📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 সুওয়ায়দ ইব্‌ন সামিত ও রাসূলুল্লাহ্ (সা)

📄 সুওয়ায়দ ইব্‌ন সামিত ও রাসূলুল্লাহ্ (সা)


ইবন ইসহাক বলেন: বর্ণিত আছে যে, আমর ইব্‌ন আওফ গোত্রের সুওয়ায়দ ইব্‌ন সামিত হজ্জ কিংবা উমরা উপলক্ষে মক্কায় আগমন করে। সুওয়ায়দ স্বগোত্রের নিকট কামিল (পূর্ণ) উপাধিতে ভূষিত ছিল। কারণ সে ছিল প্রভাব-প্রতিপত্তি, কাব্য প্রতিভা ও বংশ মর্যাদার একজন পরিপূর্ণ ব্যক্তি। সে বলত:
الا رب من تدعو صديقا ولو ترى × مقالته بالغيب سانك ما يفرى مقالته كالشهد ما كان شاهدا × وبالقيب مأثور على نفرة النحر من 127 يسرك باديه وتت أديمة × نميمة غش تبترى عقب الظهر
“শোন, এমন বহু লোক রয়েছে যাদের তুমি বন্ধু বলে ডাক, কিন্তু তার পশ্চাতের কথাবার্তা শুনলে তার মিথ্যাচার তোমাকে পীড়া দিত। সামনে উপস্থিত থাকাকালে তার কথা চর্বির মত নরম মনে হয়, কিন্তু পেছনে যা বলে, তা বক্ষদেশের চর্বির মত নরম মনে হয়। কিন্তু পেছনে বাহ্যিক দিক তোমাকে খুশি করে, কিন্তু তার চামড়ার নীচে কবটে গুপ্ত কথা, যা পৃষ্ঠদেশ বিদীর্ণ করে। সে যে হিংসা-বিদ্বেষ লুকিয়ে রাখে, তা তার রক্তচক্ষু তোমার কাছে প্রকাশ করে দেয়। আমার বিরুদ্ধাচরণে তুমি কাটিয়েছ দীর্ঘকাল, এখন তুমি আমার কিছু সাহায্য কর। কারণ সেই তো শ্রেষ্ঠ বন্ধু, যে সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে আসে এবং দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করে না।"
নিম্নের কবিতাটিও তারই। তার প্রেক্ষাপট এই যে, সুলায়ম গোত্রের শাখা বনূ যি'ব ইব্‌ন মালিক গোত্রের এক ব্যক্তির সাথে একশ' উট নিয়ে সুওয়ায়দের বিবাদ ছিল। সে আরবের একজন গণক স্ত্রীলোককে বিচারক মানে, সে তার পক্ষে ফয়সালা দেয়। এরপর তারা উভয়ে গণকের কাছ থেকে বিদায় নেয়। তাদের সাথে তৃতীয় কেউ ছিল না। যখন উভয়ের ভিন্ন রাস্তায় চলার সময় হল, তখন সুওয়ায়দ বনূ সুলায়মের লোকটিকে বলল ভাই, আমার উট আমাকে দিয়ে দাও। সে বলল: তোমার কাছে পাঠিয়ে দেব। তখন সুওয়ায়দ বলল: তুমি আমার হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার পর কে এর যামিন হবে? সে বলল: আমি তো রয়েছি। সুওয়ায়দ বলল: না, এরূপ হতে পারে না। আল্লাহর কসম! আমার উট বুঝিয়ে না দিয়ে তুমি কিছুতেই আমার থেকে বিদায় হতে পারবে না। তখন উভয়ের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়ে গেল। সুওয়ায়দ বনূ সুলায়মের লোকটিকে মাটিতে ফেলে দিল। তারপর তাকে রশি দিয়ে শক্ত করে বাঁধল এবং তাকে নিয়ে বনু আমর ইব্‌ন আওফের জনপদে গেল। সে আর তাকে ছাড়ল না। অবশেষে, বনূ সুলায়মের লোকেরা তার উট তার কাছে পাঠিয়ে দিল। তখন সে এ সম্পর্কে বলল:
ولا تحسبني يابن زعب بن مالك × كمن كنت تردى بالغيوب وتختل تحولت قرنا اذ صرعت بعزة × كذالك ان الحازم المتحول ضربت به ابط الشمال فلم يزل × على كل حال خذه هو اسفل
“হে যি'ব ইবন মালিকের বংশধর! তুমি আমাকে তাদের মত মনে করো না, যাদের তুমি বিরোধিতা করে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করছ এবং প্রতারিত করছ। আমি যখন তোমাকে আছাড় দিয়ে ফেলে ছিলাম, তখন তুমি তোমার প্রতিপক্ষকে তোমার পিঠের উপর উঠিয়ে নিলে। বস্তুত বুদ্ধিমান ব্যক্তি একস্থান হতে অন্যস্থানে যাওয়ার সময় এরূপ করে থাকে। আমি তাকে বাম বগলে চেপে ধরলাম, এরপর তার চেহারা সর্বাবস্থায় অধোমুখই থাকল।"
সে এ ঘটনাটি সুদীর্ঘ কবিতার মাঝে ব্যক্ত করত। তার আগমনের সংবাদ পেয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার সাথে সাক্ষাৎ করলেন এবং তাকে আল্লাহ্ ও ইসলামের পথে আহবান জানালেন। সুওয়ায়দ বলল: সম্ভবত আমার কাছে যা আছে, আপনার কাছেও তাই থেকে থাকবে? তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে জিজ্ঞেস করলেন : তোমার কাছে কি আছে? সুওয়ায়দ বলল: লুকমানের পণ্ডিত্যপূর্ণ বাণী সম্বলিত একখানি পুস্তক।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন : তুমি তা আমার সামনে পেশ কর। সুওয়ায়দ পেশ করল। তখন তিনি বললেন : চমৎকার। তবে আমার কাছে যা আছে, তা এর চাইতেও উত্তম। আর তা হচ্ছে কুরআন। আল্লাহ্ তা'আলা আমার প্রতি তা নাযিল করেছেন। এ কুরআন পথ-নির্দেশ ও আলো। তিনি তাকে কুরআন তিলাওয়াত করে শোনালেন। এরপর তাকে পুনরায় ইসলামের দাওয়াত দিলেন।
সুওয়াদ কুরআনের সে বাণী উপেক্ষা করতে পারলনা। সে মন্তব্য করল : এ বাণী সুন্দর বটে। এরপর সে রাসূলুল্লাহ্ (সা) হতে বিদায় নিয়ে মদীনায় নিজ গোত্রের কাছে চলে যায়। এর কিছুকাল পরেই খাযরাজ গোত্রের লোকেরা তাকে হত্যা করে। তার গোত্রের লোকেরা বলজী: আমরা মনে করি, সওয়ায়দ মুসলমান অবস্থায় নিহত হন। তিনি বুআস যুদ্ধের আগে নিহত হন।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 ইয়াস ইব্‌ন মু'আযের ইসলাম গ্রহণ ও আবুল হায়সারের বৃত্তান্ত

📄 ইয়াস ইব্‌ন মু'আযের ইসলাম গ্রহণ ও আবুল হায়সারের বৃত্তান্ত


ইবন ইসহাক বলেন : মাহমূদ ইব্‌ন লাবীদ হতে হুসায়ন ইব্‌ন আবদুর রহমান ইব্‌ 'আম্র ইবন সা'দ ইব্‌ন মু'আয আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, আবুল হায়সার আনাস ইব্‌ রাফি' যখন মক্কায় আসেন, তখন ইয়াস ইবন মালিক প্রমুখ আবদুল আশহাল গোত্রের কতিপয় যুবকও তার সাথে ছিল। খাযরাজ গোত্রের বিরুদ্ধে কুরায়শদের সাথে মৈত্রিচুক্তি করা ছিল তাদের আগমনের উদ্দেশ্য। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের আগমনের সংবাদ পেয়ে তাদের কাছে উপস্থিত হলেন এবং তাদের সাথে আলোচনায় বসলেন। তিনি তাদের বললেন : তোমরা যে উদ্দেশ্যে এসেছ, তার চাইতে উত্তম কিছু চাও কি?
তারা তাঁকে জিজ্ঞেস করল: তা কি? তিনি বললেন: আমি আল্লাহ্র রাসূল। আল্লাহ্ আমাকে তাঁর বান্দাদের কাছে পাঠিয়েছেন। আমি তাদেরকে এক আল্লাহ্র ইবাদত করতে বলি। তাঁর সংগে কোন কিছুর শরীক করতে নিষেধ করি। আল্লাহ্ আমার প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন। এরপর তিনি তাদের সামনে ইসলামের ব্যাখ্যা দিলেন এবং তাদেরকে কুরআন তিলাওয়াত করে শোনালেন।
রাবী বলেন: ইয়াস ইবন মু'আয ছিলেন তরুণ যুবক। তিনি বলে উঠলেন : হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহ্র কসম! তোমরা যে উদ্দেশ্যে এসেছ, এটা তার চাইতে উত্তম। তাঁর মন্তব্য শুনে আবুল হায়সার আনাস ইব্‌ন রাফি' একমুঠো ধূলো তুলে ইয়াস ইবন মু'আযের মুখে নিক্ষেপ করল। তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে লক্ষ্য করে বলল : আপনি আপনার ব্যাপারে আমাদের জড়াবেন না। আমার জীবনের কসম! আমরা ভিন্ন উদ্দেশ্যে এসেছি। তখন ইয়াস চুপ হয়ে গেলেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা)-ও তাদের থেকে উঠে আসলেন। তারা মদীনায় চলে গেল। এরপর আওস ও খাযরাজের মাঝে বু'আসের যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
এর কিছুদিন পরই ইয়াস ইব্‌ন মু'আযের ইন্তিকাল হয়ে যায়। মাহমূদ ইব্‌ন লাবীদ বলেন: তার অন্তিমকালে উপস্থিত ছিলেন এমন একজন তার স্বগোত্রীয় ব্যক্তি আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, তারা মৃত্যুকালে তাকে বার বার লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহু আকবর, আলহামদু লিল্লাহ্ এবং তাকে কালেমা তায়্যিবা, তাকবীর, তাহমীদ ও তাসবীহ, সুবহানাল্লাহ পাঠ করতে শুনেছে এবং সে অবস্থাতেই তার ইন্তিকাল হয়। তিনি যে ইসলাম নিয়েই ইন্তিকাল করেছেন, এ ব্যাপারে তারা ছিল নিঃসন্দেহ। বস্তুত রাসূলুল্লাহ (সা)-এর বক্তব্য যখন তিনি শুনেছিলেন, তখনই তার অন্তরে ইসলাম বদ্ধমূল হয়ে গিয়েছিল।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আনসারদের মধ্যে ইসলামের সূচনা

📄 আনসারদের মধ্যে ইসলামের সূচনা


এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 'আকাবায় একদল খাযরাজীর সাথে রাসূলুল্লাহ্ (সা)

📄 'আকাবায় একদল খাযরাজীর সাথে রাসূলুল্লাহ্ (সা)


ইবন ইসহাক বলেন: অবশেষে যখন আল্লাহ্ তা'আলার ইচ্ছা হল তাঁর দীনকে বিজয়ী করবেন, তাঁর নবীর সম্মান প্রতিষ্ঠিত করবেন এবং তাঁকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূর্ণ করবেন, তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) হজ্জ মওসুমে অন্যান্য সময়ের মত আরব গোত্রসমূহের মাঝে ইসলামের বাণী পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে বের হলেন। এই কর্মব্যস্ততার এক পর্যায়ে 'আকাবা নামক স্থানে একদল আনসারের সংগে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। তারা ছিল খাযরাজ গোত্রের লোক। আল্লাহর ফয়সালা ছিল তাদের মহা-কল্যাণে ভূষিত করার।
ইবন ইসহাক বলেন: 'আসিম ইবন 'উমর ইব্‌ন কাতাদা (র) তাঁর গোত্রীয় শায়খদের সূত্রে আমার কাছে বর্ণনা করেন, তারা বলেছেন, তাদের সাথে সাক্ষাৎ হলে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের জিজ্ঞেস করেন: তোমরা কারা? তারা বলল: আমরা খাযরাজ গোত্রের লোক। তিনি জিজ্ঞেস করেন: যারা ইয়াহুদীদের সাথে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ, তোমরা কি তারা: তারা বলল? হ্যাঁ।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তোমরা বসবে কি, আমি তোমাদের সংগে কিছু কথা বলব: তারা বলল: নিশ্চয়ই। এই বলে তারা তাঁর কাছে বসে পড়ল। তিনি তাদেরকে আল্লাহর পথে আহবান জানালেন এবং তাদের সামনে ইসলাম পেশ করলেন। তিনি তাদেরকে কুরআন তিলাওয়াত করেও শোনালেন।
রাবী বলেন: বস্তুত আল্লাহ্ তা'আলা তাদের মাঝে আগে থেকেই ইসলামের একটা পরিবেশ সৃষ্টি করে রেখেছিলেন। আর তা এভাবে যে, তারা ইয়াহূদীদের সাথে একই দেশে বাস করত। ইয়াহুদীরা ছিল আসমানী কিতাবের অধিকারী এবং জ্ঞান-বুদ্ধিসম্পন্ন এক জাতি। পক্ষান্তরে তারা ছিল মুশরিক ও পৌত্তলিক। ইয়াহুদীরা তাদের দেশ যবরদখল করে সেখানে নিজেদের প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিল। তাদের সাথে ইয়াহুদীদের কোন বিষয়ে কলহ-বিবাদ সৃষ্টি হলে ইয়াহুদীরা তাদের এই বলে শাসাত যে, শীঘ্রই এক নতুন নবীর আবির্ভাব ঘটবে। তাঁর আবির্ভাবের সময় অত্যাসন্ন। আমরা তাঁর অনুসারী হয়ে তোমাদের 'আদ ও ইরাম জাতির ন্যায় ধ্বংস করে দেব।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) আনসার প্রতিনিধি দলটির সাথে যখন আলাপ-আলোচনা করলেন এবং তাদের আল্লাহ্ দিকে দাওয়াত দিলেন, তখন তারা একে অন্যকে বলল: হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর কসম! নিশ্চিত জান ইনিই সেই নবী, যাঁর কথা বলে ইয়াহুদীরা তোমাদের শাসিয়ে থাকে। কাজেই তারা যেন তোমাদের আগে এঁর কাছে না আসতে পারে। তখনই তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আহবানে সাড়া দিল। তারা তাঁর প্রতি ঈমান আনল এবং ইসলাম কবুল করল। এরপর তারা বলল: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আমরা আমাদের সম্প্রদায়কে এমন পর্যায়ে রেখে এসেছি যে, তাদের মধ্যে যেরূপ পারস্পরিক শত্রুতা আছে, তা অন্য কোন জাতির মধ্যে নেই। আমরা আশাবাদী, আল্লাহ্ তা'আলা আমাদের গোটা সম্প্রদায়কে অচিরেই আপনার মাধ্যমে একতাবদ্ধ করে দেবেন। আমরা দেশে গিয়ে তাদের মাঝেও আপনার দীন প্রচার করব এবং আমরা যে ইসলাম গ্রহণ করেছি, তাদেরকেও তা গ্রহণ করতে বলব। আল্লাহ্ তা'আলা যদি তাদেরকে তা কবুল করার তাওফীক দান করেন। তবে আপনার চাইতে শক্তিশালী কেউ হবে না।
এরপর তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা) হতে বিদায় নিয়ে স্বদেশে চলে গেল। এ সময় তাদের অন্তর ছিল ঈমানে পরিপূর্ণ এবং বিশ্বাসে ভরপূর।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00