📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 ইস্রা স্বপ্নযোগেও হতে পারে

📄 ইস্রা স্বপ্নযোগেও হতে পারে


'আয়েশা (রা) ও মু'আবিয়া (রা)-এর এ মতামতকে সম্পূর্ণরূপে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। হাসান বসরীর উক্তি দ্বারাও তাদের সমর্থন হয় যে, وَمَا جَعَلْنَا الرُّؤْيَا الَّتِي أَرَيْنُكَ الأَفَتْنَةً للنَّاس আয়াতটি এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মত্যাগীদের সম্পর্কে অবর্তীণ রয়েছে (এতে ঘটনাটিকে 'রুইয়া' 'স্বপ্ন' বলা হয়েছে)। ইবরাহীম (আ) তাঁর পুত্রকে নিজ স্বপ্নের কথা যেভাবে শুনিয়েছিলেন, তা কুরআন মাজীদে এভাবে ব্যক্ত হয়েছে: يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ إِنِّي أَذْبَحُكَ "হে বৎস। আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে আমি যবেহ করছি।” (৩৭ : ১০২) এতে বোঝা যায় যে, আম্বিয়ায়ে কিরামের প্রতি আল্লাহ্ তা'আলার ওহী দু'ভাগে হয়ে থাকে, কখনও জাগ্রতাবস্থায়, কখনও স্বপ্নযোগে।
ইবন ইসহাক বলেন: বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) বলতেন, تنام عینای وقلبی یقظان "আমার দু'চোখ ঘুমায়, কিন্তু অন্তর জাগ্রত থাকে", আল্লাহ্ তা'আলাই অধিক জ্ঞাত, বাস্তব ব্যাপার কি ছিল! তিনি যে মহাবিস্ময় প্রত্যক্ষ করেছেন, তা স্বপ্নযোগে করেছেন, না জাগ্রত অবস্থায় তা আল্লাহ্ তা'আলাই সম্যক অবগত। যেভাবেই হোক, ঘটনা সত্য ও বিশ্বাস্য।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক ইবরাহীম, মূসা ও ঈসা (আ)-এর আকার-আকৃতি বর্ণনা

📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা) কর্তৃক ইবরাহীম, মূসা ও ঈসা (আ)-এর আকার-আকৃতি বর্ণনা


ইবন ইসহাক বলেন: ইমাম যুহরী সাঈদ ইবনুল মুসায়্যাব (র) হতে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সফরে ইবরাহীম (আ), হযরত মূসা (আ) ও ঈসা (আ)-কে দেখে এসে সাহাবায়ে কিরামের কাছে তাঁদের আকার-আকৃতিও বর্ণনা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন: দৈহিক গঠনের দিক দিয়ে তোমাদের সাথী (অর্থাৎ আমি) অপেক্ষা আর কাউকে ইবরাহীম (আ)-এর সংগে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ দেখিনি। আর তোমাদের সাথীর সাথেও বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ হযরত ইবরাহীম (আ) ছাড়া কাউকে দেখিনি। আর মূসা (আ) সম্পর্কে বলেন: তিনি বাদামী বর্ণের দীর্ঘকায়, হালকা পাতলা, কোঁকড়া চুলবিশিষ্ট উন্নত নাসিকাযুক্ত লোক। অনেকটা আযদের শাখা গোত্র শানুআর লোকদের মত। আর তিনি ঈসা (আ) সম্পর্কে বলেন: তিনি তো লালবর্ণের মাঝারী আকৃতির লোক। তাঁর চুল ছিল সোজা, চেহারায় অনেক তিল ছিল। মনে হচ্ছিল তিনি যেন সবে গোসলখানা থেকে বের হয়েছেন, মাথা থেকে পানি পড়ছিল। অথচ তাঁর মাথায় কোন পানি ছিল না। তোমাদের মধ্যে 'উরওয়া ইবন মাসউদ সাকাফী তাঁর সাথে বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 আলী (রা) কর্তৃক রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আকার-আকৃতি বর্ণনা

📄 আলী (রা) কর্তৃক রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর আকার-আকৃতি বর্ণনা


ইবন হিশাম বলেন: আলী (রা) হতে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর যে গঠনাকৃতি বর্ণিত হয়েছে, ইবরাহীম ইব্‌ন মুহাম্মদ ইব্‌ন আলী ইব্‌ন আবূ তালিবের সূত্রে গুফরার আযাদকৃত গোলাম উমর নিম্নরূপ বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন: হযরত 'আলী (রা) তাঁর গঠনাকৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলতেন: তিনি অতিমাত্রায় লম্বা ছিলেন না, আর অত্যধিক খর্বকায়ও নয়; বরং তিনি ছিলেন মধ্যমাকৃতির মানুষ। তিনি অত্যধিক কুঞ্চিত কেশবিশিষ্টও ছিলেন না, আবার ঋজু চুলবিশিষ্টও নয়, বরং তাঁর চুল ছিল ঈষৎ কোঁকড়ান। তিনি অত্যধিক স্থূলকায় ছিলেন না। চেহারা সম্পূর্ণ গোলাকার ছিল না। বর্ণ ছিল শুভ্র লোহিতাভ, চক্ষুদ্বয় ছিল নিবিড় কালো, দীর্ঘ আঁখিপল্লব। অস্থিগ্রন্থি ছিল বড়সড় ও চওড়া কাঁধ। তাঁর বক্ষদেশ হতে নাভিমূল পর্যন্ত প্রলম্বিত একটি সরু লোমের রেখা ছিল। এ ছাড়া হাতে পায়ে অতি সামান্যই লোম ছিল। পথ চলাকালে দ্রুত চলতেন, মনে হত যেন উপর হতে নীচে নামছেন। তিনি যখন কোনদিকে তাকাতেন তখন পূর্ণভাবে ফিরে তাকাতেন। তাঁর দু'কাঁধের মাঝখানে ছিল নবুওয়তের মোহর। আর তিনি ছিলেন সর্বশেষ নবী। তিনি ছিলেন অধিক দানশীল এবং অসীম সাহসের অধিকারী। তিনি কথায়ও ছিলেন সবচাইতে সত্যনিষ্ঠ এবং দায়িত্ব ও অঙ্গীকার রক্ষায় সর্বাধিক যত্নবান। তিনি ছিলেন অত্যন্ত কোমল চরিত্রের অধিকারী ও আচার-ব্যবহারে সর্বোত্তম! যখন তাঁকে কেউ প্রথমে দেখত, তখন সে ভীত-সন্ত্রস্ত হত। আর যে ব্যক্তি তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে মিশত, সে তাঁকে ভালবেসে ফেলত। তাঁর প্রশংসাকারী তো সংক্ষেপে এই-ই বলে: তাঁর আগে বা পরে তাঁর মত আমি আর কাউকে দেখিনি। আল্লাহ্ তাঁর প্রতি রহমত ও শান্তি বর্ষণ করুন।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ইস্রা সম্পর্কে উম্মু হানী (রা)-এর বর্ণনা

📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ইস্রা সম্পর্কে উম্মু হানী (রা)-এর বর্ণনা


মুহাম্মদ ইবন ইসহাক বলেন: ইস্রা সম্পর্কে উম্মু হানী বিন্ত আবু তালিব (রা)-এর বর্ণনা নিম্নরূপ। তিনি বলতেন: আমারই ঘর থেকেই রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর এ সফর শুরু হয়েছিল। তিনি সে রাতে আমার ঘরে শায়িত ছিলেন। তিনি ঈশার সালাত আদায় শেষে ঘুমিয়ে পড়েন। আমরাও ঘুমিয়ে যাই। ফজরের সামান্য আগে তিনি আমাদের জাগালেন। এরপর আমরা সকলে তাঁর সংগে ফজরের সালাত আদায় করলাম। তারপর তিনি বললেন: হে উম্মু হানী! তোমরা তো দেখেছ, আমি তোমাদের সাথে ঈশার সালাত আদায় করে তোমাদের এখানেই শুয়ে পড়ি। কিন্তু এরপরে আমি বায়তুল-মুকাদ্দাস গমন করি এবং সেখানে সালাত আদায় করি। তারপর তো তোমাদের সাথেই ফজরের সালাত আদায় করলাম, যা তোমরা দেখলে। উম্মু হানী বলেন: این বলে তিনি চলে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালেন। আমি তাঁর চাদরের কিনারা ধরে ফেললাম। ফলে তাঁর পেট থেকে কাপড় সরে গেল। তা দেখতে ভাঁজ করা কিন্তী বস্ত্রের মত স্বচ্ছ ও মসৃণ। আমি বললাম: হে আল্লাহ্ নবী! আপনি এ কথা লোকদের কাছে প্রকাশ করবেন না। অন্যথায় তারা আপনাকে মিথ্যাবাদী বলবে এবং আপনাকে কষ্ট দেবে। কিন্তু তিনি বললেন: আল্লাহ্র কসম! আমি অবশ্যই তাদের কাছে এ ঘটনা ব্যক্ত করব। তখন আমি আমার এক হাবশী দাসীকে বললাম বসে আছ কেন, জলদি, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে যাও, তিনি লোকদের কি বলেন তা শোন, আর দেখ তারা কি মন্তব্য করে। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বের হয়ে গিয়ে লোকদের এ ঘটনা জানালেন। তারা বিস্মিত হয়ে বলল: হে মুহাম্মদ! এ যে সত্য তার প্রমাণ'? এমন ঘটনা তো আমরা কোনদিন শুনিনি। তিনি বললেন:
প্রমাণ এই যে, আমি অমুক উপত্যকায় অমুক গোত্রের একটি কাফেলার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। সহসা আমার বাহন জন্তুটির গর্জনে তারা ত্রস্ত হয়ে পড়ে। ফলে তাদের একটি উট হারিয়ে যায়। আমি তাদের উটটির সন্ধান দেই। আমি তখন শামের দিকে যাচ্ছিলাম। এরপর সেখান থেকে ফিরে আসার পথে যখন দাজনান পর্বতের কাছে পৌছি, তখন সেখানেও একটি কাফেলা দেখতে পাই, তারা সকলে নিদ্রিত ছিল। তাদের কাছে একটি পানিভরা পাত্র ছিল। যা কোন কিছু দিয়ে ঢাকা ছিল। আমি সে ঢাকনা সরিয়ে তা থেকে পানি পান করি। এরপর তা আগের মত ঢেকে রেখে দেই। আর এর প্রমাণ এই যে, সে কাফেলাটি এখন বায়যা গিরিপথ থেকে সানিয়াতুত-তানঈমে নেমে আসছে। তাদের সামনে একটি ধূসর বর্ণের উট আছে। যার দেহে একটি কালো ও আরেকটি বিচিত্র বর্ণের ছাপ আছে।
উম্মু হানী (রা) বলেন: এ কথা শোনামাত্র উপস্থিত লোকেরা সানিয়ার দিকে ছুটে গেল। তারা ঠিকই সম্মুখভাগের উটটিকে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বর্ণনামত পেল। তারা কাফেলার কাছে তাদের পানির পাত্র সম্পর্কে জিজ্ঞেস করল। তারা বলল, আমরা পানির একটি ভরা-পাত্রে ঢাকনা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি। জাগ্রত হওয়ার পর পাত্রটিকে যেমন রেখেছিলাম তেমনই ঢাকা পাই, কিন্তু ভিতর পানিশূন্য ছিল।
তারা অপর কাফেলাকেও জিজ্ঞেস করল। সে কাফেলাটি তখন মক্কাতেই ছিল। তারা বলল: আল্লাহ্র কসম! তিনি সত্যই বলেছেন। তিনি যে উপত্যকার কথা বলেছেন, সেখানে ঠিকই আমরা ভয় পেয়ে ছিলাম। তখন আমাদের একটি উট হারিয়ে যায়। আমরা অদৃশ্য এক ব্যক্তির আওয়ায শুনতে পাই, যে আমাদের উটটির সন্ধান দিচ্ছিল। সেমতে আমরা উটটি ধরে ফেলি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00