📄 আবূ সালামাকে আশ্রয় দানের কারণে আবু তালিবের প্রতি মুশরিকদের চাপ, আবু লাহাবের প্রতিবাদ ও আবূ তালিবের কবিতা
ইব্ন ইসহাক বলেন: এরূপ আরেকজন হচ্ছেন আবু সালামা ইবন 'আবদুল আসাদ, তাঁর সম্পর্কে আমার পিতা ইসহাক ইবন ইয়াসার (র) আমার কাছে সালামা ইবন 'আবদুল্লাহ্ ইব্ন 'উমর ইব্ন আবূ সালামা (র)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি তার কাছে বর্ণনা করেছেন: আবূ সালামা (রা) যখন আবূ তালিবের আশ্রয় লাভ করলেন, তখন বনু মাখযূমের কতিপয় লোক তার সাথে সাক্ষাৎ করল। তারা তাকে বলল : হে আবূ তালিব। আপনি নিজ ভাতিজা মুহাম্মদকে আমাদের থেকে আগলে রেখেছেন। এখন আবার আমাদের লোককে আমাদের থেকে ছায়া দিচ্ছেন কোন অধিকারে?
আবূ তালিব বললেন: সে আমার ভাগিনেয়। আমার আশ্রয় চেয়েছে। আমি যদি ভাগিনাকে রক্ষা করার অধিকার না রাখি, তবে ভাতিজাকেও রক্ষা করতে পারি না।
তখন আবু লাহাব উঠে বলল : হে কুরায়শ সম্প্রদায়, আল্লাহর কসম! তোমরা এই প্রবীণের সাথে খুব বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলেছ। তিনি নিজ খান্দানের একজনকে আশ্রয় দিলেও তোমরা তার সাথে বাড়াবাড়ি করছ। আল্লাহ্র কসম! তোমরা এসব থেকে বিরত না হলে, আমি সব কিছুতে তাঁর সঙ্গে থাকব। তার ইচ্ছা পূরণে আমি তার সর্বপ্রকার সহযোগিতা করব।
এ কথা শুনে তারা বলল না, হে আবু উত্ত্বা! আপনি যা পসন্দ করেন না, আমরা তা এড়িয়ে চলব।
বলা বাহুল্য, আবু লাহাব রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বিরুদ্ধে তাদের এক মযবুত খুঁটি ও সহায়ক শক্তি ছিল। তাই তারা তাকে আর বিরক্ত না করে সে অবস্থাতেই থাকতে দিল।
আবু লাহাবের কথা শুনে আবূ তালিবের মনে একটু আশার সঞ্চার হল। তিনি ভাবলেন, হয়ত সে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ব্যাপারে তাকে সাহায্য করবে। তিনি এ ব্যাপারে তাকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য কবিতা আবৃত্তি করলেন:
وان امرأ أبو عتيبة عمه × لفي روضة ما أن يسام المظالما
যার চাচা আবূ উতায়বা, নিশ্চয়ই সে অবস্থান করে এমন এক সম্মানজনক স্থানে, যেখানে যুলুমের আচরণ অকল্পনীয়।
اقول له واين منه نصيحتي x ابا معتب ثبت سوادك قائما
আমি তাকে বলি, হে আবূ মুআত্তাব! নিজ দল আরও সুসংগঠিত কর। কিন্তু আমার উপদেশ কোথায় আর সে কোথায়!
দুনিয়াতে যতদিন তুমি জীবিত থাকবে ততদিন তুমি এমন কিছুই গ্রহণ করবে না, যার কারণে জাতীয় সভা-সমিতিতে যোগদান করলে তোমাকে নিন্দা কুড়াতে হয়।
অপরাগতার পথ পরিহার কর, সে পথ তো অন্যদের। কেননা এটা নিশ্চিত যে, কোনরূপ দুর্বলতার উপর তোমার জন্ম হয়নি।
যুদ্ধরত থাক, যুদ্ধই ন্যায়দণ্ড। যুদ্ধপ্রিয়কে তুমি দেখবে না কখনও অবনমিত, যতক্ষণ না লোক তার কাছে সন্ধিপ্রার্থী হয়।
কি করে তুমি স্বগোত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হবে, অথচ তারা তোমার সাথে কোন গুরুতর অপরাধ করেনি, আর তারা জয়-পরাজয় কোন অবস্থাতেই তোমার সঙ্গ ছাড়েনি।
আল্লাহ্ তা'আলা আমাদের পক্ষ হতে বনু আব্দ শামস্, বন্ নাওফল, বন্ তায়ম ও বন্ মাখযূমকে তাদের হঠকারিতা ও অপরাধের বদলা দিন।
তারা নিষিদ্ধ স্বার্থ সিদ্ধির জন্য আমাদের পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতিতে ফাটল ধরিয়েছে।
বায়তুল্লাহ্র কসম! তোমরা মিথ্যা বলেছ যে, আমাদের থেকে মুহাম্মদকে ছিনিয়ে নেওয়া হবে, অথচ এখনও তোমরা এ গিরিসংকটের পাশে (যুদ্ধের) অন্ধকার দিন দেখনি।
📄 আবূ বকর (রা) কর্তৃক ইব্ন দুগুন্নার আশ্রয় গ্রহণ এবং পরে তা প্রত্যাখ্যান
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।
📄 ইবন দু'জনা যে কারণে আবু বকর (রা)-কে আশ্রয় দেয়
ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে মুহাম্মদ ইব্ন মুসলিম ইব্ন শিহাব যুহরী (র) উরওয়া (র)-এর সূত্রে 'আয়েশা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। আবু বকর (রা)-এর জন্য যখন মক্কার যমীন সংকুচিত হয়ে গেল এবং তাঁর উপর নানা রকম উৎপীড়ন চলল এবং সেই সাথে রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও তাঁর অন্য সাহাবীদের প্রতি কুরায়শদের নির্মম যুলুম-অত্যাচার দেখে তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে হিজরতের অনুমতি চাইলেন। তিনি তাঁকে অনুমতি দিলেন। এরপর আবূ বকর (রা) মক্কা ছেড়ে রওয়ানা হলেন। যখন মক্কা হতে এক বা দু'দিনের পথ অতিক্রম করে গেলেন, তখন ইব্ন দুগুন্নার সাথে পথিমধ্যে তাঁর সাক্ষাৎ হল।
ইব্ন দুগুন্না ছিল হারিস ইবন 'আব্দ মানাত ইব্ন কিনানা গোত্রের লোক এবং সে সময়কার আহাবীশ (সম্মিলিত গোত্র)-এর নেতা।
ইবন ইসহাক বলেন: আহাবীশ হচ্ছে বনূ হারিস ইব্ন 'আব্দ মানাত ইব্ন কিনানা, হুন ইবন খুযায়মা ইন্ন মুদরিকা গোত্র এবং খুযাআ গোত্রের বনূ মুসতালিক।
ইবন হিশাম বলেন: এ গোত্রদ্বয় পরস্পর মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিল বলে তাদের নাম আহাবীশ। কারণ মক্কার নিম্ন এলাকায় আহবাশ নামক স্থানে এ চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল।
ইন্ন দুগুন্নাকে ইন্ন দুগায়নাও বলা হয়।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে ইমাম যুহরী (র) 'উরওয়া ইন্ন যুবায়র (র) সূত্রে 'আয়েশা (রা) থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন: ইব্ন দুগুন্না তাঁকে বলল: হে আবু বকর কোথায় যাচ্ছেন? তিনি বললেন আমার সম্প্রদায় আমাকে কষ্ট দিয়ে দেশ থেকে বের করে দিয়েছে। তারা আমাকে নানা রকম কষ্ট দিয়েছে এবং মক্কার যমীনকে আমার জন্য সংকীর্ণ করে দিয়েছে।
ইব্ন দুগুন্না জিজ্ঞেস করল এর কারণ? আল্লাহর কসম! আপনি বংশের গৌরব বৃদ্ধি করেন। আপনি বিপদাপদে মানুষের সাহায্য করেন। আপনি একজন সৎকর্ম-পরায়ণ মানুষ। আপনি নিঃস্বের হাতে অর্থ যোগান (বা আপনি অন্যকে শ্রেষ্ঠতম বস্তু কিংবা অন্যের কাছে যা নেই, তা তাকে দান করেন)। অতএব আপনি ফিরে যান। আমি আপনার নিরাপত্তার যিম্মাদারী গ্রহণ করলাম।
তখন আবু বকর (রা) ইব্ন দুগুন্নার সাথে ফিরে আসলেন, তারা মক্কায় পৌঁছার পর ইন্ন দুগুন্না ঘোষণা করল: হে কুরায়শ সম্প্রদায়! আমি আবু কুহাফার পুত্রকে নিরাপত্তা দিয়েছি। কাজেই কেউ যেন তার সাথে ভাল ছাড়া কোনরূপ মন্দ ব্যবহার না করে। 'আয়েশা (রা) বলেন: এর ফলে কুরায়শরা তাঁর সাথে সংযত আচরণ করতে থাকে।
📄 আবু বকর (রা) কর্তৃক ইন্ন দুগুন্নার আশ্রয় প্রত্যাখ্যানের কারণ
আয়েশা (রা) বলেন: বনু জুমাহ গোত্রে নিজ বাড়ির সামনে আবু বকর (রা)-এর একটি মসজিদ ছিল। তিনি সেখানে সালাত আদায় করতেন। তিনি ছিলেন কোমল হৃদয়বিশিষ্ট ব্যক্তি। তিনি কুরআন তিলাওয়াতকালে কাঁদতেন। শিশু, গোলাম ও নারীরা আশ্চর্য হয়ে তাঁর সে অবস্থা দেখত। এটা কুরায়শদের চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়াল। তারা ইব্ন দুগুন্নার কাছে গিয়ে বলল: হে ইব্ন দুগুন্না! আপনি তো এই লোকটিকে এজন্য নিরাপত্তা দেননি যে, সে আমাদের জ্বালাতন করবে। সে সালাতে দাঁড়িয়ে মুহাম্মদের প্রতি যা অবতীর্ণ হয় বলে কথিত, তা পাঠ করে; আর বিগলিত হয়ে কাঁদে। তার সে অবস্থা মানুষের মনকে আকৃষ্ট করে। আমাদের আশংকা হয়, পাছে সে আমাদের নারী, শিশু ও দুর্বল চিত্তের লোকগুলোকে নিজ দলে ভিড়িয়ে ফেলে। আপনি তার কাছে গিয়ে বলুন, সে যেন নিজ গৃহে চলে যায় এবং সেখানে বসে যা ইচ্ছা তাই করে।
ইব্ন দুগুন্না আবূ বকর (রা)-এর নিকট উপস্থিত হল। সে তাকে বলল: হে আবূ বকর! আপনি নিজ সম্প্রদায়কে অতিষ্ঠ করবেন বলে তো আপনাকে আশ্রয় দেইনি। আপনার বর্তমান অবস্থায় তারা উদ্বিগ্ন, এতে তারা পীড়াবোধ করছে। কাজেই আপনি বাড়ির ভেতর চলে যান এবং সেখানে বসে যা ইচ্ছা তাই করুন।
আবু বকর (রা) উত্তর দিলেন: তার চেয়ে আমি তোমার নিরাপত্তা ফিরিয়ে দিচ্ছি এবং আল্লাহ্র নিরাপত্তা গ্রহণ করা পসন্দ করছি। সে বলল: তবে আপনি তাই করুন! আবূ বকর (রা) বললেন: আমি তোমার দেওয়া নিরাপত্তা ফিরিয়ে দিলাম।
'আয়েশা (রা) বলেন: তখন ইব্ন দুগুন্না দাঁড়িয়ে বলল: হে কুরায়শ সম্প্রদায়। আবু কুহাফার পুত্র আমার আশ্রয় প্রত্যাখ্যান করেছে। কাজেই তোমাদের লোক নিয়ে এখন তোমরা বোঝ।
ইবন ইসহাক বলেন: আমার কাছে 'আবদুর রহমান ইব্ন কাসিম তাঁর পিতা কাসিম ইব্ন মুহাম্মদ (র)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, একদা আবূ বকর (রা) কা'বা শরীফের উদ্দেশ্যে অগ্রসর হলেন। পথিমধ্যে জনৈক নির্বোধ কুরায়শ তাঁর পথ রোধ করল এবং তাঁর মাথায় ধুলো নিক্ষেপ করল। এ সময় ওয়ালীদ ইব্ন মুগীরা কিংবা 'আস ইব্ন ওয়ায়ল সেখান দিয়ে যাচ্ছিল। আবূ বকর (রা) তাকে বললেন: এই আহাম্মক আমার সাথে কি আচরণ করল, দেখলে? তখন সে বলল: এটা তো তুমি নিজেই তোমার সাথে করেছ। রাবী বলেন, তখন আবূ বকর (রা) বলছিলেন: হে আমার রব! তুমিই কতই না সহনশীল। হে রব! তুমি কতই না সহনশীল! হে রব! তুমি কতই না সহনশীল।