তোমরা অবহিত রয়েছ?
আর কিতাবীদের একটি দল বলল, ঈমানদারদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে, দিনের শুরুর দিকে তার প্রতি ঈমান আন এবং দিনের শেষপ্রান্তে তার প্রতি অস্বীকৃতি ঘোষণা কর—হয়ত তারা (তাদের ধর্মমত থেকে) সরে আসবে। আর তোমাদের ধর্মের অনুসারী ছাড়া অন্য কারো আনুগত্য করবে না।
হে রাসূল! আপনি বলুন, আল্লাহর হিদায়াতই প্রকৃত হিদায়াত। বিশ্বাস করো না যে, তোমাদের যা দেওয়া হয়েছে অনুরূপ আর কাউকেও দেওয়া হবে অথবা তোমাদের প্রতিপালকের সামনে তারা তোমাদেরকে যুক্তিতে পরাভূত করবে।
(হে রাসূল!) আপনি বলুন, নিশ্চয়ই করুণারাশি আল্লাহরই হাতে—তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করেন। আর আল্লাহ্ প্রাচুর্যময় ও সর্বজ্ঞ।" (৩: ৭১-৭৩)
📄 আবু রাফি'র প্রস্তাবের বিরুদ্ধে যা নাযিল হয়েছে
যখন ইয়াহূদী পণ্ডিতবর্গ এবং নাজরানের খ্রিস্টানেরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দরবারে সমবেত হল, তখন আবু রাফি' কুরাযী রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ইসলামের দাওয়াতের জবাবে বলল: হে মুহাম্মদ! খ্রিস্টানেরা যেভাবে ঈসা ইবন মারইয়ামের পূজা করে থাকে, সেভাবে আমরা আপনার পূজা করব, এটাই কি আমাদের নিকট আপনার কামনা?
নাজরানবাসী নাসারাদের রীস নামক এক ব্যক্তিও বলে উঠল: হে মুহাম্মদ! এটাই কি আপনি আমাদের কাছে কামনা করেন আর এটার দিকেই কি আপনি আমাদের আহ্বান জানাচ্ছেন? কোন কোন রিওয়ায়াতে লোকটার নাম রীস আবার কোন রিওয়ায়াতে রঈসও এসেছে।
জবাবে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: معاذ الله ان اعبد غير الله او امر بعبادة غيره فما بذلك بعثني الله ولا امرنى او كما قال)
"আমি মহান আল্লাহ্র আশ্রয় চাই এ ব্যাপার থেকে যে, আমি আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করি অথবা তাঁকে ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করতে বলি। না আল্লাহ্ আমাকে এ জন্য প্রেরণ করেছেন, আর না এ আদেশ তিনি আমাকে দিয়েছেন (অথবা তিনি যেভাবে বলেছেন)।"
তাদের এ কথোপকথন সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা নাযিল করেন:
مَا كَانَ لِبَشَرٍ أَنْ يُؤْتِيَهُ اللهُ الْكِتٰبَ وَالحُكْمَ وَالنُّبُوَّةَ ثُمَّ يَقُولَ لِلنَّاسِ كُونُوا عِبَادًا لَيْ مِنْ دُونِ اللَّهِ ولكن كُونُوا رَبَّنِينَ بِمَا كُنْتُمْ تُعَلِّمُونَ الكَتَبَ وَبِمَا كُنْتُمْ تَدْرُسُوْنَ . وَلَا يَأْمُرُكُمْ أَنْ تَتَّخِذُوا الْمَلْئِكَةَ والنَّبِيِّنَ أَرْبَابًا يَأْمُرُكُمْ بِالْكُفْرِ بَعْدَ إِذْ أَنْتُمْ مُسْلِمُونَ.
"কোন ব্যক্তিকে আল্লাহ্ কিতাব, হিকমত ও নবুওয়ত দান করার পর সে মানুষকে বলবে, 'আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা আমার অনুগত হয়ে যাও' তা তার জন্য শোভনীয় নয়; বরং সে বলবে: তোমরা আল্লাহওয়ালা হয়ে যাও, কেননা তোমরা কিতাব (কুরআন) শিক্ষা দিয়ে থাক এবং যেহেতু তোমরা জ্ঞান চর্চা কর (بعد از انتم مسلمون পর্যন্ত)। (৩ : ৭৯-৮০)
ইবন হিশাম বলেন: ربانیون আল্লাহওয়ালা অর্থে এখানে আলিমগণ, ফকীহগণ এবং নেতৃপর্যায়ের ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব বোঝানো হয়েছে। এর এক বচন ربانی কবি এ অর্থেই বলেছেন:
لو كنت مرتهنا في القوس افتتى × منها الكلام ورباني اخبار
"যদি আমি কোন সংসারত্যাগী সাধু-সন্ন্যাসীর আশ্রমেও হতাম, তবুও প্রিয়ার কথা আমাকে এবং উক্ত সংসারত্যাগী সাধু-সন্ন্যাসীকে পর্যন্ত বিভ্রান্তিতে ফেলে দিত।"
ইব্ন হিশাম বলেন: কবিতায় ব্যবহৃত القرس শব্দের অর্থ হচ্ছে সংসারত্যাগী সাধুর আশ্রম। وافتتی হচ্ছে তামীম গোত্রের ভাষা এবং فتتی হচ্ছে কায়স গোত্রের ভাষা। কবি জারীর বলেছেন:
لا وصل اذ صرمت هند ولو وقفت × لاستنزلتنى وذا المسحين في القوس
"প্রিয়া হিন্দ যখন বিচ্ছেদ গ্রহণ করল, তখন আর মিলনের সম্ভাবনা নেই। সে যদি থেকে যেত, তাহলে নিশ্চিতভাবেই সে আমাকে এবং গেরুয়া বসন পরিহিত আশ্রমের সাধু-সন্তের পদস্খলন ঘটিয়ে ছাড়ত।"
এখানে قوس হচ্ছে সংসারত্যাগী সাধুর আশ্রম এবং ربانی শব্দটি رب থেকে উদগত যার অর্থ মনিব। আল্লাহ্র কিতাবে আছে : فَيَسْقَى رَبَّهُ خَمْراً "সে তার রবকে অর্থাৎ মনিবকে শরাব পান করাত।"
ইবন ইসহাক বলেন: وَلَا يَأْمُرُكُمْ أَنْ تَتَّخِذُوا الْمَلَئِكَةَ وَالنَّبِيِّنَ أَرْبَابًا أَيَأْمُرُكُمْ بِالْكُفْرِ بَعْدَ إِذْ أَنْتُمْ مُسْلِمُونَ .
"আর সে তোমাদেরকে এ হুকুম দিতে পারে না যে, ফেরেশতাদেরকে ও নবীগণকে তোমরা প্রভুরূপে গ্রহণ করবে। তোমাদের মুসলিম হওয়ার পরও কি সে তোমাদেরকে কুফরের আদেশ দিতে পারে?" (৩: ৮০)
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ব্যাপারে নবীগণ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ
ইবন ইসহাক বলেন: তারপর তাদের এবং তাদের নবীগণের নিকট থেকে নবী আগমনের পর তাঁকে সত্য নবীরূপে বরণ করা সংক্রান্ত যে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁরা যে সে অঙ্গীকারে আবদ্ধও হয়েছিলেন, তার উল্লেখ করে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ النَّبِيِّنَ لَمَا أَتَيْتُكُمْ مِّنْ كِتَبٍ وَحِكْمَةٍ ثُمَّ جَاءَكُمْ رَسُولٌ مُّصَدِّقُ لِّمَا مَعَكُمْ لَتُؤْمِنُنَّ بِهِ وَلَتَنْصُرُنَّهُ قَالَ أَقْرَرْتُمْ وَأَخَذْتُمْ عَلَى ذَلِكُمْ اِصْرِى قَالُوا أَقْرَرْنَا قَالَ فَاشْهَدُوا وَأَنَا مَعَكُمْ مِّنَ الشهدين
"যখন আল্লাহ নবীগণের অঙ্গীকার গ্রহণ করলেন এ মর্মে যে, আমি তোমাদেরকে কিতাব ও হিকমত দান করেছি এ শর্তে যে, তারপর যখন তোমাদের কাছে তোমাদের নিকটে রক্ষিত কিতাবের সমর্থনকারী নবী আসবেন, তখন তোমরা অবশ্যই তার উপর বিশ্বাস স্থাপন করবে, তাকে সাহায্য করবে। তিনি বললেন: তোমরা কি অঙ্গীকার করছ এবং এর দায়িত্ব গ্রহণ করছ? তারা তখন বলল: আমরা অঙ্গীকার করছি। তিনি বললেন: তোমরা সাক্ষী থাক এবং আমিও এ ব্যাপারে তোমাদের সাথে সাক্ষী থাকছি।" (৩: ৮১)