📄 উমাইয়া ইন্ন খাল্ল্ফ কর্তৃক রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নির্যাতন প্রসঙ্গে
উমাইয়া ইব্ন খাল্ল্ফ ইব্ন ওয়াহব ইবন হুযাফা ইব্ন জুমাহ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে দেখামাত্রই উচ্চঃস্বরে গালমন্দ ও নিম্নস্বরে নিন্দাবাদ করত। আল্লাহ্ তা'আলা তার সম্পর্কে নাযিল করেন:
وَيْلٌ لَكُلِّ هُمَزَةٍ لمَزَةٍ - * الَّذِي جَمَعَ مَا لا وَعَدَدَهُ - يَحْسَبُ أَنَّ مَا لَهُ أَخْلَدَهُ - كَلَّا لَيُنْبَدَنَّ فِي الْحُطَمَةِ - وَمَا أَدْرَاكَ مَا الحُطَمَةُ - نَارُ اللهِ الْمُوْقَدَةُ الَّتِي تَطَّلِعُ عَلَى الْأَفْئِدَةِ - إِنَّهَا عَلَيْهِم مُّؤْصَدَةٌ - فِي عَمَدٍ مُمَدِّدَةٍ -
"দুর্ভোগ প্রত্যেকের, যে পশ্চাতে ও সম্মুখে লোকের নিন্দা করে; যে অর্থ জমায় ও তা বারবার গণনা করে, সে ধারণা করে যে, তার অর্থ তাকে অমর করে রাখবে; কখনও না, সে অবশ্যই নিক্ষিপ্ত হবে হুতামায়; হুতামা কী, তা তুমি কি জান? তা আল্লাহর প্রজ্জ্বলিত হুতাশন, যা হৃদয়কে গ্রাস করবে; নিশ্চয়ই তা তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রাখবে দীর্ঘায়িত স্তম্ভসমূহে।" (১০৪: ১-৯)
ইবন হিশাম বলেন : الهمزة অর্থ যে ব্যক্তি মানুষকে প্রকাশ্যে গালাগাল করে, চোখ পাকায় ও কটাক্ষ করে।
এ প্রসংগে হাসান ইব্ন সাবিত (রা) তাঁর একটি গীতি কবিতায় বলেন: همزتك فاختضعت لذل نفس × يقافية تاجج كالشواظ - .
"আমি লেলিহান অগ্নিতুল্য ছন্দ দ্বারা তোমার প্রতি কটাক্ষ করি; ফলে, তুমি স্বীয় হীনতাবশত বশ্যতা স্বীকার করেছ।"
هُمَزَة এর বহুবচন همزات আর اللمزة-এর অর্থ এমন ব্যক্তি যে পশ্চাতে অন্যের দোষ চর্চা করে ও তাদের কষ্ট দেয়। রূ'বা ইব্ন আজ্জাজ তার একটি কবিতায় বলেন: في ظل عصری باطلی ولمزی
"আমার অসার বাক্য এবং আমার নিন্দাবাদ, আমার সময়ের ছায়ায় লালিত হয়েছে।"
📄 আস ইব্ন ওয়াইল কর্তৃক রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উপহাস এবং তার সম্পর্কে অবতীর্ণ আয়াত
ইবন ইসহাক বলেন: এরূপ আরেকজন দূরাচার হচ্ছে 'আস ইব্ন ওয়ায়ল সাহমী। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর অন্যতম সাহাবী খাব্বাব ইব্ন আরাত (রা) ছিলেন একজন কর্মকার। তিনি মক্কায় তরবারি বানাতেন। একবার তিনি 'আস ইবন ওয়ায়লের কাছে কয়েকটি তরবারি বিক্রি করেন। তার নির্দেশেই তিনি সেগুলো তৈরি করেছিলেন। একদিন তিনি তার কাছে সে টাকার তাগাদা দিতে গেলে আস বলল: হে খাব্বাব! তুমি যার দীনের অনুসারী, তোমার সেই সাথী মুহাম্মদ কি বলে না যে, যারা জান্নাতে যাবে, তারা সেখানে যত খুশি সোনা-রূপা, পোশাক-পরিচ্ছদ ও চাকর-বাকর লাভ করবে? খাব্বাব বললেন: বটেই তো। তখন সে বলল:
তা হলে তুমি হে খাব্বাব! আমাকে কিয়ামত পর্যন্ত সময় দাও। সেখানে গিয়ে আমি তোমার পাওনা শোধ করে দেব। আল্লাহ্র কসম, হে খাব্বাব! তুমি ও তোমার সাথী আল্লাহ্র নিকট আমার চেয়ে বেশি প্রাধান্য পাবে না এবং সেখানেও আমার চেয়ে বেশি বেহেশতী নিয়ামত পাবে না। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ্ তা'আলা নাযিল করেন:
أَفَرَأَيْتَ الَّذِي كَفَرَ بِأَيْتِنَا وَقَالَ لأُوتِيَنَّ مَالاً وولداً - اطلعَ الغَيْبَ . وَيَأْتِينَ فَرْدًا ونَرِثُهُ مَا يَقُولُ
"তুমি কি লক্ষ্য করেছ তাকে, যে আমার আয়াতসমূহ প্রত্যাখ্যান করে এবং বলে, আমাকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দেওয়া হবেই। সে কি অদৃশ্য সম্বন্ধে অবহিত হয়েছে অথবা দয়াময়ের নিকট হতে প্রতিশ্রুতি লাভ করেছে? কখন-ই নয়, তারা যা বলে, আমি তা লিখে রাখব এবং তাদের শাস্তি বৃদ্ধি করতে থাকব। সে যে বিষয়ের কথা বলে, তা থাকবে আমার অধিকারে এবং সে আমার নিকট আসবে একা।” (১৯: ৭৭-৮০)
📄 আবু জাহল কর্তৃক রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উৎপীড়ন এবং তার সম্পর্কে অবতীর্ণ আয়াত
আমি শুনেছি একবার আবু জাহল ইব্ন হিশাম রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর সাথে সাক্ষাৎ করে বলল: হে মুহাম্মদ! তুমি আমাদের দেবদেবীদের গালমন্দ করা বন্ধ কর, অন্যথায় আমরাও তোমার ইলাহের গালমন্দ করব, যার ইবাদত তুমি কর। এ প্রেক্ষিতে আল্লাহ্ তার সম্পর্কে নাযিল করেন:
وَلَا تَسُبُّوا الَّذِينَ يَدْعُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ فَيَسُبُّوا اللَّهَ عَدُوا بِغَيْرِ عِلْمٍ -
"আল্লাহকে ছেড়ে যাদের তারা ডাকে, তাদের তোমরা গালি দিও না, কেননা তারা সীমালংঘন করে অজ্ঞতাবশত আল্লাহকেও গালি দেবে।" (৬: ১০৮) বর্ণিত আছে, এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের দেবদেবীদের নিন্দা করা হতে বিরত হন এবং তাদের জন্য আল্লাহর কাছে দু'আ করতে থাকেন।
📄 নাঘ্র ইবন হারিস কর্তৃক রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নির্যাতন এবং তার সম্পর্কে অবতীর্ণ আয়াত
রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে উত্যক্তকারীদের মধ্যে আরেকজন হচ্ছে নাঘ্র ইবন হারিস ইন 'আলকামা ইব্ন কাল্দা ইন্ন 'আব্দ মানাফ ইবন 'আবদুদ্দার ইব্ন কুসাই। রাসূলুল্লাহ্ (সা) যখনই কোন মজলিসে মানুষকে আল্লাহ্র পথে আহবান জানাতেন, কুরআন তিলাওয়াত করে শোনাতেন এবং কুরায়শদের বিগত ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিসমূহের ইতিহাস দ্বারা সতর্ক করে মজলিস ত্যাগ করতেন, তখন নাঘ্র ইন্ন হারিস উঠে সে মজলিসের লোকদের পারস্য বীর রুস্তম, ইসফানদিয়ার ও ইরানী রাজা-বাদশাহদের কাহিনী বর্ণনা করে শোনাত। সে বলত, আল্লাহ্র কসম! মুহাম্মদ আমার চাইতে ভাল বর্ণনাকারী নয়। তার বর্ণনা তো অতীত যুগের উপকথা মাত্র। তার মত আমিও সেগুলো লিখে রেখেছি। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্ তা'আলা নাযিল করেন:
وَقَالُوا أَسَاطِيرُ الْأَوَّلِينَ اكْتَتَبَهَا فَهِيَ تُمْلَى عَلَيْهِ بُكْرَةً وَأَصِيلاً - قُلْ أَنْزَلَهُ الَّذِي يَعْلَمُ السِّرِّ فِي السموات والْأَرْضِ إِنَّهُ كَانَ غَفُورًا رَّحِيمًا
"তারা বলে 'এগুলো তো সেকালের উপকথা, যা সে লিখে নিয়েছে; এগুলো সকাল-সন্ধ্যা তার নিকট পাঠ করা হয়।' বল, 'এটা তিনিই অবতীর্ণ করেছেন, যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর সমুদয় রহস্য অবগত আছেন; তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (২৫: ৫-৬)
আরও নাযিল হয় : اذا تتلَى عَلَيْهِ أَيْتُنَا قَالَ أَسَاطِيْرُ الْأَوَّلِينَ "তার নিকট আমার আয়াত আবৃত্তি করা হলে সে বলে, 'এ তো সেকালের উপকথা মাত্র." (৬৮: ১৫; ৮৩ : ১৩)
আরও ইরশাদ হয়: وَيْلٌ لَكُلِّ أَفاك أَثِيم - يَسْمَعُ أَيْتِ اللهَ تُتْلَى عَلَيْهِ ثُمَّ يُصِرُّ مُسْتَكْبِرًا كَانْ لَمْ يَسْمَعْهَا فَبَشِّرْهُ بعذاب اليم -
"দুর্ভোগ প্রত্যেক ঘোর মিথ্যাবাদী পাপীর, যে আল্লাহর আয়াতের আবৃত্তি শোনে অথচ ঔদ্ধত্যের সংগে অটল থাকে যেন সে তা শোনেনি। তাকে সংবাদ দাও মর্মন্তুদ শাস্তির।" (৪৫: ৭-৮)
ইব্ন হিশাম বলেন: أَفاك মানে ঘোর মিথ্যাবাদী।
কুরআন মজীদে আছে: أَلَّا إِنَّهُمْ مِّنْ أفكهمْ لَيَقُولُونَ - وَلَدَ اللهُ وَأَنَّهُمْ لَكُذِبُونَ "দেখে তারা তো মনগড়া কথা বলে যে, আল্লাহ্ সন্তান জন্ম দিয়েছেন। তারা নিশ্চয়ই মিথ্যাবাদী।” (৩৭: ১৫১-১৫২)
রু'বা ইব্ন 'আজ্জাজ তাঁর এক কবিতায় বলেন : ما لامرى افك قولا افكا "কোন মানুষের মিথ্যা রটনায় কি লাভ।"
ইব্ন ইসহাক বলেন: আমি শুনেছি, একদা রাসূলুল্লাহ্ (সা) ওয়ালীদ ইব্ন মুগীরার সাথে মসজিদে বসে ছিলেন। এ সময় নাযর ইব্ন হারিস সেখানে উপস্থিত হয় এবং মজলিসে তাদের সাথে বসে পড়ে। সেখানে কুরায়শ গোত্রের লোক উপস্থিত ছিল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাদের সাথে আলোচনায় প্রবৃত্ত হন। নাযর ইব্ন হারিস আলোচনায় তাঁর সঙ্গে তর্ক শুরু করে দিলে রাসুলুল্লাহ (সা) তাকে নিরুত্তর করে দিতে সক্ষম হন। এরপর তিনি তাদের সকলের উদ্দেশ্যে
إِنَّكُمْ وَمَا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ حَصَبُ جَهَنَّمَ أَنْتُمْ لَهَا وَارِدُونَ - لَوْ كَانَ هؤُلَاءِ آلِهَةً مَأَرَدُوهَا وَكُلُّ فِيهَا خُلِدُونَ - لَهُمْ فِيْهَا زَفِيْرٌ وَهُمْ فيها لايَسْمَعُونَ তোমরা এবং আল্লাহর পরিবর্তে তোমরা যাদের ইবাদত কর সেগুলো তো জাহান্নামের ইন্ধন, তোমরা সকলে তাতে প্রবেশ করবে। যদি এরা উপাস্য হত তবে জাহান্নামে প্রবেশ করত নাদের সকলেই তাতে স্থায়ী হবে চিরকাল থাকবে তাদের আর্তনাদ এবং সেথায় তারা কিছুই শুনতে পাবে না।” (সূরা আম্বিয়া : ৯৮-১০০) [তাফসীরে ইব্ন কাসীর]