📄 নবী (সা)-এর বিজয়, গাছের আশ্চর্য ঘটনা
ইব্ন ইসহাক বলেন: আমার পিতা ইসহাক ইবন ইয়াসার বর্ণনা করেছেন যে, মুত্তালিব ক্ষেত্রের রুকানা ইব্ন 'আব্দ ইয়াযীদ ইবন হাশিম ইবন 'আবদুল মুত্তালিব ইবন 'আব্দ মানাফ ছিল কুরায়শদের শ্রেষ্ঠ কুস্তিগীর। একদিন মক্কার এক পাহাড়ী পথে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে তার নির্জনে সাক্ষাৎ হয়ে যায়। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে বললেন: হে রুকানা! তুমি কি আল্লাহকে ভয় করবে না? আর আমি তোমাকে যার দাওয়াত দিচ্ছি, তা কি কবূল করবে না? রুকানা বলল: আমি যদি জানতাম আপনার দাওয়াত সত্য, তবে অবশ্যই গ্রহণ করতাম। তিনি বললেন: বল তো, আমি যদি কুস্তিতে তোমাকে হারিয়ে দিতে পারি, তা হলে কি তুমি বিশ্বাস করবে আমার দাওয়াত সত্য? সে বলল: হ্যাঁ। তা হলে বিশ্বাস করব। তিনি বললেন: তা হলে উঠ, আমি তোমার সাথে কুস্তি লড়ব।
রাবী বলেন: রুকানা কুস্তি লড়ার জন্য রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দিকে অগ্রসর হল। কিন্তু রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাকে ধরেই এমনভাবে ধরাশায়ী করে ফেললেন যে, সে ছিল অসহায়। সে পুনরায় কুস্তি লড়বার প্রস্তাব করল। কিন্তু এবারও সে ধরাশায়ী হল। তখন সে বলে উঠল: হে মুহাম্মদ! আল্লাহ্র কসম, এ বড়ই বিস্ময়ের ব্যাপার। আপনি আমাকে পরাস্ত করছেন? তিনি বললেন: তুমি চাইলে আরও আশ্চর্যজনক ব্যাপার দেখাতে পারি। শর্ত হচ্ছে, আল্লাহকে ভয় করতে হবে এবং আমার অনুসরণ করতে হবে। সে বলল: তা কি? তিনি বললেন: তুমি ঐ যে গাছটিকে দেখছ, আমি তাকে তোমার জন্য ডাকব, আর সে আমার কাছে চলে আসবে। সে বলল: ডাকুন তো। তিনি গাছটিকে ডাকলেন। সাথে সাথে গাছটি এসে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সামনে থেমে গেল। এরপর তিনি গাছটিকে বললেন: এবার তুমি স্বস্থানে ফিরে যাও। তখন গাছটি তার নিজের স্থানে ফিরে গেল।
রাবী বলেন: এরপর রুকানা তার নিজ সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে গিয়ে বলল: হে বনু 'আব্দ মানাফ। তোমরা তোমাদের এই সাথীকে নিয়ে বিশ্ববাসীর সাথে যাদুর চ্যালেঞ্জ করতে পার। আল্লাহ্র কসম! আমি তার চাইতে বড় যাদুকর আর কখনো দেখিনি। এরপর সে তাদের কাছে ঐ ঘটনার বর্ণনা দিল, যা সে দেখেছিল এবং তিনি যা করেছিলেন।
📄 খ্রিস্টান প্রতিনিধিদলের আগমন ও ইসলাম গ্রহণ
ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর খবর পেয়ে আবিসিনিয়া হতে আনুমানিক বিশ সদস্যের একটি খ্রিস্টান প্রতিনিধিদল তাঁর সংগে সাক্ষাতের জন্য আসে। এ সময় তিনি مক্কাতেই ছিলেন। তারা তাঁকে মসজিদে হারামে পেল। তারা তাঁর কাছে এসে বসল এবং তাঁর সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ও তাঁকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করল। এ সময় কুরায়শরা কা'বার পাশে স্ব-স্ব মজলিসে বসা ছিল। প্রতিনিধিদল রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে তাদের প্রয়োজনীয় প্রশ্নাদি, যা তারা জিজ্ঞেস করতে চেয়েছিল, তা শেষ করলে, তিনি তাদেরকে মহান আল্লাহ্র পথে দাওয়াত দিলেন এবং তাদের কুরআন তিলাওয়াত করে শোনালেন। তারা যখন কুরআন শুনলো, তখন তাদের চোখ দিয়ে অশ্রু প্রবাহিত হতে লাগল। তারা সকলে আল্লাহ্র দাওয়াত স্বীকার করে নিল এবং তাঁর প্রতি ঈমান আনল এবং তাঁকে বিশ্বাস করে নিল। তারা বুঝে ফেলল, তাদের কিতাবে যে আখিরী নবীর বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, ইনিই সেই নবী।
📄 আবু জাহল কর্তৃক তাদেরকে ইসলাম হতে ফেরানোর চেষ্টা
খ্রিস্টান প্রতিনিধিদল ইসলাম গ্রহণ করে যখন নবী (সা)-এর নিকট হতে চলে গেল, তখন আবু জাহ্ল ইব্ন হিশাম কতিপয় কুরায়শসহ তাদের সম্মুখীন হল। তারা তাদের বলল, আল্লাহ্ তোমাদের অমঙ্গল করুন, কি অশুভ কাফেলা তোমরা! তোমাদের স্বধর্মীয় ভাইরা তোমাদের প্রতিনিধি করে পাঠিয়েছেন, যাতে তোমরা ফিরে গিয়ে এই লোকটির খবরাখবর তাদের জানাতে পার। আর তোমরা কি না তার মজলিসে বসতে না বসতেই ধর্মচ্যুত হলে এবং তার কথায় বিশ্বাস করলে? তোমাদের মত আহাম্মক কাফেলা আর আমরা দেখিনি। তারা তাদের বলল: ভাই, তোমাদের প্রতি সালাম। আমরা তোমাদের সাথে মূর্খের ন্যায় তর্ক করব না। আমরা আমাদের কর্মফল ভোগ করব, আর তোমরা তোমাদের কর্মফল ভোগ করবে। আমরা আমাদের কল্যাণ সাধনে কোন ত্রুটি করিনি।
📄 প্রতিনিধি দলটির নিবাস ও তাদের সম্পর্কে কুরআনের নাযিলকৃত আয়াত
আর বলা হয়ে থাকে এ প্রতিনিধি দলটি ছিল নাজরানবাসী খ্রিস্টানদের। প্রকৃত অবস্থা আল্লাহই ভাল জানেন। এ মত সঠিক হলে বলা যাবে এদের সম্পর্কেই এ আয়াত নাযিল হয়: الَّذِينَ آتَيْنَهُمُ الْكِتَابَ مِنْ قَبْلِهِ هُمْ بِهِ يُؤْمِنُونَ - وَإِذَا يُتْلَى عَلَيْهِمْ قَالُوا أَمَنَّا بِهِ إِنَّهُ الْحَقُّ مِنْ رَّبِّنَا إِنَّا كُنَّا مِنْ قَبْلِهِ مُسْلِمِينَ - لَنَا أَعْمَالُنَا وَلَكُمْ أَعْمَالُكُمْ سَلَّامٌ عَلَيْكُمْ لَا نَبْتَغِي الْجَاهِلِينَ
"এর পূর্বে আমি যাদের কিতাব দিয়েছিলাম, তারা এতে বিশ্বাস করে। যখন তাদের নিকট এটা আবৃত্তি করা হয়, তখন তারা বলে: আমরা এতে ঈমান আনি, এটা আমাদের প্রতিপালক হতে আগত সত্য। আমরা তো পূর্বেও আত্মসমর্পণকারী ছিলাম। তাদের দু'বার পারিশ্রমিক দেওয়া হবে। কারণ তারা ধৈর্যশীল এবং তারা ভালোর দ্বারা মন্দের মুকাবিলা করে ও আমি তাদের যে রিস্ক দিয়েছি, তা হতে তারা ব্যয় করে। তারা যখন অসার বাক্য শোনে, তখন তারা তা উপেক্ষা করে চলে এবং বলে, 'আমাদের কাজের ফল আমাদের জন্য এবং তোমাদের কাজের ফল তোমাদের জন্য। তোমাদের প্রতি সালাম। আমরা অজ্ঞদের সঙ্গ চাই না।” (২৮: ৫২-৫৫)।
ইবন ইসহাক বলেন: আমি ইব্ন শিহাব যুহরী (র)-কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এ আয়াতগুলো কাদের সম্পর্কে নাযিল করা হয়েছে? তিনি আমাকে বললেন: আমি আমাদের আলিমদের কাছে এমন শুনেছি যে, এগুলো নাজাশী ও তার লোকদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে, আর সূরা মায়িদার এ আয়াতগুলো: فَاكْتُبْنَا مَعَ الشَّاهِدِينَ ذَلِكَ بِأَنَّ مِنْهُمْ قِسَيْسِينَ وَرُهْبَانًا وَأَنَّهُمْ لَا يَسْتَكْبِرُونَ পর্যন্ত। "যারা বলে আমরা খ্রিস্টান, মানুষের মধ্যে তুমি তাদেরকেই মু'মিনদের নিকটতর বন্ধুরূপে দেখবে; কারণ, তাদের মধ্যে অনেক পণ্ডিত ও সংসার-বিরাগী আছে, আর তারা অহংকারও করে না। রাসূলের প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে তা যখন তারা শোনে, তখন তারা যে সত্য উপলব্ধি করে, তার জন্য তুমি তাদের চক্ষু অশ্রুবিগলিত দেখবে, তারা বলে, “হে আমাদের রব! আমরা ঈমান এনেছি। সুতরাং তুমি আমাদের সাক্ষ্যবহদের তালিকাভুক্ত কর।" (৫: ৮২-৮৩)