📄 কুরআনের চ্যালেঞ্জ
وَإِنْ كُنْتُمْ فِي رَيْبٍ مِّمَّا نَزَّلْنَا عَلَى عَبْدِنَا "আমি আমার বান্দার প্রতি যা নাযিল করেছি, তাতে তোমাদের সন্দেহ থাকলে।"
অর্থাৎ তিনি যা তোমাদের কাছে নিয়ে এসেছেন, এতে যদি তোমাদের কোন সন্দেহ থাকে।
فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِّنْ مِثْلِهِ وَادْعُوا شُهَدَاءَكُمْ مِّنْ دُونِ اللَّهِ إِنْ كُنْتُمْ صُدِقِينَ
"তোমরা তার অনুরূপ কোন সূরা নিয়ে এস এবং তোমরা যদি সত্যবাদী হও, তবে আল্লাহ্ ব্যতীত তোমাদের সকল সাহায্যকারীকে আহ্বান কর।" অর্থাৎ তোমাদের অবস্থানের সপক্ষে যারা সাহায্যকারীরূপে আছে, সাধ্যমত তাদেরকেও (সাহায্যার্থে) আহবান জানাও।
فَإِنْ لَّمْ تَفْعَلُوا وَلَنْ تَفْعَلُوا
"যদি তোমরা তা করতে না পার, আর কখনো তা করতে পারবে না"- তাহলে সত্য তোমাদের সম্মুখে দিবালোকের মত সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
فَاتَّقُوا النَّارَ الَّتِي وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ أُعِدَّتْ لِلْكُفِرِينَ .
"তবে সে আগুনকে ভয় কর, মানুষ ও পাথর হবে যার ইন্ধন, কাফিরদের জন্যে যা প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে।” (২: ২৪-২৫) অর্থাৎ ঐ লোকদের জন্যে, যারা তোমাদের মত কুফরীর উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছে।
📄 বনী ইসরাঈলের বর্ণনা
তারপর আল্লাহ্ তাদের উৎসাহ দেন এবং তাদের নিকট থেকে নবী করীম (সা)-এর ব্যাপারে যে অঙ্গীকার গ্রহণ করেছিলেন যে, তিনি তাদের কাছে আসলে তাঁকে গ্রহণ করতে হবে, সে অঙ্গীকার ভঙ্গের পরিণাম সম্পর্কে তাদেরকে সতর্ক করেন এবং তাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেন তাদের সৃষ্টির প্রথম সময়ের কথা এবং তাদের আদি পিতা আদম (আ)-এর অবস্থার কথা। তারপর তারা যখন তাঁর আনুগত্যের বিরোধিতা করেছিল, তখন আল্লাহ্ তাদের সাথে কী আচরণ করেছিলেন- সে কথা। তারপর বলেন:
يبني اسرائيل .
"হে বনী ইসরাঈল !" ইয়াহুদী পণ্ডিত ও ধর্মনেতাদের প্রতি সম্বোধন।
اذكروا نعمتي التي أنعمت عليكم
"আমার সে অনুগ্রহকে তোমরা স্মরণ কর, যা দিয়ে আমি তোমাদের অনুগৃহীত করেছি।" অর্থাৎ আমার পরীক্ষা স্বরূপ তোমাদের এবং তোমাদের বাপ-দাদাদের নিকট-যখন আল্লাহ তাদেরকে ফিরাউন ও তার সম্প্রদায়ের কবল থেকে নিষ্কৃতি প্রদান করেছিলেন।
وأوفوا بعهدي
"এবং আমার সঙ্গে তোমাদের অঙ্গীকার পূরণ কর", যা আমি তোমাদের যিম্মায় রেখেছিলাম পূরণ করার জন্য, যখন আমার নবী আহমদ তোমাদের নিকট আসবেন।
أُوفَ بِعَهْدِكُمْ "আমিও তোমাদের সংগে আমার অঙ্গীকার পূরণ করব।"
অর্থাৎ তাঁকে সত্যরূপে গ্রহণ ও তাঁর আনুগত্যের বিনিময়ে তোমাদের ঘাড়ের বোঝা এবং তোমাদের শৃঙ্খলরাশি-যা তোমাদের অপরাধের কারণে তোমাদের উপর চেপেছিল, তা থেকে তোমাদের মুক্ত করব।
وَإِيَّايَ فَارْهَبُونِ "এবং তোমরা শুধু আমাকেই ভয় কর।" যাতে সে সমস্ত শাস্তি ও গযব তোমাদের উপর অবতীর্ণ না হয়, যা ইতিপূর্বে তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর চেহারা বিকৃতি ইত্যাদি আকারে নাযিল হয়েছিল।
وَآمِنُوا بِمَا أَنْزَلْتُ مُصَدِّقًا لَمَا مَعَكُمْ وَلَا تَكُونُوا أَوَّلَ كَافِرِ بِهِ "আমি যা অবতীর্ণ করেছি তাতে ঈমান আন, এটি তোমাদের কাছে যা আছে তার প্রত্যয়নকারী, আর তোমরাই তার প্রথম প্রত্যাখ্যানকারী হয়ো না।"
অথচ তোমাদের কাছে রয়েছে সেই জ্ঞান, যা তোমাদের ছাড়া অন্য কারো কাছে নেই।
وَإِيَّايَ فَاتَّقُونِ - وَلَا تَلْبِسُوا الحَقِّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُوا الْحَقَّ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ "এবং তোমরা শুধু আমাকেই ভয় কর। আর তোমরা সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করো না এবং জেনে শুনে সত্য গোপন করো না।" (২: ৪০-৪২)।
অর্থাৎ আমার রাসূল সম্পর্কে এবং তাঁর আনীত শরীআত সম্পর্কে তোমাদের কাছে যে জ্ঞান রয়েছে, তা তোমরা গোপন করো না এবং তোমাদের কাছে যে কিতাব রয়েছে, তাতেও তাঁর অবস্থার বর্ণনা রয়েছে।
📄 বনী ইসরাঈলের বাড়াবাড়ি
أَتَأْمُرُونَ النَّاسِ بِالْبِرِّ وَتَنْسَوْنَ أَنْفُسَكُمْ وَأَنْتُمْ تَتْلُوْنَ الْكَتَبَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ . "তোমরা কি মানুষকে সৎকার্যের নির্দেশ দাও আর নিজেদেরকে বিস্মৃত হও? অথচ তোমরা কিতাব অধ্যয়ন কর! তবে কি তোমরা বুঝ না?" (২:৪৪)
অর্থাৎ তোমাদের কাছে নবুওয়ত ও তাওরাতের যে অঙ্গীকার রয়েছে, তা অগ্রাহ্য করতে তোমরা লোককে বারণ করে থাক। অথচ নিজেদের কথা ভুলে যাও যে, তোমরা নিজেরাই আমার রাসূলকে মান্য করার ব্যাপারে তোমাদের যে অঙ্গীকার আমার সাথে ছিল, তা তোমরা অস্বীকার ও আগ্রাহ্য করে চলেছ। আমার সাথে কৃত অঙ্গীকার ভঙ্গ করছ এবং তোমরা আমার যে কিতাবের কথা জ্ঞাত আছ, তা-ই অস্বীকার করে চলেছ।
তারপর তাদের নব উদ্ভাবিত ক্রিয়াকাণ্ডের অর্থাৎ তাদের বিদআতসমূহের কথা একে একে বর্ণনা করেন। তাদের গো-বৎস এবং এ ব্যাপারে কৃত ক্রিয়াকাণ্ড, আল্লাহ্ কর্তৃক তাদের তওবা কবূলের কথা, তারপর তাঁর তাদের প্রতি ক্রুদ্ধ হওয়ার কথা এবং তাদের উক্তি:
آرنَا اللهُ جَهْرَةً "(হে মূসা!) আমাদেরকে খোলাখুলিভাবে আল্লাহকে দেখিয়ে দিন।"-এর কথা তাদের স্মরণ করিয়ে দেন।
ইব্ন হিশাম বলেন: جهرة অর্থ ظاهرا প্রকাশ্যভাবে, কোন বস্তু যেন তাঁকে আমাদের থেকে আড়াল করে না রাখে এমনভাবে।
কবি আবুল আখযার হামানী-যার আসল নাম কুতায়বা- তিনি বলেছেন: يجهر اجواف المياه الشدم
কবি তাঁর বীররসমূলক কবিতায় এ পংক্তিতে يجهر শব্দটি ব্যবহার করে বলেছেন: সুদাম নামক জলাশয়টি তার পানির অভ্যন্তরের সবকিছু দর্শকদের সামনে প্রকাশ করে দেয়।
ইবন ইসহাক বলেন: তারপর আল্লাহ্ তা'আলা তাদের গাফলতির দরুন বজ্রাহত হওয়ার কথা, মৃত্যুর পর তাদের জীবিত করার কথা, তাদের মেঘমালা দিয়ে ছায়া দেওয়ার কথা এবং তাদের জন্যে মান্না ও সালওয়া অবতীর্ণ করার কথা বর্ণনা করেন। আর তাদের প্রতি আল্লাহর নির্দেশ "তোমরা অবনত মস্তকে 'ক্ষমা চাই' বলে দ্বার দিয়ে প্রবেশ কর"- অর্থাৎ আমি যা তোমাদের বলতে বলি, তা বল। তবে আমি তোমাদের গুনাহরাশি মাফ করে দেব।
তারপর আল্লাহ্ এ কথার উল্লেখ করেন যে, তারা এ কথাটি বদলে দেয় এবং আল্লাহর আদেশ নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করে। ফলে তাদের উপর আল্লাহর গযব পতিত হয়।
ইব্ন হিশাম বলেন: মান্না হচ্ছে এমন এক বস্তু, যা ভোররাতে তাদের গাছপালার উপর পতিত হত। তারা তা গাছের পাতা থেকে কুড়িয়ে নিত এবং তা মধুর মতো মিষ্ট হত। তারা তা পান ও আহার করত।
বনূ কায়স ইব্ন সা'লাবার কবি আ'শা বলেন: لو أطعموا الْمَنَّ وَالسَّلوَى مَكَانَهُمْ * مَا أَبْصَرَ النَّاسُ طَعْمًا فِيهِمْ نَجْعًا "লোকে যদি আপন ঘরে বসে মান্না ও সালাওয়াও আহার্যরূপে পেয়ে যায়, তবুও তারা এমন আহারকে তাদের জন্যে উপাদেয় বলে ভাববে না।"
এ পংক্তিটি তাঁর একটি দীর্ঘ কবিতার অংশবিশেষ।
سلوی (সালওয়া) হচ্ছে এক প্রকার পাখি। তার একবচন سلواة ; কেউ কেউ মধুকেও সালওয়া বলে বলে অভিহিত করেছেন। যেমন খালিদ ইব্ন যুহায়র হুযালী বলেছেন:
وَقَاسَمَهُمَا بِاللَّهِ حَقًّا لَأَنْتُمْ × الَّذِيْنَ السَّلْوَى إِذَا مَا نَشَوْرُهَا
"সে তাদের সামনে আল্লাহর নামে এ মর্মে কসম খেল যে, তোমরা হচ্ছ মধুর চাইতেও সুস্বাদু—যখন আমরা তা (মৌচাক থেকে) বের করি।" এ পংক্তিটি তাঁর একটি দীর্ঘ কবিতার অংশ। এবং حطة শব্দটির অর্থ হচ্ছে- আমাদের পাপ ক্ষমা করে দিন।
ইবন ইসহাক বলেন: তাদের এ.শব্দটি পরিবর্তন সম্পর্কে সালিহ ইব্ন কায়সান আমার কাছে বর্ণনা করেছেন, তাওমাআ বিন্ত উমাইয়া ইব্ন খালফের আযাদকৃত গোলাম সালিহ থেকে, তিনি আবু হুরায়রা (রা) থেকে এবং এমন এক ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন যাকে আমি মিথ্যাবাদী বলে ধারণা করি না, তিনি ইব্ন আব্বাস (রা) থেকে, তাঁরা রাসূলুল্লাহ্ (সা) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন: তারা যে দরজা দিয়ে প্রবেশের জন্যে আদিষ্ট হয়েছিল, সে দরজা দিয়েই অবনত মস্তকে, হামাগুড়ি দিয়ে প্রবেশ করে; আর মুখে বলে : حنط في شعير অর্থাৎ "যবের মধ্যে গম।"
ইন হিশাম বলেন: কেউ কেউ শব্দ দু'টিকে حنطة في شعيرة বলেও উল্লেখ করেছেন। ইবন ইসহাক বলেন: মূসা (আ) তাঁর সম্প্রদায়ের জন্য পানি চাইলেন। তখন আল্লাহ্ তাঁকে তাঁর লাঠি দিয়ে পাথরে আঘাত করার নির্দেশ দিলেন। আর তাদের জন্যে তা থেকে বারটি প্রস্রবণ প্রবাহিত হল। প্রত্যেকটি গোত্রের জন্য একটি করে প্রস্রবণ, তারা তাথেকে পানিপান করত। প্রত্যেক গোত্র তাদের নিজ নিজ প্রস্রবণ চিনে নেয়, যা থেকে তারা পানি পান করত।
📄 উত্তম রিস্কের পরিবর্তে নিকৃষ্ট বস্তুর প্রার্থনা
তারপর মূসার কাছে তাদের এরূপ দাবি তোলার কথা উল্লেখ করেন, যাতে তারা বলে:
لَن نَّصْبِرَ عَلَى طَعَامٍ وَاحِدٍ فَادْعُ لَنَا رَبَّكَ يُخْرِجْ لَنَا مِمَّا تُنْبِتُ الْأَرْضُ مِنْ بَعْلِهَا وَقِثَّائِهَا وَفُوْمِهَا وَعَدَسَهَا وَبَصَلِهَا *
"আমরা একই রকম খাদ্যে কখনও ধৈর্য ধারণ করব না, সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের নিকট আমাদের জন্যে প্রার্থনা কর—যেন তিনি ভূমিজাত দ্রব্য—শাকসব্জি, কাঁকুড়, গম, মসুর ও পেঁয়াজ আমাদের জন্য উৎপাদন করেন।"
قَالَ أَتَسْتَبْدِلُونَ الَّذِي هُوَ أَدْنَى بِالَّذِي هُوَ خَيْرٌ اهْبِطُوا مِصْرًا فَإِنَّ لَكُمْ مَّا سَأَلْتُمْ
"মূসা বলল: তোমরা কি উৎকৃষ্টতর বস্তুকে নিকৃষ্ট বস্তুর সাথে বদল করতে চাও? তবে কোন নগরে অবতরণ কর। তোমরা যা চাও তা সেখানে আছে।” (২: ৬১) ইবন ইসহাক বলেন: তারা কিন্তু তা করেনি। অর্থাৎ তারা কোন শহরেই যায়নি।