📄 ইয়াহ্দীদের অঙ্গীকার লংঘন ও নাফরমানী
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।
📄 অঙ্গীকার ভঙ্গ
ইবন ইসহাক বলেন: তারপর আল্লাহ্ তা'আলা তাদের তিরস্কার করে বলেন:
وَاذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَ بَنِي إِسْرَائِيلَ لَا تَعْبُدُونَ الا الله وَبِالْوَالدَيْنِ إِحْسَانًا وَذِي الْقُرْبَى وَالْيَثْمى وَالْمَسْكِينِ وَقُولُوا لِلَّاسِ حُسْنًا وَأَقِيمُوا الصَّلوةَ وَاتُوا الزكوة ثُمَّ تَوَلَّيْتُمْ إِلَّا قَلِيلًا مِّنْكُمْ وَأَنْتُمْ مُعْرِضُونَ .
"স্মরণ কর, যখন আমি ইসরাঈল-সন্তানদের অংগীকার নিয়েছিলাম যে, তোমরা আল্লাহ্ ব্যতীত অন্য কারো ইবাদত করবে না, মাতা-পিতা, আত্মীয়-স্বজন, পিতৃহীন ও দরিদ্রদের প্রতি সদয় ব্যবহার করবে এবং মানুষের সঙ্গে সদালাপ করবে, সালাত কায়েম করবে ও 'যাকাত দেবে, কিন্তু অল্প সংখ্যক লোক ব্যতীত তোমরা বিরুদ্ধ ভাবাপন্ন হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলে।" (২:৮৩)
অর্থাৎ এ সব কাজ তোমরা ছেড়ে দিলে; কিন্তু কোন দোষ-ত্রুটির কারণে তোমরা এ সব পরিত্যাগ করনি; বরং তোমরা এতে অভ্যস্ত।
وَإِذْ أَخَذْنَا مِيثَاقَكُمْ لَا تَسْفِكُونَ دِمَاءَكُمْ
"আর স্মরণ কর, যখন আমি তোমাদের অংগীকার নিয়েছিলাম যে, তোমরা পরস্পরের রক্তপাত করবে না।” (২: ৮৪)
ইবন হিশাম বলেন: تسفكون অর্থ تصبون তোমরা প্রবাহিত কর। আরবরা বলে: سفك دمه - তার রক্ত প্রবাহিত করল। وسفك الزق - মশকের সব পানি প্রবাহিত করল। কবি বলেন:
وَكُنَّا إِذْ أَمَا الضَّيْفُ حَلَّ بِأَرْضِنَا × سَفَكْنَا دِمَاءَ الْبُدْنِ فِي تُرْبَةِ الْحَالِ
"যখন আমাদের যমীনে মেহমানের আগমন ঘটে, তখন আমরা উটের রক্ত প্রবাহিত করে তার আপ্যায়ন করি, যার কারণে ভূমি তখন রক্তাক্ত হয়ে উঠে।"
ইব্ন হিশাম বলেন: حال এখানে সেই মাটির অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে, যার সঙ্গে বালু মিশ্রিত। আরবরা একে السهلة বলে থাকে। হাদীসে আছে:
لَمَّا قَالَ فِرْعَوْنُ : آمَنْتُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا الَّذِي آمَنَتْ بِهِ بَنُو إِسْرَائِيلَ أَخَذَ جِبْرِيلُ مِنْ حَالِ الْبَحْرِ وَحَمَاتِهِ فَضَرَبَ بِهِ وَجْهَ فِرْعَوْنَ .
"যখন ফিরআওন বলল: 'আমি বিশ্বাস করলাম বনী ইসরাঈল যাঁর প্রতি বিশ্বাস করে—তিনি ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ নেই।” (১০: ৯০) তখন জিবরাঈল (আ) সমুদ্রের বালু-মিশ্রিত কাদা তুলে তার মুখের উপর ছুঁড়ে মারলেন।"
حال এখানে الحماة বা কাদার অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
وَلَا تُخْرِجُونَ أَنْفُسَكُمْ مِّنْ دِيَارِكُمْ ثُمَّ أَقْرَرْتُمْ وَأَنْتُمْ تَشْهَدُونَ . : ইব্ন ইসহাক বলেন: "আর তোমরা আপনজনকে স্বদেশ থেকে বের করবে না, এরপর তোমরা এটা স্বীকার করেছিলে, আর এ বিষয়ে তোমরাই সাক্ষী।” (২: ৮৪)
অর্থাৎ তোমরাই এ ব্যাপারে সাক্ষী যে, বস্তুত আমি তোমাদের থেকে এ অঙ্গীকার নিয়েছিলাম:
ثُمَّ أَنْتُمْ هَؤُلَاءِ تَقْتُلُونَ أَنْفُسَكُمْ وَتُخْرِجُونَ فَرِيقًا مِّنْكُمْ مِّنْ دِيَارِهِمْ تَظَاهَرُونَ عَلَيْهِمْ بِالْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
"তোমরাই তারা, যারা এরপর একে অন্যকে হত্যা করছ এবং তোমাদের একদলকে স্বদেশ থেকে বের করছ, তোমরা নিজেরা তাদের বিরুদ্ধে অন্যায় ও সীমালংঘন দ্বারা পরস্পরের পৃষ্ঠপোষকতা করছ।” (২: ৮৫)
অর্থাৎ মুশরিকদের—এমনকি তারা তাদের সাথী হয়ে অপরের রক্ত প্রবাহিত করে এবং তাদের সঙ্গী হয়ে অপরকে দেশছাড়া করে।
وَأَنْ يَأْتُوكُمْ أُسَارَى تُفَادُوهُمْ
"আর তারা যখন বন্দীরূপে তোমাদের নিকট উপস্থিত হয়, তখন তোমরা মুক্তিপণ দাও;"
وَهُوَ مُحَرَّمُ عَلَيْكُمْ إِخْرَاجُهُمْ
"অথচ তাদের বের করে দেওয়াই তোমাদের জন্য হারাম ছিল।”
অর্থাৎ তোমরা জান যে, তোমাদের ধর্ম-বিধান অনুসারে এটা তোমাদের জন্য তোমাদের কিতাবে হারাম ছিল।
📄 মদীনার ইয়াহুদীদের আচরণ
তারা ছিল দু'টি উপদল। একটি ছিল বনূ কায়নুকা। খাযরাজ বংশীয় মিত্ররা তাদের মধ্যেই গণ্য হত। অপর দলটি ছিল বনূ নযীর ও বনু কুরায়যা। আওস গোত্রীয় মিত্ররাও তাদের মধ্যে গণ্য হত। তাই যখন আওস ও খাযরাজ গোত্রের মধ্যে যুদ্ধ বাধত, তখন বনু কায়নুকা খাযরাজের সাথে এবং বনূ নযীর ও বনু কুরায়যা আওসদের সাথী হয়ে যুদ্ধ করত। প্রত্যেক পক্ষ তাদের মিত্রদের পৃষ্ঠপোষকতা করত এবং এতে মিত্রদের খাতিরে স্বজাতীয়দের রক্তপাতেও কুণ্ঠিত হত না। অথচ তাদের হাতে থাকত তাওরাত, যার মাধ্যমে তারা তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে অবহিত হত। আর আওস-খাযরাজরা ছিল পৌত্তলিক অংশীবাদী। তারা মূর্তিপূজা করত। তারা বেহেস্ত দোযখ কী, তা জানত না। পুনরুত্থান ও কিয়ামত সম্পর্কে তাদের কোন জ্ঞান ছিল না। কিতাব কী বস্তু, তা তারা জানত না। হালাল-হারাম সম্বন্ধে তাদের কোন ধারণা ছিল না। যখন যুদ্ধের অবসান হত, তখন তারা তাওরাতের বিধান অনুযায়ী তাদের বন্দীদের মুক্তিপণ দিয়ে মুক্ত করত। তখন তারা একপক্ষের বন্দীদের সাথে অন্যপক্ষের বন্দীদের বিনিময় করত। বনু কায়নুকা আওসের হাতে তাদের বন্দীদের মুক্তিপণ পরিশোধ করত। পক্ষান্তরে বনূ নযীর ও বনু কুরায়যা-খাযরাজের হাতে তাদের বন্দীদের মুক্তিপণ পরিশোধ করত। ইয়াহুদীদের বিরুদ্ধে মুশরিকদের পৃষ্ঠপোষকতা করতে গিয়ে তারা নিজেরা পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হত, একপক্ষ অপর পক্ষের লোককে হত্যা করত এবং তাদের রক্তপণ তারা দাবি করত না। এ ব্যাপারে তাদের সতর্ক করে আল্লাহ্ বলেন:
افَتُؤْمِنُونَ بِبَعْضِ الْكِتٰبِ وَتَكْفُرُونَ بِبَعْضٍ
"তবে কি তোমরা কিতাবের কিছু অংশে বিশ্বাস কর এবং কিছু অংশকে প্রত্যাখ্যা কর?" (২:৮৫)
অর্থাৎ তাওরাতের নির্দেশ অনুসারে তার মুক্তিপণ আদায় কর। আবার তাকে হত্যাও কর? অথচ তাওরাতের বিধান হচ্ছে এরূপ না করার। তোমরা তাকে হত্যা কর এবং তাকে ঘরছাড়া কর; আর পার্থিব লাভের জন্য তার বিরুদ্ধে আল্লাহর সাথে শিরককারীদের এবং তাঁকে ছেড়ে মূর্তির পূজাকারীদের পৃষ্ঠপোষকতা কর?
আমার কাছে যে বর্ণনা পৌঁছেছে, সেমতে আওস ও খাযরাজের ব্যাপারে উপরোক্ত আয়াতসমূহ নাযিল হয়েছে।
📄 নবী-রাসূলগণের বিরোধিতা
তারপর আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَلَقَدْ أَتَيْنَا مُوسَى الْكِتٰبَ وَقَفَّيْنَا مِنْ بَعْدِهِ بِالرُّسُلِ وَأَتَيْنَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ الْبَيِّنَتِ *
"নিশ্চয়ই আমি মূসাকে কিতাব দিয়েছি এবং তার পরে পর্যায়ক্রমে রাসূলদের প্রেরণ করেছি এবং মারইয়াম-তনয় ঈসাকে সুস্পষ্ট প্রমাণ দিয়েছি।” (২:৮৭)
অর্থাৎ ঐ সব প্রমাণ যা তাকে দেওয়া হয়েছিল, যথা মৃতকে জীবিত করা, মাটি দিয়ে পাখি সদৃশ আকৃতি তৈরি করে তারপর তাতে আল্লাহর হুকুমে প্রাণ সঞ্চার করা এবং তা পাখি হয়ে যাওয়া, রোগীদের রোগমুক্ত করা, তারা যা ঘরে সঞ্চয় করে রাখত তার অনেক বস্তু সম্পর্কে খবর দেওয়া, ঈসা (আ)-এর কাছে নতুনভাবে ইনজীল প্রেরণ করা সত্ত্বেও পুনরায় তাদের কাছে তাওরাত প্রেরণ করা। তাদের এসব বিষয় অস্বীকার করার কথা উল্লেখ করে আল্লাহ্ বলেন:
أَفَكُلَّمَا جَاءَكُمْ رَسُولٌ بِمَا لَا تَهْوَى أَنْفُسُكُمُ اسْتَكْبَرْتُمْ فَفَرِيقًا كَذَّبْتُمْ وَفَرِيقًا تَقْتُلُونَ .
"তবে কি যখনই কোন রাসূল এমন কিছু তোমাদের কাছে নিয়ে এসেছে, যা তোমাদের মনঃপূত নয়, তখনই তোমরা অহংকার করেছ, আর কতককে অস্বীকার করেছ এবং কতককে হত্যা করেছ?" (২:৮৭)