📄 মুহাকামাত ও মুতাশাবিহাত
তখন আবূ ইয়াসির তার ভাই হুয়াই ইব্ন আখতাবকে এবং তার সঙ্গে উপস্থিত ইয়াহূদী পণ্ডিতদেরকে লক্ষ করে বলল:
তোমাদের কি জানা আছে, এমনও তো হতে পারে এ গোটা কালটাই (মানে, সর্বমোট সময়টাই) মুহাম্মদের জন্যে একত্রে দেয়া হয়েছে একাত্তর, একশ' একষট্টি, দুশো একত্রিশ, দুশো একাত্তর সর্বমোট সাত শ' চৌত্রিশ বছর। তখন তারা বলল: তার ব্যাপারটি আমাদের কাছে তালগোল পাকিয়ে গেল। লোকদের ধারণা, নিম্নের আয়াতসমূহ তাদের ব্যাপারেই নাযিল হয়েছে:
منه أيت محكمت هُنَّ أُمُّ الكتب وَآخَرُ مُتَشَبَهت
"এ কুরআনের কতক আয়াত সুস্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন এগুলো কিতাবের মূল অংশ আর অন্যগুলো রূপক।" (৩: ৭)
ইবন ইসহাক বলেন: আমি জ্ঞানীগুণীদের মধ্য থেকে নির্ভরযোগ্য লোককে বলতে শুনেছি যে, এ আয়াতসমূহ নাজরানের ইয়াহুদীদের ব্যাপারে ঐ সময় নাযিল হয়, যখন তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে ঈসা ইবন মারইয়াম (আ)-এর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতে এসেছিল।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট মুহাম্মদ ইব্ন আবু উমামা ইব্ন সাহল ইবন হুনায়ফ বর্ণনা করেছেন যে, তিনি শুনেছেন এ আয়াতগুলো একদল ইয়াহুদী সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। কিন্তু তিনি আমার কাছে এর কোন ব্যাখ্যা দেননি। আল্লাহই ভাল জানেন এর মধ্যে কোন বর্ণনাটি সঠিক।
📄 ইয়াহুদী কর্তৃক রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে অস্বীকার এবং এ সম্পর্কে বা নাযিল হয়
ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে ইব্ন আব্বাসের আযাদকৃত গোলাম ইকরামা (র) বা সাঈদ ইব্ন জুবায়র ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, ইয়াহুদীরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দোহাই দিয়ে তাঁর আবির্ভাবের পূর্বে আওস ও খাযরাজের বিরুদ্ধে বিজয় প্রার্থনা করত। তারপর যখন আল্লাহ্ তা'আলা আরবদের মধ্য থেকে তাঁকে নবীরূপে প্রেরণ করলেন, তখন তারা তাঁকে অস্বীকার করল এবং ইতিপূর্বে তারা তাঁর সম্পর্কে যা বলত, তাও অস্বীকার করল। তখন মু'আয ইবন জাবাল (রা) এবং বনূ সালামার বিশর ইব্ন বারা'আ ইব্ন মা'রূর তাদের লক্ষ্য করে বললেন: হে ইয়াহূদী সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং ইসলাম গ্রহণ কর। ইতিপূর্বে আমরা যখন পৌত্তলিক ছিলাম, তখন তোমরা মুহাম্মদ (সা)-এর দোহাই দিয়ে আমাদের বিরুদ্ধে বিজয় প্রার্থনা করতে এবং তোমরা তখন আমাদের বলতে যে, তাঁর আবির্ভাবের সময় অত্যাসন্ন। তোমরা তাঁর গুণাবলী আমাদের কাছে বর্ণনা করতে। এ কথা শুনে বনূ নযীরের লোক সালাম ইব্ন মিশকাম বলল: সে আমাদের কাছে এমন কোন জিনিস নিয়ে আসোন, যার সাথে আমরা পরিচিত। আর আমরা যার সম্পর্কে তোমাদের কাছে বলতাম, সে এ নয়। তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাদের এ কথার প্রেক্ষিতে নাযিল করেন:
وَلَمَّا جَاءَهُمْ كِتَبٌ مِّنْ عِنْدِ اللهِ مُصَدِّقُ لَّمَا مَعَهُمْ وَكَانُوا مِنْ قَبْلُ يَسْتَفْتِحُونَ عَلَى الَّذِينَ كَفَرُوا فَلَمَّا جَاءَهُمْ مَّا عَرَفُوا كَفَرُوا بِهِ فَلَعْنَةُ اللَّهِ عَلَى الْكُفِرِينَ .
“তাদের নিকট যা আছে আল্লাহ্র নিকট থেকে যখন তার সমর্থক কিতাব এল, যদিও পূর্বে সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের বিরুদ্ধে তারা এর সাহায্যে বিজয় প্রার্থনা করত, তবুও তারা যা জ্ঞাত ছিল তা যখন তাদের নিকট আসল, তখন তারা তা প্রত্যাখ্যান করল। সুতরাং সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের প্রতি আল্লাহর লা'নত।” (২:৮৯)
ইবন ইসহাক বলেন: যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) প্রেরিত হলেন আর তাঁর সম্পর্কে তাদের নিকট থেকে আল্লাহ্ যে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর ব্যাপারে আল্লাহ্ তাদের যে হুকুম দিয়েছিলেন, তা যখন তাদের সামনে উল্লেখ করা হল, তখন মালিক ইব্ন সায়ফ বলল: আল্লাহ্র কসম! মুহাম্মদের ব্যাপারে আমাদের কোন হুকুম দেওয়া হয়নি এবং তাঁর ব্যাপারে আমাদের থেকে কোন অংগীকারও নেওয়া হয়নি। তখন তার ব্যাপারে আল্লাহ্ তা'আলা নাযিল্ করেন:
أَوْ كُلَّمَا عُهَدُوا عَهْدًا نَّبَدَهُ فَرِيقٌ مِّنْهُمْ بَلْ أَكْثَرُهُمْ لَا يُؤْمِنُونَ
"যখনই তারা কোন অঙ্গীকার করেছে, তখন তাদের একদল তা নিক্ষেপ করেছে বরং তাদের অধিকাংশই ঈমান আনে না" (২: ১০০)
আবূ সালুবা ফাতয়ূনী রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে লক্ষ্য করে বলল: হে মুহাম্মদ! আপনি আমাদের কাছে এমন কোন বস্তু নিয়ে আসেননি যা আমাদের জ্ঞাত ছিল, আর না আল্লাহ্ আপনার কাছে এমন কোন নিদর্শন অবতীর্ণ করেছেন যে, আমরা এজন্য আপনার অনুসরণ করব। তখন আল্লাহ্ তার এ মন্তব্যের ব্যাপারে নাযিল করলেন:
وَلَقَدْ أَنْزَلْنَا إِلَيْكَ أَيْتِ لَبَيِّنَتٍ وَمَا يَكْفُرُ بِهَا إِلَّا الْفُسِقُونَ
"এবং নিশ্চয়ই আমি আপনার প্রতি (হে রাসূল) নাযিল করেছি সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলী-আর একমাত্র অনাচারীরা ছাড়া আর কেউ তা প্রত্যাখ্যান করে না।” (২: ৯৯)
রাফি' ইবন হুরায়মালা ওয়াহব ইন্ন যায়দ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে লক্ষ্য করে বলল: হে মুহাম্মদ! আমাদের কাছে এমন কোন কিতাব নিয়ে আসুন যা আসমান থেকে আমাদের কাছে নাযিল হবে আর আমরা দিব্যি তা পড়ব। আর আমাদের জন্যে প্রস্রবণধারা বইয়ে দিন, তাহলেই আমরা আপনার অনুসারী হব এবং আপনাকে সত্য নবী বলে মেনে নেব। তখন তাদের দু'জনের এ বক্তব্য, সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা নাযিল করেন:
📄 ঈমানের বদলে কুফর
اَمْ تُرِيدُونَ أَنْ تَسْتَلُوا رَسُولَكُمْ كَمَا سُئِلَ مُوسَى مِنْ قَبْلُ وَمَنْ يُتَبَدَّلُ الْكُفْرَ بِالْإِيْمَانِ فَقَدْ ضَلَّ سَوَاءَ السَّبِيلِ.
"তোমরা কি তোমাদের রাসূলকে সেরূপ প্রশ্ন করতে চাও যেরূপ ইতিপূর্বে মূসাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল? আর যে কেউ ঈমানের পরিবর্তে কুফরী গ্রহণ করে, সে মধ্যপথ নিশ্চিতভাবেই হারিয়ে ফেলে।" (২: ১০৮)
ইবন হিশাম বলেন: سواء হচ্ছে وسط سبيل বা মধ্যপথ। হাসসান ইব্ন সাবিত নিম্নোক্ত পংক্তিতে এ অর্থেই শব্দটি ব্যবহার করেছেন:
ياويح انصار النبي ورهطه × بعد المسغيبب في سواء الملحد
যথাস্থানে শীঘ্রই এ পংক্তি সম্পর্কে আলোচনা করা হবে ইনশাআল্লাহ্!
📄 ইয়াহুদীদের বিদ্বেষ
আল্লাহ্ তা'আলা যখন তাঁর রাসূল (সা)-কে প্রেরণের মাধ্যমে আরবদেরকে বিশিষ্ট মর্যাদার অধিকারী করলেন, তখন ইয়াহুদীরা বিদ্বেষের অনলে দগ্ধীভূত হতে লাগল। এই বিদ্বেষে সর্বাধিক دগ্ধীভূত হচ্ছিল হুয়াই ইব্ন আখতাব এবং তার ভাই আবূ ইয়াসির ইবন আখতাব। তারা মানুষকে সাধ্যমত ফিরিয়ে রাখার চেষ্টায় নিরন্তর লিপ্ত থাকত। তখন আল্লাহ্ তা'আলা তাদের দু'জনের ব্যাপারে নাযিল করেন:
وَدَّ كَثِيرٌ مِّنْ أَهْلِ الْكِتٰبِ لَوْ يَرُدُّونَكُمْ مِّنْ بَعْدِ إِيْمَانِكُمْ كُفَّارًا حَسَدًا مِّنْ عِنْدِ أَنْفُسِهِمْ مِّنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمُ الْحَقُّ فَاعْفُوا وَاصْفَحُوا حَتَّى يَأْتِيَ اللَّهُ بَأَمْرِهِ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ .
"আহলে কিতাবদের অনেকেই এ আকাঙ্ক্ষা করে যে, যদি তারা তোমাদের ঈমান আনার পর তোমাদেরকে ফিরিয়ে কাফির বানাতে পারত। এটা তাদের পক্ষ থেকে বিদ্বেষের বশে-তাদের কাছে হক প্রকাশিত হয়ে যাবার পর। সুতরাং আপনি তাদেরকে মার্জনা করুন ও উপেক্ষা করুন-যাবৎ না আল্লাহর নির্দেশ আসছে। নিঃসন্দেহে আল্লাহ্ সর্ব বিষয়ে শক্তিমান।” (২: ১০৯)