📄 পুত্রদের প্রতি ওয়ালীদের অন্তিম উপদেশ
ইবন ইসহাক বলেন: ওয়ালীদের যখন মৃত্যু ঘনিয়ে আসল, তখন সে তার পুত্রদের ডাকল। তার ছিল তিন পুত্র। হিশাম ইব্ন ওয়ালীদ, ওয়ালীদ ইব্ন ওয়ালীদ ও খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ। ওয়ালীদ তাদের বলল: হে আমার পুত্রগণ! আমি তোমাদের তিনটি উপদেশ দিচ্ছি। তোমরা এগুলো প্রতিপালনে অবহেলা করবে না।
ক. বনু খুযা'আর উপর রয়েছে আমার রক্তের (খুনের) দাবি। তোমরা এর প্রতিশোধ নিতে ভুলবে না। আল্লাহ্র কসম! আমি জানি তারা এ ব্যাপারে নির্দোষ। কিন্তু আমার আশংকা (প্রতিশোধ না নিলে) তোমরা পরবর্তীতে নিন্দিত হবে।
খ. সাকীফ গোত্রের কাছে আমার সুদ পাওনা আছে। তোমরা তা আদায় না করে ছেড়ো না।
গ. আবূ উযায়হিরের প্রতি রয়েছে আমার বিবাহিতা স্ত্রীকে আটকে রাখার দায়। তোমরা তার থেকে এর প্রতিশোধ না নিয়ে ক্ষান্ত হবে না। উল্লেখ্য, আবূ উযায়হির ওয়ালীদের নিকট নিজ কন্যা দিয়েছিল। পরে সে তাকে আটকে রাখে। মৃত্যু পর্যন্ত ওয়ালীদ তার স্ত্রীকে ফিরে পায়নি।
📄 বনু খুযা'আর কাছে মাখযূম গোত্র কর্তৃক আবূ উযায়হির রক্তপণ দাবি
ওয়ালীদের মৃত্যুর পর তার গোত্র—বনু মাখযূম, বনু খুযা'আর নিকট ওয়ালীদের রক্তপণ দাবি করে তাদের উপর হামলা করল। তারা বলল: তোমাদের লোকের তীরই তো তার মৃত্যুর কারণ।
যে লোকটির তীরে ওয়ালীদ যখম হয়েছিল, সে ছিল বনু খুযা'আর শাখা কা'ব ইব্ন আমুর গোত্রের লোক। বনূ কা'ব ও বনূ আবদুল মুত্তালিব ইবন হাশিমের মাঝে মৈত্রীচুক্তি ছিল। খুযা'আ গোত্র বনূ মাখযূমের দাবি প্রত্যাখ্যান করল। এ নিয়ে উভয় গোত্র একে অন্যের বিরুদ্ধে কবিতা রচনা করল এবং বিষয়টি ক্রমে জটিল হয়ে দাঁড়াল।
আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবূ উমাইয়া ইব্ন মুগীরা ইব্ন আবদুল্লাহ্ ইবন উমর ইব্ন মাখযূম বনূ খুযা'আকে বলল:
আনি যঈম আন তাসিরূ ওয়া ফাত্হারিবূ ওয়া আন তাতরূকা আজ-জুহরানা তা'ওয়ী সা'আলিবা। ওয়া আন তাতরূকা মাআ' বিজাজআতি আতরিক্বা ওয়া আন তাসআলূ আই আল-আরআকি আতাইয়িবাহু? ফায়াজা আনাছ লা তাতিল্লু দিমাউনা ওয়া লা ইয়াতাআ'লী ছায়িদাম মিন নিহারিবিহ。
"আমার ধারণা এই যে, তোমরা যুদ্ধে এগিয়ে আসবে কিন্তু পরক্ষণেই তোমরা পালাবে। আর তোমরা জাহরান উপত্যকা ছেড়ে যাবে এবং সেখানে শুধু শেয়ালের ডাক শোনা যাবে। তোমরা আতরিক উপত্যকার জলাশয় ত্যাগ করে যাবে। আর তোমরা খুঁজে বেড়াবে বাবলা বৃক্ষ ঘেরা কোন্ উত্তম স্থান। আমরা এমন লোক, যাদের রক্ত বৃথা যায় না। আমরা যাদের সাথে লড়াই করি, তারা সম্মানের আসনের অধিষ্ঠিত হতে পারে না।" জাহারান ও আতরিক ছিল খুযা'আ গোত্রের শাখা কা'ব গোত্রের অধিকারভুক্ত স্থান। উক্ত কবিতার জবাবে কা'ব ইবন 'আমর ইবন খুযাঈ গোত্রের জাওন ইব্ন আবূ জাওন বলল:
ওয়াল্লাহ লা নূ'তি আল-ওয়ালিদা জ্বলামাহ ওয়া লাম্মা তারওয়া ইয়াওমান তাযূলু কাওয়াকিবাহু। ওয়াইউসরিউ মিনকুম মুছমান বাদ মুছমান ওয়া তুফতাহু বা'দ আল-মাওতি কাছরান মাশারিবিহু। ইজা মা আকালতুম খুবযাকুম ওয়া খুঝিরকুম ফাকাকুম বাকী আল-ওয়ালিদি ওয়া নাদিহ。
"আল্লাহ্ কমম! ওয়ালীদের নিজে বিপদগ্রস্ত হওয়ার বদলা আমরা কখনও দেব না। আর তোমরা এখনও এমন কঠিন যুদ্ধ দেখনি, যাতে তারকামালা খসে পড়ে। তোমাদের স্থূলকায় ব্যক্তি একের পর এক খতম হতে থাকবে, এরপর তাদের অট্টালিকাগুলো জোরপূর্বক খুলে ফেলা হবে। তোমরা যখন রুটি-গোশ্ত দিয়ে উদর পূর্ণ করবে, তখন তোমরা সবাই ওয়ালীদের জন্য আর্তনাদ করবে।" অবশেষে উভয় পক্ষ আপস-মীমাংসায় সম্মত হল। বনু খুযা'আ বুঝতে পারল যে, মাখযূম গোত্র শুধু লোকনিন্দার ভয়েই এসব করছে, সুতরাং তারা বনু মাখযূমকে সামান্য কিছু রক্তপণের অংশ দিয়ে দিল। বনূ মাখযূম বাকী অংশের দাবি ছেড়ে দিল। আপস-মীমাংসা হয়ে যাওয়ার পর জাওন ইব্ন আবূ জাওন নিম্নের কবিতাটি আবৃত্তি করল :
ওয়া ক্বাঈলাতুন লাম্মা ইছতালহনা তাআজ্জুবা লাম্মা ক্বাদ হামালনা লিল ওয়ালিদি ওয়া ক্বাঈল। আলম তাকছিমউ তু'তু আল-ওয়ালিদা জ্বলামাতান ওয়া লাম্মা তারওয়া ইয়াওমান কাছির আল-বালাবিল। ফানাহনু খালাতনা আল-হারবা বিস্ সালামি ফাস্তাওয়াত নামা হাওয়াহু আমিনা কুল্লু রাহিল。
"আমরা সন্ধি সম্পন্ন করলে কতিপয় নর-নারী বিস্মিত হয়ে বলতে লাগল, আমরা কেন ওয়ালীদের রক্তপণ বহন করলাম? (তারা বলল): তোমরা কি শপথ করনি যে, ওয়ালীদের রক্তপণ কিছুতেই আদায় করবে না? তোমরা তো এখনও বিভীষিকাময় যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করনি? আমরা যুদ্ধকে সন্ধির সাথে মিশ্রিত করেছি। ফলে তা পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। এখন যে-কোন পথিক নিরাপদে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে যাত্রা করতে পারে।"
এরপরও জাওন ইব্ন আবু জাওন ক্ষান্ত হলনা। এমনকি এক পর্যায়ে সে ওয়ালীদের হত্যা নিয়ে গর্ব করতে শুরু করল। সে বলতে লাগল : ওয়ালীবকে তারাই হত্যা করেছে। অথচ এ দাবি ছিল সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তার বক্তব্য অনুযায়ী ওয়ালীদ, তার পুত্র ও সম্প্রদায়কে সেই পরিণতির সম্মুখীন হতে হয়, যার হুঁশিয়ারী সে দিয়েছিল। এ সম্পর্কে তার কবিতা নিম্নরূপ:
الازعم المغيرة أن كعبا بمكة منهم قدر كثير قلا تفخر مغيرة ان تراها * بها يمشى المعلهج والمهير بها اباؤنا وبها ولدنا * كما ارسى بمثبته ثبير وما قال المغيرة ذاك الا × ليعلم شاننا أو يستثير فان دم الوليد يطل انا * نطل دماء انت بها خبير كساه الفاتك الميمون سهما * زعافا وهو ممتلى بهير فخر ببطن مكة مسلحبا * كانه عند وجبته بقير سیکفینی مطال ابى هشام × صغار جعدة الا وبار خور
"শোন! বনু মুগীরা দাবি করছে যে, মক্কায় কা'ব গোত্র তাদের চাইতে সংখ্যাগরিষ্ঠ। বনু মুগীরা যেন এটা দেখে অহংকার না করে যে, সেথায় আশরাফ ও আতরাফ (শরীফ ও ইতর) লোকেরা চলাফেরা করে। আমাদের পিতৃপুরুষ এখানকারই, এখানেই আমাদের জন্ম। ঠিক যেমন সবীর পাহাড় নিজ স্থানে স্থির রয়েছে। বনূ মুগীরা তো এটা বলছে মানুষকে আমাদের মর্যাদা সম্পর্কে অবহিত করার জন্য, অথবা আমাদের বিরুদ্ধে তাদের উত্তেজিত করার জন্য।
কারণ, ওয়ালীদের রক্ত বৃথা যাচ্ছে, আর এভাবে আমরা অনেক রক্তের দাবি ছেড়ে দেই, যা তোমরা ভাল করেই জান। অতর্কিত আক্রমণকারী সৌভাগ্যবান ব্যক্তি তার বিষাক্ত তীর তাক করল, আর তখন সে অধিক রাগের কারণে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থায় উপনীত হল। ফলে সে মক্কা উপত্যকায় লম্বা হয়ে পড়ে যায়, তার পড়ে যাওয়ার সময় মনে হচ্ছিল যেন একটা উট পড়ে গেছে। আবূ হিশামের (রক্তপণ আদায়ের ব্যাপারে) টালবাহনার জন্য কোঁকড়ান পশমযুক্ত অধিক দুধ প্রদানকারী, কয়েকটি উটনীই আমার জন্য যথেষ্ট।"
📄 আবূ উযায়হির হত্যা ও তজ্জন্য আব্দ মানাফ গোত্রের উত্তেজনা
ইবন ইসহাক বলেন: এরপর ওয়ালীদের পুত্র হিশাম আবূ উযায়হিরের উপর হামলা করল। সে তখন যুলমাজায বাজারে ছিল। আবূ উযায়হিরের কন্যা আতিকা ছিল আবূ সুফইয়ান ইব্ন হারবের পত্নী। আবূ উযায়হির ছিল তার গোত্রের একজন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি। হিশাম উক্ত বাজারে তাকে হত্যা করে তার পিতার স্ত্রীকে আটকে রাখার প্রতিশোধ নেয়। এ সম্পর্কে তার পিতা তাকে ওসিয়ত করে গিয়েছিল। এ ঘটনা নবী (সা)-এর মদীনায় হিজরত করে যাওয়ার পর সংঘটিত হয়েছিল। ইতিমধ্যে বদর যুদ্ধও শেষ হয়েছিল। নেতৃবর্গের মধ্যে অনেকে মারা যায় এবং বন্দী হয়।
আবূ উযায়হির নিহত হওয়ার পর আবূ সুফইয়ানের পুত্র ইয়াযীদ বনু আব্দ মানাফকে সংঘবদ্ধ করে। আবূ সুফইয়ান তখন যুলমাজায বাজারে ছিল। লোকেরা বলতে লাগল: আবূ সুফইয়ানের শ্বশুরকে হত্যা করে বিশ্বাসঘাতকতা করা হয়েছে। সে প্রতিশোধ নিয়ে ছাড়বে। আবূ সুফইয়ান তার পুত্র ইয়াযীদের এ কাণ্ডের কথা শুনে দ্রুত মক্কায় চলে আসল। স্বভাব-চরিত্রে সে ছিল অত্যন্ত ধৈর্যশীল ও বিচক্ষণ লোক। নিজ গোত্রের প্রতি তার ভালবাসার অন্ত ছিল না। তার আশংকা হল আবূ উযায়হিরকে নিয়ে কুরায়শদের মাঝে কোন অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। সে তাড়াতাড়ি পুত্রের কাছ চলে গেল। সে তখন বনু আব্দ মানাফ ও মুতায়িবীনের মাঝে অস্ত্রসজ্জিত অবস্থায় ছিল। সে তার হাত থেকে বর্শা ছিনিয়ে নিয়ে তার মাথায় এমন জোরে আঘাত করল, যার ফলে তার মাথা ফেটে গেল। এরপর সে তাকে বলল: আল্লাহ্ তোর ধ্বংস করুক! তুই দাওস গোত্রীয় এক ব্যক্তিকে নিয়ে কুরায়শদের মাঝে আত্মকলহের সৃষ্টি করতে চাস? তারা যদি রক্তপণ দাবি করে, তবে আমি শীঘ্রই তা আদায় করে দেব। এভাবে সে বিষ্ফোরন্মুখ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে।
কিন্তু এর পরই হাসান ইবন সাবিত তৎপরতা চালালেন। তিনি আবূ উযায়হিরের রক্তের প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য মানুষকে উত্তেজিত করতে লাগলেন। আবূ সুফইয়ানের প্রতি বিশ্বাস হনন ও কাপুরুষতার অভিযোগ এনে তিনি বললেন:
غدا اهل ضوجي ذي المجاز كليهما x وجار ابن حرب بالمغممس ما يغدو ولم يمنع الغير الضروط ذماره × وما منعت مخزاة والدها هند كساك هشام بن الوليد ثيابه × قابل واخلف مثلها جددا بعد قضى وطرا منه فاصبح ما جدا × واصبحت رخوانا ما تخب تعدو فلو ان اشياخا بيدر تشاهدوا × لبل نعال القوم معتبط ورد
"যুলমাজাযের উভয় পক্ষের লোক ভোরে বের হয়ে পড়ে অথচ ইব্ন হারবের প্রতিবেশী মুগাম্মাসই থেকে যায়, বের হয় না। গাধা যা সংরক্ষণ করতে পারত, তা সে সংরক্ষণ করল না, যাকে রক্ষা করা তার কর্তব্য ছিল। আর হিন্দা ও তার বাপকে অপমান হতে বাঁচাতে পারল না। হিশাম ইব্ন ওয়ালীদ নিহত ব্যক্তির কাপড়-চোপড় তোমাকে পরিয়েছে। তুমি এটা জীর্ণ করে ফেল, আর এর পরেও যেন অনুরূপ নতুন কাপড় তুমি পরতে পার। সে তো তার কাজ শেষ করে ফেলেছে, ফলে সে সম্মানের অধিকারী হয়েছে। আর তুমি হয়ে গেছ অলস-ঢিলে, তুমি না পার দ্রুত চলতে, আর না পার দৌড়াতে। যদি বদরের বুড়োরা তাকে দেখত, তবে তাজা রক্তে সকলের জুতো সিক্ত হত।"
হাসান (রা)-এর এ কবিতা আবূ সুফইয়ানের কানে পৌঁছলে সে বলল: সে তো দাওস গোত্রীয় এক ব্যক্তির জন্য আমাদের পরস্পরের মাঝে কলহের সৃষ্টি করতে চাচ্ছে। আল্লাহ্ কসম! তার চিন্তা অত্যন্ত মন্দ।
📄 খালিদ (রা) কর্তৃক তার পাওনা সুদ দাবি ও এ সম্পর্কিত আয়াত
তায়ফবাসী ইসলাম গ্রহণ করার পর রাসূলুল্লাহ্ (সা) খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ (রা)-এর সাথে তার পিতা ওয়ালীদের সুদ সম্পর্কে আলোচনা করেন। বনূ সাকীফের নিকট ওয়ালীদের সুদ পাওনা ছিল, যা আদায় করার জন্য সে তার পুত্রকে ওসিয়ত করে গিয়েছিল।
ইবন ইসহাক বলেন: বিজ্ঞজনদের অনেকে আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, খালিদ ইব্ন ওয়ালীদ যখন তার পিতার পাওনা সুদ দাবি করল, যা লোকদের কাছে পাওনা ছিল, তখন এ আয়াত নাযিল হয়: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ - "হে মু'মিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা বকেয়া আছে তা ছেড়ে দাও যদি তোমরা মু'মিন হও।” (২: ২৭৮)।