📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আবু তালিব ও খাদীজা (রা)-এর ইন্তিকালের পর তাঁর প্রতি মুশরিকদের ক্রমবর্ধমান নির্যাতন

📄 আবু তালিব ও খাদীজা (রা)-এর ইন্তিকালের পর তাঁর প্রতি মুশরিকদের ক্রমবর্ধমান নির্যাতন


ইবন ইসহাক বলেন: খাদীজা বিন্ত খুওয়ায়লিদ (রা) ও আবু তালিব একই বছর ইন্তিকাল করেন। তাঁদের মৃত্যুতে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর প্রতি কাফিরদের নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। খাদীজা (রা) ছিলেন ইসলাম প্রচারে তাঁর ঘনিষ্ঠতম সহযোগী। বিপদ-আপদের কথা তিনি একমাত্র তাঁরই কাছে এসে প্রকাশ করতেন। আর আবূ তালিব ছিলেন তাঁর প্রচারকার্যের পক্ষে এক মযবুত শক্তি এবং তাঁর প্রতিরক্ষক। কুরায়শদের হাত থেকে তিনিই তাঁকে রক্ষা করতেন এবং সুখে-দুঃখে তাঁর পাশে দাঁড়াতেন। তাঁদের ইন্তিকাল হয়েছিল মদীনায় হিজরতের তিন বছর আগে।
আবূ তালিবের ইন্তিকালের পর কুরায়শরা রাসূলুল্লাহ (সা)-এর উপর এমন নির্যাতন শুরু করে দিল, যা তাঁর জীবদ্দশায় তারা আশা করতে পারেনি। এমনকি একদিন তাদের জনৈক নীচাশয় ব্যক্তি পথিমধ্যে তাঁর মাথায় ধূলো নিক্ষেপ করে।
ইবন ইসহাক বলেন: হিশাম ইব্‌ন উরওয়া তার পিতা উরওয়া ইব্‌ন যুবায়রের সূত্রে আমার নিকট বর্ণনা করেন, তিনি বলেছেন: অর্বাচীন লোকটি নবী (সা)-এর মাথায় ধূলো নিক্ষেপ করলে তিনি তা নিয়ে বাড়িতে ঢোকেন। এ অবস্থা দেখে তাঁর এক কন্যা ছুটে আসেন এবং কেঁদে কেঁদে তা ধুয়ে পরিষ্কার করে দেন। নবী (সা) তখন তাঁকে বলছিলেন: মা, তুমি কেঁদ না, আল্লাহ্ তা'আলাই তোমার পিতাকে রক্ষা করবেন। এ পর্যায়ে তিনি বলতেন: আবু তালিবের ইন্তিকালের আগে কুরায়শরা আমার প্রতি কোনরূপ দুর্ব্যবহারের সাহস করেনি।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 অন্তিম শয্যায় আবূ তালিব রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে আপোস-রফা করে দেওয়ার জন্য তাদের কাছে মুশরিকদের অনুরোধ

📄 অন্তিম শয্যায় আবূ তালিব রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে আপোস-রফা করে দেওয়ার জন্য তাদের কাছে মুশরিকদের অনুরোধ


ইবন ইসহাক বলেন: আবু তালিব রোগাক্রান্ত হওয়ার পর তার চরম অবস্থার কথা যখন কুরায়শদের কানে পৌঁছল, তখন তারা একে অপরকে বলল, হামযা ও উমর তো ইতোমধ্যে ইসলাম গ্রহণ করেছে। আর কুরায়শের সকল শাখাগোত্রে মুহাম্মদের ধর্মাদর্শ ছড়িয়ে পড়েছে। চলো আমরা আবূ তালিবের কাছে যাই যাতে তিনি মধ্যস্থতা করে তাঁর ভাতিজা ও আমাদের মধ্যে একটা কিছু চুক্তি সম্পন্ন করে দেন। আল্লাহর কসম! আমরা আশংকা করছি যে, অদূর ভবিষ্যতে তারা আমাদের উপর বিজয়ী হবে।
ইবন ইসহাক বলেন: ইব্‌ন আব্বাস (রা) হতে আব্বাস ইব্‌ন আবদুল্লাহ ইব্‌ন মা'বাদ ইব্‌ন আব্বাস তাঁর পরিবারের জনৈক ব্যক্তির সূত্রে আমার কাছে বর্ণনা করেন যে, প্রতিনিধি দলটি আবূ তালিবের সাথে সাক্ষাৎ করে এ বিষয়ে তার সাথে আলোচনা করল। এদের মধ্যে ছিল উতবা ইবন রাবী'আ, শায়বা ইবন রাবী'আ, আবু জাহল ইব্‌ন হিশাম, উমাইয়া ইব্‌ন খাল্‌ল্ফ, আবূ সুফইয়ান ইবন হারব প্রমুখ বড় বড় গোত্র প্রধান। তারা বলল: হে আবূ তালিব! আমাদের মাঝে আপনার মর্যাদা সুবিদিত। আপনার এখন অন্তিম লগ্ন। আপনার জীবন সম্পর্কে আমরা শংকিত। আমাদের ও আপনার ভাতিজার মধ্যে যা চলছে, তাও আপনার অজানা নয়। আপনি তাকে ডাকুন এবং আমাদের ও তাঁর মধ্যে একটা আপস-নিষ্পত্তি করে দিন। যাতে সে আমাদের বিরুদ্ধে কিছু না বলে এবং আমরাও তাকে কিছু না বলি। সে আমাদের ধর্মাদর্শ নিয়ে আমাদের থাকতে দেবে এবং আমরা তাকে তার দীন নিয়ে থাকতে দেব।
আবূ তালিব রাসূলুল্লাহ (সা)-কে ডেকে পাঠালেন। তিনি এলে পরে আবু তালিব তাঁকে সম্বোধন করে বললেন: হে আমার ভাতিজা! এরা তোমার সম্প্রদায়ের নেতৃবর্গ। তোমার ব্যাপারে তারা এখানে সমবেত হয়েছে। তারা চায়, তারা তোমাকে একটা প্রতিশ্রুতি দেয়, তুমিও তাদের একটা প্রতিশ্রুতি দাও।
তখন রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন: ঠিক আছে, তোমরা আমাকে একটামাত্র কথা দাও, যার ফলে তোমরা আরব জাহানের অধিকর্তা হয়ে যাবে এবং অনারব বিশ্ব তোমাদের বশ্যতা স্বীকার করবে। আবু জাহল বলল: বেশ! তোমার পিতার কসম, এরূপ হলে একটা কেন, আমরা দশটা কথা দিতে রাখী। তিনি বললেন: তা হলে তোমরা বল, لا اله الا الله (আল্লাহ্ ছাড়া কোন ইলাহ্ নেই)। তিনি ব্যতীত আর যাদের পূজা-অর্চনা তোমরা কর, তাদের সকলকে পরিত্যাগ কর।
এ কথা শুনে তারা একযোগে হাতে তালি দিয়ে উঠল। তারা বলল, হে মুহাম্মদ! তুমি সকল ইলাহকে এক ইলাহে পর্যবসিত করতে চাও? আশ্চর্য তোমার কথা! এরপর তারা একে অপরকে বলল: আল্লাহ্র কসম! এ লোক তোমাদের ইন্সিত কোন প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেবে না, চলো ফিরে যাই। আমরা বাপ-দাদার ধর্ম পালন করতে থাকি। দেখা যাক আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর ও আমাদের মাঝে কি ফায়সালা করেন। এই বলে তারা সেখান থেকে চলে গেল।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মনে আবু তালিবের ইসলাম গ্রহণের আশাবাদ

📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মনে আবু তালিবের ইসলাম গ্রহণের আশাবাদ


এরপর আবূ তালিব রাসূলুল্লাহ (সা)-কে বললেন: আল্লাহ্র কসম! ভাতিজা! আমার মতে তুমি তাদের নিকট অন্যায় কিছু দাবি করনি। তাঁর এ মন্তব্যে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর মনে তাঁর ইসলাম গ্রহণের আশার সঞ্চার হল। তিনি তাকে বললেন: চাচা! তা হলে অন্তত আপনি তো এ বাক্যটি উচ্চারণ করুন। যাতে কিয়ামতের দিন আপনার জন্য আমার সুপারিশ করার সুযোগ হয়। তাঁর এ ব্যাকুল আগ্রহ দেখে আবূ তালিব উত্তর দিলেন: হে আমার প্রিয় ভাতিজা! আমার মৃত্যুর পর তোমাকে ও তোমার ভ্রাতৃবর্গকে গাল-মন্দ শুনতে হবে, আর কুরায়শরা ভাববে, আমি মৃত্যু ভয়ে অস্থির হয়েই এ বাক্য উচ্চারণ করেছি-এ আশংকা না হলে আমি সত্যিই এ বাক্য উচ্চারণ করতাম। আমি তোমাকে খুশি করার জন্যই এরূপ বলছি।
ইবন ইসহাক বলেন: আবূ তালিবের মৃত্যু ঘনিয়ে এলে আব্বাস তাকিয়ে দেখলেন তিনি ঠোঁট নাড়ছেন। তিনি তার দিকে কান বাড়িয়ে দিলেন। তখন তিনি বলে উঠলেন: হে ভাতিজা! আল্লাহ্র কসম! আমার ভাইতো তুমি যে বাক্য উচ্চারণ করতে বলেছিলে, তাই উচ্চারণ করেছে। রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন: আমি শুনিনি।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 কুরায়শরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে আপোস-নিস্পত্তির জন্য আবু তালিবের কাছে এলে তাদের সম্পর্কে যা নাযিল হয়

📄 কুরায়শরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে আপোস-নিস্পত্তির জন্য আবু তালিবের কাছে এলে তাদের সম্পর্কে যা নাযিল হয়


রাবী বলেন: কুরায়শদের যে দলটি আবূ তালিবের কাছে এসেছিল এবং তাদের ও রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মাঝে যে কথপোকথন হয়েছিল, সে সম্পর্কে আল্লাহ্ তা'আলা সূরা 'সাদ'-এর এ আয়াতগুলো নাযিল করেন:
ص وَالْقُرْآنِ ذِي الذِكْرِ بَلِ الَّذِينَ كَفَرُوا فِي عِرَّةٍ وَشِقَاقٍ ...... أَجَعَلَ الْأَلِهَةَ إِلَهَا وَاحِدًا إِنَّ هَذَا لَشَيْ عُجَابٌ - وَانْطَلَقَ الْمَلَأُ مِنْهُمْ أَنِ امْشُوا وَاصْبِرُوا عَلَى الْهَتِكُمْ إِنَّ هَذَا لَشَيْ يُرَادُ - مَا سَمِعْنَا بِهذا في الملةِ الْآخِرَةِ إِنْ هذا الا اختلاق
"সাদ, শপথ উপদেশপূর্ণ কুরআনের! আপনি অবশ্যই সত্যবাদী কিন্তু কাফিররা ঔদ্ধত্য ও বিরোধিতায় ডুবে আছে। এদের পূর্বে আমি কত জনগোষ্ঠী ধ্বংস করেছি। তখন তারা আর্ত-চীৎকার করেছিল। কিন্তু তখন পরিত্রাণের কোনই উপায় ছিল না। এরা বিস্ময়বোধ করছে যে, এদের নিকট এদেরই মধ্য হতে একজন সতর্ককারী আসল এবং কাফিররা বলে, এতো এক যাদুকর, মিথ্যাবাদী। সে কি বহু ইলাহের পরিবর্তে এক ইলাহ বানিয়ে নিয়েছে? এ তো এক অত্যাশ্চর্য ব্যাপার! এদের প্রধানেরা সরে পড়ে এই বলে, তোমরা চলে যাও এবং তোমাদের দেবতাগুলোর পূজায় তোমরা অবিচলিত থাক। নিশ্চয়ই এ ব্যাপারটি উদ্দেশ্যমূলক। আমরা তো অন্য ধর্মাদর্শে এরূপ কথা শুনিনি; এ এক মনগড়া উক্তি মাত্র।" (৩৮: ১-৭)
অন্য ধর্মাদর্শ বলতে তারা খ্রিস্টধর্মকে বুঝিয়েছে, যেহেতু খ্রিস্টানরা এরূপ বলত যে, إِنَّ الله ثالث ثلثة (আল্লাহ্ তো তিনের তৃতীয়) (৫:৭৩)। এরপর আবূ তালিবের ইন্তিকাল হয়ে যায়।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00