📄 বনী ইসরাঈলের বাড়াবাড়ি
أَتَأْمُرُونَ النَّاسِ بِالْبِرِّ وَتَنْسَوْنَ أَنْفُسَكُمْ وَأَنْتُمْ تَتْلُوْنَ الْكَتَبَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ . "তোমরা কি মানুষকে সৎকার্যের নির্দেশ দাও আর নিজেদেরকে বিস্মৃত হও? অথচ তোমরা কিতাব অধ্যয়ন কর! তবে কি তোমরা বুঝ না?" (২:৪৪)
অর্থাৎ তোমাদের কাছে নবুওয়ত ও তাওরাতের যে অঙ্গীকার রয়েছে, তা অগ্রাহ্য করতে তোমরা লোককে বারণ করে থাক। অথচ নিজেদের কথা ভুলে যাও যে, তোমরা নিজেরাই আমার রাসূলকে মান্য করার ব্যাপারে তোমাদের যে অঙ্গীকার আমার সাথে ছিল, তা তোমরা অস্বীকার ও আগ্রাহ্য করে চলেছ। আমার সাথে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করছ এবং তোমরা আমার যে কিতাবের কথা জ্ঞাত আছ, তা-ই অস্বীকার করে চলেছ।
তারপর তাদের নব উদ্ভাবিত ক্রিয়াকাণ্ডের অর্থাৎ তাদের বিদআতসমূহের কথা একে একে বর্ণনা করেন। তাদের গো-বৎস এবং এ ব্যাপারে কৃত ক্রিয়াকাণ্ড, আল্লাহ্ কর্তৃক তাদের তওবা কবূলের কথা, তারপর তাঁর তাদের প্রতি ক্রুদ্ধ হওয়ার কথা এবং তাদের উক্তি:
آرنَا اللهُ جَهْرَةً "(হে মূসা!) আমাদেরকে খোলাখুলিভাবে আল্লাহকে দেখিয়ে দিন।"-এর কথা তাদের স্মরণ করিয়ে দেন।
ইব্ন হিশাম বলেন: جهرة অর্থ ظاهرا প্রকাশ্যভাবে, কোন বস্তু যেন তাঁকে আমাদের থেকে আড়াল করে না রাখে এমনভাবে।
কবি আবুল আখযার হামানী-যার আসল নাম কুতায়বা- তিনি বলেছেন: يجهر اجواف المياه الشدم
কবি তাঁর বীররসমূলক কবিতায় এ পংক্তিতে يجهر শব্দটি ব্যবহার করে বলেছেন: সুদাম নামক জলাশয়টি তার পানির অভ্যন্তরের সবকিছু দর্শকদের সামনে প্রকাশ করে দেয়।
ইবন ইসহাক বলেন: তারপর আল্লাহ্ তা'আলা তাদের গাফলতির দরুন বজ্রাহত হওয়ার কথা, মৃত্যুর পর তাদের জীবিত করার কথা, তাদের মেঘমালা দিয়ে ছায়া দেওয়ার কথা এবং তাদের জন্যে মান্না ও সালওয়া অবতীর্ণ করার কথা বর্ণনা করেন। আর তাদের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ "তোমরা অবনত মস্তকে 'ক্ষমা চাই' বলে দ্বার দিয়ে প্রবেশ কর"- অর্থাৎ আমি যা তোমাদের বলতে বলি, তা বল। তবে আমি তোমাদের গুনাহরাশি মাফ করে দেব।
তারপর আল্লাহ্ এ কথার উল্লেখ করেন যে, তারা এ কথাটি বদলে দেয় এবং আল্লাহর আদেশ নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করে। ফলে তাদের উপর আল্লাহর গযব পতিত হয়।
ইব্ন হিশাম বলেন: মান্না হচ্ছে এমন এক বস্তু, যা ভোররাতে তাদের গাছপালার উপর পতিত হত। তারা তা গাছের পাতা থেকে কুড়িয়ে নিত এবং তা মধুর মতো মিষ্ট হত। তারা তা পান ও আহার করত।
বনূ কায়স ইব্ন সা'লাবার কবি আ'শা বলেন: لو أطعموا الْمَنَّ وَالسَّلوَى مَكَانَهُمْ * مَا أَبْصَرَ النَّاسُ طَعْمًا فِيهِمْ نَجْعًا "লোকে যদি আপন ঘরে বসে মান্না ও সালাওয়াও আহার্যরূপে পেয়ে যায়, তবুও তারা এমন আহারকে তাদের জন্যে উপাদেয় বলে ভাববে না।"
এ পংক্তিটি তাঁর একটি দীর্ঘ কবিতার অংশবিশেষ।
سلوی (সালওয়া) হচ্ছে এক প্রকার পাখি। তার একবচন سلواة ; কেউ কেউ মধুকেও সালওয়া বলে বলে অভিহিত করেছেন। যেমন খালিদ ইব্ন যুহায়র হুযালী বলেছেন:
وَقَاسَمَهُمَا بِاللَّهِ حَقًّا لَأَنْتُمْ × الَّذِيْنَ السَّلْوَى إِذَا مَا نَشَوْرُهَا
"সে তাদের সামনে আল্লাহর নামে এ মর্মে কসম খেল যে, তোমরা হচ্ছ মধুর চাইতেও সুস্বাদু—যখন আমরা তা (মৌচাক থেকে) বের করি।" এ পংক্তিটি তাঁর একটি দীর্ঘ কবিতার অংশ। এবং حطة শব্দটির অর্থ হচ্ছে- আমাদের পাপ ক্ষমা করে দিন।
ইবন ইসহাক বলেন: তাদের এ.শব্দটি পরিবর্তন সম্পর্কে সালিহ ইব্ন কায়সান আমার কাছে বর্ণনা করেছেন, তাওমাআ বিন্ত উমাইয়া ইব্ন খালফের আযাদকৃত গোলাম সালিহ থেকে, তিনি আবু হুরায়রা (রা) থেকে এবং এমন এক ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন যাকে আমি মিথ্যাবাদী বলে ধারণা করি না, তিনি ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে, তাঁরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন: তারা যে দরজা দিয়ে প্রবেশের জন্যে আদিষ্ট হয়েছিল, সে দরজা দিয়েই অবনত মস্তকে, হামাগুড়ি দিয়ে প্রবেশ করে; আর মুখে বলে : حنط في شعير অর্থাৎ "যবের মধ্যে গম।"
ইন হিশাম বলেন: কেউ কেউ শব্দ দু'টিকে حنطة في شعيرة বলেও উল্লেখ করেছেন। ইবন ইসহাক বলেন: মূসা (আ) তাঁর সম্প্রদায়ের জন্য পানি চাইলেন। তখন আল্লাহ্ তাঁকে তাঁর লাঠি দিয়ে পাথরে আঘাত করার নির্দেশ দিলেন। আর তাদের জন্যে তা থেকে বারটি প্রস্রবণ প্রবাহিত হল। প্রত্যেকটি গোত্রের জন্য একটি করে প্রস্রবণ, তারা তাথেকে পানিপান করত। প্রত্যেক গোত্র তাদের নিজ নিজ প্রস্রবণ চিনে নেয়, যা থেকে তারা পানি পান করত।
📄 উত্তম রিস্কের পরিবর্তে নিকৃষ্ট বস্তুর প্রার্থনা
তারপর মূসার কাছে তাদের এরূপ দাবি তোলার কথা উল্লেখ করেন, যাতে তারা বলে:
لَن نَّصْبِرَ عَلَى طَعَامٍ وَاحِدٍ فَادْعُ لَنَا رَبَّكَ يُخْرِجْ لَنَا مِمَّا تُنْبِتُ الْأَرْضُ مِنْ بَعْلِهَا وَقِثَّائِهَا وَفُوْمِهَا وَعَدَسَهَا وَبَصَلِهَا *
"আমরা একই রকম খাদ্যে কখনও ধৈর্য ধারণ করব না, সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট আমাদের জন্যে প্রার্থনা কর—যেন তিনি ভূমিজাত দ্রব্য—শাকসব্জি, কাঁকুড়, গম, মসুর ও পেঁয়াজ আমাদের জন্য উৎপাদন করেন।"
قَالَ أَتَسْتَبْدِلُونَ الَّذِي هُوَ أَدْنَى بِالَّذِي هُوَ خَيْرٌ اهْبِطُوا مِصْرًا فَإِنَّ لَكُمْ مَّا سَأَلْتُمْ
"মূসা বলল: তোমরা কি উৎকৃষ্টতর বস্তুকে নিকৃষ্ট বস্তুর সাথে বদল করতে চাও? তবে কোন নগরে অবতরণ কর। তোমরা যা চাও তা সেখানে আছে।” (২: ৬১) ইবন ইসহাক বলেন: তারা কিন্তু তা করেনি। অর্থাৎ তারা কোন শহরেই যায়নি।
📄 পাথর থেকেও কঠিন
তারপর তারা যাতে তাঁর প্রদত্ত দায়িত্ব গ্রহণ করে, তার জন্য তাদের উপরে তুর পাহাড়কে উত্তোলন ও তাদের চেহারা বিকৃতির কথা বর্ণনা করেন। আর তাদের কিছু সংখ্যককে বানর বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তারপর সে গাভীর কথা বর্ণনা করেন, যা দিয়ে জনৈক নিহত ব্যক্তির ব্যাপারে তাদের মতানৈক্যকালে আল্লাহ্ তাদেরকে নিদর্শন দেখান এবং শেষ পর্যন্ত গাভীর হাকীকত সম্পর্কে মূসাকে তাদের অনেক জিজ্ঞাসাবাদের পর তাদের সামনে আল্লাহ্ প্রকৃত ব্যাপারটি প্রকাশ করে দেন।
তারপর আল্লাহ্ তাদের হৃদয় কঠিন হওয়া সম্পর্কে বলেন যে, حَتَّى كَانَتْ كَالْحِجَارَةِ أَوْ أَشَدُّ قَسْوَةٌ -তা পাথরের মত কিংবা তার চাইতেও অধিক কঠিন হয়ে গেছে।
আল্লাহ্ তা'আলা বলেন:
وَإِنَّ مِنَ الْحِجَارَةِ لَمَا يَتَفَجَّرُ مِنْهُ الْأَنْهُرُ وَإِنَّ مِنْهَا لَمَا يَسْقُ فَيَخْرُجُ مِنْهُ الْمَاءُ وَإِنَّ مِنْهَا لَمَا يَهْبِطُ مِنْ خَشْيَةِ اللَّهِ *
"আর পাথরও কতক এমন যে তা থেকে নদী-নালা প্রবাহিত হয় এবং কতক এরূপ যে, বিদীর্ণ হওয়ার পর তা থেকে পানি নির্গত হয়, আবার কতক এমন, যা আল্লাহর ভয়ে ধসে পড়ে।"
অর্থাৎ পাথরের মধ্যে কতক এমনও আছে, যা তোমাদের ঐ অন্তরসমূহ থেকে নরম, যাকে হকের দিকে দাওয়াত দেওয়া হয়, কিন্তু তা কবুল করে না।
وَمَا اللَّهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُونَ ...
"তোমরা যা কর, আল্লাহ্ সে সে সম্পর্কে অনবহিত নন।" (২: ৭৪)
📄 আল্লাহ্র কিতাবে বিকৃতি সাধন
তারপর মুহাম্মদ (সা) এবং তাঁর বিশ্বাসী সাহাবীগণকে ওদের সম্পর্কে নিরাশ করে দিয়ে আল্লাহ্ বলেন:
أَفَتَطْمَعُونَ أَنْ يُؤْمِنُوا لَكُمْ وَقَدْ كَانَ فَرِيقٌ مِّنْهُمْ يَسْمَعُونَ كَلَّمَ اللَّهِ ثُمَّ يُحَرِّفُونَهُ مِنْ بَعْدِ مَا عَقَلُوهُ وَهُمْ يَعْلَمُونَ
"তোমরা কি এ আশা কর যে, তারা তোমাদের কথায় ঈমান আনবে? যখন তাদের একদল আল্লাহ্র বাণী শুনত ও বোঝার পর জেনেশুনে তা বিকৃত করত।” (২: ৭৫)
আল্লাহর কালামের এ অর্থ এ নয় যে, তাদের সকলে আল্লাহর কালাম তাওরাত শুনত। বরং অর্থ এই যে, তাদের এক বিশেষ দল তা শুনত।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছ কোন কোন জ্ঞানী ব্যক্তি থেকে এ কথাটি পৌঁছেছে যে, তারা মূসা (আ)-কে বলল: হে মুসা! আমাদের এবং আল্লাহর দীদারের মধ্যে অন্তরায় সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে। যখন তিনি তোমার সাথে কথাবার্তা বলেন, তখন আমাদের সে কথাগুলো শুনিয়ে দেবে। তখন মূসা (আ) তাঁর রবের নিকট সে মর্মে ফরিয়াদ করলেন। তখন আল্লাহ্ মুসাকে বললেন: আচ্ছা, তাদেরকে তাদের দেহের ও বস্ত্রের পবিত্রতা অর্জন করতে এবং রোযা রাখতে বলে দাও! তারা তা-ই করল। তারপর মূসা (আ) তাদের নিয়ে ঘর থেকে বের হলেন। যখন তারা তুরে গিয়ে উপনীত হল, তখন মেঘমালা তাদের ঢেকে ফেলল। মূসা (আ)-এর আদেশক্রমে তারা তখন সিজদায় পড়ল। আল্লাহ্ তখন মূসার সাথে কথা বলল এবং তারা তা শুনতেও পেল। আল্লাহ্ তাদেরকে আদেশ-নিষেধ শুনালেন, তারা তা শুনল এবং উপলব্ধিও করল। মূসা (আ) তাদেরকে নিয়ে বনী ইসরাঈলদের মধ্যে ফিরে গেলেন। যখন তারা তাদের নিকট আসল, তখন তাদের একদল আল্লাহ্ তাদেরকে যে আদেশ দিয়েছিলেন তা বিকৃত করে ফেলল। যখন মূসা তাদের বললেন যে, আল্লাহ্ তোমাদেরকে অমুক অমুক আদেশ দিয়েছেন, তখন ঐ বিকৃতিকারী দল বলতে লাগল : না, আল্লাহ্ এরূপ বলেছেন। একথা বলে তারা আল্লাহ্ যা বলেছিলেন, তার বিপরীত কথা শোনাল। উপরোক্ত আয়াতে আল্লাহ্ তা'আলা এর প্রতিই ইঙ্গিত করেছেন।