📄 আবু লাহাব সম্পর্কে আল্লাহ্ যা নাযিল করেন
আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর রাসূল (সা)-কে বরাবরই কুরায়শদের থেকে হিফাযত করেছেন। এই সামাজিক বয়কটকালে তাঁর চাচা এবং তাঁর গোত্র-বনু হাশিম ও বনূ মুত্তালিবও যথারীতি তাঁর পক্ষে রুখে দাঁড়ায় এবং সার্বিক সহায়তা দান করে। কাফিররা যখনই তাঁর উপর কোন দৈহিক আক্রমণ চালানোর দুরভিসন্ধি করেছে, তখনই তারা ইস্পাত-কঠিন প্রাচীররূপে সম্মুখে দাঁড়িয়েছে। অনন্যোপায় হয়ে কুরায়শরা ঠাট্টা-উপহাস ও কূট-তর্কের পথ বেছে নেয়। তাদের এসব অপতৎপরতা সম্পর্কে যুগপৎভাবে কুরআনের আয়াতও নাযিল হতে থাকে। কুরআন তো পরিষ্কারভাবে অনেকের নামও উচ্চারণ করেছে, আবার অনেক সময় সাধারণভাবে কাফিরদের আলোচনাক্রমে তাদের উল্লেখ করে দিয়েছে। কুরআন মজীদে যাদের নাম উচ্চারিত হয়েছে, তাদের মধ্যে সবশেষে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর চাচা আবু লাহাব ইব্ন আবদুল মুত্তালিব এবং তার স্ত্রী উম্মু জামীল বিন্ত হারব ইবন উমাইয়া; যাকে আল্লাহ তা'আলা নাম দিয়েছেন 'হাম্মালাতাল-হাতাব' 'ইন্ধন বহনকারিণী'। কারণ সে কাঁটা বহন করে রাসূলুল্লাহ (সা)-এর যাতায়াত পথে ছড়িয়ে দিত। আল্লাহ্ তা'আলা তাঁদের উভয়ের সম্পর্কে নাযিল করেন:
تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ - مَا أَغْنَى عَنْهُ مَالُهُ وَمَا كَسَبَ - سَيَصْلَى نَارًا ذَاتَ لَهَبٍ - وَأَمْرَأَتُهُ حمالة الحطب - فِي جِيدِهَا حَبْلٌ مِّن مَّسَد - .
"ধ্বংস হোক আবু লাহাবের দু'হাত এবং ধ্বংস হোক সে নিজেও। তার ধন-সম্পদ ও তার উপার্জন তার কোন কাজে আসেনি। অচিরে সে দগ্ধ হবে লেলিহান আগুনে এবং তার স্ত্রীও- যে ইন্ধন বহন করে, তার গলদেশে পাকান রজ্জু।" (১১১: ১-৫)
📄 উম্মু জামীলের দুরভিসন্ধি এবং আল্লাহ্ কর্তৃক তার রাসূলের হিফাযত
ইবন ইসহাক বলেন: আমি শুনেছি, এই ইন্ধন বহনকারিণী উম্মু জামীল তাঁর ও তার স্বামীর সম্পর্কে অবতীর্ণ কুরআনের আয়াত শুনে ভীষণ ক্ষুব্ধ হল। সে তৎক্ষণাৎ একখণ্ড পাথর নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উদ্দেশ্যে ছুটে আসল। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তখন আবূ বকর সিদ্দীক (রা)-কে সংগে নিয়ে কা'বা শরীফের পাশে উপবিষ্ট ছিলেন। উম্মু জামীল তাঁদের সামনে এসে দাঁড়াতেই আল্লাহ্ তা'আলা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে তার দৃষ্টির আড়াল করে দিলেন। ফলে সে কেবল আবু বকর (রা)-কেই দেখতে পেল। সে জিজ্ঞেস করল: হে আবূ বকর! তোমার সঙ্গী কই? আমি শুনেছি, সে নাকি আমার কুৎসা করে। আল্লাহর কসম! এই মুহূর্তে তাকে পেলে আমি এই পাথর তার মুখে ছুঁড়ে মারতাম। শোন, আমিও কিন্তু একজন কবি। তখন সে বলল: "আমরা এক নিন্দিত ব্যক্তির নাফরমানী করেছি, আমরা তার নির্দেশ অমান্য করেছি এবং আমরা তার দীনকে ঘৃণা করি।"
এই বলে সে চলে গেল। আবু বকর (রা) বললেন: ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা)! সেকি আপনাকে দেখেনি? তিনি বললেন: না, সে আমাকে দেখেনি। আল্লাহ্ তার দৃষ্টি থেকে আমাকে আড়াল করে দেন।
ইন হিশাম বলেন: ودينه قلينا লাইনটি ইবন ইসহাক ভিন্ন অপর সূত্রে প্রাপ্ত।
২. ইব্ন ইসহাক বলেন: কুরায়শরা রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে মুযাম্মাম (নিন্দিত) নাম দিয়ে গালমন্দ করত। তিনি বলতেন: তোমরা কি আশ্চর্যবোধ কর না যে, আল্লাহ্ তা'আলা আমার থেকে কুরায়শদের গালমন্দ কিভাবে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। তারা গালমন্দ করে 'মুযাম্মাম' (নিন্দিত)-কে; আর আমি হচ্ছি 'মুহাম্মদ' (প্রশংসিত)।
📄 উমাইয়া ইন্ন খাল্ল্ফ কর্তৃক রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর নির্যাতন প্রসঙ্গে
উমাইয়া ইব্ন খাল্ল্ফ ইব্ন ওয়াহব ইবন হুযাফা ইব্ন জুমাহ রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে দেখামাত্রই উচ্চঃস্বরে গালমন্দ ও নিম্নস্বরে নিন্দাবাদ করত। আল্লাহ্ তা'আলা তার সম্পর্কে নাযিল করেন:
وَيْلٌ لَكُلِّ هُمَزَةٍ لمَزَةٍ - * الَّذِي جَمَعَ مَا لا وَعَدَدَهُ - يَحْسَبُ أَنَّ مَا لَهُ أَخْلَدَهُ - كَلَّا لَيُنْبَدَنَّ فِي الْحُطَمَةِ - وَمَا أَدْرَاكَ مَا الحُطَمَةُ - نَارُ اللهِ الْمُوْقَدَةُ الَّتِي تَطَّلِعُ عَلَى الْأَفْئِدَةِ - إِنَّهَا عَلَيْهِم مُّؤْصَدَةٌ - فِي عَمَدٍ مُمَدِّدَةٍ -
"দুর্ভোগ প্রত্যেকের, যে পশ্চাতে ও সম্মুখে লোকের নিন্দা করে; যে অর্থ জমায় ও তা বারবার গণনা করে, সে ধারণা করে যে, তার অর্থ তাকে অমর করে রাখবে; কখনও না, সে অবশ্যই নিক্ষিপ্ত হবে হুতামায়; হুতামা কী, তা তুমি কি জান? তা আল্লাহর প্রজ্জ্বলিত হুতাশন, যা হৃদয়কে গ্রাস করবে; নিশ্চয়ই তা তাদেরকে পরিবেষ্টন করে রাখবে দীর্ঘায়িত স্তম্ভসমূহে।" (১০৪: ১-৯)
ইবন হিশাম বলেন : الهمزة অর্থ যে ব্যক্তি মানুষকে প্রকাশ্যে গালাগাল করে, চোখ পাকায় ও কটাক্ষ করে।
এ প্রসংগে হাসান ইব্ন সাবিত (রা) তাঁর একটি গীতি কবিতায় বলেন: همزتك فاختضعت لذل نفس × يقافية تاجج كالشواظ - .
"আমি লেলিহান অগ্নিতুল্য ছন্দ দ্বারা তোমার প্রতি কটাক্ষ করি; ফলে, তুমি স্বীয় হীনতাবশত বশ্যতা স্বীকার করেছ।"
هُمَزَة এর বহুবচন همزات আর اللمزة-এর অর্থ এমন ব্যক্তি যে পশ্চাতে অন্যের দোষ চর্চা করে ও তাদের কষ্ট দেয়। রূ'বা ইব্ন আজ্জাজ তার একটি কবিতায় বলেন: في ظل عصری باطلی ولمزی
"আমার অসার বাক্য এবং আমার নিন্দাবাদ, আমার সময়ের ছায়ায় লালিত হয়েছে।"
📄 আস ইব্ন ওয়াইল কর্তৃক রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর উপহাস এবং তার সম্পর্কে অবতীর্ণ আয়াত
ইবন ইসহাক বলেন: এরূপ আরেকজন দূরাচার হচ্ছে 'আস ইব্ন ওয়ায়ল সাহমী। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর অন্যতম সাহাবী খাব্বাব ইব্ন আরাত (রা) ছিলেন একজন কর্মকার। তিনি মক্কায় তরবারি বানাতেন। একবার তিনি 'আস ইবন ওয়ায়লের কাছে কয়েকটি তরবারি বিক্রি করেন। তার নির্দেশেই তিনি সেগুলো তৈরি করেছিলেন। একদিন তিনি তার কাছে সে টাকার তাগাদা দিতে গেলে আস বলল: হে খাব্বাব! তুমি যার দীনের অনুসারী, তোমার সেই সাথী মুহাম্মদ কি বলে না যে, যারা জান্নাতে যাবে, তারা সেখানে যত খুশি সোনা-রূপা, পোশাক-পরিচ্ছদ ও চাকর-বাকর লাভ করবে? খাব্বাব বললেন: বটেই তো। তখন সে বলল:
তা হলে তুমি হে খাব্বাব! আমাকে কিয়ামত পর্যন্ত সময় দাও। সেখানে গিয়ে আমি তোমার পাওনা শোধ করে দেব। আল্লাহ্র কসম, হে খাব্বাব! তুমি ও তোমার সাথী আল্লাহ্র নিকট আমার চেয়ে বেশি প্রাধান্য পাবে না এবং সেখানেও আমার চেয়ে বেশি বেহেশতী নিয়ামত পাবে না। এরই পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ্ তা'আলা নাযিল করেন:
أَفَرَأَيْتَ الَّذِي كَفَرَ بِأَيْتِنَا وَقَالَ لأُوتِيَنَّ مَالاً وولداً - اطلعَ الغَيْبَ . وَيَأْتِينَ فَرْدًا ونَرِثُهُ مَا يَقُولُ
"তুমি কি লক্ষ্য করেছ তাকে, যে আমার আয়াতসমূহ প্রত্যাখ্যান করে এবং বলে, আমাকে ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দেওয়া হবেই। সে কি অদৃশ্য সম্বন্ধে অবহিত হয়েছে অথবা দয়াময়ের নিকট হতে প্রতিশ্রুতি লাভ করেছে? কখন-ই নয়, তারা যা বলে, আমি তা লিখে রাখব এবং তাদের শাস্তি বৃদ্ধি করতে থাকব। সে যে বিষয়ের কথা বলে, তা থাকবে আমার অধিকারে এবং সে আমার নিকট আসবে একা।” (১৯: ৭৭-৮০)