📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 মদীনায় মসজিদ নির্মাণ

📄 মদীনায় মসজিদ নির্মাণ


তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) সেখানে মসজিদ নির্মাণের আদেশ দিলেন। মসজিদ ও তাঁর বাসস্থান নির্মাণের পূর্ব পর্যন্ত তিনি আবু আইয়ুব (রা)-এর বাড়িতেই অবস্থান করেন। ঐ নির্মাণ কাজে রাসূলুল্লাহ্ (সা) নিজে অংশগ্রহণ করেন এবং মুসলমানদেরকে সে কাজে অংশগ্রহণের উৎসাহ প্রদান করেন। ফলে আনসার ও মুহাজির সকলেই নির্মাণকাজে যোগ দেন। মুসলমানদের মধ্যকার এক ব্যক্তি তখন এ স্ব-রচিত চরণটি আবৃত্তি করেন: لَذاكَ مِنَّا العَمَلَ المُضَلَّل لَئِن قَعَدنَا وَالنَّبِيُّ يعمل "আমরা যদি বসে থাকি (আর) নবী (সা) করেন কাজ এ যে চরম ভ্রান্তি হবে, হবে বিষম লাজের কাজ।" মুসলমানরা নির্মাণ কাজ করতে গিয়ে সমস্বরে ধুয়া ধরলেন: اللَّهُمَّ أَرْحَمِ الْأَنصَارَ وَالمُهَاجِرَ لا عيش الأ عيش الآخرة "আয়েশ-আরাম আখিরাতে (দুনিয়ায় তা আছে কিরে?) রহম কর আল্লাহ্ তুমি আনসারে আর মুহাজিরে!" ইবন হিশাম (র) বলেন: এটি ছিল একটি পংক্তিমাত্র, ধুয়া নয়। ইবন ইসহাক (র) বলেন: তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-ও বলছিলেন: اللهم ارحم لمهاجرين والانصار لاعيش الا عيش الآخرة "আয়েশ যত আখিরাতে (দুনিয়ায় তা আছে কিরে?) দয়া কর আল্লাহ্ তুমি মুহাজিরীন ও আনসারে।"

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আম্মার ও বিদ্রোহীদল

📄 আম্মার ও বিদ্রোহীদল


বর্ণনাকারী বলেন: এমন সময় আম্মার ইন্ন ইয়াসির এসে ঢুকলেন। তখন তাঁর উপর ভারী ইটের বোঝা বাঁধা অবস্থায় রয়েছে। তিনি বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! এরা তো আমাকে মেরে ফেলল! তারা আমার উপর এমনি বোঝা চাপিয়ে দেয় যা তারা নিজেরা বহন করতে পারে না। নবী (সা)-এর সহধর্মিণী উম্মু সালামা (রা) বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে নিজ হাতে তাঁর কান পর্যন্ত দীর্ঘ চুলের বিন্যাস করতে দেখেছি আর 'আম্মার ছিলেন জুলফিধারী চুলের অধিকারী ব্যক্তি। তিনি তখন বলছিলেন:
ويح ابن سمية ليسوا بالذين يقتلونك انما تقتلك الفئة الباغية
"আফসোস, হে ইব্‌ন সুমাইয়া! এরা তেমন লোক নয়, যারা তোমাকে হত্যা করবে। তোমাকে তো হত্যা করবে একদল বিদ্রোহী।"

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 হযরত আলী (রা)-এর পংক্তি

📄 হযরত আলী (রা)-এর পংক্তি


সেদিন আলী ইব্‌ন আবূ তালিব (রা) একটি পংক্তি আবৃত্তি করেছিলেন :
لا يستوى من يعمر المساجدا x يدأب فيه قائما وقاعدا
ومن يرى عن الغبار حائدا
"কখনও সমান নয় তারা দু'জনে সর্বদা রুকু ও সিজদায় মসজিদ আবাদ করে যে জনে।"
ইব্‌ন হিশাম বলেন: আমি কবিতা বিশেষজ্ঞ একাধিক ব্যক্তিকে এ চরণ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছি। তাঁরা বলেন: আমরা যতদূর জানি, হযরত আলী ইব্‌ন আবূ তালিব এ পংক্তিগুলো আবেগময় কণ্ঠে আবৃত্তি করেছিলেন, কিন্তু কেউ বলতে পারেন না যে, পংক্তিগুলো তাঁরই রচিত, না তিনি অন্য কারো কবিতা থেকে তা আবৃত্তি করেছেন।
ইবন ইসহাক বলেন: আম্মার ইবন ইয়াসির কবিতাটি কণ্ঠস্থ করেন এবং জোরে জোরে আবেগময় কণ্ঠে তা আবৃত্তি করতে থাকেন।
ইবন হিশাম বলেন: যখন তিনি বারবার তা আবৃত্তি করছিলেন, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাহাবীগণের একজন ধারণা করেন যে, তিনি তাঁকে লক্ষ্য করেই কবিতাটি আবৃত্তি করছিলেন। যিয়াদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ বুকাই আমার কাছে ইবন ইসহাকের বরাতে এরূপই বর্ণনা করেছেন আর তিনি লোকটির নাম উল্লেখ করেছিলেন।
ইবন ইসহাক বলেন: তখন ঐ সাহাবী বললেন, হে ইব্‌ন সুমাইয়া (আম্মার)! তুমি সারাদিন ধরে যা আবৃত্তি করছিলে তা আমি শুনেছি। আল্লাহ্র কসম! আমি দেখছি যে, আমি এ লাঠি দিয়ে তোমার নাকে আঘাত করব (অর্থাৎ নাক ভেঙ্গে দেব)। বর্ণনাকারী বলেন, আর তখন তাঁর হাতে একটি লাঠি ছিল। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) ক্রুদ্ধ হলেন এবং বললেন:
ما لهم ولعمار يدعوهم الى الجنة ويدعونه الى النار ان عمارا جلدة ما بين عيني وانفى
"আম্মারের ব্যাপারে তাদের এত উষ্মা কেন? সে তো তাদেরকে জান্নাতের দিকে আহবান করে এবং তারা তাকে আগুনের দিকে আহবান করছে! জেনে রেখো, আম্মার হচ্ছে আমার চক্ষুযুগল ও নাকের মধ্যবর্তী চর্মস্বরূপ।"
ঐ ব্যক্তির ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর অসন্তুষ্টির কথা জানতে পেরে আম্মার আর তাঁর চরণ আবৃত্তি থেকে নিবৃত্ত, হলেন না।
ইব্‌ন হিশাম বলেন: সুফইয়ান ইব্‌ন উয়ায়না যাকারিয়া (র) তিনি শা'বী (র) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন, ইসলামে যিনি সর্বপ্রথম মসজিদ নির্মাণ করেন, তিনি হচ্ছেন আম্মার ইবন ইয়াসির।

টিকাঃ
১. ইব্‌ন হিশাম (র) কিন্তু তাঁর নাম নেন নি। তিনি কোন সাহাবীর নাম নিন্দাস্থলে উল্লেখ করা পসন্দ করেন নি। এজন্যে আমরাও তা উল্লেখ করব না। নাম নিয়ে অনেক মতভেদও আছে। আর এতে অতিরিক্ত কোন ফায়দাও নেই।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আবূ আইয়ুব (রা)-এর ঘরে মহানবী (সা) অবতরণ করলেন

📄 আবূ আইয়ুব (রা)-এর ঘরে মহানবী (সা) অবতরণ করলেন


ইবন ইসহাক বলেন: মসজিদ এবং বাসস্থানসমূহ' নির্মাণ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত রাসূলুল্লাহ্ (সা) আবূ আইয়ূব (রা)-এর ঘরেই অবস্থান করেন। তারপর আবূ আইয়্যুব (রা)-এর ঘর থেকে রাসূলুল্লাহ (সা) নিজ বাসগৃহে স্থানান্তরিত হন।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে ইয়াযীদ ইব্‌ন আবু হাবীব মারসাদ ইব্‌ন আবদুল্লাহ্ আল-ইয়াযী থেকে, তিনি আবু রুহম আস-সিমাঈ থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমার নিকট আবু আইয়ূব (রা) বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেন: যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) আমার বাড়িতে অবতরণ করেন, তখন তিনি অবস্থান করেন নিচতলায় এবং আমি ও আমার সহধর্মিণী উম্মু আইয়ূব (রা) ছিলাম উপরতলায়। তখন আমি তাঁর খিদমতে আরয করলাম, হে আল্লাহ্র নবী! আপনার জন্যে আমার পিতামাতা কুরবান হোন! আমরা উপরে অবস্থান করব আর আপনি নিচে থাকবেন এটা আমি অত্যন্ত অপসন্দ করি এবং গুরুতর ব্যাপার বলে মনে করি। সুতরাং আপনি উপরে উঠে আমাদের উপরে অবস্থান করুন, আমরা নিচের তলায় চলে যাব এবং আপনার নিচেই অবস্থান করব।
জবাবে তিনি বললেন: হে আইয়ূব, আমার এবং আমার কাছে আগমনকারীদের জন্যে নিচে অবস্থান করাটাই অধিকতর সুবিধাজনক।
তিনি বলেন: তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) ঘরের নিচতলায়ই রইলেন আর আমরা ঘরের উপর তলায় রইলাম। একবার আমাদের একটি বড় পানির মটকা ভেঙ্গে গেল। তখন আমি ও উন্মু আইয়ূব তাড়াতাড়ি করে আমাদের কম্বলটি বিছিয়ে ধরে পানি শুকালাম আর তখন আমাদের লেহাফ বলে কিছু ছিল না। আমাদের আশঙ্কা হচ্ছিল, পানি না রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উপর পড়ে তাঁর কষ্টের কারণ হয়ে যায়!
রাতের বেলা আমরা তাঁর জন্যে খাবার তৈরি করে পাঠিয়ে দিতাম। যখন তিনি খাবারের অবশিষ্টাংশ ফেরত পাঠাতেন, তখন আমি ও উম্মু আইয়ূব তাঁর পবিত্র হস্তের স্পর্শ পাওয়া স্থানগুলো খুঁজে নিয়ে সেখান থেকে খাবার গ্রহণ করে বরকত হাসিলের চেষ্টা করতাম। একদিন রাতের বেলা আমরা পেঁয়াজ অথবা রসুন দেওয়া খাবার তাঁর খিদমতে পাঠালাম। তিনি তা ফেরত পাঠিয়ে দিলেন অথচ তার মধ্যে তাঁর পবিত্র হস্তের কোন চিহ্ন আমরা দেখতে পেলাম না। আমি অত্যন্ত বিব্রত হয়ে তাঁর কাছে ছুটে গেলাম এবং আরয করলাম: ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আপনার জন্যে আমার পিতামাতা কুরবান, আপনি রাতের খাবার ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছেন অথচ তাতে আপনার পবিত্র হাতের কোন চিহ্নই নেই! আপনি যখন খাবার ফেরত পাঠান, তখন আমি ও উম্মু আইয়ূব বরকত হাসিলের উদ্দেশ্যে আপনার পবিত্র হাতের স্পর্শমণ্ডিত অংশ থেকে খাবার গ্রহণ করে থাকি!
জবাবে তিনি বললেন: আমি তাতে ঐ গাছের গন্ধ পেলাম। আর আমাকে তো ফেরেশতাগণের সঙ্গে গোপনে কথোপকথন করতে হয় (আর ফেরেশতাগণ এর গন্ধ পসন্দ করেন না), তাই তোমরা তা খেয়ে নাও। তখন (অগত্যা) আমরা তা খেয়ে নিলাম। তারপর আর কোন দিন তাঁর জন্যে এ বস্তু পরিবেশন করিনি।

টিকাঃ
১. আম্মার মসজিদের প্রথম নির্মাতা একথা কিভাবে বলা হল, অথচ অন্যান্য লোকও নির্মাণকাজে অংশগ্রহণ করেছিলেন? এর জবাব হয়, আম্মারই সর্বপ্রথম মসজিদে কুবা নির্মাণের জন্যে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে প্রস্তাব দিয়েছিলেন। আর তিনিই ভিত্তির জন্যে পাথর সংগ্রহ করেছিলেন। তারপর নবী (সা) যখন মসজিদের ভিত্তি স্থাপন করেন, তখন তাঁর কাজ সমাপ্ত করেছিলেন আম্মার।
২. খেজুর পাতায় ছাওয়া নয়টি কক্ষ ছিল। দরজায় কোন কড়া ছিল না, তাই নখ দিয়ে করাঘাত করতে হত। ছাদ হাতে নাগাল পাওয়া যেত।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00