📄 মি'রাজ সম্পর্কে আবু সাঈদ খুদরী (রা)-এর হাদীসের বাকী অংশ
আবু সাঈদ খুদরী (রা) বলেন, প্রিয় নবী (সা) বলেছেন: এরপর জিবরাঈল (আ) আমাকে নিয়ে দ্বিতীয় আসমানে পৌঁছলেন। সেখানে দুই খালাত ভাই ঈসা ইবন মারইয়াম ও ইয়াহ্ইয়া ইব্ন যাকারিয়ার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়।
পরে তিনি আমাকে নিয়ে তৃতীয় আসমানে আরোহণ করেন। সেখানে আমি পূর্ণিমার চাঁদের মত সুন্দর দীপ্তিমান এক পুরুষকে দেখতে পাই। আমি জিজ্ঞেস করলাম: হে জিবরাঈল! ইনি কে? তিনি বললেন: ইনি আপনার ভাই ইউসুফ ইন্ন ইয়াকুব (আ)।
তারপর তিনি আমাকে নিয়ে চতুর্থ আসমানে পৌঁছেন। সেখানে এক ব্যক্তিকে দেখে আমি জিবরাঈলকে জিজ্ঞেস করলাম: ইনি কে? তিনি বললেন: ইনি হলেন ইদরীস (আ)।
আবু সাঈদ খুদরী (রা) বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) ইদরীস (আ)-এর প্রসংগ আসলে এ আয়াত তিলাওয়াত করতেন। وَرَفَعْنَهُ مَكَانًا عَلِيًّا "এবং আমি তাঁকে উন্নীত করেছিলাম মর্যাদায়।” (১৯: ৫৭)।
নবী (সা) বলেন: এরপর জিবরাঈল আমাকে নিয়ে পঞ্চম আসমানে আরোহণ করলেন, সেখানে আমি সাদা চুল-দাড়ি ও ঘন-দীর্ঘ শ্মশ্রুমণ্ডিত এক বৃদ্ধলোককে দেখতে পেলাম। এত সুন্দর বৃদ্ধলোক আমি আর কখনো দেখিনি। আমি জিজ্ঞেস করলাম: হে জিবরাঈল। ইনি কে? তিনি বললেন: ইনি স্বজাতির কাছে সমাদৃত ব্যক্তি হারুন ইবন ইমরান (আ)।
তিনি বলেন: এরপর জিবরাঈল আমাকে নিয়ে ষষ্ঠ আসমানে আরোহণ করলেন। সেখানে আমি একজন বাদামী রংয়ের উন্নত নাসিকাবিশিষ্ট দীর্ঘকায় ব্যক্তিকে দেখতে পেলাম। তিনি ছিলেন অনেকটা শানুআ গোত্রের লোকদের মত। আমি জিজ্ঞেস করলাম: হে জিবরাঈল! ইনি কে? তিনি বললেন: ইনি আপনার ভাই মূসা ইব্ন ইমরান (আ)।
এরপর তিনি আমাকে নিয়ে সপ্তম আসমানে আরোহণ করলেন। সেখানে দেখলাম, বায়তুল মা'মূরের দরজার কাছে এক বৃদ্ধলোক চেয়ারে বসে আছেন। বায়তুল মা'মুর এমন মসজিদ যার মধ্যে প্রতিদিন সত্তর হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করে। একবার যারা তার মধ্যে প্রবেশ করে, তারা কিয়ামত পর্যন্ত পুনরায় সেখানে প্রবেশের সুযোগ পাবে না। চেয়ারে উপবিষ্ট ব্যক্তির সাথে তোমাদের এই সঙ্গীর চাইতে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ আমি আর কাউকে দেখিনি এবং তোমাদের এই সাথীর সাথেও তাঁর চাইতে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ আমি আর কাউকে দেখিনি। আমি জিজ্ঞেস করলাম : হে জিবরাঈল! ইনি কে? তিনি বললেন : ইনি আপনার পিতা ইবরাহীম (আ)।
নবী (সা) বলেন : এরপর জিবরাঈল আমাকে নিয়ে জান্নাতে প্রবেশ করলেন। সেখানে ঈষৎকালো রক্তিম অধরবিশিষ্ট এক রূপসীকে দেখতে পেলাম। আমি মুগ্ধ হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কার? সে বলল : যায়দ ইব্ন হারিসার। নবী (সা) যায়দ (রা)-কে এর সুসংবাদ দান করেছিলেন।
ইব্ন ইসহাক বলেন : আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা) বর্ণিত হাদীসে আছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন : জিবরাঈল আমাকে নিয়ে যে আসমানেরই দ্বারপ্রান্তে পৌঁছতেন এবং প্রবেশের অনুমতি চাইতেন, সেখানেই তাঁকে জিজ্ঞেস করা হত : হে জিবরাঈল! ইনি কে? তিনি বলতেন : মুহাম্মদ! আবার জিজ্ঞেস করা হত, তাঁকে কি ডেকে পাঠান হয়েছে? তিনি উত্তর দিতেন : হ্যাঁ। তখন তাঁরা আমাকে স্বাগতম জানিয়ে বলতেন : তিনি একজন শ্রেষ্ঠ ভাই, উত্তম বন্ধু। এভাবে তিনি তাঁকে নিয়ে সপ্তম আসমান পর্যন্ত পৌঁছান। এরপর তাঁকে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছান হয়। এ সময় আল্লাহ তা'আলা তাঁর উপর দৈনিক পঞ্চাশ ওয়াক্ত সালাত ফরয করে দেন।
📄 সালাত সংক্ষেপ করার ব্যাপারে মূসা (আ)-এর পরামর্শ
রাবী বলেন, নবী (সা) বলেছেন : আমি সেখান থেকে ফেরত রওয়ানা হলাম, 'পথিমধ্যে মূসা ইবন ইমরান (আ)-এর সংগে আমার দেখা হল। তিনি তোমাদের একজন উত্তম বন্ধুই বটে। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন : আপনার উপর কত ওয়াক্ত সালাত ফরয করা হয়েছে। আমি বললাম : দৈনিক পঞ্চাশ ওয়াক্ত। তিনি বললেন : সালাত তো সুকঠিন বিষয়, অথচ আপনার উম্মত দুর্বল। কাজেই আপনি আপনার রবের কাছে ফিরে যান এবং আপনার ও আপনার উম্মতের জন্য এর পরিমাণ কমিয়ে দিতে বলুন।
আমি আল্লাহ্র কাছে ফিরে গেলাম। আমি তাঁর কাছে আবেদন জানালাম, যেন তিনি আমার ও আমার উম্মতের জন্য বিষয়টি সহজ করে দেন। আল্লাহ্ দশ ওয়াক্ত কমিয়ে দিলেন। বাদ বাকি নিয়ে আমি রওয়ানা হলাম। পথে মূসার সাথে আবার সাক্ষাৎ হল। তিনি এবারও আগের মতই বললেন। ফলে আমি পুনরায় ফিরে গেলাম এবং আমার রবের কাছে আরও কমানোর জন্য আবেদন জানালাম। তিনি আরও দশ ওয়াক্ত কমিয়ে দিলেন। আমি ফিরে গেলাম। পথে মূসার সাথে আবার দেখা হলো। এবারও তিনি আমাকে একই কথা বললেন। সুতরাং আমি আবার আল্লাহর কাছে ফিরে গেলাম এবং আরও কমানোর জন্য আবেদন জানালাম। তিনি আরও দশ ওয়াক্ত হ্রাস করে দিলেন। আমি ফেরত রওয়ানা হলাম। কিন্তু মূসা আমাকে ক্রমাগত একই পরামর্শ দিতে লাগলেন যে, আপনি ফিরে গিয়ে আরও কমানোর আবেদন জানান। এভাবে সে সংখ্যা কমাতে কমাতে দৈনিক মাত্র পাঁচ ওয়াক্ত বাকী রাখা হল। আমি তা নিয়ে মূসার কাছে আস্বলাম। তিনি আমাকে আগের মত বললেন কিন্তু আমি বললাম: আমি আমার রবের কাছে অনেকবার গিয়েছি এবং সালাতের পরিমাণ কমানোর জন্য আবেদন করেছি। এখন আমি তাঁর কাছে যেতে লজ্জাবোধ করছি। কাজেই আর নয়, আমি এরূপ আর করব না।
নবী (সা) বলেন: তোমাদের মধ্যে যে কেউ ঈমানের সাথে, সওয়াবের আশায় পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করবে, সে পূর্ণ পঞ্চাশ ওয়াক্তের সওয়াব লাভ করবে।