📄 চুক্তিপত্র কীটে খাওয়া সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সংবাদ দান ও পরবর্তী বৃত্তান্ত
ইন হিশাম বলেন: এক বর্ণনায় জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা) আবূ তালিবকে বলেছিলেন: হে চাচা! আমার রব কুরায়শদের চুক্তিনামা খেয়ে ফেলার জন্য উইপোকাকে ক্ষমতা দিয়েছেন। তার যত জায়গায় আল্লাহ্ নাম লেখা ছিল, তা বাদ দিয়ে তাদের যুলুম, আত্মীয়তা বিচ্ছেদ ও অপবাদমূলক যত কথা ছিল, তা উইপোকায় খেয়ে ফেলেছে। আবু তালিব বললেন: তোমার রব কি তোমাকে এ সংবাদ জানিয়েছেন? তিনি বললেন: হ্যাঁ। আবূ তালিব বললেন: তা হলে আল্লাহ্র কসম! কেউ তোমার ক্ষতি করতে পারবে না। এই বলে তিনি কুরায়শদের কাছে চলে গেলেন।
তিনি বললেন: হে কুরায়শ সম্প্রদায়! আমার ভাতিজা আমাকে এই এই সংবাদ দিয়েছে। কাজেই তোমরা এসে দেখ, তোমাদের চুক্তিপত্রের কি অবস্থা। তার সংবাদ যদি সঠিক হয়, তা হলে তোমরা আমাদের সাথে এই সম্পর্কচ্ছেদ পরিহার কর। আর তোমরা তোমাদের অবস্থান হতে সরে আস। পক্ষান্তরে তাঁর সংবাদ যদি সত্য না হয়, তবে আমি তাঁকে তোমাদের হাতে তুলে দেব।
কুরায়শগণ বলল: আমরা এতে রাযী। তারা সকলে এ প্রস্তাবে একমত হল। অবশেষে চুক্তিপত্র নামিয়ে আনা হল। দেখা গেল, রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দেওয়া খবর সম্পূর্ণ সত্য। কিন্তু এতে তাদের হঠকারিতা আরও বেড়ে গেল। এ সময় কুরায়শের উপরিউক্ত দলটি চুক্তিনামাটি টুকরো টুকরো করে ফেলল।
📄 চুক্তিপত্র ছিন্নকারীদের প্রশংসায় আবু তালিবের কবিতা
ইবন ইসহাক বলেন: চুক্তিপত্রটি ছিন্ন করা হলে এবং তাতে যা লেখা ছিল তা বাতিল হয়ে গেলে, যারা এ চুক্তিনামা ছিন্ন করেন, আবু তালিব তাঁদের প্রশংসায় এ কবিতা রচনা করেন:
الاهل اتي بحرينا صنع ربنا * على نايهم والله بالناس ارود
কে আছে এমন যে সুদূর সাগরের ওপারে অবস্থিত আমাদের ভাইদের কাছে পৌঁছে দেবে আমাদের রবের আচরণের কথা। আল্লাহ্ তো মানুষের প্রতি অতি মেহেরবান।
فيخبرهم ان الصحيفة مزقت × وان كل مالم يرضه الله مفسد
তাদের কাছে পৌঁছে দেবে এ বার্তা যে, চুক্তিপত্রটি ছিন্নভিন্ন করে ফেলা হয়েছে। বস্তুত আল্লাহ্ মনঃপূত নয় এমন সবই ধ্বংস হতে বাধ্য।
تراوحها افك وسحر مجمع × ولم يلف سحر اخر الدهر يصعد
চুক্তিটি ছিল অপবাদ ও ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যায় পরিপূর্ণ, কিন্তু মিথ্যা কখনও স্থায়ী হয় না।
এ চুক্তিপত্র সম্পাদনে এমন সব লোক একত্রিত হয়েছিল, যারা এতে পুরোপুরিভাবে একমত ছিল না। ফলে এ চুক্তির অশুভ পাখি তাদের মাথার উপর ঘুরপাক খাচ্ছিল।
বস্তুত চুক্তিপত্রের এ ব্যাপারটি ছিল এমন এক জঘন্য অপরাধ, যার বদলে সংশ্লিষ্ট সকলের হাত ও গর্দান কেটে ফেললেই উচিত বিচার হত।
মক্কার উভয় পাশের লোকদের যখন পথিকেরা অতিক্রম করে, তখন তারা তাদের অনিষ্টের আশংকায় সেখান থেকে ভীত-প্রকম্পিত অবস্থায় দ্রুত পালিয়ে যায়।
আর উপার্জনকারীকে ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য অবকাশ দেওয়া হয় যে, সে তিহামার পথ ধরবে, না কি নজদের।
আখশাবায়ন পর্বতদ্বয়ের মাঝখানে উঠে আসে এমন এক বাহিনী, যার রয়েছে ঢের তিক্ত ফল-তীর, ধনুক আর তরবারি।
যদি এমন কেউ থাকে, যে মান-সম্মানের সাথে মক্কায় লালিত-পালিত হয়েছে; তবে তার জেনে রাখা উচিত যে, আমরা মক্কা উপত্যকায় পুরুষানুক্রমে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত।
আমরা এখানে প্রতিপালিত হয়েছি, যখন এখানকার জনসংখ্যা ছিল সামান্য। এরপর আমরা দিন দিন কল্যাণপ্রাপ্ত হতে থাকি; আর আমাদের খ্যাতি চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।
আমরা মানুষকে অন্নদান করতে থাকি, ফলে এক পর্যায়ে অন্য লোকদের মর্যাদা ম্লান হয়ে যায়। আমরা তখনও অন্নদান করি, যখন জুয়ার তীর তুলতে গিয়ে কেঁপে ওঠে প্রতিযোগীর হাত।
আল্লাহ্ তা'আলা সেই দলটিকে উত্তম বদলা দান করুন, যারা হাজুন থেকে একের পর এক জনসমক্ষে এসে হাযির হয় এবং তাদেরকে জ্ঞান-বুদ্ধির কথা শোনায় এবং সৎপথের সন্ধান দেয়।
তারা খাতমুল-হাজুন নামক স্থানে এমনভাবে বসে ছিলেন, যেন তারা রাজণ্যবর্গ। বস্তুত তারা ছিলেন সম্মানিত নেতাদের মধ্যে অতি মর্যাদাবান।
اعان عليها كل صقر كانه × اذا مامشى في رفرف الدرع احد ....
এতে যাঁরা সহযোগিতা করেছিলেন, তারা প্রত্যেকে ছিলেন বাজপাখির মত। যখন তারা দীর্ঘ বর্ম পরিহিত অবস্থায় এগিয়ে চলতেন, তখন তারা ধীর পদক্ষেপে চলতেন।
جرى على جلى الخطوب كانه × شهاب بكفى قابس يتوقد
অনেক বড় বিপজ্জনক কাজেও তারা সাহসিকতার পরিচয় দেন, তারা যেন এক-একটা অগ্নিশিখা, যা অগ্নি গ্রহণকারীর হাতে দাউ-দাউ করে জ্বলতে থাকে।
من الاكرمين من لؤى بن غالب × اذا سيم خسفا وجهه يتربد
তারা লুআঈ ইব্ন গালিবের বংশধরদের মধ্যে অন্যতম মর্যাদাবান, যখন তদের সাথে কোন অবমাননাকর আচরণ করা হয়, তখন তাদের চেহারা পরিবর্তিত হয়ে যায়।
طويل النجاد خارج نصف ساقه x على وجهه يسقى الغمام وسعد
তারা দীর্ঘ দেহের অধিকারী, তাদের পায়ের অর্ধেক পরিধেয় বস্ত্রের বাইরে থেকে যায়। তাদের চেহারার বদৌলতে মেঘ বৃষ্টি বর্ষণ করে এবং নিজেকে ধন্য মনে করে।
عظيم الرماد سيد و ابن سيد × يحض على مقعرى الضيوف ويحشد
তারা দানবীর, জননেতা এবং নেতার সন্তান, তারা অন্যকেও অতিথি আপ্যায়নে উৎসাহিত করে এবং নিজেরাও এ উদ্দেশ্যে অর্থ সঞ্চয় করে।
بيني لابناء العشيرة صالحا × اذا نحن طفنا في البلاد ويمهد
আমরা যখন দেশ-বিদেশে সফরে থাকি, তখন তারা তাদের ভবিষ্যৎ বংশধরদের জন্য ঘর-বাড়ি তৈরি করে এবং অন্যান্য আসবাবপত্রের ব্যবস্থা করে।
الظ بهذا الصلح كل مبرأ × عظيم اللواء أمره ثم يحمد
ঐ সন্ধিপত্রে হস্তক্ষেপ করে এমন সব লোক, যাঁরা নির্মল চরিত্রের অধিকারী, বৃহৎ ঝাণ্ডাধারী জননেতা, তদুপরি তারা সর্বজননন্দিত।
قضوا ما قضوا في ليلهم ثم اصبحوا * على مهل وسائر الناس رقد
তারা রাত্রিকালে যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার নিয়ে নিল এবং তারা সকালে তাদের উদ্দিষ্ট স্থানে ধীর-স্থিরভাবে পৌঁছে গেল; আর এ সময় অন্য লোকেরা নিদ্রায় বিভোর ছিল।
هم رجعوا سهل بن بيضاء راضيا × وسر ابو بكر بها ومحمد
তারা সাহল ইব্ন বায়যাকে রাযী করে ফিরিয়ে দিল, আর তাদের এ কাজে মুহাম্মদ (সা) ও আবূ বকর (রা) খুশি হলেন।
متى شرك الاقوام في جل امرنا * وكنا قديما قبلها نتودد
এরা আমাদের বড় বড় কাজে অংশগ্রহণ করেছে? আমরা তো এ চুক্তিপত্রের আগে, বহু আগ থেকেই পরস্পর বন্ধুভাবাপন্ন ছিলাম।
وكنا قديما لا نقر ظلامة × وندرك ما شئنا ولا نتشدد
সুদূর অতীত থেকে আমরা কখনও যুলুমকে প্রশ্রয় দেইনি। আমরা যা চাইতাম তা করতাম, কিন্তু কখনও কঠোর হতাম না।
فيا القصى هل لكم في نفوسكم x وهل لكم فيما يجئ به غد
সুতরাং হে বনূ কূসাই! তোমাদের জন্য আশ্চর্য! তোমরা কি কখনো তোমাদের ভাল-মন্দের কথা চিন্তা করেছ, আগামীকাল কি ঘটতে পারে, সে ব্যাপারে তোমরা কি একবারও চিন্তা করে দেখেছ?
فاني واياكم كما قال قائل × لديك البيان لو تكلمت اسود
আমার ও তোমাদের অবস্থা তো ঠিক সেইরূপ, যেমন কেউ বলেছিল: হে আসওয়াদ পাহাড়! কথা বলার শক্তি তোমারই আছে, যদি তুমি বলতে।
📄 মুতঈম ইব্ন আদীর ইন্তিকালে হাসান (রা)-এর শোকগাথা এবং চুক্তিপত্র বাতিলকরণে তার অবদান প্রসঙ্গে
মুতঈম ইবন 'আদীর ইন্তিকাল হলে হাসান ইবন সাবিত (রা) নিম্নের শোকগাথাটি রচনা করেন। চুক্তিপত্র বাতিলকরণে তিনি যে অবদান রাখেন, তা তিনি এ শোকগাথায় তুলে ধরেন:
أيا عين فابكي سيد القوم واسفحى x بدمع وان انرفته فاسكبي الدماء .
হে চোখ! গোত্র-প্রধানের শোকে কাঁদো, অশ্রু উজাড় করে দাও। আর যখন অশ্রু ফুরিয়ে যাবে, তখন রক্তধারা ঝরাতে থাকবে।
وبكي عظيم المشعرين كليهما * على الناس معروفا له ما تكلما
উভয় দলের প্রধান ব্যক্তির স্মরণে কাঁদো। মানুষের প্রতি তাঁর অনুগ্রহ ততদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে, যতদিন মানুষ কথা বলবে।
فلو كان مجد يخلد الدهر واحدا × من الناس ابقى مجده اليوم مطعما
প্রতিপত্তির যদি ক্ষমতা থাকত কোন মানুষকে চিরদিন বাঁচিয়ে রাখার, তা হলে মুতঈমকে তাঁর প্রতিপত্তি আজও বাঁচিয়ে রাখত।
اجرت رسول الله منهم فاصبحوا × عبيدك مالبي مهل واحرما
তুমি আল্লাহর রাসূলকে তাদের থেকে আশ্রয় দিয়েছ। সুতরাং যতদিন আল্লাহ্র ডাকে সাড়া প্রদানকারী ইহরাম বেঁধে লাব্বায়ক বলবে, ততদিন তারা তোমার কৃতজ্ঞতার পাশে আবদ্ধ থাকবে।
فلو سئلت عنه معد باسرها × وقحطان او باقي بقية جرهما
যদি তাঁর সম্পর্কে বনূ মা'আদ, বনু কাহতান এবং বনু জুরহুমের অবশিষ্ট লোকদের জিজ্ঞেস করা হয়,
لقالوا هو الموفى بخفرة جاره * وذمته يوما اذا تذمما
তবে তারা একযোগে বলবে: তিনি তাঁর আশ্রিতের দেওয়া অংগীকার পূরণ করেন এবং তিনি আদায় করেন নিজ যিম্মাদারী, যখন তা আদায়ের সময় আসে।
فما تطلع الشمس المنيرة فوقهم x على مثله فيهم اعز واعظما
সুতরাং তাদের উপর তার মত উজ্জ্বল সূর্য আর উদিত হবে না; যা তার মত অধিক সম্মান ও মর্যাদাসম্পন্ন।
وابي اذا یابی والين شيمة × وانوم عن جار اذا الليل اظلما
আর যখন সে অস্বীকার করে, তখন তার মত অস্বীকারকারী আর কেউ নেই। আর সে উত্তম চরিত্রের অধিকারী। অন্ধকার রাতে সে তার আশ্রিতদের ব্যাপারে নিশ্চিন্তে নিদ্রা-বিভোর থাকে।
ইবন হিশাম বলেন: এ কবিতার كليهما সম্বালিত লাইনটি ইবন ইসহাক ছাড়া অন্যদের সূত্র থেকে প্রাপ্ত।
📄 মুতঈম ইব্ন আদী রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে যেভাবে আশ্রয় দিয়েছিলেন
ইন হিশাম বলেন: হাসান (রা) এ কবিতায় বলেছেন اجرت رسول الله منهم রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে তুমি তাদের থেকে আশ্রয় দিয়েছিলে)।
এ উক্তি দিয়ে তিনি এই ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন যে, যখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) তায়ফবাসীদের তাঁর প্রতি ঈমান আনার এবং তাঁর সহযোগিতা করার আহবান জানালেন, কিন্তু তারা তাঁর এ আহবানে সাড়া দিল না, তখন তিনি হেরা পর্বতে চলে গেলেন। এরপর তিনি আখনাস ইব্ন শুরায়কের কাছে তার আশ্রয় চেয়ে তার কাছে খবর পাঠালেন। সে উত্তর দিল: আমি কুরায়শদের মিত্র। এক গোত্রের মিত্র তাদের প্রতিপক্ষকে আশ্রয় দিতে পারে না। এরপর তিনি সুহায়ল ইব্ন আমরকে অনুরূপ অনুরোধ জানালেন। সে বলল: বনু 'আমিরের লোক বন্ কা'বের বিরুদ্ধে কাউকে আশ্রয় দেয় না। অবশেষে তিনি মুতঈম ইবন 'আদীর কাছে লোক পাঠালেন। মুতঈম তাঁর অনুরোধ রক্ষা করলেন। মুতঈম ও তাঁর খান্দানের লোকসহ অস্ত্র সজ্জিত হয়ে মসজিদে হারামে প্রবেশ করলেন এবং তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে সেখানে প্রবেশ করার জন্য ডেকে পাঠালেন। তিনি এসে বায়তুল্লাহ্ তাওয়াফ করলেন এবং সেখানে সালাত আদায় করলেন। এরপর তিনি (সা) তার বাড়িতে চলে গেলেন। হাসান (রা) ঐ ঘটনারই প্রতি ইঙ্গিত করে উপরোক্ত উক্তি করেন।