📄 মুস'আব ইবন 'উমায়র ও দ্বিতীয় 'আকাবার বায়'আত
ইবন ইসহাক বলেন: এরপর মুস'আব ইবন উমায়র (রা) মক্কায় প্রত্যাবর্তন করেন।
পরবর্তী হজ্জ মওসুমে কিছু সংখ্যক আনসার নও-মুসলিম তাদের গোত্রীয় পৌত্তলিকদের সাথে নিয়ে মক্কা আগমন করে। আল্লাহ্ তা'আলার ইচ্ছা ছিল তাদেরকে বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করা, তাদেরকে তাঁর নবীর সাহায্যকারীরূপে মনোনীত করা এবং এভাবে ইসলাম ও মুসলিমদের শক্তি বৃদ্ধি আর শির্ক ও মুশরিকদের মূলোৎপাটন করা। সেমতে মদীনা হতে আগত আনসারগণ কথা দিল তাকবীরে তাশরীকের দিনগুলোর মাঝামাঝি সময়ে তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে 'আকাবায় মিলিত হবে।
📄 বারা ইব্ন মা'রূর (রা) এবং কা'বার দিকে ফিরে তাঁর সালাত আদায়
ইবন ইসহাক বলেন: বনূ সালামার মা'বাদ ইব্ন কা'ব ইবন মালিক ইব্ন আবু কা'ব ইব্ন কায়ন আমার নিকট বর্ণনা করেন যে, তাঁর ভাই আবদুল্লাহ্ ইব্ন কা'ব—যিনি আনসারদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ আলিম ছিলেন, তাঁর কাছে বর্ণনা করেছেন যে, তাঁর পিতা কা'ব, যিনি 'আকাবায় হাযির ছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট বায়'আত করেছিলেন, তাঁর কাছে বর্ণনা করেছেন। তিনি [কা'ব (রা)] বলেন: আমরা আমাদের স্বগোত্রীয় পৌত্তলিকদের সাথে হজ্জে গমন করি। এর আগে আমরা সালাত আদায় করতাম এবং দীনী বিধি-বিধান সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করেছিলাম। বারা ইব্ন মা'রূরও আমাদের সফরসঙ্গী ছিলেন। তিনি ছিলেন আমাদের একজন গোত্র প্রধান এবং প্রধান ব্যক্তি। আমরা সফরের উদ্দেশ্যে যখন মদীনা ত্যাগ করলাম তখন তিনি আমাদের বললেন: হে লোক সকল! আমি একটি ব্যাপারে মত স্থির করেছি, আল্লাহর শপথ! জানি না তোমরা আমার সাথে এতে একমত হবে কিনা। আমরা জিজ্ঞেস করলাম: ব্যাপারটি কি? তিনি বললেন:
আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এখন থেকে আর কা'বাকে পেছনে রেখে নয়; বরং এর দিকে মুখ ফিরিয়ে সালাত আদায় করব।
আমরা বললাম: আমরা তো জানি আমাদের নবী শাম অর্থাৎ বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করেই সালাত আদায় করেন। আমরা তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করতে চাই না।
তিনি বললেন: যাই বল, আমি কা'বাকে সামনে রেখেই সালাত আদায় করব। আমরা তাকে বললাম: কিন্তু আমরা তা করব না।
কা'ব (রা) বলেন: এরপর সালাতের সময় হলে আমরা তো শামের দিক মুখ ফিরিয়ে সালাত আদায় করতাম, আর তিনি কা'বার দিকে মুখ করে সালাত আদায় করতেন। এভাবে আমরা মক্কায় পৌঁছলাম। আমরা সব সময়ই তার কাজের জন্য তাকে নিন্দা করতাম। কিন্তু তিনি তাতে অটল থাকেন। মক্কায় পৌছার পর তিনি আমাকে বললেন: ভাতিজা! আমাকে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দাও। আমি এ সফরে যা করলাম, সে সম্পর্কে তাঁকে জিজ্ঞেস করব। তোমরা যেহেতু আমার বিরোধিতা করেছ, তাই এ বিষয়ে আমার অন্তরে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে।
আমরা এ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে রওয়ানা হলাম। কিন্তু আমরা তাঁকে চিনতাম না। আর এর আগে আমরা তাঁকে দেখিনি। পথিমধ্যে মক্কার এক ব্যক্তির সাথে আমাদের দেখা হল। আমরা তার কাছে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ঠিকানা চাইলাম। সে জিজ্ঞেস করল : আপনারা তাঁকে চিনেন কি না? আমরা বললাম: না। সে বলল : আপনারা কি তাঁর চাচা আব্বাস ইব্ন আবদুল মুত্তালিবকে চেনেন? আমরা বললাম : হ্যাঁ।
কা'ব (রা) বলেন: আমরা আব্বাসকে চিনতাম। তিনি ব্যবসা উপলক্ষে আমাদের এখানে যাতায়াত করতেন।
লোকটি বলল: আপনারা মসজিদে প্রবেশ করলেই তাঁকে পাবেন। তিনি আব্বাসের পাশেই মসজিদে বসে আছেন। আমরা সোজা মসজিদে প্রবেশ করলাম। সেখানে আব্বাসকে বসা দেখলাম। আর দেখলাম তার পাশেই আল্লাহর রাসূল (সা) বসে আছেন। আমরা তাঁকে সালাম দিয়ে তাঁর সামনে বসে পড়লাম। তিনি আব্বাসকে বললেন: হে আবুল ফযল! আপনি কি এ দুই ব্যক্তিকে চেনেন? তিনি বললেন : হ্যাঁ। ইনি হচ্ছেন বারা ইব্ন মা'রূর, নিজ গোত্রের নেতা, আর ইনি কা'ব ইবন মালিক। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন, 'কবি কা'ব'? তিনি বললেন : হ্যাঁ। কা'ব (রা) বলেন: আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর এ কথাটুকু আমি কোনদিন ভুলব না।
বারা ইব্ন মা'রূর বললেন: হে আল্লাহ্ নবী! আল্লাহ্ তা'আলার মেহেরবানী তিনি আমাকে ইসলামের হিদায়াত দান করেছেন। আমি এ সফরে বের হয়ে মতস্থির করলাম, কা'বাকে পশ্চাৎদিকে রাখব না। সেমতে আমি কা'বার দিকে মুখ করে সালাত আদায় করেছি। আমার সহযাত্রীরা এতে আমার বিরোধিতা করে। ফলে আমার মনে দ্বিধা-দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আপনি এ ব্যাপারে কি বলেন? রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন: বায়তুল-মুকাদ্দাস তো কিবলাই ছিল। কাজেই ধৈর্য ধারণ করলেই ভাল হত।
এরপর বারা (রা) রাসূলুল্লাহ (সা)-এর অনুসৃত কিবলার দিকে মুখ করেন এবং আমাদের সংগে বায়তুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ ফিরিয়ে সালাত আদায় করেন। রাবী বলেন: তবে পরিবারবর্গের ধারণা, তিনি মৃত্যু পর্যন্ত কা'বামুখী হয়ে সালাত আদায় করেছেন কিন্তু সে ধারণা ঠিক নয়। তাঁর সম্পর্কে তাদের চাইতে আমরাই ভাল জানি।
ইবন হিশাম বলেন: 'আওন ইব্ন আইয়ূব আনসারী তাঁর এক কাসীদায় আবৃত্তি করেন:
ومنا المصلى أول الناس مقبلا × على كعبة الرحمن بين المشاعر
"হজ্জের স্থানসমূহে দয়াময় আল্লাহর কা'বার দিকে সর্বপ্রথম যিনি মুখ করে সালাত আদায় করেন, তিনি আমাদেরই লোক।"
এতে কবি বারা ইব্ন মা'রূর (রা)-এর প্রতিই ইঙ্গিত করেছেন।
📄 আবদুল্লাহ্ ইব্ন 'আমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণ
ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে মা'বাদ ইব্ন কা'ব বর্ণনা করেছেন যে, তার ভাই আবদুল্লাহ্ ইব্ন কা'ব তার নিকট বর্ণনা করেছেন যে, তার পিতা কা'ব ইবন মালিক (রা) তার কাছে বর্ণনা করেন, তিনি (কা'ব) বলেন: এরপর আমরা হজ্জ উপলক্ষে বের হলাম এবং ওয়াদা করলাম আইয়ামে তাশরীকের মাঝামাঝি এক রাতে আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে 'আকাবায় মিলিত হব। আমরা হজ্জের কার্যাদি সমাপ্ত করলাম। নবী (সা)-এর সঙ্গে সাক্ষাতের সে নির্দিষ্ট রাতও এসে গেল। আমাদের এক সঙ্গী ছিলেন আবূ জাবির আবদুল্লাহ্ ইব্ন আম্র ইবন হারাম। তিনি ছিলেন আমাদের একজন শ্রেষ্ঠ নেতা ও মর্যাদাবান ব্যক্তি। আমরা তাকে আমাদের সঙ্গে নিলাম। আর আমরা এ ব্যাপারটা আমাদের মুশরিক সফরসঙ্গীদের কাছ থেকে গোপন রাখছিলাম।
আমরা এ প্রসঙ্গে আবূ জাবিরের সাথে আলোচনা করলাম এবং তাকে বললাম: হে আবু জাবির! আপনি আমাদের একজন অন্যতম নেতা ও মর্যাদাবান ব্যক্তি। আমরা চাই না আপনি আপনার বর্তমান ধর্মাদর্শে বহাল থেকে আখিরাতে জাহান্নামের ইন্ধনে পরিণত হোন। এই বলে আমরা তাকে ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিলাম। তাঁকে এটাও জানালাম যে, এ রাতে আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে 'আকাবায় মিলিত হব। আবূ জাবির আমাদের দাওয়াতে সাড়া দিয়ে ইসলাম গ্রহণ করলেন এবং তিনি আমাদের সঙ্গে 'আকাবায় উপস্থিত হয়ে নকীবের মর্যাদা লাভ করলেন।
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর জন্য 'আব্বাসের প্রতিশ্রুতি গ্রহণ
রাবী বলেন: আমরা 'আকাবা গিরিসংকটে সমবেত হয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই তিনি এসে উপস্থিত হলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁর চাচা আব্বাস ইব্ন আবদুল মুত্তালিব। তখনও তিনি পূর্ব পুরুষের ধর্মে বিদ্যমান ছিলেন। তবে তিনি ভ্রাতুষ্পুত্রের এ আলোচনায় উপস্থিত থাকা ও তাঁর নিরাপত্তার ব্যাপারে তাদের থেকে অংগীকার গ্রহণ করাকে জরুরী মনে করেন। আসন গ্রহণের পর আব্বাস ইব্ন আবদুল মুত্তালিবই প্রথমে কথা বলেন। তিনি বললেন: হে খাযরাজ গোত্রের লোকেরা!
উল্লেখ্য যে, আরবদের কাছে তখন আওস ও খাযরাজ উভয় গোত্র সম্মিলিতভাবে খাযরাজ নামে অভিহিত হত।