📄 উসমান ইবন মায'উন (রা) কর্তৃক ওয়ালীদের আশ্রয় প্রত্যাখ্যান
ইবন ইসহাক বলেন: সালিহ ইব্ন ইবরাহীম ইব্ন 'আবদুর রহমান ইব্ন 'আওফ (র) আমার কাছে বর্ণনা করেছেন এমন এক ব্যক্তির সূত্রে, যিনি তার কাছে বর্ণনা করেছেন উসমান ইবন মায'উন (রা)-এর থেকে, 'উসমান (রা) বলেন: তিনি যখন দেখলেন যে, রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লামের অন্য সাহাবীগণ কাফিরদের হাতে অবর্ণনীয় দুঃখ-কষ্ট ভোগ করছেন, আর তিনি নিজে ওয়ালীদ ইবন মুগীরার আশ্রয়ে নিরাপদে চলাফেরা করছেন, তখন তিনি বললেন: আমার সঙ্গী-সাথী ও দীনী ভাইয়েরা আল্লাহর রাহে এরূপ উৎপীড়িত হবে, আর আমি একজন মুশরিকের আশ্রয়ে সে উৎপীড়ন থেকে বেঁচে থাকব এবং নিরাপদে তাদের সামনে ঘুরে বেড়াব-আল্লাহ্ কসম! এটা আমার জন্য এক বিরাট ত্রুটি। এই বলে তিনি ওয়ালীদের কাছে চলে গেলেন এবং তাকে বললেন: হে আবূ 'আব্দ শাম্স! তুমি তোমার যিম্মাদারী পূর্ণ করেছ। আমি তোমার আশ্রয় তোমাকে ফিরিয়ে দিলাম। ওয়ালীদ বলল: কেন ভাতিজা! আমার কওমের কেউ তোমাকে কোন কষ্ট দিয়েছে কি? তিনি বললেন: না, বরং আমি আল্লাহর আশ্রয়ই বেছে নিচ্ছি। তাঁর আশ্রয় ভিন্ন অন্যের আশ্রয়ে আমি থাকতে চাই না।
তখন ওয়ালীদ বলল: তা হলে তুমি মসজিদুল হারামে চল। সেখানে তুমি প্রকাশ্যে আমার আশ্রয় প্রত্যাখ্যান কর, যেমন আমি প্রকাশ্যে তোমাকে আশ্রয় দিয়েছিলাম। সেমতে তারা উভয়ে মসজিদে চলে গেলেন। ওয়ালীদ সকলকে লক্ষ্য করে বলল: এই যে 'উসমান ইব্ন মায'উন—সে আমার আশ্রয় ফিরিয়ে দিতে এসেছে। তখন 'উসমান (রা) বললেন: হ্যাঁ, সে সত্য বলেছে। আমি তাকে ওয়াদা পালনকারী এবং একজন উত্তম আশ্রয়দাতা পেয়েছি। তবে আমি আল্লাহ্ ভিন্ন আর কারও আশ্রয়ে থাকতে চাই না। তাই তার আশ্রয় প্রত্যাখ্যান করছি। এই বলে তিনি সেখান থেকে প্রস্থান করলেন।
📄 দীনী ভাইদের দুঃখকষ্টে তাঁর মর্ম যাতনা ও লাবীদের মজলিসে উদ্ভূত ঘটনা
তখন কবি লাবীদ ইব্ন রবী'আ ইব্ন মালিক ইব্ন জা'ফর ইন কিলাব কুরায়শদের একটি মজলিসে তাদের কবিতা শোনাচ্ছিলেন। 'উসমান (রা) সেখানে গিয়ে তাদের সাথে বসে পড়লেন। লাবীদ আবৃত্তি করলেন:
الا كل شيئ ما خلا الله باطل
"শোন, আল্লাহ্ ছাড়া আর সবই মিথ্যা।" 'উসমান (রা) বললেন: তুমি ঠিক বলেছ।
লাবীদ তার পরবর্তী চরণ উচ্চারণ করলেন:
وكل نعيم لا محالة زائل
"যা কিছু ঐশ্বর্য, সবই অনিবার্য ধ্বংসশীল।"
'উসমান (রা) বললেন: তোমার কথা মিথ্যা। জান্নাতের নি'আমত কখনই ধ্বংস হবে না। এ কথা শুনে লাবীদ ইব্ন রবী'আ বললেন: হে কুরায়শ সম্প্রদায়! আল্লাহ্র কসম, তোমাদের মজলিসে বসে কেউ কখনও কষ্ট পেত না। তা এই অনাসৃষ্টি তোমাদের মাঝে কবে থেকে শুরু হল? এক ব্যক্তি উত্তর দিল, ও একটা আহমক, তার দলে এরূপ আরও কিছু বেওকুফ আছে, তারা আমাদের ধর্ম ত্যাগ করেছে। কাজেই আপনি ওর কথায় মনে কিছু নেবেন না। উসমান (রা) তার কথার প্রতিবাদ করলেন। ফলে উভয়ের মাঝে বাদানুবাদ বাড়তে থাকল। এক পর্যায়ে সে লোকটি উঠে 'উসমান (রা)-এর চোখে এমন জোরে চড় মারল যে, তাঁর চোখটি নষ্ট হয়ে গেল। ওয়ালীদ ইব্ন মুগীরা কাছে বসে তাঁর এ অবস্থা লক্ষ্য করছিল। সে বলল: হে ভাতিজা! আল্লাহ্র কসম, তোমার চোখের এ অবস্থা নাও হতে পারত। তুমি তো এক সুরক্ষিত আশ্রয়ে ছিলে। উসমান (রা) বললেন: তুমি উল্টো বলেছ, বরং আমার ভাল চোখটির জন্যও প্রয়োজন আল্লাহর পথে অপর চোখটির যা হয়েছে, অনুরূপ হওয়া। আমি যার আশ্রয়ে আছি, তিনি হে আব্দ শামস্! তোমার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী, অনেক ক্ষমতাবান।
ওয়ালীদ বলল: ভাতিজা, ইচ্ছা হলে এসো, পুনরায় আমার আশ্রয় গ্রহণ কর। তিনি বললেন: আমার প্রয়োজন নেই।
📄 আবু সালামা (রা)-এর আশ্রয় নেওয়া প্রসঙ্গে
এই অধ্যায়ে কোনো কন্টেন্ট এখনো যোগ করা হয়নি।
📄 আবূ সালামাকে আশ্রয় দানের কারণে আবু তালিবের প্রতি মুশরিকদের চাপ, আবু লাহাবের প্রতিবাদ ও আবূ তালিবের কবিতা
ইব্ন ইসহাক বলেন: এরূপ আরেকজন হচ্ছেন আবু সালামা ইবন 'আবদুল আসাদ, তাঁর সম্পর্কে আমার পিতা ইসহাক ইবন ইয়াসার (র) আমার কাছে সালামা ইবন 'আবদুল্লাহ্ ইব্ন 'উমর ইব্ন আবূ সালামা (র)-এর সূত্রে বর্ণনা করেন যে, তিনি তার কাছে বর্ণনা করেছেন: আবূ সালামা (রা) যখন আবূ তালিবের আশ্রয় লাভ করলেন, তখন বনু মাখযূমের কতিপয় লোক তার সাথে সাক্ষাৎ করল। তারা তাকে বলল : হে আবূ তালিব। আপনি নিজ ভাতিজা মুহাম্মদকে আমাদের থেকে আগলে রেখেছেন। এখন আবার আমাদের লোককে আমাদের থেকে ছায়া দিচ্ছেন কোন অধিকারে?
আবূ তালিব বললেন: সে আমার ভাগিনেয়। আমার আশ্রয় চেয়েছে। আমি যদি ভাগিনাকে রক্ষা করার অধিকার না রাখি, তবে ভাতিজাকেও রক্ষা করতে পারি না।
তখন আবু লাহাব উঠে বলল : হে কুরায়শ সম্প্রদায়, আল্লাহর কসম! তোমরা এই প্রবীণের সাথে খুব বেশি বাড়াবাড়ি করে ফেলেছ। তিনি নিজ খান্দানের একজনকে আশ্রয় দিলেও তোমরা তার সাথে বাড়াবাড়ি করছ। আল্লাহ্র কসম! তোমরা এসব থেকে বিরত না হলে, আমি সব কিছুতে তাঁর সঙ্গে থাকব। তার ইচ্ছা পূরণে আমি তার সর্বপ্রকার সহযোগিতা করব।
এ কথা শুনে তারা বলল না, হে আবু উত্ত্বা! আপনি যা পসন্দ করেন না, আমরা তা এড়িয়ে চলব।
বলা বাহুল্য, আবু লাহাব রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বিরুদ্ধে তাদের এক মযবুত খুঁটি ও সহায়ক শক্তি ছিল। তাই তারা তাকে আর বিরক্ত না করে সে অবস্থাতেই থাকতে দিল।
আবু লাহাবের কথা শুনে আবূ তালিবের মনে একটু আশার সঞ্চার হল। তিনি ভাবলেন, হয়ত সে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর ব্যাপারে তাকে সাহায্য করবে। তিনি এ ব্যাপারে তাকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য কবিতা আবৃত্তি করলেন:
وان امرأ أبو عتيبة عمه × لفي روضة ما أن يسام المظالما
যার চাচা আবূ উতায়বা, নিশ্চয়ই সে অবস্থান করে এমন এক সম্মানজনক স্থানে, যেখানে যুলুমের আচরণ অকল্পনীয়।
اقول له واين منه نصيحتي x ابا معتب ثبت سوادك قائما
আমি তাকে বলি, হে আবূ মুআত্তাব! নিজ দল আরও সুসংগঠিত কর। কিন্তু আমার উপদেশ কোথায় আর সে কোথায়!
দুনিয়াতে যতদিন তুমি জীবিত থাকবে ততদিন তুমি এমন কিছুই গ্রহণ করবে না, যার কারণে জাতীয় সভা-সমিতিতে যোগদান করলে তোমাকে নিন্দা কুড়াতে হয়।
অপরাগতার পথ পরিহার কর, সে পথ তো অন্যদের। কেননা এটা নিশ্চিত যে, কোনরূপ দুর্বলতার উপর তোমার জন্ম হয়নি।
যুদ্ধরত থাক, যুদ্ধই ন্যায়দণ্ড। যুদ্ধপ্রিয়কে তুমি দেখবে না কখনও অবনমিত, যতক্ষণ না লোক তার কাছে সন্ধিপ্রার্থী হয়।
কি করে তুমি স্বগোত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হবে, অথচ তারা তোমার সাথে কোন গুরুতর অপরাধ করেনি, আর তারা জয়-পরাজয় কোন অবস্থাতেই তোমার সঙ্গ ছাড়েনি।
আল্লাহ্ তা'আলা আমাদের পক্ষ হতে বনু আব্দ শামস্, বন্ নাওফল, বন্ তায়ম ও বন্ মাখযূমকে তাদের হঠকারিতা ও অপরাধের বদলা দিন।
তারা নিষিদ্ধ স্বার্থ সিদ্ধির জন্য আমাদের পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতিতে ফাটল ধরিয়েছে।
বায়তুল্লাহ্র কসম! তোমরা মিথ্যা বলেছ যে, আমাদের থেকে মুহাম্মদকে ছিনিয়ে নেওয়া হবে, অথচ এখনও তোমরা এ গিরিসংকটের পাশে (যুদ্ধের) অন্ধকার দিন দেখনি।