📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 ইয়াহুদী কর্তৃক সুলায়মান (আ)-এর নবুওয়াত অস্বীকার এবং আল্লাহ্ পক্ষ থেকে তার জবাব

📄 ইয়াহুদী কর্তৃক সুলায়মান (আ)-এর নবুওয়াত অস্বীকার এবং আল্লাহ্ পক্ষ থেকে তার জবাব


ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে যে বর্ণনা পৌঁছেছে, সেমতে তার বিবরণ হচ্ছে এরূপ: রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন প্রেরিত রাসূলদের মধ্যে সুলায়মান (আ)-এর নামও উল্লেখ করলেন, তখন তাদের কোন কোন পণ্ডিত বলল: তোমরা কি মুহাম্মদের কথায় বিস্মিত হও না? তাঁর ধারণা এই যে, সুলায়মান ইব্‌ন দাউদও নবী ছিলেন। আল্লাহর কসম! তিনি তো একজন জাদুকর ছিলেন। তাদের এ কথার জবাবে আল্লাহ্ তা'আলা নাযিল করেন:
وَمَا كَفَرَ سُلَيْمَنُ وَلَكِنَّ الشَّيْطَينَ كَفَرُوا
"সুলায়মান কুফরী করেনি, কিন্তু শয়তানরাই কুফরী করেছিল।" অর্থাৎ জাদুবিদ্যার অনুসরণ ও অনুশীলনের দ্বারা।
وَمَا أُنْزِلَ عَلَى الْمَلَكَيْنِ بِبَابِلَ هَارُوتَ وَمَارُوتَ وَمَا يُعَلِّمُنِ مِنْ أَحَدٍ
“এবং যা বাবিল শহরে দু'জন ফেরেশতা-হারূত ও মারূতের উপর অবতীর্ণ হয়েছিল, তারা কাউকে তা শিক্ষা দিত না।” (২: ১০২)
ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে একজন নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী ইকরামা সূত্রে ইব্‌ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলতেন: ইসরাঈল যা তাঁর নিজের উপর হারাম করেছিলেন, তা হল হৃৎপিণ্ডের দু'টি বাড়তি টুকরো, দুটো যকৃত এবং চর্বি, তবে পিঠের চর্বি বাদ দিয়ে; কেননা তা কুরবানীর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করা হত এবং তা আগুন ভক্ষণ করে নিত।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 খায়বরের ইয়াহুদীদের কাছে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পত্র

📄 খায়বরের ইয়াহুদীদের কাছে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পত্র


ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে এরূপ বর্ণনা করা হয়েছে যে, যায়দ ইব্‌ন সাবিত (রা)-এর পরিবারের আযাদকৃত গোলাম ইকরামা বা সাঈদ ইব্‌ন জুবায়র (র)-এর সূত্রে ইব্‌ন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ (সা) খায়বরের ইয়াহুদীদের কাছে যে চিঠি লিখেছিলেন, তা হল নিম্নরূপ:
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ من محمد رسول الله صلى الله عليه وسلم - صاحب موسى واخيه والمصدق لما جاء به موسى : الا ان الله قد قال لكم يا معشر اهل التوراة ، وانكم لتجدون ذلك في كتابكم مُحَمَّدٌ رَّسُولُ اللهِ وَالَّذِينَ مَعَهُ أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ - تَرَهُمْ رَكْعًا سُجَّدًا يَبْتَغُونَ فَضْلاً مِّنَ اللَّهِ وَرِضْوَانًا سِيمَاهُمْ فِي وُجُوهِهِمْ مِّنْ أَثَرِ السُّجُودِ ذَلِكَ مَثَلُهُمْ فِي التَّوْرَةِ وَمَثَلُهُمْ فِي الْإِنْجِيلِ كَزَرْعٍ أَخْرَجَ شَطْتَهُ فَأَزَرَهُ فَاسْتَغْلَظَ فَاسْتَوَى عَلَى سُوقِهِ يُعْجِبُ الزَّرَاعَ لِيَغِيظَ بِهِمُ الْكُفَّارَ - وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ أمَنُوا وَعَمِلُو الصلحت مِنْهُم مَّغْفِرَةً وَأَجْرًا عَظِيمًا .
রাহমান ও রাহীম আল্লাহর নামে।
"আল্লাহ্র রাসূল মুহাম্মদ (সা)-এর পক্ষ থেকে, যিনি মূসার বন্ধু ও ভাই এবং যিনি মূসার আনীত শরীআতের সমর্থক। হে তাওরাতধারীরা! শোন, আল্লাহ্ তো তোমাদের বলেছেন এবং নিশ্চয়ই তোমরা তা তোমাদের কিতাবে পেয়ে থাক: 'মুহাম্মদ আল্লাহ্র রাসূল; তাঁর সহচরগণ কাফিরদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল; আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় তুমি তাদের রুকূ' ও সিজদায় অবনত দেখবে। তাদের মুখমণ্ডলে সিজদার চিহ্ন থাকবে, তাওরাতে তাদের বর্ণনা এরূপই এবং-ইনজীলেও। তাদের দৃষ্টান্ত একটি চারাগাছ, যা থেকে নির্গত হয় কিশলয়, তারপর এটা শক্ত ও পুষ্ট হয় এবং পরে কাণ্ডের উপর দাঁড়ায় দৃঢ়ভাবে, যা চাষীর জন্য আনন্দদায়ক। এভাবে আল্লাহ্ মুমিনদের সমৃদ্ধি দ্বারা কাফিরদের অন্তর্জ্বালা সৃষ্টি করেন। যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ্ তাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ক্ষমা ও মহাপুরস্কারের।' (৪৮: ২৯)
আমি তোমাদের কসম দিচ্ছি আল্লাহর, কসম দিচ্ছি ঐ বস্তুর-যা আল্লাহ্ তোমাদের উপর নাযিল করেছেন, কসম দিচ্ছি ঐ সত্তার, যিনি তোমাদের পূর্বপুরুষদের মান্না ও সালওয়া খাইয়েছেন, কসম দিচ্ছি ঐ সত্তার, যিনি তোমাদের বাপ-দাদাদের জন্যে সমুদ্রকে শুকিয়ে তাদের নিষ্কৃতি দিয়েছেন ফিরআওন এবং তার অপকর্ম থেকে—তোমরা আমাকে বল দেখি, তোমাদের কাছে আল্লাহর নাযিলকৃত প্রত্যাদেশের মধ্যে তোমরা এ কথা পাও কিনা যে, তোমরা মুহাম্মদের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে। যদি তোমরা একান্তই এ কথা তোমাদের কিতাবে না পাও, তাহলে তোমাদের উপর কোন জোরজবরদস্তি নেই। গুমরাহী থেকে হিদায়াত পৃথক হয়ে গেছে। সুতরাং আমি তোমাদের আল্লাহ্ ও তাঁর নবীর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।"

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আবু ইয়াসির ও তার ভাই সম্পর্কে যা নাযিল হয়

📄 আবু ইয়াসির ও তার ভাই সম্পর্কে যা নাযিল হয়


ইবন ইসহাক বলেন: ইয়াহূদী পণ্ডিত ও তাদের কাফির সঙ্গীদের ব্যাপারে অনেক আয়াত নাযিল হয়েছে। বিশেষত যারা তাঁকে (অর্থাৎ রাসূলুল্লাহকে) নানারূপে প্রশ্ন করত এবং বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলতে প্রয়াস পেত—যাতে তারা হক ও বাতিলের মধ্যে তালগোল পাকাতে পারে।
আমার কাছে আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আব্বাস এবং জাবির ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন রি'আব সূত্রে বর্ণনা করা হয়েছে যে, একদা আবূ ইয়াসির ইব্‌ন আখতাব রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিল। তখন তিনি সূরা বাকারার প্রথম অংশ তিলাওয়াত করছিলেন। الم . ذلك الكتبُ لَا رَيْبَ فِيهِ
"আলিফ, লাম, মীম-এটি সেই কিতাব, যাতে কোন সন্দেহ নেই।" (২: ১-২)। তখন সে তার ভাই হুয়াই ইব্‌ন আখতাবের নিকট কয়েকজন ইয়াহূদীসহ এসে উপস্থিত হল। সে বলল: শোন, আল্লাহ্র কসম! আমি মুহাম্মদকে তাঁর উপর অবতীর্ণ 'আলিফ, লাম, মীম- যালিকাল কিতাব', তিলাওয়াত করতে শুনেছি। তখন তারা জিজ্ঞেস করল: তুমি কি নিজ কানে তা শুনেছ? সে বলল: হ্যাঁ।
তখন হুয়াই ইব্‌ন আখতাব সে ইয়াহূদী দলকে সাথে নিয়েই রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দরবারে উপস্থিত হল। তারা তাঁকে বলল: হে মুহাম্মদ! আমরা জানতে পারলাম, আপনার কাছে নাযিলকৃত আয়াতসমূহের মধ্যে আপনি الهذلك الكتب তিলাওয়াত করে থাকেন।
জবাবে রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: হ্যাঁ। তারা জিজ্ঞেস করল: এটা কি জিবরীল আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনার কাছে নিয়ে এসেছেন?
তিনি বললেন: হ্যাঁ।
তখন তারা বলল: আপনার পূর্বেও আল্লাহ্ অনেক নবী প্রেরণ করেছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে একমাত্র আপনি ছাড়া অন্য কারো কথা আমাদের জানা নেই, যাঁর রাজত্বকালের কথা বা তাঁর উম্মতের মুদ্দতকাল সম্পর্কে তাঁকে অবগত করা হয়েছে।
হুয়াই ইব্‌ন আখতাব তখন তার সঙ্গীদের প্রতি তাকিয়ে বলল: আলিফের মান হচ্ছে এক, লামের মান হচ্ছে ত্রিশ, মীমের মান হচ্ছে চল্লিশ। সর্বমোট একাত্তর বছর হল। তোমরা কি এমন একটি ধর্মে দীক্ষিত হবে, যার রাজত্বকাল এবং উম্মতের টিকে থাকার মুদ্দত হচ্ছে মাত্র একাত্তর বছর? তারপর সে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল: হে মুহাম্মদ! এর সাথে কি আর কিছু আছে?
তিনি বললেন: হ্যাঁ।
সে জিজ্ঞেস করল: তা কি?
তিনি বললেন: المص আলিফ, লাম, মীম, সাদ।
সে বলল: আল্লাহ্র কসম! এটা আরো ভারী ও আরো দীর্ঘ। আলিফে-এক, লামে- ত্রিশ, মীমে- চল্লিশ, সাদে- নব্বই, সর্বমোট একশ' একষট্টি বছর। এর সাথে কি আর কিছু আছে হে মুহাম্মদ?
জবাবে তিনি বললেন: হ্যাঁ। আলিফ-লাম-রা।
সে বলল: আল্লাহ্র কসম! এটা তো আরো ভারী ও আরো দীর্ঘ। আলিফে- এক, লামে-ত্রিশ, রা- এ দুশো, সর্বমোট দুশো একত্রিশ বছর হল।
সে বলল: এর সাথে আরো কিছু আছে?
তিনি বললেন: হ্যাঁ, আলিফ, লাম, মীম, রা।
সে বলল: আল্লাহ্র কসম। এটা তো আরো ভারী, আরো দীর্ঘ। আলিফে- এক, লামে- ত্রিশ, মীমে- চল্লিশ, রা-তে-দুশো। সর্বমোট দুশো একাত্তর বছর।
তখন সে বলল: আপনার ব্যাপারটা আমাদের কাছে তালগোল পাকিয়ে গেল, হে মুহাম্মদ! ফলে আমরা বুঝতেই পারছি না যে, আপনাকে স্বল্প মেয়াদ দেওয়া হল, নাকি দীর্ঘ মেয়াদ। তারপর তারা তাঁর নিকট থেকে চলে গেল।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 মুহাকামাত ও মুতাশাবিহাত

📄 মুহাকামাত ও মুতাশাবিহাত


তখন আবূ ইয়াসির তার ভাই হুয়াই ইব্‌ন আখতাবকে এবং তার সঙ্গে উপস্থিত ইয়াহূদী পণ্ডিতদেরকে লক্ষ করে বলল:
তোমাদের কি জানা আছে, এমনও তো হতে পারে এ গোটা কালটাই (মানে, সর্বমোট সময়টাই) মুহাম্মদের জন্যে একত্রে দেয়া হয়েছে একাত্তর, একশ' একষট্টি, দুশো একত্রিশ, দুশো একাত্তর সর্বমোট সাত শ' চৌত্রিশ বছর। তখন তারা বলল: তার ব্যাপারটি আমাদের কাছে তালগোল পাকিয়ে গেল। লোকদের ধারণা, নিম্নের আয়াতসমূহ তাদের ব্যাপারেই নাযিল হয়েছে:
منه أيت محكمت هُنَّ أُمُّ الكتب وَآخَرُ مُتَشَبَهت
"এ কুরআনের কতক আয়াত সুস্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন এগুলো কিতাবের মূল অংশ আর অন্যগুলো রূপক।" (৩: ৭)
ইবন ইসহাক বলেন: আমি জ্ঞানীগুণীদের মধ্য থেকে নির্ভরযোগ্য লোককে বলতে শুনেছি যে, এ আয়াতসমূহ নাজরানের ইয়াহুদীদের ব্যাপারে ঐ সময় নাযিল হয়, যখন তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে ঈসা ইবন মারইয়াম (আ)-এর ব্যাপারে জিজ্ঞেস করতে এসেছিল।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার নিকট মুহাম্মদ ইব্‌ন আবু উমামা ইব্‌ন সাহল ইবন হুনায়ফ বর্ণনা করেছেন যে, তিনি শুনেছেন এ আয়াতগুলো একদল ইয়াহুদী সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। কিন্তু তিনি আমার কাছে এর কোন ব্যাখ্যা দেননি। আল্লাহই ভাল জানেন এর মধ্যে কোন বর্ণনাটি সঠিক।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00