📄 যারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর হিজরতের সংবাদ জানতেন
ইবন ইসহাক বলেন: আমি যতদূর জানতে পেরেছি, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন রওয়ানা করে যান, তখন আলী ইব্ন আবু তালিব, আবু বকর সিদ্দীক এবং আবূ বকরের পরিবারবর্গ ছাড়া আর কেউ তা ঘুণাক্ষরেও জানত না। আলীকে তো আমার জানামতে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর রওয়ানা হয়ে যাওয়ার সংবাদ দিয়ে তাঁকে তাঁর প্রস্থানের পর মক্কা শরীফে অবস্থান করতে এবং তাঁর কাছে লোকের গচ্ছিত দ্রব্যসামগ্রী তাদের হাতে বুঝিয়ে দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। মক্কা শরীফে যার কাছেই এমন কোন দ্রব্য থাকত, যা হারানোর বা হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা থাকত, তা-ই তারা তাঁর কাছে গচ্ছিত রাখত। কেননা তাঁর বিশ্বস্ততা ও আমানতদারীর গুণটি ছিল সুবিদিত।
📄 হযরত আবূ বকর (রা)-এর সঙ্গে গিরিগুহায়
ইবন ইসহাক বলেন: যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কা শরীফ থেকে রওয়ানা করতে মনস্থ করলেন, তখন তিনি আবু বকর ইব্ন আবু কুহাফার বাড়িতে আসলেন এবং আবু বকরের বাড়ির পশ্চাতের একটি খিড়কিদ্বার দিয়ে দু'জনে বেরিয়ে পড়লেন। তাঁরা সওর গিরিগুহার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। এটা ছিল মক্কার নিম্নাঞ্চলের একটি পাহাড়। তাঁরা উভয়ে তাতে প্রবেশ করলেন। আবু বকর তাঁর পুত্র আবদুল্লাহকে দিনের বেলা লোকে তাঁদের দু'জন সম্পর্কে কী বলাবলি করে তা শোনার এবং রাত্রে এসে ঐ দিনের খবরাদি পৌঁছিয়ে দিতে নির্দেশ দিল। তিনি তাঁর আযাদকৃত গোলাম আমির ইব্ন ফুহায়রাকে এ মর্মে নির্দেশ দেন যেন তিনি দিনের বেলা তাঁর বকরী চরাতে চরাতে সন্ধ্যা বেলা গিরিগুহায় তাঁদের কাছে এসে পৌঁছেন। আর আসমা বিন্ত আবূ বকর রাতের বেলা তাঁদের প্রয়োজনীয় খাবার সামগ্রী নিয়ে তাঁদের কাছে আসতেন।
ইব্ন হিশাম বলেন: আমার কাছে জনৈক জ্ঞানী ব্যক্তি হাসান ইব্ন আবুল হাসান বসরী প্রমুখাৎ বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও আবু বকর রাতের বেলায় গিয়ে গিরিগুহায় পৌঁছেন। প্রথমে আবূ বকর তাতে প্রবেশ করে গুহার এদিক-ওদিকে কোন হিংস্র শ্বাপদ আছে কিনা ভাল করে দেখে নেন। অর্থাৎ নিজের প্রাণকে বিপন্ন করে হলেও রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিরাপত্তা বিধানের জন্যে তিনি সচেষ্ট হন।
📄 আবু বকরের ছেলে ও ফুহায়রার ছেলে রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও তাঁর সাথীর সম্মানার্থে সারাক্ষণ খিদমতে নিয়োজিত থাকেন
ইবন ইসহাক বলেন রাসূলুল্লাহ্ (সা) আবু বকরকে সাথে নিয়ে তিনদিন গিরিগুহায় অবস্থান করেন। কুরায়শরা তাঁর কোন সন্ধান না পেয়ে কেউ তাঁকে ধরিয়ে দিলে এক শ' উষ্ট্রী উপহার দেবে বলে ঘোষণা করে দেয়। আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবু বকর দিনভর কুরায়שদের মধ্যে ঘোরাফেরা করে তাদের সলা-পরামর্শ এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও আবু বকরের ব্যাপারে তাদের বলাবলি শুনতেন আর সন্ধ্যা বেলা গিরিগুহায় এসে তাঁদেরকে সে খবরাদি অবহিত করতেন। আবূ বকরের আযাদকৃত গোলাম আমির ইব্ন ফুহায়রা সারাদিন মক্কাবাসীদের রাখালদের সাথে বকরী চরাতেন আর সন্ধ্যাবেলা আবু বকরের বকরীগুলো গুহার কাছে নিয়ে আসতেন। তাঁরা দু'জনে ওগুলোর দুধ দুইয়ে পান করতেন। আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবূ বকর যখন ভোরে তাঁদের নিকট থেকে মক্কা শরীফের দিকে যেতেন, তখন আমির ইব্ন ফুহায়রাও বকরীর পাল নিয়ে তাঁর পিছু পিছু যেতেন যাতে করে তাঁর পদচিহ্নগুলো মুছে যায়।
এভাবে যখন তিন দিন অতিবাহিত হয়ে গেল এবং লোকজনের তাঁদের ব্যাপারে চাঞ্চল্য একটু কমে গেল, তখন তাঁদের পূর্ব নির্ধারিত সেই শ্রমিক ব্যক্তিটি তাঁদের দু'জনের দু'টি উট এবং নিজের উটটি নিয়ে হাযির হল। আসমা বিন্ত আবূ বকরও পাথেয় সামগ্রী নিয়ে এসে পৌঁছে গেলেন। কিন্তু পাথেয় সামগ্রীর থলে বেঁধে দেয়ার রশি আনতে তিনি ভুলে যান। তাঁরা যখন রওয়ানা হলেন, তখন তিনি পাথেয় থলি বাঁধতে গিয়ে দেখেন, তাতে রশি নেই। তখন তিনি নিজের কোমরবন্দ ছিঁড়ে তার দ্বারা থলেটি বেঁধে লটকিয়ে দেন। এ জন্যে আসমা বিন্ত আবু বকরকে 'যাতুন নেতাক' বা কোমরবন্দওয়ালী বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে।
📄 হযরত আসমাকে 'যাতুন-নেতাকায়ন' বলার কারণ
ইব্ন হিশাম বলেন: আমি একাধিক জ্ঞানী ব্যক্তিকে 'যাতুন নেতাকায়ন' বা দুই কমরবন্দওয়ালী বলতে শুনেছি। তার ব্যাখ্যা হচ্ছে এই যে, যখন আসমা পাথেয় সামগ্রীর থলেটি বেঁধে দিতে মনস্থ করলেন, তখন তিনি তাঁর কোমরবন্দকে দু'ভাগে ভাগ করে একভাগ দিয়ে থলেটি বেঁধে লটকিয়ে দিলেন এবং অপরভাগ দিয়ে নিজের কোমর বাঁধলেন (ফলে একটি কোমরবন্দ কার্যত দু'টিতে পরিণত হয়)।