📄 ইন্ন যাবা'রীর উক্তি এবং তার সম্পর্কে অবতীর্ণ আয়াত
ইবন ইসহাক বলেন: তাদেরকে উল্লিখিত আয়াত শুনিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা) মজলিস ত্যাগ করলেন। এ সময় সেখানে আবদুল্লাহ ইব্ন যাবা'রী সাহমী এসে উপস্থিত হল। সে অন্যদের সাথে মজলিসে আসন গ্রহণ করল। ওয়ালীদ ইব্ন মুগীরা তাকে লক্ষ্য করে বলল: আল্লাহর কসম! আবদুল মুত্তালিবের সন্তান এইমাত্র নাফ্র ইব্ন হারিসকে নির্বাক করে দিয়েছে। মুহাম্মদ দাবি করে বলে: আমরা এবং আমরা যাদের উপাসনা করি, সকলেই জাহান্নামের ইন্ধন হব। একথা শুনে আবদুল্লাহ্ ইব্ন যাবা'রী বলল: দেখ আমি যদি তাকে পেতাম, তবে নির্ঘাত হারিয়ে দিতাম। তোমরা গিয়ে মুহাম্মদকে জিজ্ঞেস কর, আল্লাহ্ ছাড়া যাদেরই ইবাদত করা হয়, সকলেই কি উপাসকদের সাথে জাহান্নামী হবে? আমরা তো ফেরেশতাদেরও উপাসনা করি। অনুরূপ ইয়াহুদীরা হযরত উযায়র (আ)-এর এবং নাসারা সম্প্রদায় 'ঈসা ইব্ন মারইয়াম (আ)-এর পূজা করে। এ উত্তর শুনে ওয়ালীদ এবং মজলিসের অন্যরা খুবই খুশি হল। তারা ভাবল, ইব্ন যাবা'রীর এ প্রতিউত্তরে মুহাম্মদ (সা)-এর পরাজয় অনিবার্য। তার এ উক্তি রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট উত্থাপন করা হল। তিনি বললেন: আল্লাহ্ ছাড়া আর যে-কেউ এটা ভালবাসে যে তার উপাসনা করা হোক, সে অবশ্যই উপাসকের সাথে জাহান্নামী হবে। তারা তো কেবল শয়তানদেরই পূজা করে। আর করে তাদের পূজা, যারা তাদের উপাসনা করতে বলে। এ প্রসঙ্গেই আল্লাহ্ তা'আলা নাযিল করেন: إِنَّ الَّذِينَ سَبَقَتْ لَهُمْ مِّنَّا الْحُسْنَى أُولَئِكَ عَنْهَا مُبْعَدُونَ - لَا يَسْمَعُوْنَ حَسِيْسَهَا وَهُمْ فِي مَا اشْتَهَتْ أَنْفُسُهُمْ خَلِدُونَ - "যাদের জন্য আমার নিকট হতে আগে থেকেই কল্যাণ নির্ধারিত রয়েছে তাদের তা থেকে দূরে রাখা হবে। তারা তার ক্ষীণতম শব্দও শুনবে না এবং সেথায় তারা তাদের মন যা চায়, চিরকাল তা ভোগ করবে।” (২১ : ১০১-১০২)
এ আয়াতে 'ঈসা ইবন মারইয়াম (আ) ও উযায়র (আ)-কে বোঝানো হয়েছে। অনুরূপ সেইসব ইয়াহুদী ধর্মশাস্ত্রবিদ (আহবার) ও খ্রিস্টান ধর্মযাজক (রাহিব)-ও এর অন্তর্ভুক্ত, যারা আল্লাহ্ তা'আলার আনুগত্যে জীবন নির্বাহ করেছেন, কিন্তু পরবর্তীকালের বিভ্রান্ত সম্প্রদায়গুলো তাদেরকে আল্লাহ্র স্থলে রব ঠাউরে নিয়েছে এবং তাদের পূজা-অর্চনায় লিপ্ত হয়েছে।
তারা বলত: তারা ফেরেশতাদের পূজা করে এবং ফেরেশতারা আল্লাহ্র কন্যা। এ সম্পর্কে আল্লাহ্ নাযিল করেন:
وَقَالُوا اتَّخَذَ الرَّحْمَنُ وَلَداً سُبْحْنَهُ بَلْ عِبَادٌ مُّكْرَمُونَ - لَا يَسْبِقُونَهُ بِالْقَوْلِ وَهُمْ بِأَمْرِهِ يَعْمَلُونَ وَمَنْ يَقُلْ مِنْهُمْ إِنَّى الهُ مِنْ دُونِهِ فَذَلِكَ نَجْزِيْهِ جَهَنَّمَ كَذَلِكَ نَجْزِي الظَّلِمِينَ -
"তারা বলে, 'দয়াময় (আল্লাহ্) সন্তান গ্রহণ করেছেন'। তিনি পবিত্র, মহান! তারা তো তাঁর সম্মানিত বান্দা। তারা আগে বেড়ে কথা বলে না; তারা তো তাঁর আদেশ অনুসারেই কাজ করে থাকে। তাদের সামনে ও পেছনে যা কিছু আছে তা তিনি অবগত। তারা সুপারিশ করে শুধু তাদের জন্য, যাদের প্রতি তিনি সন্তুষ্ট এবং তারা তাঁর ভয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত। তাদের মধ্যে যে বলবে, 'আমি-ই ইলাহ্ তিনি (আল্লাহ্) ব্যতীত', তাকে আমি প্রতিফল দেব জাহান্নাম; এভাবেই আমি যালিমদের শাস্তি দিয়ে থাকি।” (২১: ২৬-২৯)
আবদুল্লাহ্ ইব্ন যাবা'রী-এর এ উক্তি যে, আল্লাহ্ ব্যতীত ঈসা ইবন মারইয়াম (আ)-এরও পূজা-অর্চনা করা হয়, যা শুনে ওয়ালীদ ও উপস্থিত শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে যায় এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর বিরুদ্ধে এটাকে অপ্রতিরোধ্য আক্রমণ বলে মনে করে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা নাযিল করেন:
وَلَمَّا ضُرِبَ ابْنُ مَرْيَمَ مَثَلاً إِذا قَوْمُكَ مِنْهُ يَصِدُّونَ -
"যখন মারইয়াম-তনয়ের দৃষ্টান্ত উপস্থিত করা হয়, তখন তোমার সম্প্রদায় শোরগোল আরম্ভ করে দেয়।" (৪৩: ৫৭)
তারপর 'ঈসা (আ) সম্পর্ক বলা হচ্ছে:
إِنْ هُوَ إِلَّا عَبْدٌ انْعَمْنَا عَلَيْهِ وَجَعَلْتُهُ مَثَلاً لَبَنِي إِسْرَائِيلَ - وَلَوْ نَشَاءُ لَجَعَلْنَا مِنْكُمْ مَّلْئِكَةٌ فِي الْأَرْضِ يَخْلُفُونَ - وَإِنَّهُ لَعِلْمُ للسَّاعَةِ لَا تَمْتَرُنَّ بِهَا وَاتَّبِعُونِ هَذَا صِرَاطٍ مُسْتَقِيمُ -
"সে তো ছিল আমারই এক বান্দা, যাকে আমি অনুগ্রহ করেছিলাম এবং করেছিলাম বনী ইসরাঈলের জন্য দৃষ্টান্ত। আমি ইচ্ছা করলে তাদের মধ্য হতে ফেরেশতা সৃষ্টি করতে পারতাম, যারা পৃথিবীতে উত্তরাধিকারী হত। ঈসা তো কিয়ামতের নিদর্শন; সুতরাং তোমরা কিয়ামতে সন্দেহ পোষণ করো না এবং আমাকে অনুসরণ কর। এটাই সরল পথ।” (৪৩: ৫৯-৬১)
وَإِنَّهُ لَعَلْمُ السَّاعَةِ অর্থাৎ মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করা, রুগ্নকে সুস্থ করা সহ যে সকল নিদর্শন আমি তার হাতে তুলে দিয়েছি, কিয়ামতের সত্যতা উপলব্ধি করার জন্য সেগুলো প্রমাণ হিসেবে যথেষ্ট।
📄 আখনাস ইব্ন শারীক ও তার সম্পর্কে আল্লাহ্ যা নাযিল করেন
ইবন ইসহাক বলেন: অপর একজন নির্যাতনকারী হচ্ছে আখনাস ইব্ন শারীক ইব্ন 'আম্র ইব্ন ওয়াহব সাকাফী। সে ছিল যুহরা গোত্রের মিত্র এবং স্বগোত্রের একজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি। গোত্রের সকলে তার কথা শুনত। সে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিন্দা করে বেড়াত এবং তাঁর প্রচার খণ্ডন করত। আল্লাহ্ তা'আলা তার সম্পর্কে وَلَا تُطِعْ كُلَّ حَلَّافٍ مَّهِينٍ - هَمَّازٍ مَّشَّاء بِنَمِيمٍ হতে زنيم পর্যন্ত সূরা কালামের এ আয়াতগুলো নাযিল করেন। অর্থ: "তুমি অনুসরণ কর না তার - যে কথায় কথায় শপথ করে, যে লাঞ্ছিত, পশ্চাতে নিন্দাকারী, যে একের কথা অপরের নিকট লাগিয়ে বেড়ায়, যে কল্যাণকার্যে বাধা দান করে, যে সীমালংঘনকারী, পাপিষ্ঠ, রূঢ় স্বভাব এবং তদুপরি কুখ্যাত।" (৬৮: ১০-১৩)।
এখানে زنيم শব্দটি জারজ অর্থে ব্যবহৃত হয় নি। কেননা আল্লাহ্ তা'আলা কারও পিতৃ-পরিচয় নিয়ে নিন্দা করেন না। বস্তুত এ বিশেষণ উল্লেখপূর্বক আল্লাহ্ তা'আলা তার পরিচয় তুলে ধরতে চেয়েছেন। الزنيم অর্থ যে নিজ বংশে অপরিচিত, তবে অন্য গোত্রের পরিচয়ে পরিচিত। জাহিলী যুগের কবি খাতীম তামীমীর কবিতায় আছে: زنیم تداعاه الرجال زيادة × كما زيد في عرض الأديم الاكارع "সে অন্য গোত্রের লোক, কিন্তু এ গোত্রের পরিচয়ে পরিচিতি। লোকে তাকে ফালতু বলেই জানে। সে যেন পায়ের তলার চামড়া, যাকে বাড়তি ধরে অন্য চামড়ার সাথে মিলিয়ে দেওয়া হয়।"
📄 ওয়ালীদ ইবন মুগীরা এবং তার সম্পর্কে আল্লাহ্ যা নাযিল করেন
অন্য একজন নির্যাতনকারী হচ্ছে ওয়ালীদ ইব্ন মুগীরা। সে বলত, মুহাম্মদের প্রতি ওহী নাযিল হবে, আর আমি বাদ যাব; যেখানে আমি কুরায়শ গোত্রের একজন সরদার ও সর্বজনমান্য নেতা? কিংবা অপসন্দ করা হবে সাকীফ গোত্রের অধিপতি আবু মাসউদ 'আমর ইব্ন 'উমায়কে? আমরা দু'জন হচ্ছি মক্কা ও তায়ফের প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ وَقَالُوا لَوْلَا نُزِّلَ هَذَا الْقُرْآنُ عَلَى رَجُلٍ مِّنَ الْقَرْيَتَيْنِ عَظِيمٍ (43 যুখরূফের এ আয়াত দু'টি নাযিল করেন। অর্থ: "এবং এরা বলে, 'এই কুরআন কেন অবতীর্ণ হল না দুই জনপদের কোন প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তির উপর? এরা কি তোমার প্রতিপালকের করুণা বণ্টন করে? আমিই তাদের মধ্যে জীবিকা বন্টন করি তদের পার্থিব জীবনে এবং একজনকে অপরের উপর মর্যাদায় উন্নত করি, যাতে একে অপরের দ্বারা কাজ করিয়ে নিতে পারে; এবং তারা যা জমা করে তা হতে তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ উৎকৃষ্টতম।" (৪৩: ৩১-৩২)
📄 উবায় ইব্ন খাল্ল্ফ ও উব্বা ইব্ন আবূ মু'আয়ত এবং তাদের সম্পর্কে আল্লাহ্ যা নাযিল করেন
রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উপর অপর দুজন নির্যাতনকারী ব্যক্তি হচ্ছে-উবায় ইব্ন খাল্ল্ফ ইব্ন ওয়াহব ইবন হুযাফা ইব্ন জুমাহ ও 'উব্বা ইব্ন আবূ মু'আয়ত। তারা ছিল একে অপরের অন্তরঙ্গ বন্ধু। একবার 'উব্বা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর মজলিসে বসে তাঁর কথা শুনেছিল। একথা উবায়-এর কানে পৌঁছায়। সে তখন 'উব্বার কাছে এসে বলল: আমি কি শুনিনি, তুমি মুহাম্মদের সাথ ওঠাবসা কর এবং তার কথা শোন? আমি যদি তোমার সাথে কথা বলি, তবে আমার জন্য তোমার চেহারা দেখা হারাম। সে একটা কঠিন শপথ করে বলল: যদি তুমি তাঁর কাছে বস, বা তাঁর কথা শোন, তবে তাঁর মুখে থুথু মেরে আসতে হবে। আল্লাহর দুশমন 'উব্বা এ ঘৃণ্য কাজটি সম্পন্ন করে। আল্লাহ্ তাকে লা'নত করুন। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা নাযিল করেন:
وَيَوْمَ يَعَضُّ الظَّالِمُ عَلَى يَدَيْهِ يَقُولُ لِيْتَنِي اتَّخَذْتُ مَعَ الرَّسُولِ سَبِيلاً . يُوَيْلَتي لَيْتَنِي لَمْ أَتَّخِذُ فلانًا خَلِيلاً - لَقَدْ أَضَلَّنِي عَنِ الذِّكْرِ بَعْدَ إِذْ جَاءَنِي وَكَانَ الشَّيْطَنُ لِلْإِنْسَانِ خَذُولاً .
"যালিম ব্যক্তি সেদিন নিজের দু'হাত দংশন করতে করতে বলবে, 'হায়, আমি যদি রাসূলের সাথে সৎপথ অবলম্বন করতাম! হায়, 'দুর্ভোগ আমার, আমি যদি অমুককে বন্ধুরূপে গ্রহণ না করতাম! আমাকে তো সে বিভ্রান্ত করেছিল আমার নিকট উপদেশ পৌঁছাবার পর। শয়তান তো মানুষের জন্য মহাপ্রতারক।” (২৫: ২৭-২৯)
একদিন উবায় ইব্ন খাল্ল্ফ একখণ্ড জরাজীর্ণ হাড় নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নিকট উপস্থিত হল। সে বলল: হে মুহাম্মদ! তোমার বিশ্বাস আল্লাহ্ তা'আলা এই ক্ষয়প্রাপ্ত অস্থিকেও পূনরুজ্জীবিত করবেন? এই বলে সে অস্থিটিকে হাতের মাঝে গুড়োগুড়ো করে ফেলল এবং তা ফুঁ দিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর দিকে উড়িয়ে দিল। তখন রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন: হ্যাঁ, আমি তাই বলি। আল্লাহ তা'আলা এর পুনরুত্থান ঘটাবেন এবং তোমারও এরূপ অবস্থা হওয়ার পর আল্লাহ তোমাকেও পুনরায় জীবিত করে তোমাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। এ সময় আল্লাহ্ তা'আলা নাযিল করেন:
وَضَرَبَ لَنَا مَثَلاً وَنَسِيَ خَلَقَهُ قَالَ مَنْ يُحْى العِظامَ وَهِيَ رَمِيمٌ - قُلْ يُحْيِيهَا الَّذِي أَنْشَاهَا أَوَّلَ مَرَّةٍ وَهُوَ بِكُلِّ خَلْقٍ عَلِيمٌ - الَّذِي جَعَلَ لَكُمْ مِّنَ الشَّجَرِ الْأَخْضَرِ نَارًا فَإِذَا أَنْتُمْ مِّنْهُ تُوقِدُونَ -
"এবং সে আমার সম্বন্ধে উপমা রচনা করে অথচ সে নিজের সৃষ্টির কথা ভুলে যায়; বলে, 'অস্থিতে প্রাণ সঞ্চার করবে কে, যখন তা পঁচে গলে যাবে?' বল, 'তার মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করবেন তিনিই, যিনি তা প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি প্রত্যেকটি সৃষ্টি সম্বন্ধে সম্যক পরিজ্ঞাত।' তিনি তোমাদের জন্য সবুজ বৃক্ষ হতে অগ্নি উৎপাদন করেন এবং তোমরা তা দ্বারা অগ্নি প্রজ্বলিত কর।" (৩৬: ৭৮-৮০)