📄 কুরায়শ কর্তৃক নবী (সা)-এর কথা না শোনার জন্য তাঁকে সতর্কীকরণ
ইবন ইসহাক বলেন: রাসূলুল্লাহ্ (সা) তার সম্প্রদায়কে পাপ-পঙ্কিলতা হতে বিরত হওয়ার জন্য উপদেশ দিতে থাকেন এবং তাদের মুক্তির পথে আহবান জানাতে থাকেন। ওদিকে তাদের হাত থেকে যখন আল্লাহ্ তা'আলা তাঁকে হিফাযত করলেন, তখন তারা নতুন কৌশল অবলম্বন করল। তারা মক্কাবাসী ও মক্কায় আগত অপরাপর আরববাসীকে তাঁর ব্যাপারে সতর্ক করতে লাগল, যেন কেউ তাঁর কাছে না আসে, তাঁর কথা না শোনে।
তুফায়ল ইবন 'আমর দাওসী নিজ ঘটনা সম্পর্কে বলতেন রাসূলুল্লাহ্ (সা) মক্কায় থাকাকালে তিনি একবার কোন কাজে সেখানে আসেন। তিনি ছিলেন একজন কবি, বিচক্ষণ ও শরীফ লোক। তিনি মক্কায় পৌঁছানোর সাথে সাথেই একদল কুরায়শ তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করল এবং তাঁকে বলল: হে তুফায়ল! আপনি আমাদের দেশে এসেছেন (খুবই খুশির কথা), তবে সাবধান থাকবেন। কেননা আমাদের মাঝে এই যে লোকটির অভ্যুদয় হয়েছে, সে আমাদের জটিলতার মাঝে ফেলে দিয়েছে। সে আমাদের ঐক্য নষ্ট করেছে এবং আমাদের দীনের ব্যাপারে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেছে। তার কথা যাদুর মত যা পিতা-পুত্র, ভাই-ভাই ও স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ফাটল ধরায়। আমরা আপনার জন্য আশংকা করছি যে, সে আমাদের যে বিপদে ফেলেছে, সে বিপদে আপনাকে ও আপনার কাওমকে ফেলবে। কাজেই আপনি কখনো তাঁর সাথে কোন কথা বলবেন না এবং তাঁর কথা শুনবেনও না।
📄 তুফায়ল ইবন 'আমর কর্তৃক কুরায়শদের কথা মেনে চলা, পরে তা প্রত্যাখ্যান করা এবং শেষে নবী (সা)-এর কথা শ্রবণ
তুফায়ল (রা) বলেন: আল্লাহ্র কসম, তারা এভাবে আমার পেছনে লেগে থাকল। ফলে আমিও সংকল্প করলাম, তাঁর কোন কথা শুনব না এবং নিজেও তাঁর কাছে কিছু বলব না।
এমনকি অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁর কোন কথা কানে ঢুকে পড়তে পারে এ আশংকায় আমি যখন কা'বা শরীফে যেতাম, তখন কানে কাপড় এঁটে নিতাম। এমনিভাবে আমি একদিন যখন কা'বা শরীফে যাই, তখন দেখি রাসূলুল্লাহ্ (সা) সেখানে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করছেন। আমি তাঁর কাছাকাছি এক জায়গায় দাঁড়ালাম। কিন্তু আল্লাহ্ তা'আলার ইচ্ছা ছিল আমাকে তাঁর কিছু কথা শোনানোর। তিনি বলেন: তখন আমি সুন্দর কথা শুনলাম। মনে মনে বললাম: আমার মা সন্তানহারা হোক। আল্লাহর কসম! আমি তো একজন কবি ও বুদ্ধিমান লোক। ভাল-মন্দ আমার কাছে অস্পষ্ট থাকে না। কাজেই আমি তাঁর বক্তব্য শুনছি না কেন? যদি ভাল হয় তা 'গ্রহণ করব, আর যদি মন্দ হয়, তবে তা বর্জন করব।
📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সঙ্গে তার সাক্ষাৎ এবং তাঁর দাওয়াত গ্রহণ
তুফায়ল (রা) বলেন: আমি অপেক্ষা করতে থাকলাম। এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর বাড়ির দিকে রওয়ানা হলেন। আমি তাঁর অনুসরণ করলাম। তিনি তাঁর বাড়িতে প্রবেশ করলে আমিও তাঁর সংগে প্রবেশ করলাম। তারপর বললাম: হে মুহাম্মদ! আপনার সম্প্রদায় আপনার সম্পর্কে এই এই কথা বলে। আল্লাহর কসম! তারা আমাকে আপনার ব্যাপারে এত বেশি ভয় দেখিয়েছে যে, আমি আমার কানে তুলা পর্যন্ত গুঁজে নিই, যাতে আমি আপনার কোন কথা শুনতে না পাই। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা ছিল ভিন্ন, তিনি আমাকে আপনার কথা শোনালেন। আমি এক সুমধুর বাণীই শুনেছি। কাজেই আপনি আপনার দীনের বিষয়টি আমার সামনে তুলে ধরুন। তিনি আমার সামনে ইসলাম পেশ করলেন এবং আমাকে কুরআন পাঠ করে শোনালেন। আল্লাহর কসম! এমন মধুর বাণী আমি আর কখনও শুনিনি এবং এমন ভারসাম্যপূর্ণ ধর্মীয় বিধানের কথা জানতে পারিনি। আমি তখনই ইসলাম কবুল করলাম এবং সত্যের সাক্ষ্য দিলাম।
এরপর আমি বললাম: হে আল্লাহ্র নবী! আমি আমার সম্প্রদায়ের একজন মান্যগণ্য ব্যক্তি। আমি তাদের কাছে ফিরে গিয়ে তাদের ইসলামের দাওয়াত জানাব। আপনি আল্লাহর কাছে দু'আ করুন, যেন তিনি আমাকে এমন কোন নিদর্শন দান করেন, যা আমার দাওয়াতের পক্ষে সহায়ক হবে। তিনি বললেন : اللهم اجعل له اية 'হে আল্লাহ্! তাকে একটি নিদর্শন দিন।'
📄 যে নিদর্শন তাঁকে দেওয়া হয়
তুফায়ল (রা) বলেন: আমি স্বদেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। যখন এক গিরিপথে পৌছলাম, তখন আমার দু'চোখের মাঝ বরাবর একটি আলোকবর্তিকা জ্বলে উঠল। সেখানে একটি কাফেলা পানি গ্রহণের জন্য অবস্থান করছিল। আমি আল্লাহর কাছে দু'আ করলাম, এটা আমার চেহারা ভিন্ন অন্য কোথাও স্থানান্তর করে দিন। আমি আশংকা করছিলাম যে, লোকেরা ভাবতে শুরু করবে তাদের ধর্ম ত্যাগের কারণে আমার চেহারা বিকৃতি ঘটেছে। তখন সে আলো সরে গিয়ে আমার চাবুকের মাথায় পড়ল। উক্ত কাফেলার লোকেরা একটি ঝুলন্ত ফানুসের মত সে আলো আমার চাবুকের মাথায় প্রত্যক্ষ করছিল। আমি গিরিপথ থেকে তাদের দিকে নেমে আসলাম এবং তাদের সাথে মিলে গেলাম।