📄 কুরায়শদের হাত থেকে ইবন 'উবাদার নিষ্কৃতি ও এ সম্পর্কিত কবিতা
রাবী বলেন: মিনা হতে হজ্জযাত্রীরা বিদায় নিলে কুরায়শরা বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধান চালাল। অবশেষে প্রমাণিত হল, ঘটনা সূত্য। তখন তারা আনসারদের পাকড়াও করার জন্য বের হল এবং সা'দ ইবন উবাদা ও সাঈদা ইব্ন কা'ব ইব্ন খাযরাজ গোত্রীয় নেতা মুনযির ইব্ন আমরকে আযাখির নামক স্থানে পেয়ে গেল। তাঁরা উভয়েই নকীব ছিলেন। মুনযির তো তাদের কবল থেকে আত্মরক্ষা করতে সক্ষম হলেন কিন্তু সা'দ ইব্ন উবাদা (রা)-কে তারা ধরে ফেলে। তারা তাঁর, হাওদার রশি দিয়ে তাঁর দু'হাত ঘাড়ের পেছনে নিয়ে কষে বাঁধল। তাঁর মাথায় ছিল অনেক চুল এবং তিনি ছিলেন বাবরিধারী। তারা তাঁর সে বাবরি ধরে টেনে-হেঁচড়ে পেটাতে পেটাতে মক্কায় নিয়ে গেল।
সা'দ (রা) বলেন: আমি তাদের হাতে বন্দী অবস্থায় ছিলাম। এ সময় কুরায়শদের একটি দল আমার কাছে উপস্থিত হয়। তাদের মধ্যে একজন ফর্সা ও উজ্জ্বল চেহারার অধিকারী, দীর্ঘকায় সুদর্শন ব্যক্তি ছিল।
রাবী বলেন: তখন আমি মনে মনে বললাম: যদি তাদের কারও মধ্যে ভাল কিছু থেকে থাকে, তবে তা এ ব্যক্তির মধ্যেই আছে। কিন্তু লোকটি আমার কাছে এসে আমাকে এক প্রচণ্ড থাপ্পড় মারল। তখন আমি মনে মনে বললাম: এরপর আর এদের কারও থেকে সুব্যবহারের আশা করা যায় না। আমি যখন তাদের হাতে বন্দী ছিলাম আর তারা আমাকে টেনে-হেঁচড়ে নিয়ে বেড়াত, তখন তাদের এক ব্যক্তির আমার প্রতি দয়া হল। সে আমাকে ধিক্কার দিয়ে বলল কুরায়শদের মাঝে কারও সাথেই কি তোমার কোনরূপ বন্ধুত্ব নেই? আমি বললাম: নিশ্চয়ই আছে। আমি একসময় জুবায়র ইবন মুত'ইম ইব্ন আদী ইবন নাওফাল ইব্ন আব্দ মানাফের বাণিজ্য-কাফেলাকে আশ্রয় দিতাম। আমার দেশে কেউ তাদের কোন ক্ষতি করতে চাইলে আমি বাধা দিতাম।
আর আশ্রয় দিতাম হারিস ইব্ন হারব্ ইব্ন উমাইয়া ইব্ন আব্দ শামস্ ইব্ন আব্দ মানাফকেও। লোকটি বলল আরে মিয়া। এখনও বসে আছ, তাদের দু'জনের নাম ধরে জোরে জোরে ডাক দাও এবং তাদের ও তোমার মধ্যেকার সম্পর্কের কথাও উল্লেখ কর। আমি তাই করলাম। লোকটি তখন তাদের খোঁজে বেরিয়ে পড়ল। আর সে তাদের দু'জনকে মসজিদে হারামের মধ্যে পেল। সে তাদের বলল খাযরাজ গোত্রের একটি লোককে মক্কার সংলগ্ন সমভূমিতে ভীষণ পেটান হচ্ছে। সে তোমাদের নাম ধরে চিৎকার করে বলছে, তোমাদের সাথে নাকি তার সম্পর্ক আছে? তখন তারা জিজ্ঞেস করল সে ব্যক্তি কে? সে বলল: সা'দ ইবন উবাদা। তারা বলল: আল্লাহর কসম! সে সত্য বলেছে। সে আমাদের বাণিজ্য কাফেলাকে আশ্রয় দিত এবং তার দেশে কেউ আমাদের ক্ষতি করতে চাইলে সে বাধা দিত। রাবী বলেন: তখন তার দু'জন এসে সা'দ (রা)-কে কুরায়শদের হাত থেকে ছাড়িয়ে নেয়। তখন সা'দ (রা) সেখান থেকে মদীনায় চলে যান।
সা'দ (রা)-কে যে ব্যক্তি থাপ্পড় মেরেছিল তার নাম হলো সুহায়ল ইবন 'আমর! সে 'আমির ইব্ন লুআঈ গোত্রের লোক।
ইব্ন হিশাম বলেন: যে ব্যক্তি সা'দ (রা)-এর প্রতি দয়া দেখিয়েছিল, তার নাম নাম হল আবুল বাখতারী ইব্ন হিশام।
ইবন ইসহাক বলেন: হিজরত সম্পর্কে যে সব কবিতা রচিত হয়, তার মধ্যে সর্বপ্রথম হচ্ছে মুহারিব ইব্ন ফির গোত্রীয় কবি যিরার ই-খাত্তাব ইন্ন মিরদাসের দু'টি শ্লোক। তিনি বলেন:
تداركت سعدا عنوة فاخذته × وكان شفاء لو تداركت منذرا زولو نلته طلت هناك جراحه * وكانت حريا ان يهان ويهدرا
"আমি সা'দকে কাবুতে পেলাম এবং তাকে পাকড়াও করলাম। যদি আমি মুনযিরকেও কাবুতে পেতাম, তবে আমার মনের ক্ষোভ দূর হত। আমি যদি তাকে ধরতে পারতাম, তবে তাকে ক্রমাগত আঘাত করে যখম করতাম; আর যত যখমই আমি তাকে করতাম, তা তুচ্ছ ও বৈধই গণ্য হত (অর্থাৎ এর প্রতিশোধ আমার থেকে কেউ-ই নিতে পারত না)।"
ইন্ন হিশাম বলেন: এক বর্ণনা অনুযায়ী শেষোক্ত লাইনটি এরূপ وكان حقيقا أن يهان ويهدرا অর্থ একই।
ইন্ন ইসহাক বলেন: কবি হাসান ইবন সাবিত (রা) এর জবাবে বলেন:
لست إلى سعد ولا المرء منذر * اذا ما مطايا القوم اصبحن ضمرا فلو لا ابو وهب لمرت قصائد * على شرف البرقاء يهوين حسرا اتفضخر بالكتان لمالبسته * وقد تلبس الانباط ربطا مقصرا فلا نك كالوسنان يحلم انه * بقرية كسرى او بقرية قيصرا ولاتك كالشكلى وكانت بمعزل * عن الشكل لوكان الفؤاد تفكرا ولاتك كالشاة التي كان حتفها * بحفر ذراعيها فلم ترض محفرا ولاتك كالعاوى فاقبل نحره * ولم يخشه سهما من النبل مضمرا فانا ومن يهدى القصائد نحونا * كمستبضع تمرا الى ارض خيبرا
"তুমি না সা'দের নাগাল পেতে পার, না মুনযিরের, যখন তাদের সওয়ারী বিশেষভাবে প্রস্তুত থাকে। যদি আবু ওয়াহব না হত, তবে বারকা'র উচ্চ স্থান হতে কবিতামালা সবেগে অতিক্রম করত। তুমি কাতান কাপড় পরে অহংকার করছ, অথচ নিবতী সম্প্রদায়ের লোকেরাও সাদা ধবধবে কাপড় পরিধান করে থাকে। তুমি সেই তন্দ্রাচ্ছন্ন ব্যক্তির মত হয়ো না, যে স্বপ্ন দেখে যে, সে রয়েছে পারস্যরাজের দেশে অথবা রোম সম্রাটের পল্লীতে। অথবা সেই সন্তানহারা রমণীর মত হয়ো না, যাকে হতে হতনা নিঃসন্তান, যদি সে ভেবে কাজ করত। কিংবা তুমি সে ছাগলের মত হয়ো না, যাব মৃত্যু তার সামনের পায়ের খননে বের হয়ে আসা ছুরি দ্বারা সাধিত হয়েছিল। তার সে খনন তার জন্য শুভ ফল বয়ে আনেনি। অথবা তুমি সেই ঘেউঘেউকারী কুকুরের মতও হয়ো না, যে গুপ্ত তীরন্দাজ হতে নিঃশঙ্ক হয়ে গলা বের করে দেয়। আমাদের উদ্দেশ্যে যারা কবিতা পাঠায়, তারা তো সেই খেজুর বিক্রেতার মত, যে খায়বারে খেজুর বেচতে আসে।"
📄 'আমর ইবন জামূহ-এর প্রতিমার কাহিনী
'আকাবার দ্বিতীয় বায়'আত শেষে আনসারগণ মদীনায় আসলেন। তাদের দাওয়াতী কর্মতৎপরতার ফলে সেখানে ইসলাম সুপ্রতিষ্ঠিত হল। কেবল সামান্য সংখ্যক বৃদ্ধ লোকই তাদের পৌত্তলিক ধর্ম আঁকড়ে থাকল। তাদের মধ্যে 'আমর ইবন জামূহ ইবন যায়দ ইবন হারাম ইব্ন কা'ব ইব্ন গানম ইব্ন কা'ব ইব্ন সালামা উল্লেখ্যযোগ্য। তার পুত্র মু'আয ইব্ন আমর (রা) 'আকাবার বায়'আতে শরীক ছিলেন। আমর ইব্ন জামূহ ছিল সালামা গোত্রের একজন শ্রেষ্ঠ নেতা এবং অত্যন্ত মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তি। সে অন্যান্য উচ্চ শ্রেণীর লোকদের মত নিজ বাড়িতে একটি কাঠের প্রতিমা রেখেছিল। এর নাম ছিল মানাত। সে প্রতিমাটির সম্মান করত, সেটাকে পবিত্র রাখত এবং ইলাহরূপে এর পূজা করত।
📄 'আমরের প্রতিমার সাথে তার সম্প্রদায়ের শত্রুতা
ইসলাম গ্রহণের পর বনূ সালামার যুবকগণ-যথা মু'আয ইব্ন জাবাল (রা), আমরের পুত্র মু'আয, যিনি আকাবার বায়'আতেও শরীক ছিলেন, এরূপ যুবক শ্রেণী মিলিত হয়ে রাতের আঁধারে সে মূর্তির কাছে গিয়ে সেটাকে নিয়ে এসে সালামা গোত্রের একটি পূতিগন্ধময় গর্তে উল্টোমুখো করে ফেলে দিত। সকালবেলা আমর তার প্রতিমা না পেয়ে বলত, তোদের সর্বনাশ হোক। আজ রাতে কে আমাদের উপাস্যের সাথে এরূপ বেআদবী করল? এরপর সে তার প্রতিমার সন্ধানে বের হত এবং অনেক খোঁজাখুজির পর সেটাকে পেয়ে ধুয়ে পাক-পবিত্র করত এবং সুগন্ধি লাগিয়ে সযত্নে আগের স্থানে রাখত। তারপর বলত, হে দেবী! যদি জানতে পারি কে তোমার সাথে এরূপ গোস্তাখী করেছে, তবে আমি তাকে অবশ্যই কঠিন শাস্তি দেব। পরের রাতেও আমর ঘুমিয়ে পড়লে তার প্রতিমার দশা আগের মত হল। আর সে সকালে উঠে সেই দুর্গন্ধময় গর্ত থেকে সেটাকে তুলে এনে গোসল করিয়ে পাক-সাফ করল এবং আতর মাখিয়ে আগের স্থানে রাখল। কিন্তু এর পরের রাতেও এই অবস্থা ঘটল। এভাবে যখন চলতেই থাকল, তখন একদিন সে তার প্রতিমাকে উক্ত ময়লা-পঁচা গর্ত থেকে তুলে এনে গোসল দিয়ে সুগন্ধি মাখিয়ে আগের স্থানে বসানোর পর নিজের তরবারি এনে তার গলায় ঝুলিয়ে দিল এবং বলল: হে দেবী! আল্লাহ্র কসম! আমি জানি না, কে তোমার সাথে এরূপ আচরণ করে। অতএব যদি তোমার শক্তি থাকে, তবে তুমি নিজেকে রক্ষা কর। আর এ তরবারি তোমার সাথে থাকল।
কিন্তু এ রাতেও আমর ঘুমিয়ে যাওয়ার পর যুবকদল এসে প্রতিমার গলা থেকে তরবারি নিয়ে নিল এবং একটি মরা কুকুর এনে তার সাথে একরশিতে কষে বেঁধে দিল। এরপর সেটাকে বনূ সালামার একটি পূতিগন্ধময় কুয়ার ভেতর ফেলে দিল।
📄 আমরের ইসলাম গ্রহণ ও এ সম্পর্কে তাঁর কবিতা
সকালবেলা আমর গিয়ে দেখল প্রতিমা তার জায়গায় নেই। সে খুঁজতে খুঁজতে উক্ত কুয়ার ভেতর সেটাকে অধোমুখে দেখতে পেল। সে আরও দেখল তার সাথে একটি মরা কুকুর বাঁধা রয়েছে। যখন সেটাকে এ অবস্থায় দেখল, সে এ ব্যাপারে গভীরভাবে চিন্তা করল, আর তার সম্প্রদায়ের যারা ইসলাম কবুল করেছিল, তাদের মধ্য থেকে কতিপয় ব্যক্তি তার সাথে কথাবার্তাও বলল, তখন সে আল্লাহ্র রহমতে ইসলাম গ্রহণ করল। তার ইসলাম গ্রহণ ছিল আন্তরিকতায় পরিপূর্ণ। এ সময় তিনি একটি কবিতা পাঠ করেন, যাতে তিনি আল্লাহ্ সম্পর্কে তাঁর উপলব্ধি, দেবমূর্তির স্বরূপ এবং এর অসহায়ত্ব তুলে ধরেন এবং এতদিন তিনি যে বিভ্রান্তি ও অজ্ঞতায় নিমজ্জিত ছিলেন, তা থেকে নিষ্কৃতি দেওয়ার জন্য আল্লাহ্ তা'আলার শোকর আদায় করেন। তিনি বলেন:
والله لو كنت الها لم تكن * انت وكلب وسط بئر في قرن اف لملقاك الها مستدن * الان فتشناك عن شوء الغبن الحمد الله العلى ذى المنن * الواهب الرزاق ديان الدين هو الذي انقذني من قبل ان * اكون في ظلمة قبر مرتهن باحمد المهدى النبي المرتهن
"আল্লাহ্র কসম! তুমি যদি ইলাহ হতে, তা হলে কুকুরের সাথে একই কুয়ার মধ্যে পড়ে থাকতে না। ছিঃ ছিঃ! ইলাহ হয়েও তোমার এই পরিণতি, বস্তুত তোমার সম্পর্কে আমার নিকৃষ্টতম ভ্রান্তি এখনই ধরা পড়ল। মহান আল্লাহর প্রশংসা, যিনি অনুগ্রহশীল, দাতা, রুযী দানকারী এবং ধার্মিকদের বিনিময় দানকারী।
তিনিই সে সত্তা, যিনি কবরের আঁধার গহ্বরে যাওয়ার আগে আমাকে শিরক ও কুফরী থেকে নিষ্কৃতি দিয়েছেন। সৎপথ প্রদর্শনকারী, আমানতদার নবী আহমদ (সা)-এর মাধ্যমে।"