📄 তায়েফের তিন প্রধান ব্যক্তির সাথে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাক্ষাৎ এবং তাঁর বিরুদ্ধে উস্কানি
ইবন ইসহাক বলেন: ইয়াযীদ ইব্ন যিয়াদ আমার নিকট মুহাম্মদ ইব্ন কা'ব কুরাযী হতে বর্ণনা করেছেন যে, তায়েফ পৌঁছার পর রাসূলুল্লাহ (সা) সাকীফ গোত্রের তিন ভাইয়ের কাছে গেলেন। তারা ছিল এ গোত্রের সব চাইতে গন্যমান্য ব্যক্তি। তাদের নাম হল: 'আব্দ ইয়ালীল ইবন 'আমর ইবন 'উমায়র, মাসউদ ইব্ন আমর ইবুন 'উমায়র ও হাবীব ইবন 'আমর ইব্ন উমায়র ইবন 'আওফ ইব্ন উকদা ইন্ন গীরা ইবন 'আওফ ইব্ন সাকীফ। তাদের একজন কুরায়শের শাখা জুমাহ গোত্রে বিবাহ করেছিল।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) এ তিন ভাইয়ের কাছে বসে তাদের আল্লাহ্ দীন গ্রহণের দাওয়াত দিলেন এবং ইসলামের প্রচারকার্যে তাঁকে সাহায্য করার ও বিরুদ্ধবাদীদের প্রতিরোধ করার জন্য তিনি তাদের সাহায্য চাইলেন।
তখন তাদের একজন বলল: আল্লাহ যদি তোমাকে রাসূল করে পাঠিয়ে থাকেন, তাহলে আমি কা'বার গিলাফ টুকরা টুকরা করে ফেলে দেব।
দ্বিতীয়জন বলল: আল্লাহ্ কি তোমাকে ব্যতীত অন্য কাউকে পেলেন না রাসূলরূপে প্রেরণের জন্য?
তৃতীয়জন বলল: আল্লাহ্র কসম! আমি তোমার সঙ্গে কোন কথা বলব না। কারণ তুমি নিজ দাবি অনুযায়ী সত্যিই যদি রাসূল হয়ে থাক, তবে তোমার কথা প্রত্যাখ্যান করা মহাবিপজ্জনক। পক্ষান্তরে তুমি যদি আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ কর, তবে তোমার সাথে আমার কথা বলা উচিত নয়। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের কাছ থেকে উঠে গেলেন এবং সাকীফের কল্যাণের ব্যাপারে নিরাশ হলেন। এ সময় তিনি তাদের বললেন, যা আমার কাছে বর্ণনা করা হয়েছে: 'যে আচরণ তোমরা করলে, যদি এটাই তোমাদের সিদ্ধান্ত হয়ে থাকে, তবে তোমরা আমার ব্যাপারটি গোপন রাখবে।' কেননা রাসূলুল্লাহ্ (সা) এরূপ আশংকা করছিলেন যে, তাদের থেকে কুরায়শদের কাছে এ সংবাদ পৌঁছলে তাঁর উপর তাদের ঔদ্ধত্য আরও বেড়ে যাবে। ইব্ন হিশাম বলেন: কবি উবায়দ ইব্ন আবরাসের কবিতায় আছে:
ولقد اتاني عن تميم انهم × ذكروا لقتلي عامر وتعصبوا
"বনূ তামীম সম্পর্কে আমার কাছে খবর এসেছে যে, তারা আমির গোত্রের নিহতদের নিয়ে ঔদ্ধত্য ও হঠকারিতা করছে।"
কিন্তু তারা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ঐ অনুরোধও রক্ষা করল না; বরং তারা তাঁকে গালাগাল ও অপদস্থ করার নিমিত্তে তাদের নির্বোধ ও দাস শ্রেণীর লোকদের লেলিয়ে দিল, যারা তাঁকে গালাগালি করতে লাগল এবং বিভিন্ন ধ্বনি দিতে থাকল। এমনকি একদল লোক তাঁকে ঘিরে ফেলল।' তখন তিনি 'উতবা ইব্ন রবী'আ ও শায়বা ইব্ন রবী'আর ফলের বাগানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হলেন। তারা দু'ভাই তখন বাগানেই ছিল। সাকীফ গোত্রের যে বখাটে লোকগুলো তাঁর পিছু নিয়েছিল, তখন তারা সব ফিরে গেল। তিনি একটি আঙ্গুর গাছের ছায়ায় গিয়ে বসলেন। রবী'আর দুই ছেলে তাঁকে দেখছিল এবং তারা তায়েফের অর্বাচীন লোকেরা তাঁর সংগে যে আচরণ করছিল, তা প্রত্যক্ষ করছিল।
বর্ণিত আছে যে, সাকীফ গোত্রে জুমাহ্ গোত্রের যে মহিলাটির বিবাহ হয়েছিল, তার সাথে রাসূলুল্লাহ্ (সা) দেখা করে তাকে বলেছিলেন: তোমার স্বামীর জ্ঞাতি-গোষ্ঠী আমার সাথে এটা কি ধরনের আচরণ করল?
📄 আল্লাহ্র কাছে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ফরিয়াদ
এরপর একটু শান্ত হয়ে নবী (সা) আল্লাহ্র কাছে দু'আ করলেন:
اللهم اليك اشكو ضعف قوتي وقلة حيلتي - وهواني على الناس - يا ارحم الراحمين - انت رب المستصعفين - وانت ربي - الى من تكلني ؟ الى بعيد يتجهمنى ؟ ام الى عدو ملكته امری ؟ ان لم يكن بك على غضب فلا ابالي ولكن عافيتك هي اوسع لي اعوذ بنور وجهك الذي اشرقت له الظلمات - وصلح عليه امر الدنيا والآخرة من ان تنزل بي غضبك - أو يحل على سخطك - لك العتبى حتى ترضى ولاحول ولاقوة الابك .
"হে আল্লাহ্! আমার অক্ষমতা ও সহায়-সম্বলহীনতা এবং মানুষের কাছে আমার নগণ্যতার জন্য আমি আপনারই কাছে ফরিয়াদ করছি। হে পরম দয়াময়! আপনি দুর্বলদের প্রতিপালক। আপনি আমার রব। আপনি আমাকে কার হাতে সোপর্দ করছেন? আমার প্রতি যে নিষ্ঠুর আচরণ করে, সেই অনাত্মীয়ের হাতে? নাকি সেই শত্রুর হাতে যাকে আমার উপর কর্তৃত্ব দান করেছেন? আমার প্রতি যদি আপনার অসন্তুষ্টি না থাকে, তবে আমি কোন কিছুর পরওয়া করি না। আপনার প্রদত্ত নিরাপত্তাই আমার শ্রেষ্ঠ অবলম্বন। আমার প্রতি আপনার ক্রোধ কিংবা আপনার অসন্তুষ্টি বর্ষণ হতে আমি আপনার সেই নূরের আশ্রয় চাই, যদ্দ্বারা সকল অন্ধকার তিরোহিত হয়ে যায় এবং দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্যাসমূহের সুরাহা হয়। সব কিছুর শেষ পরিণাম আপনি ছাড়া আর কারো ক্ষতি প্রতিহত করার এবং উপকার করার ক্ষমতা নেই।
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে খ্রিস্টান গোলাম আদ্দাসের আচরণ প্রসঙ্গে
রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর এহেন দুরবস্থা ও তাঁর প্রতি কাফিরদের নির্মম আচরণ লক্ষ্য করে অবশেষে উতবা ও শায়বা ভ্রাতৃদ্বয়ের অন্তর তাঁর আত্মীয়তার টানে বিচলিত হয়ে উঠল। 'আদ্দাস নামক তাদের এক খ্রিস্টান গোলাম ছিল। তারা তাকে ডেকে বলল : এই পাত্রে কিছু আঙ্গুর নিয়ে ঐ লোকটির কাছে যাও এবং তাকে খেতে বল। আদ্দাস সে নির্দেশ পালন করল। সে আঙ্গুরভর্তি পাত্রটি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সামনে নিয়ে রাখল এবং বলল খান। তিনি বিসমিল্লাহ্ বলে তা খেতে শুরু করলেন।
'আদ্দাস তা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চেহারার দিকে তাকাল। এরপর বলল: আল্লাহ্ কসম! এ বাক্য তো এ দেশের মানুষ বলে না! তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে জিজ্ঞেস করলেন: আচ্ছা তুমি কোন দেশের লোক হে 'আদ্দাস? তোমার ধর্মই বা কি? সে বলল: আমি খ্রিস্টান। আমি নীনাওয়ার অধিবাসী। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তুমি তা হলে নেককার ইউনুস ইব্ন মাত্তার এলাকার মানুষ? আদ্দাস বলল: ইউনুস ইব্ন মাত্তা সম্পর্কে আপনি জানেন কি করে? তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: তিনি তো আমার ভাই। তিনি নবী ছিলেন; আমিও একজন নবী। এ কথা শোনামাত্র আদ্দাস রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর পায়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ল এবং তাঁর মাথায়, হাতে ও পায়ে চুমু খেতে লাগল।
এ দৃশ্য দেখে রবী'আর পুত্রদ্বয় একে অপরকে বলতে লাগল: আরে, লোকটা যে গোলামটাকে নষ্ট করে দিল। সে তাদের কাছে ফিরে আসলে তারা তাকে বলল: ছিঃ আদ্দাস! তোমার কি হল যে লোকটার মাথায়, হাতে ও পায়ে চুমু খেলে? সে বলল: হে আমার মনিব! ভূ-পৃষ্ঠে তাঁর চাইতে উত্তম লোক আর নেই। তিনি আমাকে এমন একটা কথা জানিয়েছেন, যা নবী ছাড়া কেউ জানে না। তারা তাকে ধিক্কার দিয়ে বলল: আদ্দাস! সে তোমাকে ধর্মান্তরিত করে না ফেলে। তোমার ধর্ম তাঁর ধর্ম অপেক্ষা উৎকৃষ্ট।
📄 একদল জিন কর্তৃক রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কুরআন তিলাওয়াত শ্রবণ এবং তাদের ঈমান আনয়ন প্রসঙ্গে
বনু সাকীফের ব্যাপারে হতাশ হয়ে নবী (সা) তায়েফ থেকে মক্কায় ফিরে চললেন। নাখলা উপত্যকায় পৌঁছে তিনি মধ্যরাতে সালাত আদায় করছিলেন, এ সময় নাসীবীনের সাতজন জিনের একটি দল সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। তারা মনোযোগ দিয়ে তাঁর কুরআন তিলাওয়াত শুনল। তাঁর সালাত শেষ হলে, তারা নিজ সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গেল এবং তাদের সতর্ক করল। তারা এ বাণী শোনামাত্রই ঈমান এনে তা কবুল করে নিয়েছিল। তাদের সে ঘটনা আল্লাহ্ তা'আলা ওহী মারফত নবী (সা)-কে অবগত করেন। ইরশাদ হচ্ছে:
وَإِذْ صَرَفْنَا إِلَيْكَ نَفَراً مِّنَ الْجِنِّ يَسْتَمِعُونَ الْقُرْآنَ . ... وَيُجْرْكُمْ مِّنْ عَذَابِ اليم
"স্মরণ করুন, আমি আপনার প্রতি আকৃষ্ট করেছিলাম একদল জিনকে যারা কুরআন পাঠ শুনছিল, যখন তারা তার নিকট উপস্থিত হল, তারা একে অপরকে বলতে লাগল, চুপ করে শ্রবণ কর। যখন কুরআন পাঠ সমাপ্ত হল, তারা তাদের সম্প্রদায়ের নিকট ফিরে গেল সতর্ককারীরূপে—তারা বলেছিল, হে আমাদের সম্প্রদায়! আমরা এমন এক কিতাবের পাঠ শ্রবণ করেছি, যা অবতীর্ণ হয়েছে মূসার পরে; এটা তার পূর্ববর্তী কিতাবকে সমর্থন করে এবং সত্য ও সরল পথের দিকে পরিচালিত করে। হে আমাদের সম্প্রদায়! আল্লাহ্ দিকে আহবানকারীর প্রতি সাড়া দাও এবং তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর। আল্লাহ্ তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন এবং মর্মন্তুদ শাস্তি হতে তোমাদের রক্ষা করবেন।" (৪৬: ২৯-৩১)
আরও ইরশাদ হচ্ছে : قُلْ أُوحِيَ إِلَى أَنَّهُ اسْتَمَعَ نَفَرٌ مِّنَ الجن "বলুন, আমার প্রতি ওহী প্রেরিত হয়েছে যে, জিনদের একটি দল মনোযোগ সহকারে শ্রবণ করেছে এবং বলেছে, আমরা তো এক বিস্ময়কর কুরআন শ্রবণ করেছি।" (৭২: ১) এ সূরায় পূর্ণ ঘটনাটি বিধৃত হয়েছে।