📄 তাঁর স্ত্রীকে ইসলামের দিকে দাওয়াত দেওয়া প্রসঙ্গে
তিনি বলেন: এরপর আমার স্ত্রী আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে আসল। আমি বললাম: তুমি আমার থেকে দূরে সরে যাও। তুমি আর আমার কেউ নও, আমিও তোমার কেউ নই। সে বলল: এর কারণ কি? আমি বললাম: ইসলাম তোমার ও আমার মাঝে বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিয়েছে। আমি দীনে ইসলামের দীক্ষা নিয়ে মুহাম্মদ (সা)-এর অনুসারী হয়েছি। সে বলল: তা হলে আমার দীনও তাই, যা আপনার দীন। আমি বললাম তা হলে যাও যু'শ্-শারার পানি হতে পাক-পবিত্র হয়ে আস।
ইবন হিশাম বলেন: যুশ্-শারা ছিল দাওস গোত্রের একটি প্রতিমা। তার জন্য তারা একটি পশু চারণক্ষেত্র বরাদ্দ করে রেখেছিল। এ চারণক্ষেত্রে পাহাড় থেকে নেমে আসা পানি জমে একটি ক্ষুদ্র জলাশয়ের সৃষ্টি হয়েছিল। যুশ্-শারার পানি বলতে সে জলাশয়ের পানি বোঝানো হয়েছে।
তুফায়ল (রা) বলেন: আমার স্ত্রী বলল, আমার পিতামাতা আপনার প্রতি কুরবান হোক, যু'শ্-শারার পক্ষ হতে আমাদের শিশুর কোন ক্ষতির আশংকা নেই তো? আমি বললাম না। সে দায়-দায়িত্ব আমার। কাজেই সে গিয়ে গোসল করে আসল। আমি তার কাছে ইসলামের বাণী পেশ করলাম এবং সে তা কবুল করে নিল।
📄 তাঁর নিজ গোত্রকে ইসলামের দাওয়াত দেওয়া, তাদের বিলম্ব করা, পরিশেষে তাদের রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে মিলিত হওয়া
তুফায়ল (রা) বলেন: এরপর আমি দাওস গোত্রকে ইসলামের প্রতি আহবান জানালাম। কিন্তু তারা সাড়া দিতে বিলম্ব করল। পরে আমি মক্কায় এসে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করলাম এবং তাঁকে বললাম: হে আল্লাহ্ নবী! দাওস গোত্র অশ্লীলতার মাঝে ডুবে রয়েছে। আপনি তাদের জন্য বদ দু'আ করুন। তিনি বললেন: ইয়া আল্লাহ্! দাওস গোত্রকে হিদায়াত দান করুন। তারপর তিনি আমাকে বললেন: তুফায়ল, তুমি তোমার সম্প্রদায়ের কাছে ফিরে যাও। তাদের আবার দাওয়াত দাও। আর দাওয়াতের কাজে নম্রতা বজায় রাখবে।
তুফায়ল (রা) বলেন: আমি দাওস গোত্রের এলাকায় দাওয়াতী কার্যক্রম চালাতে থাকলাম। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মদীনায় হিজরতের পরও তা চালু থাকল। এর মধ্যে বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধও সংঘটিত হয়ে গেল। এরপর আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। এ সময় আমার সাথে ছিল দাওস গোত্রের ঐ সব লোক, যারা আমার ডাকে সাড়া দিয়ে ইসলাম কবুল করেছিল।
রাসূলুল্লাহ্ (সা) খায়বারে অবস্থান করছিলেন। পরিশেষে আমি দাওস গোত্রের সত্তর বা আশিটি পরিবার নিয়ে মদীনায় পৌঁছলাম। পরে আমরা সেখান থেকে খায়বারে গিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংগে মিলিত হলাম। তিনি গনীমতের মাল থেকে অন্যান্য মুসলমানের সাথে আমাদেরও অংশ দিয়েছিলেন।
📄 তাঁর যুল-কাফায়ন প্রতিমায় অগ্নিসংযোগ এবং এ সম্পর্কে তাঁর কবিতা
তুফায়ল (রা) বলেন: এরপর থেকে মক্কা বিজয় হওয়া পর্যন্ত আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে ছিলাম। একদিন আমি আরয করলাম: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! আমাকে যুলকাফায়ন প্রতিমা জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য প্রেরণ করুন। যুলকাফায়ন ছিল 'আম্ম ইব্ন হুমামা গোত্রের একটি প্রতিমা।
ইবন ইসহাক বলেন: সেমতে তুফায়ল (রা) যুলকাফায়ন প্রতিমা ধ্বংসের জন্য যাত্রা করলেন। তিনি সেখানে পৌঁছে মূর্তিটির গায়ে অগ্নি সংযোগ করে আবৃত্তি করতে লাগলেন:
ياذا الكفين لست من عبادكا x ميلادنا اقدم من ميلادكا انی حشوت النار في فؤادكا
'হে যুলকাফায়ন! আমি তোমার পূজারী নই। আমার জন্ম তো তোমার জন্মের আগে। দেখ, আমি তোমার বুকের ভিতর আগুন ঢুকিয়ে দিলাম।'
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ওফাতের পর তাঁর জিহাদে অংশগ্রহণ, তাঁর স্বপ্ন ও শাহাদত প্রসংগে
এরপর তুফায়ল (রা) রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট ফিরে আসেন এবং তাঁর ওফাত পর্যন্ত তিনি মদীনাতেই তাঁর সংগে অবস্থান করেন। আরবের বিভিন্ন গোত্রের ধর্মত্যাগ-এর ফিতনা বিস্তার লাভ করলে তিনি মুসলিম মুজাহিদদের সাথে জিহাদে অংশগ্রহণ করেন। তুলায়হাকে দমন ও নাজদের বিদ্রোহ প্রশমনের কাজ' সমাপ্ত করে মুজাহিদগণ ইয়ামামা যাত্রা করেন। তুফায়ল (রা) এসব অভিযানে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তাঁর পুত্র 'আমর (রা)-ও তাঁর সাথে ছিলেন। ইয়ামামা যাত্রার পথে তুফায়ল (রা) একটি স্বপ্ন দেখে সঙ্গীদের কাছে তা এভাবে বর্ণনা করেন যে, আমি দেখলাম আমার মাথা কামিয়ে ফেলা হয়েছে। আমার মুখ থেকে একটি পাখি উড়ে গেল। একটি নারী এসে আমাকে তার গুপ্ত অঙ্গের ভেতর ঢুকিয়ে ফেলল। আর দেখলাম আমার পুত্র আমাকে দিশেহারা হয়ে খুঁজছে, শেষ পর্যন্ত সে বাধাপ্রাপ্ত হল। তোমরা আমাকে এ স্বপ্নের ব্যাখ্যা বল। তারা বলল: ভালই তো দেখেছেন। তিনি বললেন: আল্লাহর কসম! আমি নিজে এর এক ব্যাখ্যা করেছি। তারা জিজ্ঞেস করল কি ব্যাখ্যা করেছেন? তিনি বললেন: আমার মাথা কামানোর অর্থ হচ্ছে মাথা দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া। যে পাখিটি আমার মুখ থেকে বের হয়ে গেল, সে হচ্ছে আমার আত্মা। স্ত্রীলোকটি আমাকে তার যোনি গহবরে লুকিয়ে ফেলল-এর অর্থ আমার জন্য কবর খনন করা হবে এবং তার ভেতরে আমাকে ঢেকে ফেলা হবে। আর আমাকে আমার পুত্রের খুঁজে বেড়ানো এবং শেষ পর্যন্ত বাধাপ্রাপ্ত হওয়ার মানে হচ্ছে, সেও আমার অনুরূপ অবস্থা প্রাপ্ত হওয়ার জন্য চেষ্টা করবে (কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে বেঁচে যাবে)।
বস্তুত তুফায়ল (রা) ইয়ামামার যুদ্ধে শহীদ হন। আর তাঁর পুত্রও এ যুদ্ধে মারাত্মকভাবে আহত হন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। পরবর্তীতে 'উমর (রা)-এর আমলে তিনি ইয়ারমুকের যুদ্ধে শহীদ হন।