📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 বনূ নাজ্জারের

📄 বনূ নাজ্জারের


সালসালা ইব্‌ন বারহাম। এরাই হচ্ছে সেই ইয়াহুদী পণ্ডিত ও ধর্মযাজক-যারা রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও তাঁর সাহাবীদের অনিষ্ট সাধন ও তাঁদের সাথে শত্রুতামূলক তৎপরতায় লিপ্ত ছিল। এরাই যতসব বিব্রতকর প্রশ্ন করত এবং নিজেদের অনিষ্টকর তৎপরতার মাধ্যমে ইসলামের প্রজ্বলিত প্রদীপ শিখাকে নিভিয়ে দেয়ার অপচেষ্টায় লিপ্ত ছিল। আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন সালাম এবং মুখায়রিক অবশ্য নিজেদেরকে ব্যক্তিক্রম বলে প্রমাণিত করেন।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আবদুল্লাহ ইবন সালামের ইসলাম গ্রহণ

📄 আবদুল্লাহ ইবন সালামের ইসলাম গ্রহণ


ইবন ইসহাক বলেন: আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন সালামের কথা আর তাঁর ইসলাম গ্রহণের ঘটনাবলী তাঁরই পরিবারের এক ব্যক্তি আমার কাছে বর্ণনা করেছেন, তা এরূপ : তিনি ছিলেন একজন বড় বিদ্বান ও পণ্ডিত ব্যক্তি। তিনি বলেন: যখন আমি রাসুলুল্লাহ্ (সা)-এর কথা শুনলাম, তখন তাঁর নাম, গুণাবলী এবং সন্ধিক্ষণ দ্বারা তাঁকে চিনতে পারলাম যে, তিনিই সেই মহাপুরুষ যাঁর প্রতীক্ষায় আমরা ছিলাম, আমি ব্যাপারটিকে গোপন রাখি এবং এ ব্যাপারে একেবারে নীরব থাকি যাবৎ না তিনি মদীনায় পদার্পণ করেন। তারপর যখন তিনি কুবায় এসে অবতরণ করলেন এবং বনূ Amr ইব্‌ন আওফের পল্লীতে উঠলেন, তখন একব্যক্তি এসে আমাকে তাঁর আগমনের সংবাদ দিল। আমি তখন আমার একটি খেজুর গাছের শীর্ষে কাজ করছিলাম। আমার ফুফু খালিদা বিন্ত হারিস নিচেই বসা ছিলেন। যখন আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আগমন সংবাদ শুনতে পেলাম, তখন আমি সজোরে তাকবীর ধ্বনি দিয়ে উঠলাম। তখন আমার ফুফু আমার তাকবীর ধ্বনি শুনে বলে উঠলেন: আল্লাহ তোমাকে ব্যর্থকাম করুন। আল্লাহ্র কসম, যদি তুমি (আমাদের নবী) মূসা ইব্‌ন ইমরানের আগমন সংবাদও শুনতে, তা হলে এর চাইতে বেশি কিছু করতে না।
তিনি বলেন, আমি তখন জবাবে বললাম: ফুফুআম্মা, আল্লাহ্র কসম, তিনি হচ্ছেন মূসারই ভাই। তিনি তাঁরই ধর্মের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং তিনি যে বস্তু নিয়ে প্রেরিত হয়েছিলেন, ইনিও ঠিক সেই বস্তু নিয়েই প্রেরিত হয়েছেন।
তখন তিনি বললেন: হে আমার ভাইপো! ইনি কি সেই নবী, যাঁর সম্পর্কে আমাদেরকে সুসমাচার শুনানো হত যে, কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে তিনি প্রেরিত হবেন?
তিনি বলেন: আমি তখন তাঁর জবাবে বললাম : হ্যাঁ। তিনি বলেন : এজন্যেই তো তোমার এ উল্লাস!
রাবী (আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন সালাম) বলেন: তারপর আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট যাই এবং ইসলাম গ্রহণ করি। তারপর আমি আমার পরিবার-পরিজনের কাছে আসি এবং তাদেরকে এ ব্যাপারে আদেশ করি। তখন তারাও ইসলাম গ্রহণ করে।
তিনি বলেন: আমি আমার ইসলাম গ্রহণের কথা ইয়াহুদীদের থেকে গোপন রাখলাম। তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট গিয়ে তাঁকে বললাম: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! ইয়াহুদীরা একটি অপবাদপ্রিয় জাতি। আমি চাই আপনি আমাকে আপনার কোন এক ঘরে ঢুকিয়ে তাদের চোখের আড়ালে রেখে তাদেরকে আমার সম্পর্কে প্রশ্ন করবেন যে, আমি কেমন লোক। তারপর আমার ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে অবগত হওয়ার পূর্বেই তারা আমার সম্পর্কে আপনাকে অবহিত করবে, তাদের মধ্যে আমার অবস্থান কেমন। কেননা তারা যদি তা জানতে পায়, তবে নিশ্চয়ই আমার উপর অপবাদ আরোপ করবে এবং আমাকে দোষারোপ করবে।
রাবী (আবদুল্লাহ ইবন সালাম) বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) সেমতে আমাকে তাঁর একটি ঘরে ঢুকিয়ে রাখলেন। ইয়াহুদীরা তাঁর নিকট আগমন করল। নানা প্রসঙ্গে তাঁর সাথে আলাপ-আলোচনা করল। তাঁকে নানারূপ প্রশ্ন করল। তারপর তিনি তাদেরকে লক্ষ্য করে বললেন : তোমাদের হুসায়ন ইবন সালাম কেমন লোক?
জবাবে তারা বলল: তিনি আমাদের নেতা। তাঁর পিতাও আমাদের নেতা ছিলেন। তিনি আমাদের ধর্মযাজক ও পণ্ডিত ব্যক্তি।
রাবী বলেন: যখন তারা তাদের কথা শেষ করল, তখন আমি তাদের সম্মুখে আত্মপ্রকাশ করলাম এবং তাদের লক্ষ্য করে বললাম: হে ইয়াহুদী সমাজ! আল্লাহকে ভয় কর এবং আল্লাহ্ নবী তোমাদের কাছে যা নিয়ে এসেছেন তা গ্রহণ করে নাও। আল্লাহ্র কসম, তোমরা নিশ্চয়ই জান যে, তিনি আল্লাহ্র রাসূল। তোমাদের কাছে মওজুদ তাওরাত কিতাবে তোমরা তাঁকে তাঁর নাম ও গুণাবলীসহ পাচ্ছি। সুতরাং আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তিনি আল্লাহ্র রাসূল (সা)। আমি তাঁর প্রতি ঈমান আনছি তাঁকে সত্য নবী বলে প্রত্যয়ন করছি এবং তাঁকে আমি ঠিকই চিনতে পেরেছি। তারা বলল: তুমি মিথ্যাবাদী। তারা তখন আমাকে দোষারোপ করতে লাগল। আমি তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বললাম: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি কি ইতিপূর্বেই আপনাকে বলিনি ইয়াহুদীরা অপবাদে অভ্যস্ত একটি জাতি। বিশ্বাসঘাতকতা, মিথ্যাচার ও পাপাচার এদের জাতীয় বৈশিষ্ট্য।
আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন সালাম (রা) বলেন: তখন আমি আমার এবং আমার পরিবার-পরিজনের ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করলাম এবং আমার ফুফু খালিদা বিন্ত হারিসও ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং তিনি একজন উন্নতমানের মুসলমানে পরিণত হলেন।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 মুখায়রীকের ইসলাম গ্রহণ

📄 মুখায়রীকের ইসলাম গ্রহণ


ইবন ইসহাক বলেন: মুখায়রীকের ঘটনাবলী এরূপ: তিনি ছিলেন একজন ধর্মযাজক ও পণ্ডিত। তিনি ছিলেন একজন বিত্তশালী লোক। তাঁর ছিল বিরাট খেজুর বাগান। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে তাঁর গুণাবলী মারফত চিনতে পেরেছিলেন। তাঁর স্বধর্মের টান প্রবল ছিল। উহুদ যুদ্ধের দিন পর্যন্ত তিনি ইয়াহুদী ধর্মেই অবিচল থাকেন।
তারপর যখন উহুদ যুদ্ধের দিন এল আর সে দিনটি ছিল শনিবার। তিনি তাঁর স্বজাতির লোকজনকে লক্ষ্য করে বললেন: হে ইয়াহূদী সমাজ! আল্লাহর কসম, তোমাদের অবশ্যই জানা আছে যে, মুহাম্মদকে সাহায্য করা তোমাদের কর্তব্য।
তারা বলল: আজ তো শনিবার।
তিনি বললেন: তোমাদের জন্য শনিবার কিছু নয়।
তারপর তিনি অস্ত্রহাতে বেরিয়ে পড়লেন। উহুদ প্রান্তরে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট এসে উপস্থিত হলেন এবং তাঁর পেছনে রয়ে যাওয়া স্বজাতির লোজনকে এ মর্মে ওসিয়ত করে আসলেন যে, এ যুদ্ধে যদি আমি নিহত হই, তবে আমার সমস্ত সম্পদ মুহাম্মদ (সা)-এর হয়ে যাবে। তিনি আল্লাহ্র পসন্দমত যা ইচ্ছা তা করবেন।
তারপর যখন লোকজন যুদ্ধে লিপ্ত হল, তিনিও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করলেন এবং জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যুদ্ধ করে যুদ্ধক্ষেত্রেই শাহাদত بরণ করলেন।
আমার কাছে এরূপ সংবাদ পৌঁছেছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) প্রায়ই বলতেন: مخیریق خیر بهرد "মুখায়রীক ইয়াহুদীদের মধ্যে উত্তম ব্যক্তি ছিলেন।"
তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) মুখায়রীকের সমস্ত সম্পদের মালিকানা গ্রহণ করেন। মদীনায় তাঁর সাদকাসমূহ সাধারণত মুখায়রীকের এ সম্পদ হতেই তিনি দান করতেন।

টিকাঃ
১. শনিবার ইয়াহুদীদের সাপ্তাহিক ধর্মীয় দিন। এ দিন যুদ্ধ-বিগ্রহ করাকে তারা নিষিদ্ধ মনে করত।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 হযরত সফিয়্যা (রা)-এর বর্ণনা

📄 হযরত সফিয়্যা (রা)-এর বর্ণনা


ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে বর্ণনা করেছেন আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবূ বকর ইব্‌ন মুহাম্মদ ইবন আমর ইবন হাযম (র)। তিনি বলেন: আমার কাছে সফিয়্যা বিন্ত হুয়াই ইব্‌ন আখতাবের নিকট থেকে রিওয়ায়ত পৌঁছেছে, তিনি বলেছেন: আমি আমার পিতা ও চাচা আবু ইয়াসিরের সন্তানদের মধ্যে প্রিয়তম সন্তান ছিলাম। যখনই আমি তাঁদের সাথে দেখা করতাম, তখনই তাঁরা তাঁদের অন্য সন্তানদের ছেড়ে আমাকেই কোলে তুলে নিতেন। তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন মদীনায় পদার্পণ করলেন এবং কুবায় বনূ আমর ইব্‌ন আওফের পল্লীতে অবস্থান করেন, তখন আমার পিতা হুয়াই ইব্‌ন আখতাব এবং আমার চাচা আবূ ইয়াসির ইব্‌ন আখতাব তাঁর নিকট গেলেন ভোর সকালে। তিনি বলেন: কিন্তু সূর্য অস্ত যাওয়া পর্যন্ত তাঁরা আর ফিরে এলেন না।
তিনি বলেন: তারপর তাঁরা যখন এলেন, তখন তাঁরা এতই ক্লান্ত যে, চলতে গিয়ে যেন পড়ে যাচ্ছিলেন। আমি চিরাচরিত নিয়মে খুশি মুখে তাঁদের দিকে এগিয়ে গেলাম কিন্তু আল্লাহর কসম, দুজনের একজনও আমার দিকে একটু ফিরেও তাকালেন না। কারণ তারা ছিলেন বিষণ্ণ ও চিন্তিত। তিনি বলেন, আমি আমার চাচা আবূ ইয়াসিরকে আমার পিতা হুয়াই ইব্‌ন আখতাবকে লক্ষ্য করে বলতে শুনলাম এ কি সেই ব্যক্তি? জবাবে তিনি বললেন: হ্যাঁ, আল্লাহর কসম, তিনিই সেই ব্যক্তি। তখন চাচা বললেন: আপনি কি তাঁকে সত্যিই চিনতে পেরেছেন এবং এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়েছেন? পিতা বললেন: হ্যাঁ। তখন চাচা বললেন: এখন আপনি তাঁর সম্পর্কে কি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন? পিতা বললেন: আজীবন তাঁর সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করে যাব।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00