📄 বনূ হানীফাকে ইসলামের দাওয়াত
ইবন ইসহাক বলেন: আবদুল্লাহ ইব্ন কা'ব ইবন মালিকের সূত্রে আমাদের জনৈক সাথী আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বনূ হানীফার তাঁবুতে গিয়ে তাদেরকে আল্লাহ্ দিকে ডাকেন এবং তাদের সামনে নিজেকে পেশ করেন। কিন্তু তাদের মত নিকৃষ্টভাবে তাঁর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান আর কোন আরব গোত্র করেনি।
📄 বনু আমিরকে ইসলামের দাওয়াত
ইবন ইসহাক বলেন: ইমাম যুহরী আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বনু আমির ইবন সা'সা'আর তাঁবুতে পৌঁছে তাদেরকে আল্লাহর প্রতি আহবান করেন এবং তাদের সামনে নিজকে পেশ করেন। তাদের মধ্যে বায়হারা ইব্ন ফিরাস নামে এক লোক ছিল। ইন্ন হিশাম তার বংশ তালিকা এরূপ বর্ণনা করেন: ফিরাস ইব্ন আব্দুল্লাহ্ ইব্ন সালামা (ঝাল-খায়র) ইব্ন কুশায়র ইব্ন কা'ব ইব্ন রবী'আ ইবন আমির ইবন সা'সা'আ। বায়হারা বলে উঠল: আল্লাহর কসম! আমি যদি এই কুরায়শ যুবককে গ্রহণ করি, তাহলে সারা আরব জাহানকে আমি গ্রাস করতে পারব। এরপর সে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে লক্ষ্য করে বলল:
আমরা যদি আপনার ধর্মাদর্শ গ্রহণ করে আপনার আনুগত্য স্বীকার করি, এরপর আল্লাহ্ তা'আলা আপনাকে আপনার প্রতিপক্ষের উপর বিজয়ী করেন, তবে আপনার পরে কি আমরা ক্ষমতা লাভ করব?
তিনি বললেন: সকল কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা আল্লাহ্রই হাতে। তিনি যাকে ইচ্ছা তা দান করেন। বায়হারা বলল: বটে, আপনি আপনার জন্য আমাদের বক্ষকে সারা আরব সম্প্রদায়ের অস্ত্রের লক্ষ্য বানাবেন, আর বিজয় লাভের পর কর্তৃত্ব পাবে অন্যরা? আমাদের কোন দরকার নেই আপনার দাওয়াত গ্রহণের। এভাবে তারাও তাঁকে প্রত্যাখ্যান করল।
হজ্জ শেষে অপরাপর লোকের মত বনূ আমির গোত্রও দেশে ফিরে গেল। তাদের এক বয়োবৃদ্ধ মুরব্বী ছিল। অনেক তার বয়স। তাদের সাথে হজ্জে যাওয়ার শক্তি সে রাখত না। প্রতি বছর তারা হজ্জ থেকে ফিরে এসে তাকে সে বছরের হজ্জের বিবরণ শোনাত। বরাবরের মত এ বছরও তারা ফিরে আসলে, সে তাদের কাছে হজ্জের ঘটনাবলী জিজ্ঞেস করল। তারা বলল: এবার জনৈক কুরায়শী যুবক আমাদের কাছে এসেছিল। সে আবদুল মুত্তালিবের বংশধর। তার দাবি, সে নবী। আমাদেরকে তাঁর ধর্মাদর্শ গ্রহণ ও তাঁর পার্শ্বে দাঁড়ানোর দাওয়াত দিয়েছিল। আরও প্রস্তাব করেছিল, তাকে আমাদের দেশে নিয়ে আসি। এ কথা শুনে বৃদ্ধ মাথায় হাত দিল। তারপর বলল: হে বনু 'আমির! এর কি কোন ক্ষতি পূরণের ব্যবস্থা আছে? যা হারিয়েছ, তা কি আর ফিরে পাওয়া সম্ভব? আল্লাহর কসম! ইসমাঈলের বংশে কেউ কখনও মিথ্যা নবুওয়াতের দাবি করেনি। তার দাবি সত্য। তোমরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে কি করে ভুল করলে?
📄 আরব গোত্রসমূহের মাঝে দাওয়াতী প্রচেষ্টা
ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) এভাবে অবিরাম কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। যখনই কোন মেলা বসত, তিনি আগত আরব গোত্রসমূহের কাছে গিয়ে তাদেরকে আল্লাহর প্রতি আহবান করতেন, ইসলামের দাওয়াত দিতেন এবং তাদের সামনে নিজেকে ও আল্লাহ্র পক্ষ হতে আনীত হিদায়াত ও রহমতের বাণী পেশ করতেন। যখনই শুনতেন, মক্কায় কোন সম্মানিত বহিরাগতের উপস্থিতি ঘটেছে, তখন তিনি তার কাছে হাযির হয়ে তাকে আল্লাহ্র প্রতি আহবান জানাতেন ও ইসলামের দাওয়াত দিতেন।
📄 সুওয়ায়দ ইব্ন সামিত ও রাসূলুল্লাহ্ (সা)
ইবন ইসহাক বলেন: বর্ণিত আছে যে, আমর ইব্ন আওফ গোত্রের সুওয়ায়দ ইব্ন সামিত হজ্জ কিংবা উমরা উপলক্ষে মক্কায় আগমন করে। সুওয়ায়দ স্বগোত্রের নিকট কামিল (পূর্ণ) উপাধিতে ভূষিত ছিল। কারণ সে ছিল প্রভাব-প্রতিপত্তি, কাব্য প্রতিভা ও বংশ মর্যাদার একজন পরিপূর্ণ ব্যক্তি। সে বলত:
الا رب من تدعو صديقا ولو ترى × مقالته بالغيب سانك ما يفرى مقالته كالشهد ما كان شاهدا × وبالقيب مأثور على نفرة النحر من 127 يسرك باديه وتت أديمة × نميمة غش تبترى عقب الظهر
“শোন, এমন বহু লোক রয়েছে যাদের তুমি বন্ধু বলে ডাক, কিন্তু তার পশ্চাতের কথাবার্তা শুনলে তার মিথ্যাচার তোমাকে পীড়া দিত। সামনে উপস্থিত থাকাকালে তার কথা চর্বির মত নরম মনে হয়, কিন্তু পেছনে যা বলে, তা বক্ষদেশের চর্বির মত নরম মনে হয়। কিন্তু পেছনে বাহ্যিক দিক তোমাকে খুশি করে, কিন্তু তার চামড়ার নীচে কবটে গুপ্ত কথা, যা পৃষ্ঠদেশ বিদীর্ণ করে। সে যে হিংসা-বিদ্বেষ লুকিয়ে রাখে, তা তার রক্তচক্ষু তোমার কাছে প্রকাশ করে দেয়। আমার বিরুদ্ধাচরণে তুমি কাটিয়েছ দীর্ঘকাল, এখন তুমি আমার কিছু সাহায্য কর। কারণ সেই তো শ্রেষ্ঠ বন্ধু, যে সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে আসে এবং দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করে না।"
নিম্নের কবিতাটিও তারই। তার প্রেক্ষাপট এই যে, সুলায়ম গোত্রের শাখা বনূ যি'ব ইব্ন মালিক গোত্রের এক ব্যক্তির সাথে একশ' উট নিয়ে সুওয়ায়দের বিবাদ ছিল। সে আরবের একজন গণক স্ত্রীলোককে বিচারক মানে, সে তার পক্ষে ফয়সালা দেয়। এরপর তারা উভয়ে গণকের কাছ থেকে বিদায় নেয়। তাদের সাথে তৃতীয় কেউ ছিল না। যখন উভয়ের ভিন্ন রাস্তায় চলার সময় হল, তখন সুওয়ায়দ বনূ সুলায়মের লোকটিকে বলল ভাই, আমার উট আমাকে দিয়ে দাও। সে বলল: তোমার কাছে পাঠিয়ে দেব। তখন সুওয়ায়দ বলল: তুমি আমার হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার পর কে এর যামিন হবে? সে বলল: আমি তো রয়েছি। সুওয়ায়দ বলল: না, এরূপ হতে পারে না। আল্লাহর কসম! আমার উট বুঝিয়ে না দিয়ে তুমি কিছুতেই আমার থেকে বিদায় হতে পারবে না। তখন উভয়ের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়ে গেল। সুওয়ায়দ বনূ সুলায়মের লোকটিকে মাটিতে ফেলে দিল। তারপর তাকে রশি দিয়ে শক্ত করে বাঁধল এবং তাকে নিয়ে বনু আমর ইব্ন আওফের জনপদে গেল। সে আর তাকে ছাড়ল না। অবশেষে, বনূ সুলায়মের লোকেরা তার উট তার কাছে পাঠিয়ে দিল। তখন সে এ সম্পর্কে বলল:
ولا تحسبني يابن زعب بن مالك × كمن كنت تردى بالغيوب وتختل تحولت قرنا اذ صرعت بعزة × كذالك ان الحازم المتحول ضربت به ابط الشمال فلم يزل × على كل حال خذه هو اسفل
“হে যি'ব ইবন মালিকের বংশধর! তুমি আমাকে তাদের মত মনে করো না, যাদের তুমি বিরোধিতা করে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করছ এবং প্রতারিত করছ। আমি যখন তোমাকে আছাড় দিয়ে ফেলে ছিলাম, তখন তুমি তোমার প্রতিপক্ষকে তোমার পিঠের উপর উঠিয়ে নিলে। বস্তুত বুদ্ধিমান ব্যক্তি একস্থান হতে অন্যস্থানে যাওয়ার সময় এরূপ করে থাকে। আমি তাকে বাম বগলে চেপে ধরলাম, এরপর তার চেহারা সর্বাবস্থায় অধোমুখই থাকল।"
সে এ ঘটনাটি সুদীর্ঘ কবিতার মাঝে ব্যক্ত করত। তার আগমনের সংবাদ পেয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার সাথে সাক্ষাৎ করলেন এবং তাকে আল্লাহ্ ও ইসলামের পথে আহবান জানালেন। সুওয়ায়দ বলল: সম্ভবত আমার কাছে যা আছে, আপনার কাছেও তাই থেকে থাকবে? তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে জিজ্ঞেস করলেন : তোমার কাছে কি আছে? সুওয়ায়দ বলল: লুকমানের পণ্ডিত্যপূর্ণ বাণী সম্বলিত একখানি পুস্তক।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন : তুমি তা আমার সামনে পেশ কর। সুওয়ায়দ পেশ করল। তখন তিনি বললেন : চমৎকার। তবে আমার কাছে যা আছে, তা এর চাইতেও উত্তম। আর তা হচ্ছে কুরআন। আল্লাহ্ তা'আলা আমার প্রতি তা নাযিল করেছেন। এ কুরআন পথ-নির্দেশ ও আলো। তিনি তাকে কুরআন তিলাওয়াত করে শোনালেন। এরপর তাকে পুনরায় ইসলামের দাওয়াত দিলেন।
সুওয়াদ কুরআনের সে বাণী উপেক্ষা করতে পারলনা। সে মন্তব্য করল : এ বাণী সুন্দর বটে। এরপর সে রাসূলুল্লাহ্ (সা) হতে বিদায় নিয়ে মদীনায় নিজ গোত্রের কাছে চলে যায়। এর কিছুকাল পরেই খাযরাজ গোত্রের লোকেরা তাকে হত্যা করে। তার গোত্রের লোকেরা বলজী: আমরা মনে করি, সওয়ায়দ মুসলমান অবস্থায় নিহত হন। তিনি বুআস যুদ্ধের আগে নিহত হন।