📄 কাবার দিকে কিবলা পরিবর্তনকালে ইয়াহুদীদের বক্তব্য
ইবন ইসহাক বলেন: যখন সিরিয়ার দিক থেকে কা'বার দিকে কিবলা পরিবর্তিত হল, এ কিবলা পরিবর্তনের ঘটনাটি ঘটে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মদীনা শরীফে শুভাগমনের সতের মাসের মাথায় রজব মাসে। তখন রিফাআ ইব্ন কায়স, কুরদম ইব্ন Amr, কা'ব ইব্ন আশরাফ, রাফি 'ইব্ন আবু রাফি', কা'ব ইবন আশরাফের মিত্র হাজ্জাজ ইব্ন Amr, রবী' ইবন রবী' ইব্ন আবুল হুকায়ক ও কিনানা ইব্ন রবী' ইব্ন আবুল হুকায়ক রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলল: হে মুহাম্মদ! আপনি যে কিবলার উপর প্রতিষ্ঠিত ছিলেন তা থেকে কে আপনাকে ফিরিয়ে দিল, অথচ আপনি দাবি করেন যে, আপনি ইব্রাহীমের মিল্লাত ও দীনের উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছেন? আপনি যে কিবলাপন্থী ছিলেন, তাতে প্রত্যাবর্তন করুন, তাহলে আমরা আপনার অনুসারী হয়ে যাব এবং আপনাকে সত্য নবী বলে মানব। আর এ কথা দ্বারা তারা তাঁকে দীন থেকে সরিয়ে নিতে সচেষ্ট হয়। তখন এ ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলা নাযিল করেন:
سَيَقُولُ السُّفَهَاءُ مِنَ النَّاسِ مَا وَلَهُمْ عَنْ قِبْلَتِهِمْ الَّتِي كَانُوا عَلَيْهَا قُلْ لِلَّهِ الْمُشْرِقُ وَالْمَغْرِبُ يَهْدِي مَنْ يَشَاءُ إِلى صِرَاطٍ مُسْتَقِيمَ - وَكَذَلِكَ جَعَلْنَكُمْ أُمَّةً وَسَطًا لَتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ .
وَيَكُونَ الرَّسُولُ عَلَيْكُمْ شَهِيداً * وَمَا جَعَلْنَا الْقِبْلَةَ الَّتِي كُنْتَ عَلَيْهَا إِلَّا لِنَعْلَمَ مَنْ يَتَّبِعُ الرَّسُولَ مِمَّنْ يَنْقَلِبُ عَلَى عَقِبَيْه
"লোকদের মধ্যকার নির্বোধরা অচিরেই বলবে-ওদেরকে সেই কিবলা থেকে কিসে ফিরাল, যার উপর তারা প্রতিষ্ঠিত ছিল? আপনি বলুন, আল্লাহ্রই মালিকানাধীন পূর্বও, পশ্চিমও। আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছা সরল-সঠিক পথে পরিচালিত করে থাকেন। আর এভাবে আমি তোমাদের বানিয়েছি মধ্যবর্তী বা শ্রেষ্ঠ উম্মত-যাতে করে তোমরা সমগ্র মানব জাতির ব্যাপারে সাক্ষী হতে পার আর রাসূল হবেন তোমাদের সপক্ষে সাক্ষী। আর যে কিবলার উপর আপনি ছিলেন, তা এজন্যেই আমি কিবলারূপে নির্ধারিত করেছিলাম যেন পৃষ্ঠ প্রদর্শনকারীদের মধ্য থেকে রাসূলের প্রকৃত অনুসারীদেরকে আমি (তাদের আনুগত্যের মাধ্যমে) চিনে নিতে পারি।” (২: ১৪২-১৪৩)
অর্থাৎ এটা ছিল নিছক পরীক্ষা যে, কারা রাসূলের অনুসারী আর কারা তাঁর বিরোধী।
وَان كَانَتْ لكَبِيرَةً إِلا عَلَى الَّذِينَ هَدَى اللَّهُ
"এটা অত্যন্ত গুরুত্বের ব্যাপার, তবে তাদের জন্যে নয়, যাদেরকে আল্লাহ্ সঠিক পথে পরিচালিত করেছেন।” (২: ১৪৩) অর্থাৎ যাদেরকে আল্লাহ্ ফিতনা থেকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। অর্থাৎ আল্লাহ্ যাদেরকে অবিচল রেখেছেন।
وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُضِيْعَ إِيْمَانَكُمْ
"আর আল্লাহ্ তোমাদের ঈমানকে বরবাদ করতে পারেন না।"
অর্থাৎ প্রথম কিবলার প্রতি এবং তোমাদের নবীর প্রতি তোমাদের ঈমানকে এবং পরবর্তী কিবলামুখী হওয়ার ব্যাপারে তাঁর প্রতি তোমাদের আনুগত্যকে তিনি বিনষ্ট ও বাতিল করে দেবেন এমন হতে পারে না। অর্থাৎ উভয় কিবলার আনুগত্যের পুরস্কারই তিনি তোমাদের অবশ্যই প্রদান করবেন।
إِنَّ اللَّهَ بِالنَّاسِ لَرَءُوفٌ رَّحِيمٌ
"নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ মানুষের প্রতি অত্যন্ত মমতাময় ও পরম করুণাশীল।" তারপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
قَدْ نَرَى تَقَلُّبَ وَجْهِكَ فِي السَّمَاءِ فَلَنُوَلِّيَنَّكَ قِبْلَةً تَرْضُهَا فَوَلَّ وَجْهَكَ شَطْرَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ وَحَيْثُ مَا كُنْتُمْ فَوَلُّوا وُجُوهَكُمْ شَطْرَه -
"আকাশের দিকে বারবার আপনার মুখ ফিরিয়ে তাকানোটা দেখে থাকি, অতএব তারপর অবশ্যই আমি সেই কিবলার দিকে ফিরিয়ে দেব-যা আপনার পসন্দনীয়। সুতরাং (হে রাসূল!) আপনি মাসজিদুল হারামের দিকে মুখ করুন এবং (হে মু'মিনগণ!) তোমরাও যে যেখানে থাক না কেন, তোমাদের মুখ সেদিকেই ফিরাও!" (২: ১৪৪)
ইবন হিশাম বলেন: শাতর শব্দের অর্থ نحو সেদিকে।
Amr ইবন আহমার আল-বাহিলী আর বাহিলা ছিলেন ইয়াসূর ইবন সা'দ ইব্ন কায়স ইব্ন আয়লান-এর পুত্র। উক্ত Amr ইব্ন আহ্মার তাঁর একটি উষ্ট্রীর প্রশংসা করতে গিয়ে বলেন:
تعدو بنا شطر جمع وهي عاقدة × قد كارب العقد من ايفادها الحقبا
তাঁর কবিতায় ব্যবহৃত এ শাতর শব্দটি এ অর্থেই ব্যবহৃত হয়েছে।
উক্ত পংক্তিতে কবি বলেছেন: "সে (মানে উষ্ট্রীটি) আমাদেরকে নিয়ে মুজদালিফার দিকে দ্রুত চলে যায়। অথচ তার লেজকে সে রেখেছিল সংকুচিত করে। তার সংকুচিত লেজ তখন তার দ্রুতগতির দরুন তার পেটের সাথে হাওদা বাঁধার রশির সাথে জড়িয়ে রয়েছিল। কায়স্ ইব্ন খুওয়ায়লিদ হুযালী তার উষ্ট্রীর বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন:
ان النعوس بها داء مخامرها * فشطرها نظر العينين محسور
"নাউস নাম্নী উষ্ট্রীর শিরায় সংক্রামক রোগ প্রবাহিত। এজন্যে তার দিকে দৃষ্টিপাতে চক্ষুদ্বয়ে ক্লান্তি নেমে আসে-মানে এর পিঠে চড়ে সফরের ভরসা পাওয়া যায় না।"
ইবন হিশাম বলেন: নাউস হচ্ছে তার উষ্ট্রী। তা ছিল রোগাক্রান্ত। সুতরাং তার দিকে কবি ক্লান্ত দৃষ্টিতে তাকান محسور শব্দটি এখানে حسیر অর্থে ব্যবহৃত।
وَإِنَّ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبَ لَيَعْلَمُونَ أَنَّهُ الْحَقُّ مِنْ رَّبِّهِمْ وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا يَعْمَلُونَ
"যাদের কিতাব দেয়া হয়েছে তারা অবশ্যই জ্ঞাত আছে যে, (কিবলা পরিবর্তনের) ব্যাপারটি যথার্থই তাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে নির্ধারিত আর আল্লাহ্ তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে অনবহিত নন।"
وَلَئِنْ آتَيْتَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَبَ بِكُلِّ آيَةٍ مَّا تَبِعُوا قَبْلَتَكَ، وَمَا أَنْتَ بِتَابِعٍ قِبْلَتَهُمْ ۚ وَمَا بَعْضُهُمْ يتابع قِبْلَةَ بَعْضٍ وَلَئِنِ اتَّبَعْتَ أَهْوَاءَهُمْ مِّنْ بَعْدِ مَا جَاءَكَ مِنَ الْعِلْمِ إِنَّكَ إِذًا لَّمِنَ الظَّلِمِينَ
"আপনি যদি কিতাবপ্রাপ্ত সম্প্রদায়ের নিকট সমস্ত নিদর্শনও নিয়ে আসেন, তবুও তারা আপনার কিবলার অনুসরণ করবে না, আর আপনিও (হে রাসূল!) তাদের কিবলার অনুসরণ করবেন না। আর তারাও একে অপরের কিবলার অনুসরণ করবে না। আপনি যদি তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করেন আপনার কাছে জ্ঞান এসে পৌঁছার পরও, তাহলে আপনি নিশ্চিতভাবে যালিমদের অন্তর্ভুক্ত হবেন।” (২ : ১৪৫)
الْحَقُّ مِنْ رَبِّكَ فَلا تَكُونَنَّ مِنَ الْمُمْتَرِيْنَ
" “الْحَقُّ مِنْ رَبِّكَ فَلا تَكُونَنَّ مِنَ الْمُمْتَرِيْنَ সত্য তো তা যা আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে প্রেরিত। সুতরাং (এ ব্যাপারে) আপনি অবশ্যই সংশয়কারীদের অন্তর্ভুক্ত হবেন না।” (২ : ১৪৭)
📄 তাওরাতের সত্য গোপন
বনূ সালামা গোত্রের মু'আয ইবন জাবাল (রা) বনু আবদুল আশহালের সা'দ ইব্ন মু'আয (রা) ও বলোহারিস ইন্ন খাযরাজ গোত্রের খারিজা ইব্ন যায়দ ইয়াহুদী পণ্ডিতদের একটি দলকে তাওরাতে মওজুদ কোন ব্যাপারে প্রশ্ন করলে তারা তা গোপন করে এবং তারা সে সম্পর্কে তথ্য প্রকাশে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে। তখন এ সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা নাযিল করেন:
إِنَّ الَّذِينَ يَكْتِمُونَ مَا أَنْزَلْنَا مِنَ الْبَيِّنَتِ وَالْهُدَى مِنْ بَعْدِ مَا بَيَّنَّهُ لِلنَّاسِ فِي الْكِتُبِ أُولَئِكَ يَلْعَنْهُمُ اللهُ وَيَلْعَنْهُمُ اللَّعْنُونَ .
"আমি যেসব স্পষ্ট নিদর্শন ও হিদায়াত নাযিল করেছি মানুষের জন্যে, কিতাবে তা স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করার পরও যারা গোপন রাখে, আল্লাহ্ তাদের লা'নত দেন এবং লা'নতকারীগণও তাদের লা'নত দেয়।” (২: ১৫৯)
📄 নবী করীম (সা) কর্তৃক ইসলামের দাওয়াত ও ইয়াহুদীদের জবাব
বর্ণনাকারী বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) আহল কিতাব ইয়াহুদীদেরকে ইসলামের দিকে দাওয়াত দেন এবং তাদেরকে এ ব্যাপারে উৎসাহ প্রদান করেন। তিনি তাদেরকে আল্লাহ্ শাস্তি ও গযবের ব্যাপারে সতর্ক করেন। তখন নাফি' ইবন খারিজা এবং মালিক ইব্ন আওফ বলে: হে মুহাম্মদ! বরং আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে যে ধর্ম ও রীতিনীতি অনুসরণ করতে দেখেছি, তারই অনুসরণ করব। কেননা তাঁরা আমাদের তুলনায় অধিকতর বিজ্ঞ এবং উত্তম ছিলেন।
তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাদের উভয়ের বক্তব্যের জবাবে এ আয়াত নাযিল করেন:
وَإِذَا قِيلَ لَهُمُ اتَّبِعُوا مَا أَنْزَلَ اللَّهُ قَالُوا بَلْ تَتَّبِعُ مَا الْفَيْنَا عَلَيْهِ أَبَاءَنَا ، أَوَلَوْ كَانَ أَبَاؤُهُمْ لَا يَعْقِلُونَ شَيْئًا وَلَا يَهْتَدُونَ
"আর যখন তাদের বলা হয় যে, আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ করেছেন তার অনুসরণ কর, তখন তারা বলে, বরং আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে যে রীতি-নীতির অনুসারীরূপে পেয়েছি, তারই অনুসরণ করব-যদিও তাদের পিতৃপুরুষরা কিছুই উপলব্ধি করত না আর তারা সঠিক পথের অনুসারীও ছিল না।” (২: ১৭০)
📄 বনু কায়নুকার বাজারে ইয়াহুদীদের সমাবেশ
বদর যুদ্ধের দিন আল্লাহ্ তা'আলা যখন কুরায়শদের উপর বিপদ অবতীর্ণ করলেন, তখন মদীনায় পদার্পণ করে রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইয়াহুদীদেরকে বনু কায়নুকার বাজারে সমবেত করলেন।
এরপর তিনি তাদের লক্ষ্য করে বলেন: "হে ইয়াহুদী সমাজ! তোমাদের উপর কুরায়שদের মত আল্লাহ বিপদ অবতীর্ণ করার পূর্বেই তোমরা ইসলাম গ্রহণ কর।"
তখন তারা বলল: হে মুহাম্মদ! একদল আনাড়ী কুরায়শকে পরাজিত করেছেন বলে আপনি এ অহমিকায় মত্ত হবেন না যে, সর্বক্ষেত্রেই বুঝি এমনটি ঘটবে। এ আনাড়ীরা যুদ্ধ কি, তা জানত না। আল্লাহর কসম, আমাদের সাথে যদি আপনি যুদ্ধে অবতীর্ণ হন, তখন নিশ্চয়ই আপনি টের পাবেন যে, আমরা কি ধরনের লোক। আর নিশ্চয়ই ইতিপূর্বে আমাদের মত আর কারো সাথে আপনার সাক্ষাৎ হয়নি। তখন তাদের এ মন্তব্য সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা নাযিল করেন:
قُلْ لِلَّذِينَ كَفَرُوا سَتُغْلَبُونَ وَتُحْشَرُونَ إِلى جَهَنَّمَ وَبِئْسَ الْمِهَادُ . قَدْ كَانَ لَكُمْ آيَةٌ فِي فِئَتَيْنِ الْتَقَتَا فِئَةٌ تُقَاتِلُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَأُخْرَى كَافِرَةٌ يَرَوْنَهُمْ مُثْلَيْهِمْ رَأَى الْعَيْنِ وَاللَّهُ يُؤَيِّدُ بِنَصْرِهِ مَنْ يَشَاءُ إِنَّ فِي ذلِكَ لَعِبْرَة لأُولِي الْأَبْصَارِ .
"আর যারা কুফরী করেছে, তাদের বলুন (হে রাসূল!) তোমরা অচিরেই পরাস্ত হবে এবং তোমাদের একত্র করে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে, আর তা কতই না মন্দ অবস্থানস্থল! দুটো যুদ্ধমান দলের মধ্যে তোমাদের জন্যে ছিল নিদর্শন। একদল আল্লাহর রাহে যুদ্ধ করছিল, আর অপর দলটি ছিল কাফির-ওরা তাদেরকে চাক্ষুষভাবে দ্বিগুণ প্রত্যক্ষ করছিল। আল্লাহ্ তাঁর সাহায্য দানে যাকে ইচ্ছা বলীয়ান করেন। নিশ্চয়ই এতে চক্ষুষ্মানদের জন্য রয়েছে শিক্ষণীয় উপদেশ।" (৩: ১২-১৩)