📄 নবী করীম (সা) রওয়ানা হলেন এবং তাঁর বিছানায় আলী (রা)-কে রেখে গেলেন
হযরত জিবরাঈল আলায়হিস্ সালাম রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললেন: আজ আপনি আপনার বিছানায় রাত্রি যাপন করবেন না।
বর্ণনাকারী বলেন, তারপর যখন রাতের আঁধার ঘনিয়ে আসল, তখন ঐ বাছাই করা যুবকরা তাঁর বাড়িতে উপস্থিত হয়ে কখন তিনি শুতে যান তার অপেক্ষায় রইল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন তাদের অবস্থান লক্ষ্য করলেন, তখন আলী ইব্ন আবূ তালিবকে ডেকে বললেন: তুমি আমার বিছানায় আমার সবুজ হাযরামী চাদরটি গায়ে দিয়ে শুয়ে পড়। কেননা এতে তারা তোমার কোন অনিষ্ট করতে পারবে না। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন শুতেন, তখন ঐ চাদরটি গায়ে দিতেন।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে বর্ণনা করেছেন, ইয়াযীদ ইব্ন যিয়াদ মুহাম্মদ ইব্ কা'ব কারাযী-এর বরাতে। তিনি বলেন: যখন তারা দ্বারপ্রান্তে গিয়ে সমবেত হল, আবু জাহল ইব্ন হিশামও তখন তাদের সাথে ছিল। সে তাদেরকে লক্ষ্য করে বলল, নিশ্চয়ই মুহাম্মদের ধারণা, তোমরা যদি তার ধর্মের আনুগত্য-অনুসরণ কর, তাহলে তোমরা আরব-আজমের বাদশাহ্ হয়ে যাবে, তারপর মৃত্যুর পর তোমরা পুনরুত্থিত হবে, তখন তোমাদের জন্যে জর্দানের বাগ-বাগিচার মতো বাগ-বাগিচা হবে। আর যদি তোমরা তা না কর, তাহলে তোমাদের রক্তপাত বৈধ হবে এবং মৃত্যুর পর তোমরা পুনরুত্থিত হবে আর তখন তোমাদেরকে আগুনে পোড়ানো হবে।
বর্ণনাকারী বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের সম্মুখে বের হলেন। তিনি হাতে একমুঠো মাটি নিলেন। তারপর বললেন: হ্যাঁ, আমি এরূপই বলে থাকি। আর তুমি তাদেরই একজন (যারা আগুনে প্রজ্বলিত হবে)। আল্লাহ্ তা'আলা তখন তাদের দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নিলেন আর তারা তখন তাঁকে দেখতে পাচ্ছিলনা। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তখন ঐ মাটি তাদের মাথায় ছিটাতে লাগলেন। তখন তিনি সূরা ইয়াসীনের এ আয়াতগুলো তিলাওয়াত করছিলেন :
بِسْمِ اللهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ يس . وَالْقُرْآنِ الْحَكِيمِ . إِنَّكَ لَمِنَ الْمُرْسَلِينَ . عَلَى صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٍ . مِنْ بَيْنِ أَيْدِيهِمْ سَدًّا وَمِنْ خَلْفِهِمْ سَدًّا فَاغْشَيْنَهُمْ فَهُمْ لَا يُبْصِرُونَ ٥ وَجَعَلْنَا
"ইয়াসীন, বিজ্ঞানময় কুরআনের কসম! নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত রাসূল। আপনি সরল পথের উপর প্রতিষ্ঠিত। কুরআন অবতীর্ণ, পরাক্রমশালী, পরম দয়ালু আল্লাহ্র নিকট থেকে, যাতে আপনি সতর্ক করতে পারেন এমন এক জাতিকে, যাদের পিতৃপুরুষদেরকে সতর্ক করা হয়নি; যার ফলে তারা গাফিল। তাদের অধিকাংশের জন্য সেই বাণী অবধারিত হয়েছে : সুতরাং তারা ঈমান আনবেনা। আমি তাদের গলদেশের চিবুক পর্যন্ত বেড়ি পরিয়েছি ফলে তারা উর্ধ্বমুখী হয়ে গেছে। আমি তাদের অগ্রপশ্চাতে একটি প্রাচীর তুলে দিয়েছি এবং তাদের চোখের উপর আবরণ ফেলে দিয়েছি সুতরাং তারা দেখতে পাবে না।" (৩৬ : ১-৯)
রাসূলুল্লাহ্ (সা) এ আয়াতগুলোর তিলাওয়াত সম্পন্ন করতে করতে তাদের সব ক'জনের মাথার উপর মাটি নিক্ষেপ করা সম্পন্ন হল। তারপর তিনি তাঁর গন্তব্যের পানে রওয়ানা হয়ে পড়লেন। তখন তাদের কাছে এমন একজন আগন্তুক এসে পৌঁছল, যে কোনদিন তাদের কাছে আসেনি। আগন্তুকটি বলল : কী হে! এখানে কার জন্যে অপেক্ষা করছ? তারা জবাব দিল : মুহাম্মদের জন্যে। সে বলল : আল্লাহ্ তোমাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছেন। আল্লাহর কসম! মুহাম্মদ তো তোমাদের সম্মুখ দিয়েই বেরিয়ে গেলেন আর তোমাদের প্রত্যেকের মাথায় মাটি নিক্ষেপ করে আপন গন্তব্য পথে চলে গিয়েছেন। তোমরা কি তোমাদের অবস্থা লক্ষ্য করবেনা? তখন তাদের প্রত্যেকেই মাথায় হাত দিয়ে দেখল যে, সত্যি সত্যি তাদের প্রত্যেকের মাথার উপর মাটি রয়েছে। তখন তারা অনুসন্ধান করে দেখল, আলী রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চাদর গায়ে তাঁর বিছানার উপর শুয়ে আছেন। তারা তখন পরস্পরে বলাবলি করতে লাগল : এই যে মুহাম্মদ চাদর মুড়ি দিয়ে শায়িত। এ অবস্থায় ভোর পর্যন্ত তারা সেখানে অবস্থান করল। তারপর যখন আলী (রা) শয্যাত্যাগ করলেন, তখন তারা বলে উঠল : আল্লাহ্র কসম! ঐ আগন্তুকটি যা বলেছিল তাই সত্য ছিল।
📄 মুশরিকদের প্রতীক্ষা সম্পর্কে নাযিলকৃত আয়াত
ইবন ইসহাক বলেন : ঐদিন এবং তাঁর বিরুদ্ধে তাদের সমবেত প্রচেষ্টা সম্পর্কে কুরআন শরীফের যে সব আয়াত নাযিল হয় তার মধ্যে আছে :
وَإِذْ يَمْكُرُبِكَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِيُثْبِتُوكَ أَوْ يَقْتُلُوكَ أَوْ يُخْرِجُوكَ وَيَمْكُرُونَ وَيَمْكُرُ اللَّهُ وَاللَّهُ خَيْرٌ الْمَاكِرِينَ .
“হে রাসূল! আপনি স্মরণ করুন সেই সময়ের কথা, যখন কাফিররা আপনার বিরুদ্ধে তাদের গোপন ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছিল যাতে করে তারা আপনাকে বন্দী করতে পারে বা হত্যা করতে পারে অথবা দেশান্তর করতে পারে। তারা তাদের গোপন ষড়যন্ত্র আঁটছিল আর আল্লাহও তাঁর গোপন কৌশল আঁটছিলেন। আর গোপন কৌশল আঁটার ব্যাপারে আল্লাহই সর্বোত্তম।” (৮: ৩০)
এ ছাড়াও আল্লাহর বাণী:
أَمْ يَقُولُونَ شَاعِرٌ نَتَرَبَّصُ بِهِ رَيْبَ الْمَنُونِ - قُلْ تَرَبَّصُوا فَإِنِّي مَعَكُمْ مِّنَ الْمُتَرَبِّصِينَ
“তারা কি বলে, ইনি একজন কবি? আমরা তার মৃত্যুর প্রাদুর্ভাবের প্রতীক্ষায় আছি? হে রাসূল! আপনি বলুন, প্রতীক্ষায় থাক, আমিও তোমাদের সাথে প্রতীক্ষায় রইলাম। দেখা যাবে শেষফল কার ভাগ্যে জুটে।” (৫২: ৩০-৩১)
ইবন হিশাম (র) বলেন: المنون শব্দের অর্থ মৃত্যু এবং ريب المنون অর্থ মৃত্যুর প্রাদুর্ভাব বা মৃত্যুর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যাপারাদি। আবূ যুয়ায়ব হুযালীর কবিতায় আছে:
أمن المنون وريبها تتوجع * والدهر ليس بمعتب من يجزع
“মৃত্যু ও তার প্রাদুর্ভাবের আশংকায় তুমি ব্যাকুল ও বেদনাহত? কিন্তু যুগচক্র যে কারো বিচলিত ভাব দর্শনে তার রুদ্ররোষ থেকে মুক্তি দেয় না।”
ইবন ইসহাক বলেন: আল্লাহ্ তা'আলা এই সময় তাঁর নবী (সা)-কে হিজরতের অনুমতি দান করেন।
📄 নবী করীম (রা)-এর সাথে হিজরত করার জন্য আবু বকর (রা)-এর আকাঙ্ক্ষা
ইবন ইসহাক বলেন: হযরত আবূ বকর (রা) ছিলেন একজন ধনী ব্যক্তি। তিনি যখন রাসূলুল্লাহ্-এর কাছে হিজরতের অনুমতি চাইলেন, তখন তিনি জবাবে বলেছিলেন:
لا تعجل لعل الله يجعل لك صاحبا
“তড়িঘড়ি করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তোমাকে কোন সঙ্গী জুটিয়ে দেবেন।”
হযরত আবূ বকর (রা) মনে মনে আশা পোষণ করতে থাকেন যে, সেই কথিত সাথী যেন স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ হন। অর্থাৎ এ সাথী বলতে তিনি নিজেকেই বুঝিয়েছেন বলে তিনি ধরে নেন। তাই তিনি দু'টি সওয়ারীর উট কিনে তাঁর বাড়িতে বেঁধে রাখেন এবং হিজরতের প্রস্তুতি স্বরূপ এগুলোকে ঘাস পানি খাওয়াতে থাকেন।
📄 যারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর হিজরতের সংবাদ জানতেন
ইবন ইসহাক বলেন: আমি যতদূর জানতে পেরেছি, রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখন রওয়ানা করে যান, তখন আলী ইব্ন আবু তালিব, আবু বকর সিদ্দীক এবং আবূ বকরের পরিবারবর্গ ছাড়া আর কেউ তা ঘুণাক্ষরেও জানত না। আলীকে তো আমার জানামতে স্বয়ং রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর রওয়ানা হয়ে যাওয়ার সংবাদ দিয়ে তাঁকে তাঁর প্রস্থানের পর মক্কা শরীফে অবস্থান করতে এবং তাঁর কাছে লোকের গচ্ছিত দ্রব্যসামগ্রী তাদের হাতে বুঝিয়ে দিতে নির্দেশ দিয়েছিলেন। মক্কা শরীফে যার কাছেই এমন কোন দ্রব্য থাকত, যা হারানোর বা হাতছাড়া হওয়ার আশঙ্কা থাকত, তা-ই তারা তাঁর কাছে গচ্ছিত রাখত। কেননা তাঁর বিশ্বস্ততা ও আমানতদারীর গুণটি ছিল সুবিদিত।