📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 উমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের কারণ

📄 উমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের কারণ


ইবন ইসহাক বলেন : আমি যতদূর জানতে পেরেছি , উমর ( রা ) -এর ইসলাম গ্রহণের কারণ ছিল নিম্নরূপ :
উমরের বোন ফাতিমা বিনত খাত্তাব ও তাঁর স্বামী সাঈদ ইবন যায়দ ইবন আমর ইবন নুফায়ল ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন । কিন্তু তাঁরা তাঁদের ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটি উমরের কাছ থেকে গোপন রেখেছিলেন । মক্কার আর এক ব্যক্তি নাঈম ইবন আবদুল্লাহ্ নাহহামও একইভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন । উমরের স্বগোত্রীয় অর্থাৎ বনূ আদী ইবন কা'বের অন্তর্ভুক্ত এ ব্যক্তি নিজ গোত্রের অত্যাচারের ভয়ে নিজের ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করেন নি । খাব্বাব ইব্‌ন আরাত গোপনে ফাতিমা বিন্ত খাত্তাব ( রা ) -এর কাছে যাতায়াত করতেন এবং তাঁকে তিনি কুরআন পড়াতেন । একদিন উমর ইব্‌ন খাত্তাব উন্মুক্ত তরবারি হাতে নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) ও তাঁর একদল সাহাবীর সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন । তিনি জানতে পেরেছিলেন যে , প্রায় চল্লিশজন নারী ও পুরুষ সাহাবীসহ রাসূলুল্লাহ্ (সা:) সাফা পাহাড়ের নিকটবর্তী একটা ঘরে জমায়েত আছেন । এ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর সংগে তাঁর চাচা হামযা ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিব , আবূ বকর সিদ্দীক ইব্‌ন আবূ কুহাফা ও আলী ইব্‌ন আবূ তালিব ( রা ) সহ এমন কিছু সংখ্যক মুসলমান ছিলেন যারা রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর সংগে মক্কায় অবস্থান করছিলেন এবং আবিসিনিয়ায় হিজরতকারীদের সংগে হিজরত করেন নি । পথিমধ্যে নাঈম ইবন আবদুল্লাহ্ ( রা ) -এর সংগে উমরের দেখা হল । তিনি তাকে বললেন : কোথায় চলেছ উমর ? উমর বললেন : স্বধর্মত্যাগী মুহাম্মদের সন্ধানে চলেছি । যে কুরায়শ বংশে বিভেদ সৃষ্টি করেছে , তাদের বুদ্ধিমানদের বোকা সাব্যস্ত করেছে , তাদের অনুসৃত ধর্মের নিন্দা করেছে এবং তাদের দেবদেবীকে গালি দিয়েছে , আমি তাকে হত্যা করব । তখন নাঈম ( রা ) বললেন ; উমর ! আল্লাহ্র কসম ! তুমি কি মনে কর , মুহাম্মদকে হত্যা করার পর বনূ আব্দ মানাফ তোমাকে ছেড়ে দেবে , আর তুমি পৃথিবীর ওপর অবাধে বিচরণ করে বেড়াতে পারবে ? তোমার কি উচিত নয় , আগে নিজের পরিবার- পরিজনের দিকে মনোনিবেশ করা এবং তাদের শোধরানো ? তখন উমর বললেন : আমার পরিবার - পরিজনের কে ? নাঈম ( রা ) বললেন : তোমরা ভগ্নিপতি ও চাচাতো ভাই সাঈদ ইবন যায়দ ইবন আমর এবং তোমার বোন ফাতিমা বিনত খাত্তাব । আল্লাহ্র কসম ! তাঁরা উভয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং মুহাম্মদের ধর্ম অনুসরণ করছে । পারলে তুমি তাদের সামলাও । রাবী বলেন , তখন উমর তার বোন ও ভগ্নিপতির বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলেন । যখন তিনি তাঁদের কাছে পৌঁছলেন , তখন তাদের কাছে খাব্বাব ইবনুল আরাতও ছিলেন । তিনি তাদেরকে পবিত্র কুরআনের একটি অংশ হাতে নিয়ে পড়াচ্ছিলেন । এই অংশটিতে সূরা তা - হা লেখা ছিল । যখন উমরের পদধ্বনি শুনতে পেলেন , তখন খাব্বাব ( রা ) ঘরের এক কোণে আত্মগোপন করলেন । আর ফাতিমা ( রা ) কুরআনের অংশটি নিজের ঊরুর নীচে চাপা দিয়ে রাখলেন । ঘরের কাছাকাছি পৌঁছার পর উমর খাব্বাব ( রা ) -এর কুরআন পড়ার আওয়াজ শুনেছিলেন । ঘরে ঢুকে তিনি বললেন একটা দুর্বোধ্য বাণী আবৃত্তি করার আওয়াজ শুনছিলাম , ওটা কি ? তাঁরা উভয়ে বললেন না , আপনি কিছুই শোনেননি । উমর বললেন : নিশ্চয়ই শুনেছি । আর আল্লাহ্র কসম ! এটাও জেনেছি যে , তোমরা দু'জনে মুহাম্মদের দীনের অনুসারী হয়ে গেছ । কথাটা বলেই ভগ্নিপতি সাঈদ ( রা ) -কে প্রবলভাবে জাপটে ধরলেন । তাঁর বোন ফাতিমা বিনত খাত্তাব স্বামীকে বাঁচাতে ছুটে গেলেন । তিনি তাঁকেও মেরে রক্তাক্ত করে দিলেন । এ কাণ্ড ঘটানোর পর তাঁর বোন ও ভগ্নিপতি একযোগে তাঁকে বললেন : হ্যাঁ , আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি । আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি । এখন আপনি যা করতে চান , করুন । উমর যখন দেখলেন , তার বোনের শরীর রক্তাক্ত , তখন তিনি অনুতপ্ত হলেন । তিনি তাঁর বোনকে বললেন : আমাকে ঐ পুস্তিকাটি দাও , যা এইমাত্র তোমাদেরকে পড়তে শুনলাম । আমি একটু দেখব মুহাম্মদ কি জিনিস নিয়ে এসেছে । উমর লেখাপড়া জানতেন । তিনি এ কথা বললে তাঁর বোন তাঁকে বললেন : আমার ভয় হয় , ওটি তুমি নষ্ট করে ফেল কিনা । উমর বললেন : ভয় পেয়ো না । এরপর তিনি নিজের দেবদেবীর শপথ করে বললেন : তিনি তা পড়েই তাকে ফেরত দেবেন । উমরের এ কথা শুনে ফাতিমার মনে আশার সঞ্চার হলো যে , উমর ইসলাম গ্রহণ করতে পারে । তিনি তাঁকে বললেন : ভাইজান ! আপনি যে অপবিত্র ! কেননা আপনি এখনো মুশরিক । অথচ এ পবিত্র গ্রন্থকে পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ স্পর্শ করতে পারে না । উমর তৎক্ষণাৎ উঠে চলে গেলেন এবং গোসল করে এলেন । এবার ফাতিমা তাকে সহীফাখানি দিলেন । তাতে সূরা ত্বা - হা লিখিত ছিল । তিনি তা পড়লেন । প্রথম অংশটি পড়েই তিনি বললেন : আহ্ ! কী সুন্দর কথা ! কী মহৎ বাণী ! তাঁর এ উক্তি শুনে খাব্বাব ( রা ) তাঁর সামনে বেরিয়ে এলেন । তিনি তাকে বললেন : হে উমর ! আল্লাহ্র কসম ! আমার মনে আশার সঞ্চার হচ্ছে যে , আল্লাহ্ হয়ত আপনাকে তাঁর নবীর দাওয়াত গ্রহণের জন্য মনোনীত করেছেন । আমি গতকাল রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -কে এরূপ দু'আ করতে শুনেছি : “ হে আল্লাহ্ আপনি আবুল হিকাম ইবন হিশাম অথবা উমর ইবনুল খাত্তাবের দ্বারা ইসলামের শক্তি বৃদ্ধি করুন । ” অতএব , হে উমর ! আল্লাহকে ভয় কর , আল্লাহকে ভয় কর । তখন উমর তাঁকে বললেন : হে খাব্বাব ! আমাকে মুহাম্মদের সন্ধান দাও । আমি তাঁর কাছে যেয়ে ইসলাম গ্রহণ করব । খাব্বাব বললেন : তিনি সাফা পাহাড়ের নিকট একটি বাড়িতে আছেন । সেখানে তাঁর সংগে তাঁর একদল সাহাবী রয়েছেন । উমর তার তরবারি আগের মতই খোলা অবস্থায় ধরে নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) ও তাঁর সাহাবীদের কাছে চললেন । তিনি সেখানে গিয়ে দরজার কড়া নাড়লেন । তাঁর আওয়াজ শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর জনৈক সাহাবী ভেতর থেকে দরজার কাছে গিয়ে তাকিয়ে দেখলেন যে , উমর মুক্ত তরবারি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন । তিনি শংকিত চিত্তে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর কাছে ফিরে গিয়ে বললেন ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা:) ! এ যে উমর ইব্‌ন খাত্তাব , একেবারে নগ্ন তরবারি হাতে ! তখন হামযা ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিব বললেন : ওকে ভেতরে আসার অনুমতি দিন । সে যদি কোন ভাল উদ্দেশ্য নিয়ে এসে থাকে , তবে আমরা তার সাথে ভাল ব্যবহার করব । পক্ষান্তরে সে যদি কোন খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে এসে থাকে , তা হলে আমরা তার তরবারি দিয়েই তাকে হত্যা করব । রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বললেন : তাকে ভেতরে আসতে দাও । উক্ত সাহাবী তাকে ভেতরে আসতে দিলেন । রাসূলুল্লাহ্ (সা:) নিজে উঠে তার কাছে এগিয়ে গেলেন এবং হুজরায় একান্তে তার সাথে দেখা করলেন । তিনি (সা:) উমরের কোমর ধরে অথবা যেখানে চাদরের দুই কোণ মিলিত হয় , সেখানটা ধরে তাকে প্রবল জোরে আকর্ষণ করলেন এবং বললেন : হে খাত্তাবের পুত্র ! তোমার এখানে আগমন ঘটল কিভাবে ? আল্লাহ্র কসম ! আমার তো মনে হয় , আল্লাহ তোমাকে কোন বিপর্যয়ে না ফেলা পর্যন্ত তুমি ফিরবে না । উমর বললেন ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা:) ! আমি আপনার কাছে এসেছি , আল্লাহর ওপর তাঁর রাসূলের উপর ও আপনার কাছে আল্লাহ্র পক্ষ থেকে যা কিছু এসেছে তার ওপর ঈমান আনার জন্য । রাবী বলেন : এ কথা শোনামাত্র রাসূলুল্লাহ্ (সা:) এমন জোরে আল্লাহু আকবার বলে উঠলেন যে , ঐ ঘরের ভেতরে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর যে কয়জন সাহাবী ছিলেন , সবাই বুঝলেন যে , উমর ইসলাম গ্রহণ করেছেন ।
এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর সাহাবীগণ যার যার জায়গায় চলে গেলেন । হামযা ( রা ) -এর পর উমর ( রা ) -এর ইসলাম গ্রহণে তাদের মনোবল ও আত্মমর্যাদা বেড়ে গেল । তাঁরা নিশ্চিত হলেন যে , তারা দু'জন রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর হিফাযত করবেন এবং মুসলমানরা এ দু'জনের বদৌলতে শত্রুদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারবেন । উমর ইবন খাত্তাব ( রা ) -এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা মদীনাবাসী বর্ণনাকারীদের ভাষায় উপরে বর্ণিত হল ।

**টিকাঃ**
১. বনূ তামীম বংশোদ্ভূত এ সাহাবী জাহিলী যুগে তরবারি তৈরির পেশায় নিয়োজিত ছিলেন এবং খুযা'আ গোত্রের উম্মু আনমার বিন্ত সিবা ' নাম্নী খুযায়ী মহিলার আযাদকৃত গোলাম ছিলেন । ( রওযুল উনুফ ; ২ য় খণ্ড , পৃ . ৯৮ দ্র . )
১. সুহায়লী বলেন : উমর ( রা ) -কে কুরআন স্পর্শ করার পূর্বে গোসল করার জন্য তাঁর বোন ফাতিমা আমা ' পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া কেউ এটা স্পর্শ করতে পারে না ' বলে যে উক্তি করেছেন , অথচ এখানে ফেরেশতাদের প্রতি ইংগিত রয়েছে । কিন্তু এও ইংগিত রয়েছে যে , ফেরেশতাদের অনুসরণে পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া কেউ তা স্পর্শ করবে না ।
সূরা আবাসায় ( ৮০ : ১৩-১৪ ) -ও এর ইংগিত রয়েছে । ( রাওযুল উনুফ , খ . ২ , পৃ . ৯৮-৯৯ ) । তাছাড়া হাদীস শরীফে আছে , রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন : AYY ( আবু দাউদের মারাসীল , অনুরূপ নিষেধাজ্ঞা মর্মের হাদীস মুসলিম ও মুআত্তায়ও রয়েছে ) । ( ইবন কাছীর , খ . ৩ , পৃ . ৪৩৯ )

ইবন ইসহাক বলেন : আমি যতদূর জানতে পেরেছি , উমর ( রা ) -এর ইসলাম গ্রহণের কারণ ছিল নিম্নরূপ :
উমরের বোন ফাতিমা বিনত খাত্তাব ও তাঁর স্বামী সাঈদ ইবন যায়দ ইবন আমর ইবন নুফায়ল ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন । কিন্তু তাঁরা তাঁদের ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটি উমরের কাছ থেকে গোপন রেখেছিলেন । মক্কার আর এক ব্যক্তি নাঈম ইবন আবদুল্লাহ্ নাহহামও একইভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন । উমরের স্বগোত্রীয় অর্থাৎ বনূ আদী ইবন কা'বের অন্তর্ভুক্ত এ ব্যক্তি নিজ গোত্রের অত্যাচারের ভয়ে নিজের ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করেন নি । খাব্বাব ইব্‌ন আরাত গোপনে ফাতিমা বিন্ত খাত্তাব ( রা ) -এর কাছে যাতায়াত করতেন এবং তাঁকে তিনি কুরআন পড়াতেন ।
ঘরের কাছাকাছি পৌঁছার পর উমর খাব্বাব ( রা ) -এর কুরআন পড়ার আওয়াজ শুনেছিলেন । ঘরে ঢুকে তিনি বললেন একটা দুর্বোধ্য বাণী আবৃত্তি করার আওয়াজ শুনছিলাম , ওটা কি ? তাঁরা উভয়ে বললেন না , আপনি কিছুই শোনেননি । উমর বললেন : নিশ্চয়ই শুনেছি । আর আল্লাহ্র কসম ! এটাও জেনেছি যে , তোমরা দু'জনে মুহাম্মদের দীনের অনুসারী হয়ে গেছ । কথাটা বলেই ভগ্নিপতি সাঈদ ( রা ) -কে প্রবলভাবে জাপটে ধরলেন । তাঁর বোন ফাতিমা বিনত খাত্তাব স্বামীকে বাঁচাতে ছুটে গেলেন । তিনি তাঁকেও মেরে রক্তাক্ত করে দিলেন । এ কাণ্ড ঘটানোর পর তাঁর বোন ও ভগ্নিপতি একযোগে তাঁকে বললেন : হ্যাঁ , আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি । আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি । এখন আপনি যা করতে চান , করুন । উমর যখন দেখলেন , তার বোনের শরীর রক্তাক্ত , তখন তিনি অনুতপ্ত হলেন । তিনি তাঁর বোনকে বললেন : আমাকে ঐ পুস্তিকাটি দাও , যা এইমাত্র তোমাদেরকে পড়তে শুনলাম । আমি একটু দেখব মুহাম্মদ কি জিনিস নিয়ে এসেছে । উমর লেখাপড়া জানতেন । তিনি এ কথা বললে তাঁর বোন তাঁকে বললেন : আমার ভয় হয় , ওটি তুমি নষ্ট করে ফেল কিনা । উমর বললেন : ভয় পেয়ো না । এরপর তিনি নিজের দেবদেবীর শপথ করে বললেন : তিনি তা পড়েই তাকে ফেরত দেবেন । উমরের এ কথা শুনে ফাতিমার মনে আশার সঞ্চার হলো যে , উমর ইসলাম গ্রহণ করতে পারে । তিনি তাঁকে বললেন : ভাইজান ! আপনি যে অপবিত্র ! কেননা আপনি এখনো মুশরিক । অথচ এ পবিত্র গ্রন্থকে পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ স্পর্শ করতে পারে না । উমর তৎক্ষণাৎ উঠে চলে গেলেন এবং গোসল করে এলেন । এবার ফাতিমা তাকে সহীফাখানি দিলেন । তাতে সূরা ত্বা - হা লিখিত ছিল । তিনি তা পড়লেন । প্রথম অংশটি পড়েই তিনি বললেন : আহ্ ! কী সুন্দর কথা ! কী মহৎ বাণী ! তাঁর এ উক্তি শুনে খাব্বাব ( রা ) তাঁর সামনে বেরিয়ে এলেন । তিনি তাকে বললেন : হে উমর ! আল্লাহ্র কসম ! আমার মনে আশার সঞ্চার হচ্ছে যে , আল্লাহ্ হয়ত আপনাকে তাঁর নবীর দাওয়াত গ্রহণের জন্য মনোনীত করেছেন । আমি গতকাল রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -কে এরূপ দু'আ করতে শুনেছি : “ হে আল্লাহ্ আপনি আবুল হিকাম ইবন হিশাম অথবা উমর ইবনুল খাত্তাবের দ্বারা ইসলামের শক্তি বৃদ্ধি করুন । ” অতএব , হে উমর ! আল্লাহকে ভয় কর , আল্লাহকে ভয় কর । তখন উমর তাঁকে বললেন : হে খাব্বাব ! আমাকে মুহাম্মদের সন্ধান দাও । আমি তাঁর কাছে যেয়ে ইসলাম গ্রহণ করব । খাব্বাব বললেন : তিনি সাফা পাহাড়ের নিকট একটি বাড়িতে আছেন । সেখানে তাঁর সংগে তাঁর একদল সাহাবী রয়েছেন । উমর তার তরবারি আগের মতই খোলা অবস্থায় ধরে নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) ও তাঁর সাহাবীদের কাছে চললেন । তিনি সেখানে গিয়ে দরজার কড়া নাড়লেন । তাঁর আওয়াজ শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর জনৈক সাহাবী ভেতর থেকে দরজার কাছে গিয়ে তাকিয়ে দেখলেন যে , উমর মুক্ত তরবারি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন । তিনি শংকিত চিত্তে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর কাছে ফিরে গিয়ে বললেন ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা:) ! এ যে উমর ইব্‌ন খাত্তাব , একেবারে নগ্ন তরবারি হাতে ! তখন হামযা ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিব বললেন : ওকে ভেতরে আসার অনুমতি দিন । সে যদি কোন ভাল উদ্দেশ্য নিয়ে এসে থাকে , তবে আমরা তার সাথে ভাল ব্যবহার করব । পক্ষান্তরে সে যদি কোন খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে এসে থাকে , তা হলে আমরা তার তরবারি দিয়েই তাকে হত্যা করব । রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বললেন : তাকে ভেতরে আসতে দাও । উক্ত সাহাবী তাকে ভেতরে আসতে দিলেন । রাসূলুল্লাহ্ (সা:) নিজে উঠে তার কাছে এগিয়ে গেলেন এবং হুজরায় একান্তে তার সাথে দেখা করলেন । তিনি (সা:) উমরের কোমর ধরে অথবা যেখানে চাদরের দুই কোণ মিলিত হয় , সেখানটা ধরে তাকে প্রবল জোরে আকর্ষণ করলেন এবং বললেন : হে খাত্তাবের পুত্র ! তোমার এখানে আগমন ঘটল কিভাবে ? আল্লাহ্র কসম ! আমার তো মনে হয় , আল্লাহ তোমাকে কোন বিপর্যয়ে না ফেলা পর্যন্ত তুমি ফিরবে না । উমর বললেন ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা:) ! আমি আপনার কাছে এসেছি , আল্লাহর ওপর তাঁর রাসূলের উপর ও আপনার কাছে আল্লাহ্র পক্ষ থেকে যা কিছু এসেছে তার ওপর ঈমান আনার জন্য । রাবী বলেন : এ কথা শোনামাত্র রাসূলুল্লাহ্ (সা:) এমন জোরে আল্লাহু আকবার বলে উঠলেন যে , ঐ ঘরের ভেতরে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর যে কয়জন সাহাবী ছিলেন , সবাই বুঝলেন যে , উমর ইসলাম গ্রহণ করেছেন ।
এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর সাহাবীগণ যার যার জায়গায় চলে গেলেন । হামযা ( রা ) -এর পর উমর ( রা ) -এর ইসলাম গ্রহণে তাদের মনোবল ও আত্মমর্যাদা বেড়ে গেল । তাঁরা নিশ্চিত হলেন যে , তারা দু'জন রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর হিফাযত করবেন এবং মুসলমানরা এ দু'জনের বদৌলতে শত্রুদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারবেন । উমর ইবন খাত্তাব ( রা ) -এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা মদীনাবাসী বর্ণনাকারীদের ভাষায় উপরে বর্ণিত হল ।

**টিকাঃ**
১. বনূ তামীম বংশোদ্ভূত এ সাহাবী জাহিলী যুগে তরবারি তৈরির পেশায় নিয়োজিত ছিলেন এবং খুযা'আ গোত্রের উম্মু আনমার বিন্ত সিবা ' নাম্নী খুযায়ী মহিলার আযাদকৃত গোলাম ছিলেন । ( রওযুল উনুফ ; ২ য় খণ্ড , পৃ . ৯৮ দ্র . )
১. সুহায়লী বলেন : উমর ( রা ) -কে কুরআন স্পর্শ করার পূর্বে গোসল করার জন্য তাঁর বোন ফাতিমা bircbaji Y1 ami Y ‘ পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া কেউ এটা স্পর্শ করতে পারে না ' বলে যে উক্তি করেছেন , অথচ এখানে ফেরেশতাদের প্রতি ইংগিত রয়েছে । কিন্তু এও ইংগিত রয়েছে যে , ফেরেশতাদের অনুসরণে পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া কেউ তা স্পর্শ করবে না ।
সূরা আবাসায় ( ৮০ : ১৩-১৪ ) -ও এর ইংগিত রয়েছে । ( রাওযুল উনুফ , খ . ২ , পৃ . ৯৮-৯৯ ) । তাছাড়া হাদীস শরীফে আছে , রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন : AYY ( আবু দাউদের মারাসীল , অনুরূপ নিষেধাজ্ঞা মর্মের হাদীস মুসলিম ও মুআত্তায়ও রয়েছে ) । ( ইবন কাছীর , খ . ৩ , পৃ . ৪৩৯ )

ইবন ইসহাক বলেন : আমি যতদূর জানতে পেরেছি , উমর ( রা ) -এর ইসলাম গ্রহণের কারণ ছিল নিম্নরূপ :
উমরের বোন ফাতিমা বিনত খাত্তাব ও তাঁর স্বামী সাঈদ ইবন যায়দ ইবন আমর ইবন নুফায়ল ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন । কিন্তু তাঁরা তাঁদের ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটি উমরের কাছ থেকে গোপন রেখেছিলেন । মক্কার আর এক ব্যক্তি নাঈম ইবন আবদুল্লাহ্ নাহহামও একইভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন । উমরের স্বগোত্রীয় অর্থাৎ বনূ আদী ইবন কা'বের অন্তর্ভুক্ত এ ব্যক্তি নিজ গোত্রের অত্যাচারের ভয়ে নিজের ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করেন নি । খাব্বাব ইব্‌ন আরাত গোপনে ফাতিমা বিন্ত খাত্তাব ( রা ) -এর কাছে যাতায়াত করতেন এবং তাঁকে তিনি কুরআন পড়াতেন । একদিন উমর ইব্‌ন খাত্তাব উন্মুক্ত তরবারি হাতে নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) ও তাঁর একদল সাহাবীর সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন । তিনি জানতে পেরেছিলেন যে , প্রায় চল্লিশজন নারী ও পুরুষ সাহাবীসহ রাসূলুল্লাহ্ (সা:) সাফা পাহাড়ের নিকটবর্তী একটা ঘরে জমায়েত আছেন । এ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর সংগে তাঁর চাচা হামযা ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিব , আবূ বকর সিদ্দীক ইব্‌ন আবূ কুহাফা ও আলী ইব্‌ন আবূ তালিব ( রা ) সহ এমন কিছু সংখ্যক মুসলমান ছিলেন যারা রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর সংগে মক্কায় অবস্থান করছিলেন এবং আবিসিনিয়ায় হিজরতকারীদের সংগে হিজরত করেন নি । পথিমধ্যে নাঈম ইবন আবদুল্লাহ্ ( রা ) -এর সংগে উমরের দেখা হল । তিনি তাকে বললেন : কোথায় চলেছ উমর ? উমর বললেন : স্বধর্মত্যাগী মুহাম্মদের সন্ধানে চলেছি । যে কুরায়শ বংশে বিভেদ সৃষ্টি করেছে , তাদের বুদ্ধিমানদের বোকা সাব্যস্ত করেছে , তাদের অনুসৃত ধর্মের নিন্দা করেছে এবং তাদের দেবদেবীকে গালি দিয়েছে , আমি তাকে হত্যা করব । তখন নাঈম ( রা ) বললেন ; উমর ! আল্লাহ্র কসম ! তুমি কি মনে কর , মুহাম্মদকে হত্যা করার পর বনূ আব্দ মানাফ তোমাকে ছেড়ে দেবে , আর তুমি পৃথিবীর ওপর অবাধে বিচরণ করে বেড়াতে পারবে ? তোমার কি উচিত নয় , আগে নিজের পরিবার- পরিজনের দিকে মনোনিবেশ করা এবং তাদের শোধরানো ? তখন উমর বললেন : আমার পরিবার - পরিজনের কে ? নাঈম ( রা ) বললেন : তোমরা ভগ্নিপতি ও চাচাতো ভাই সাঈদ ইবন যায়দ ইবন আমর এবং তোমার বোন ফাতিমা বিনত খাত্তাব । আল্লাহ্র কসম ! তাঁরা উভয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং মুহাম্মদের ধর্ম অনুসরণ করছে । পারলে তুমি তাদের সামলাও । রাবী বলেন , তখন উমর তার বোন ও ভগ্নিপতির বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলেন । যখন তিনি তাঁদের কাছে পৌঁছলেন , তখন তাদের কাছে খাব্বাব ইবনুল আরাতও ছিলেন । তিনি তাদেরকে পবিত্র কুরআনের একটি অংশ হাতে নিয়ে পড়াচ্ছিলেন । এই অংশটিতে সূরা তা - হা লেখা ছিল । যখন উমরের পদধ্বনি শুনতে পেলেন , তখন খাব্বাব ( রা ) ঘরের এক কোণে আত্মগোপন করলেন । আর ফাতিমা ( রা ) কুরআনের অংশটি নিজের ঊরুর নীচে চাপা দিয়ে রাখলেন । ঘরের কাছাকাছি পৌঁছার পর উমর খাব্বাব ( রা ) -এর কুরআন পড়ার আওয়াজ শুনেছিলেন । ঘরে ঢুকে তিনি বললেন একটা দুর্বোধ্য বাণী আবৃত্তি করার আওয়াজ শুনছিলাম , ওটা কি ? তাঁরা উভয়ে বললেন না , আপনি কিছুই শোনেননি । উমর বললেন : নিশ্চয়ই শুনেছি । আর আল্লাহ্র কসম ! এটাও জেনেছি যে , তোমরা দু'জনে মুহাম্মদের দীনের অনুসারী হয়ে গেছ । কথাটা বলেই ভগ্নিপতি সাঈদ ( রা ) -কে প্রবলভাবে জাপটে ধরলেন । তাঁর বোন ফাতিমা বিনত খাত্তাব স্বামীকে বাঁচাতে ছুটে গেলেন । তিনি তাঁকেও মেরে রক্তাক্ত করে দিলেন । এ কাণ্ড ঘটানোর পর তাঁর বোন ও ভগ্নিপতি একযোগে তাঁকে বললেন : হ্যাঁ , আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি । আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি । এখন আপনি যা করতে চান , করুন । উমর যখন দেখলেন , তার বোনের শরীর রক্তাক্ত , তখন তিনি অনুতপ্ত হলেন । তিনি তাঁর বোনকে বললেন : আমাকে ঐ পুস্তিকাটি দাও , যা এইমাত্র তোমাদেরকে পড়তে শুনলাম । আমি একটু দেখব মুহাম্মদ কি জিনিস নিয়ে এসেছে । উমর লেখাপড়া জানতেন । তিনি এ কথা বললে তাঁর বোন তাঁকে বললেন : আমার ভয় হয় , ওটি তুমি নষ্ট করে ফেল কিনা । উমর বললেন : ভয় পেয়ো না । এরপর তিনি নিজের দেবদেবীর শপথ করে বললেন : তিনি তা পড়েই তাকে ফেরত দেবেন । উমরের এ কথা শুনে ফাতিমার মনে আশার সঞ্চার হলো যে , উমর ইসলাম গ্রহণ করতে পারে । তিনি তাঁকে বললেন : ভাইজান ! আপনি যে অপবিত্র ! কেননা আপনি এখনো মুশরিক । অথচ এ পবিত্র গ্রন্থকে পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া আর কেউ স্পর্শ করতে পারে না । উমর তৎক্ষণাৎ উঠে চলে গেলেন এবং গোসল করে এলেন । এবার ফাতিমা তাকে সহীফাখানি দিলেন । তাতে সূরা ত্বা - হা লিখিত ছিল । তিনি তা পড়লেন । প্রথম অংশটি পড়েই তিনি বললেন : আহ্ ! কী সুন্দর কথা ! কী মহৎ বাণী ! তাঁর এ উক্তি শুনে খাব্বাব ( রা ) তাঁর সামনে বেরিয়ে এলেন । তিনি তাকে বললেন : হে উমর ! আল্লাহ্র কসম ! আমার মনে আশার সঞ্চার হচ্ছে যে , আল্লাহ্ হয়ত আপনাকে তাঁর নবীর দাওয়াত গ্রহণের জন্য মনোনীত করেছেন । আমি গতকাল রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -কে এরূপ দু'আ করতে শুনেছি : “ হে আল্লাহ্ আপনি আবুল হিকাম ইবন হিশাম অথবা উমর ইবনুল খাত্তাবের দ্বারা ইসলামের শক্তি বৃদ্ধি করুন । ” অতএব , হে উমর ! আল্লাহকে ভয় কর , আল্লাহকে ভয় কর । তখন উমর তাঁকে বললেন : হে খাব্বাব ! আমাকে মুহাম্মদের সন্ধান দাও । আমি তাঁর কাছে যেয়ে ইসলাম গ্রহণ করব । খাব্বাব বললেন : তিনি সাফা পাহাড়ের নিকট একটি বাড়িতে আছেন । সেখানে তাঁর সংগে তাঁর একদল সাহাবী রয়েছেন । উমর তার তরবারি আগের মতই খোলা অবস্থায় ধরে নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) ও তাঁর সাহাবীদের কাছে চললেন । তিনি সেখানে গিয়ে দরজার কড়া নাড়লেন । তাঁর আওয়াজ শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর জনৈক সাহাবী ভেতর থেকে দরজার কাছে গিয়ে তাকিয়ে দেখলেন যে , উমর মুক্ত তরবারি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন । তিনি শংকিত চিত্তে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর কাছে ফিরে গিয়ে বললেন ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা:) ! এ যে উমর ইব্‌ন খাত্তাব , একেবারে নগ্ন তরবারি হাতে ! তখন হামযা ইব্‌ন আবদুল মুত্তালিব বললেন : ওকে ভেতরে আসার অনুমতি দিন । সে যদি কোন ভাল উদ্দেশ্য নিয়ে এসে থাকে , তবে আমরা তার সাথে ভাল ব্যবহার করব । পক্ষান্তরে সে যদি কোন খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে এসে থাকে , তা হলে আমরা তার তরবারি দিয়েই তাকে হত্যা করব । রাসূলুল্লাহ্ (সা:) বললেন : তাকে ভেতরে আসতে দাও । উক্ত সাহাবী তাকে ভেতরে আসতে দিলেন । রাসূলুল্লাহ্ (সা:) নিজে উঠে তার কাছে এগিয়ে গেলেন এবং হুজরায় একান্তে তার সাথে দেখা করলেন । তিনি (সা:) উমরের কোমর ধরে অথবা যেখানে চাদরের দুই কোণ মিলিত হয় , সেখানটা ধরে তাকে প্রবল জোরে আকর্ষণ করলেন এবং বললেন : হে খাত্তাবের পুত্র ! তোমার এখানে আগমন ঘটল কিভাবে ? আল্লাহ্র কসম ! আমার তো মনে হয় , আল্লাহ তোমাকে কোন বিপর্যয়ে না ফেলা পর্যন্ত তুমি ফিরবে না । উমর বললেন ইয়া রাসূলাল্লাহ্ (সা:) ! আমি আপনার কাছে এসেছি , আল্লাহর ওপর তাঁর রাসূলের উপর ও আপনার কাছে আল্লাহ্র পক্ষ থেকে যা কিছু এসেছে তার ওপর ঈমান আনার জন্য । রাবী বলেন : এ কথা শোনামাত্র রাসূলুল্লাহ্ (সা:) এমন জোরে আল্লাহু আকবার বলে উঠলেন যে , ঐ ঘরের ভেতরে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর যে কয়জন সাহাবী ছিলেন , সবাই বুঝলেন যে , উমর ইসলাম গ্রহণ করেছেন ।
এরপর রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর সাহাবীগণ যার যার জায়গায় চলে গেলেন । হামযা ( রা ) -এর পর উমর ( রা ) -এর ইসলাম গ্রহণে তাদের মনোবল ও আত্মমর্যাদা বেড়ে গেল । তাঁরা নিশ্চিত হলেন যে , তারা দু'জন রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর হিফাযত করবেন এবং মুসলমানরা এ দু'জনের বদৌলতে শত্রুদের থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারবেন । উমর ইবন খাত্তাব ( রা ) -এর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা মদীনাবাসী বর্ণনাকারীদের ভাষায় উপরে বর্ণিত হল ।

**টিকাঃ**
১. বনূ তামীম বংশোদ্ভূত এ সাহাবী জাহিলী যুগে তরবারি তৈরির পেশায় নিয়োজিত ছিলেন এবং খুযা'আ গোত্রের উম্মু আনমার বিন্ত সিবা ' নাম্নী খুযায়ী মহিলার আযাদকৃত গোলাম ছিলেন । ( রওযুল উনুফ ; ২ য় খণ্ড , পৃ . ৯৮ দ্র . )
২. সুহায়লী বলেন : উমর ( রা ) -কে কুরআন স্পর্শ করার পূর্বে গোসল করার জন্য তাঁর বোন ফাতিমা bircbaji Y1 ami Y ‘ পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া কেউ এটা স্পর্শ করতে পারে না ' বলে যে উক্তি করেছেন , অথচ এখানে ফেরেশতাদের প্রতি ইংগিত রয়েছে । কিন্তু এও ইংগিত রয়েছে যে , ফেরেশতাদের অনুসরণে পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া কেউ তা স্পর্শ করবে না ।
সূরা আবাসায় ( ৮০ : ১৩-১৪ ) -ও এর ইংগিত রয়েছে । ( রাওযুল উনুফ , খ . ২ , পৃ . ৯৮-৯৯ ) । তাছাড়া হাদীস শরীফে আছে , রাসূলুল্লাহ (সা:) বলেছেন : AYY ( আবু দাউদের মারাসীল , অনুরূপ নিষেধাজ্ঞা মর্মের হাদীস মুসলিম ও মুআত্তায়ও রয়েছে ) । ( ইবন কাছীর , খ . ৩ , পৃ . ৪৩৯ )

ইবন ইসহাক বলেন : আমি যতদূর জানতে পেরেছি, উমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের কারণ ছিল নিম্নরূপ :
উমরের বোন ফাতিমা বিন্ত খাত্তাব ও তাঁর স্বামী সাঈদ ইবন যায়দ ইবন আমর ইবন নুফায়ল ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তাঁরা তাঁদের ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটি উমরের কাছ থেকে গোপন রেখেছিলেন। মক্কার আর এক ব্যক্তি নাঈম ইবন আবদুল্লাহ্ নাহহামও একইভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। উমরের স্বগোত্রীয় অর্থাৎ বনূ আদী ইবন কা'বের অন্তর্ভুক্ত এ ব্যক্তি নিজ গোত্রের অত্যাচারের ভয়ে নিজের ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করেন নি। খাব্বাব ইবন আরাত গোপনে ফাতিমা বিন্ত খাত্তাব (রা)-এর কাছে যাতায়াত করতেন এবং তাঁকে তিনি কুরআন পড়াতেন।

টিকাঃ
১. বনূ তামীম বংশোদ্ভূত এ সাহাবী জাহিলী যুগে তরবারি তৈরির পেশায় নিয়োজিত ছিলেন এবং ইসলাম গ্রহণের পর কাফিরদের হাতে নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। (দ্র. আল-ইসাবা, ২খ, পৃ. ২৪৮)।

ইবন ইসহাক বলেন : আমি যতদূর জানতে পেরেছি, উমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের কারণ ছিল নিম্নরূপ:
উমরের বোন ফাতিমা বিন্ত খাত্তাব ও তাঁর স্বামী সাঈদ ইবন যায়দ ইবন আমর ইবন নুফায়ল ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তাঁরা তাঁদের ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটি উমরের কাছ থেকে গোপন রেখেছিলেন। মক্কার আর এক ব্যক্তি নাঈম ইবন আবদুল্লাহ্ নাহহামও একইভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। উমরের স্বগোত্রীয় অর্থাৎ বনূ আদী ইবন কা'বের অন্তর্ভুক্ত এ ব্যক্তি নিজ গোত্রের অত্যাচারের ভয়ে নিজের ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করেন নি। খাব্বাব ইব্‌ন আরাত গোপনে ফাতিমা বিন্ত খাত্তাব (রা)-এর কাছে যাতায়াত করতেন এবং তাঁকে তিনি কুরআন পড়াতেন।
একদিন উমর তরবারি কাঁধে ঝুলিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও তাঁর সাহাবীদের খোঁজে বের হন। তিনি শুনেছিলেন, তাঁরা সাফা পর্বতের কাছে একটি ঘরে সমবেত হয়েছেন। সেখানে তখন প্রায় চল্লিশজন পুরুষ ও মহিলা সাহাবী ছিলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর চাচা হামযা ইবন আবদুল মুত্তালিব, আবূ বকর সিদ্দীক (রা), আলী ইবন আবী তালিব (রা)-সহ এমন অনেক সাহাবী তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন, যাঁরা কুরায়শদের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে আবিসিনিয়ায় হিজরত করতে পারেননি। নাঈম ইবন আবদুল্লাহ্ পথে উমরের দেখা পান। তিনি জিজ্ঞেস করেন : উমর, কোথায় যাচ্ছ? উমর বললেন : স্বধর্মত্যাগী মুহাম্মদের কাছে যাচ্ছি, যে কুরায়শদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছে, তাদের জ্ঞানীদের মূর্খ বলেছে, তাদের ধর্মের নিন্দা করেছে এবং তাদের উপাস্যদের গালাগাল করেছে। আমি তাকে হত্যা করব। নাঈম বললেন : আল্লাহ্‌র কসম, উমর! তোমার মন তোমাকে প্রতারিত করেছে। তুমি কি মনে কর, তুমি মুহাম্মদকে হত্যা করার পর বনূ আবদে মানাফ তোমাকে ছেড়ে দেবে? এর চেয়ে তুমি তোমার নিজের ঘরে ফিরে যাও এবং তাদের খোঁজ-খবর নাও। উমর বললেন : আমার ঘরে কী হয়েছে? নাঈম বললেন : তোমার বোন ফাতিমা ও তোমার ভগ্নিপতি সাঈদ ইবন যায়দ — দু'জনই স্বধর্ম ত্যাগ করেছে এবং মুহাম্মদের ধর্মের অনুসরণ করেছে। সুতরাং আগে তাদের ব্যবস্থা নাও। তখন উমর সোজা তাঁর বোন ও ভগ্নিপতির বাড়ির দিকে রওনা হলেন। এ সময় খাব্বাব ইবন আরাতও তাঁদের ঘরে ছিলেন। তিনি তাঁদেরকে সূরা ত্বা-হা শিক্ষা দিচ্ছিলেন। উমরের আগমন টের পেয়ে খাব্বাব ঘরের এক কোণে লুকিয়ে পড়লেন। ফাতিমাও কুরআনের সহীফাটি লুকিয়ে ফেললেন। কিন্তু উমর ঘরের কাছে এসেই খাব্বাবের কুরআন তিলাওয়াতের আওয়াজ শুনতে পেয়েছিলেন। ঘরে প্রবেশ করেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন : আমি তোমাদের এখানে কিসের গুণগুণ আওয়াজ শুনতে পেলাম? তাঁরা বললেন : আমরা নিজেদের মধ্যে কথাবার্তা বলছিলাম। উমর বললেন : সম্ভবত তোমরা দু’জনই ধর্মত্যাগী হয়েছ? ভগ্নিপতি সাঈদ বললেন : হে উমর! তুমি যে ধর্ম অনুসরণ কর, তার বাইরে অন্য কোথাও যদি সত্য থেকে থাকে, তাহলে তোমার কী বলার আছে? এ কথা শুনে উমর তাঁর ভগ্নিপতি সাঈদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং তাঁকে বেদম প্রহার করতে লাগলেন। বোন ফাতিমা স্বামীকে রক্ষা করতে এগিয়ে এলে উমর তাঁকেও প্রহার করলেন এবং তাঁর মুখমণ্ডল রক্তাক্ত করে দিলেন।
তখন তাঁর বোন ও ভগ্নিপতি উভয়েই বলে উঠলেন : হ্যাঁ, আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি এবং আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি। এখন তোমার যা করার আছে, তাই কর। নিজের বোন ও ভগ্নিপতির এ দৃঢ়তা দেখে এবং বোনের মুখ রক্তাক্ত দেখে উমর লজ্জিত, অনুতপ্ত ও হতাশ হলেন। তিনি বললেন : তোমরা যে সহীফাটি পড়ছিলে, তা আমাকে দাও, আমি একটু দেখি। বোন বললেন : তুমি অপবিত্র, এ পবিত্র গ্রন্থ অপবিত্র কেউ স্পর্শ করতে পারে না। যাও, আগে গোসল করে এসো। উমর গোসল করে এলেন। তখন বোন তাঁকে সহীফাটি দিলেন। তাতে সূরা ত্বা-হা লিখিত ছিল। উমর তা পাঠ করতে শুরু করলেন। সূরার শুরু থেকে পাঠ করতে করতে যখন এ আয়াতে পৌঁছলেন : إِنَّنِي أَنَا اللَّهُ لَا إِلَٰهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدْنِي وَأَقِمِ الصَّلَاةَ لِذِكْرِي অর্থাৎ “নিশ্চয়ই আমি আল্লাহ্, আমি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। সুতরাং আমারই ইবাদত কর এবং আমার স্মরণে সালাত কায়েম কর।” তখন উমর বলে উঠলেন : এ তো অতি চমৎকার ও মহিমান্বিত কালাম! একথা শুনে খাব্বাব গোপন স্থান থেকে বেরিয়ে এসে বললেন : হে উমর! আল্লাহ্‌র কসম, আমি আশা করি, আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর নবীর দু'আর মাধ্যমে আপনাকে সম্মানিত করেছেন। কারণ আমি গতকাল রাসূলুল্লাহ্ (সা)-কে বলতে শুনেছি : হে আল্লাহ্! তুমি আবুল হাকাম ইবন হিশাম অথবা উমর ইবন খাত্তাবের মাধ্যমে ইসলামকে শক্তিশালী কর। উমর, আল্লাহকে ভয় কর, আল্লাহকে ভয় কর। উমর বললেন : হে খাব্বাব! আমাকে মুহাম্মদের ঠিকানা বলে দাও। আমি তাঁর কাছে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করব। খাব্বাব বললেন : তিনি সাফা পর্বতের কাছে একটি ঘরে অবস্থান করছেন। তখন উমর তাঁর তরবারি কাঁধে নিয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও তাঁর সাহাবীদের যেখানে অবস্থান করছিলেন, সে বাড়ির দিকে রওনা হলেন। তিনি দরজায় করাঘাত করলেন। তাঁর আওয়াজ শুনে একজন সাহাবী উঠে দরজার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে দেখলেন, উমর ইবন খাত্তাব কাঁধে তরবারি ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি ভীত হয়ে রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কাছে ছুটে এসে বললেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ্! উমর ইবন খাত্তাব কাঁধে তরবারি ঝুলিয়ে দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। হামযা ইবন আবদুল মুত্তালিব (রা) বললেন : তাকে আসতে দাও। যদি সে কোনো কল্যাণের উদ্দেশ্যে এসে থাকে, তাহলে আমরাও তার সাথে সেরূপ ব্যবহার করব। আর যদি কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে এসে থাকে, তাহলে আমরা তারই তরবারি দিয়ে তাকে হত্যা করব। রাসূলুল্লাহ্ (সা) বললেন : তাকে ভেতরে আসতে দাও। সাহাবী দরজা খুলে দিলে উমর ভেতরে প্রবেশ করলেন। রাসূলুল্লাহ্ (সা) তাঁর চাদর ও চাদরের কিনারা ধরে খুব জোরে টান দিলেন এবং বললেন : হে খাত্তাবের পুত্র! কী মনে করে তুমি এসেছ? আল্লাহ্‌র কসম, আমি দেখতে পাচ্ছি, আল্লাহ্ তা'আলা তোমার উপর কোনো বিপর্যয় নাযিল না করা পর্যন্ত তুমি বিরত হবে না। উমর বললেন : ইয়া রাসূলাল্লাহ্! আমি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের এবং তিনি আল্লাহ্‌র পক্ষ থেকে যা কিছু নিয়ে এসেছেন, তার প্রতি ঈমান আনার জন্য আপনার কাছে এসেছি। ইবন ইসহাক বলেন : রাসূলুল্লাহ্ (সা) তখন উচ্চস্বরে ‘আল্লাহু আকবার' বলে তাকবীর দিলেন। এতে ঘরের সব সাহাবী বুঝতে পারলেন যে, উমর ইসলাম গ্রহণ করেছেন।
তখন সাহাবীগণ সেখান থেকে বেরিয়ে এলেন। উমরের ইসলাম গ্রহণ এবং হামযার ইসলাম গ্রহণের পর রাসূলুল্লাহ্ (সা) ও তাঁর সাহাবীগণ কিছুটা স্বস্তিবোধ করলেন।

টিকাঃ
১. বনূ তামীম বংশোদ্ভূত এ সাহাবী জাহিলী যুগে তরবারি তৈরির পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। এরপর ইসলাম গ্রহণ করেন।

ইবন ইসহাক বলেন : আমি যতদূর জানতে পেরেছি, উমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের কারণ ছিল নিম্নরূপ :
উমরের বোন ফাতিমা বিনত খাত্তাব (রা) ও তাঁর স্বামী সাঈদ ইবন যায়দ ইবন আমর ইবন নুফায়ল (রা) ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তাঁরা তাঁদের ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটি উমরের কাছ থেকে গোপন রেখেছিলেন। মক্কার আর এক ব্যক্তি নাঈম ইবন আবদুল্লাহ্ নাহহামও একইভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। উমরের স্বগোত্রীয় অর্থাৎ বনূ আদী ইবন কা'বের অন্তর্ভুক্ত এ ব্যক্তি নিজ গোত্রের অত্যাচারের ভয়ে নিজের ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করেন নি। খাব্বাব ইব্‌ন আরাত (রা) গোপনে ফাতিমা বিন্ত খাত্তাব (রা)-এর কাছে যাতায়াত করতেন এবং তাঁকে তিনি কুরআন পড়াতেন।¹

টিকাঃ
১. বনূ তামীম বংশোদ্ভূত এ সাহাবী জাহিলী যুগে তরবারি তৈরির পেশায় নিয়োজিত ছিলেন...

ইবন ইসহাক বলেন : আমি যতদূর জানতে পেরেছি , উমর ( রা ) -এর ইসলাম গ্রহণের কারণ ছিল নিম্নরূপ :
উমরের বোন ফাতিমা বিনত খাত্তাব ও তাঁর স্বামী সাঈদ ইবন যায়দ ইবন আমর ইবন নুফায়ল ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন । কিন্তু তাঁরা তাঁদের ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটি উমরের কাছ থেকে গোপন রেখেছিলেন । মক্কার আর এক ব্যক্তি নাঈম ইবন আবদুল্লাহ্ নাহহামও একইভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন । উমরের স্বগোত্রীয় অর্থাৎ বনূ আদী ইবন কা'বের অন্তর্ভুক্ত এ ব্যক্তি নিজ গোত্রের অত্যাচারের ভয়ে নিজের ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করেন নি । খাব্বাব ইব্‌ন আরাত গোপনে ফাতিমা বিন্ত খাত্তাব ( রা ) -এর কাছে যাতায়াত করতেন এবং তাঁকে তিনি কুরআন পড়াতেন ।

টিকাঃ
১. বনূ তামীম বংশোদ্ভূত এ সাহাবী জাহিলী যুগে তরবারি তৈরির পেশায় নিয়োজিত ছিলেন...

ইবন ইসহাক বলেন : আমি যতদূর জানতে পেরেছি , উমর ( রা ) -এর ইসলাম গ্রহণের কারণ ছিল নিম্নরূপ :
উমরের বোন ফাতিমা বিনত খাত্তাব ও তাঁর স্বামী সাঈদ ইবন যায়দ... ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ... খাব্বাব ইব্‌ন আরাত গোপনে ফাতিমা বিন্ত খাত্তাব ( রা ) -এর কাছে যাতায়াত করতেন এবং তাঁকে তিনি কুরআন পড়াতেন।¹

টিকাঃ
১. বনূ তামীম বংশোদ্ভূত এ সাহাবী জাহিলী যুগে তরবারি তৈরির পেশায় নিয়োজিত ছিলেন...

ইবন ইসহাক বলেন : আমি যতদূর জানতে পেরেছি , উমর ( রা ) -এর ইসলাম গ্রহণের কারণ ছিল নিম্নরূপ :
উমরের বোন ফাতিমা বিনত খাত্তাব ও তাঁর স্বামী সাঈদ ইবন যায়দ ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন । কিন্তু তাঁরা তাঁদের ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটি উমরের কাছ থেকে গোপন রেখেছিলেন । মক্কার আর এক ব্যক্তি নাঈম ইবন আবদুল্লাহ্ নাহহামও একইভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন । উমরের স্বগোত্রীয় অর্থাৎ বনূ আদী ইবন কা'বের অন্তর্ভুক্ত এ ব্যক্তি নিজ গোত্রের অত্যাচারের ভয়ে নিজের ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করেন নি । খাব্বাব ইব্‌ন আরাত গোপনে ফাতিমা বিন্ত খাত্তাব ( রা ) -এর কাছে যাতায়াত করতেন এবং তাঁকে তিনি কুরআন পড়াতেন ।

এই অধ্যায়ের শিরোনামটি প্রদত্ত নথিতে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

ইমাম বাগাবী তাঁর শারহুস সুন্নাহ গ্রন্থে বলেন : ইচ্ছাকৃতভাবে ফরয সলাত ত্যাগকারী কাফের হবে কিনা- এ ব্যাপারে বিদ্বানগণ ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। অতঃপর এ বিষয়ে বিভিন্ন মতামত পেশ করেছেন এমন কতিপয় মনীষীদের নাম উল্লেখ করেছেন। (২য়খণ্ড ১৭৮-১৭৯ পৃ.)
আল্লামা শাওকানী 'নাইলুল আওতার' গ্রন্থে পূর্ব উল্লিখিত জাবির কর্তৃক বর্ণিত হাদীসটির টীকায় বলেন, হাদীসটি দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, সলাত ত্যাগ করা কুফরকে আবশ্যক করে। আর যে ব্যক্তি সলাত ফরয হওয়াকে অস্বীকার করত তা ত্যাগ করে তাহলে সকল মুসলিমের ঐক্যমতে সে কাফের। হ্যাঁ, যদি নতুন ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারী হয়, কিংবা মুসলিমদের সাথে এ পরিমাণ সময় চলাফেরা করার সুযোগ না পেয়ে থাকে যে, সলাতের আবশ্যকীয়তা তার নিকট পৌঁছেনি; তাহলে উক্ত ব্যক্তির কথা ভিন্ন।
আর যদি কোনো ব্যক্তি সলাতের আবশ্যকীয়তা সম্পর্কে অবগত থাকে এবং তা বিশ্বাস রাখে; কিন্তু অলসতাবশত ছেড়ে দেয়- যেমন আমাদের সমাজে এরকম অনেক মানুষ রয়েছে- এরূপ ব্যক্তিদের ব্যাপারে উলামাদের মাঝে ভিন্ন ভিন্ন মতামত রয়েছে।
জমহুর (অধিকাংশ) সালাফ (পূর্ববর্তী) এবং খাল্‌ল্ফ (পরবর্তী) আলেমগণ এ ব্যাপারে মতামত দিয়েছেন। তন্মধ্যে ইমাম শাফেঈ ও ইমাম মালেক এর মতে সে কাফের হবে না; বরং সে ফাসেক। অতএব যদি সে তওবা করে ফিরে আসে তাহলে মুক্তি পাবে। নতুবা আমরা তাকে বিবাহিত ব্যভিচারীর শাস্তির ন্যায় হদ মেরে হত্যা করব।
ইমাম ইবনু হিব্বান তাঁর সহীহ গ্রন্থে (৪/৩২৪) পৃষ্ঠায় বলেন, রাসূলুল্লাহ সলাত ত্যাগকারীর উপর 'কুফর' শব্দটি এ জন্য প্রয়োগ করেছেন যেহেতু সলাত পরিত্যাগ করা 'কুফর' শুরু হওয়ার প্রাথমিক ধাপ। কেননা, মানুষ যখন সলাত ছেড়ে দেয় তখন সে অন্যান্য ফরযসমূহকে ত্যাগ করা আরম্ভ করে দেয়। আর যখন সে যাবতীয় ফরয আমল ত্যাগ করা শুরু করে দেবে তখন এক পর্যায়ে সেটাকে (ফরযসমূকে) অস্বীকার করার দিকে ধাবিত হবে- এ জন্য রাসূলুল্লাহ শেষ ধাপের কথাটিকে প্রথমেই প্রয়োগ করেছেন।
অতঃপর ইবনু হিব্বান অধ্যায় রচনা করে তাতে এমন হাদীস উল্লেখ করেছেন আমরা যা উল্লেখ করেছি তা সঠিক হিসেবে প্রমাণ করে। সে অধ্যায়টি হল “ যা শেষে সংঘটিত হবে এমন বস্তুকে শুরুতে আরবরা উল্লেখ করে থাকে।”
এ প্রসঙ্গে তিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর اَلْمَرَاءُ فِي الْقُرْآنِ كُفْرٌ 'আল-কুরআনের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করা কুফর কথাটি উল্লেখ করে বলেন : কোনো সন্দেহপোষণকারী মুতাশাবেহ আয়াত সমূহের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করতে পারে যা এক প্রকার অস্বীকার করা- এমন ভেবে রাসূলুল্লাহ প্রথমেই مراء তথা 'সন্দেহ' শব্দটি উল্লেখ করেছেন।
সুতরাং সলাত পরিত্যাগ করা ভয়াবহ এবং মারাত্মক একটি বিষয় যা দ্বীন ইসলাম থেকে মানুষকে বের করে দেয় এবং কাফের ও মুশরিকদের সাথে সম্পৃক্ত করে দেয়। (এ জন্য আল্লাহ তা'আলার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি)
আর যখন এ গুরুত্বপূর্ণ মাস'আলার বিষয়ে উলামায়ে কিরাম এবং ইমামদের মাঝে মতভেদ রয়েছে সে জন্যই জ্ঞান অন্বেষণকারীদের উপর আবশ্যক হল, এ বিষয়ে গভীরভাবে জ্ঞান অর্জন করা। ঢালাওভাবে প্রত্যেক সলাত পরিত্যাগকারীকে কাফের বা মুরতাদ শব্দ ইত্যাদি না বলা।
কারণ, সূর্যের ন্যায় স্পষ্ট প্রমাণ ছাড়া একজন মুসলিম ব্যক্তিকে ফতোয়া দিয়ে ইসলাম থেকে বের করে কাফেরদের সাথে সম্পৃক্ত করে দেয়া ঐ মুসলিম ব্যক্তি জন্য উচিত নয় যে আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে। কেননা, সহীহ হাদীসে অনেক সংখ্যক সাহাবায়ে কেরাম থেকে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ বলেন-'
مَنْ قَالِ لِأَخِيهِ : يَا كَافِرُ فَقَدْ بَاءَ بِهَا أَحَدُهُمَا
অর্থাৎ “যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইকে বলে 'হে কাফের' তাহলে দু'জনের মধ্যে যে কোনো এক ব্যক্তির প্রতি উক্ত শব্দটি প্রযোজ্য হয়।”
আর বুখারীর বর্ণনায় এসেছে- فَقَدَ كَفَرَ أَحَدُهُمَا অর্থাৎ “দু'জনের মধ্যে যে কোনো একজন কাফের হয়ে যাবে।”
সুতরাং এ সমস্ত হাদীস এবং এ বিষয়ে আরো যে সব হাদীস রয়েছে সেগুলো কাউকে দ্রুত কাফের না বলার জন্য সতর্ককারী এবং বিরাট উপদেশ প্রদান করছে। আল্লাহ তা'আলা বলেন :
وَلَكِنْ مَنْ شَرَحَ بِالْكُفْرِ صَدْرًا ....
অর্থাৎ “কিন্তু যে ব্যক্তি কুফরীর জন্য তার হৃদয়কে উন্মুক্ত করে দেয়।”
সুতরাং জরুরী বিষয় হচ্ছে, যে ব্যক্তি কুফরি কাজের প্রতি তার হৃদয়কে উন্মুক্ত করে দেয় এবং অন্তর তাতে প্রশান্তি পায় তখন অন্তর কুফরির দিকেই ধাবিত হয়।
তবে হ্যাঁ, কতক বিদ্বান অথবা বিদ্যা অর্জনকারীদের আবেগ ও ঈর্ষা তাদেরকে এ ফাতওয়ার দিকে ধাবিত করেছে যে, “প্রত্যেক সলাত পরিত্যাগকারী কাফের, সে অস্বীকার করে সলাত বর্জন করুক বা অলসতা করে বর্জন করুক। তারা এ ফাতওয়া দিয়েছেন সলাত পরিত্যাগকারীদেরকে ভীতি প্রদর্শন করার জন্য এবং সলাতের প্রতি উৎসাহ প্রদানের জন্য। কেননা তাদের ধারণা অনুযায়ী সলাতের প্রতি অলসতা প্রদর্শন এক পর্যায় ইসলামের এ মহান রুকন ত্যাগ করার দিকে ধাবিত করবে।"
এ সকল বিদ্বান অথবা বিদ্যা অর্জনকারীরা তাদের উক্ত মতের স্বপক্ষে কুরআন ও হাদীস থেকে দলীল পেশ করেছেন, কিন্তু এ সংক্রান্ত যত হাদীস রয়েছে সবগুলো উপস্থাপন করেননি। কারণ যদি সমস্ত হাদীস উপস্থাপন করা হয় তাহলে বিষয়টি হালকা হবে এবং এক পর্যায়ে দলীলগুলো বিপরীত পক্ষকে সমর্থন করবে। আমিও এ মহৎ মাসআলায় মতানৈক্যকারীদের প্রমাণাদি ও মতানৈক্যের কেন্দ্র এবং তার প্রতি গভীর মনোনিবেশন করব না। কারণ এর জন্য আলাদা স্থান উপযুক্ত মনে করি।
তবে আমি এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন মনে করছি যা সচরাচর অনেক জ্ঞান অন্বেষণকারীরা অবগত নয়।
প্রথমত : ইমাম আহমাদ ইবনু হাম্বাল তার ছাত্র ইমাম হাফেজ মুসাদ্দাদ ইবনু মুসারহাদকে উপদেশ দিয়ে বলেছেন : “আল্লাহর সাথে শরীক করা ছাড়া কোনো বিষয় ইসলাম থেকে বান্দাকে বের করে দেয় না।” অথবা আল্লাহর ফরয বিধানগুলোর মধ্যে কোনো একটি ফরয বিধানকে অস্বীকারবশত প্রত্যাখ্যান করলে (ইসলাম থেকে বের হয়ে যায়)। যদি কেউ কোন বিধান অলসতা কিংবা অবজ্ঞাবশত ছেড়ে দেয় তাহলে তা আল্লাহর ইচ্ছাধীন। ইচ্ছা করলে আল্লাহ তাকে শাস্তি দিতে পারেন। কিংবা ক্ষমা করতে পারেন।
আমার মতে, কুরআন ও হাদীসে সলাত পরিত্যাগের বিষয়টি (আম) সাধারণভাবে এবং (খাস) বিশেষভাবে এসেছে।
আল্লাহ তা'আলা বলেন,
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُوْنَ ذُلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ )
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করার গুনাহ ক্ষমা করবেন না। এটা ছাড়া অন্য সব যাকে ইচ্ছে মাফ করবেন”
রাসূলুল্লাহ ইরশাদ করেছেন :
خَمْسُ صَلَوَاتٍ كَتَبَهُنَّ اللهُ عَلَى الْعِبَادِ فَمَنْ جَاءَ بِهِنَّ وَلَمْ يُضَيِّعُ مِنْهُمْ شَيْئًا اسْتِخْفَافًا بِحَقِّهِنَّ كَانَ لَهُ عِنْدَ اللَّهِ عَهْدٌ أَنْ يُدْخِلَهُ الْجَنَّةَ وَمَنْ لَمْ يَأْتِ بِهِنَّ فَلَيْسَ لَهُ عِنْدَ اللهِ عَهْدٌ إِنْ شَاءَ عَذَّبَهُ وَإِنْ شَاءَ أَدْخَلَهُ الْجَنَّةَ»
“আল্লাহ তা'আলা তাঁর বান্দার উপর পাঁচ ওয়াক্ত সলাত ফরয করে দিয়েছেন। যে ব্যক্তি তা আদায় করে এবং তা হতে কোনো কিছু হালকা মনে করে কমতি করে না, তাহলে তার জন্য আল্লাহর নিকট এ প্রতিশ্রুতি রয়েছে যে, তিনি তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আর যে ব্যক্তি তা পালন করল না, তার জন্য আল্লাহর নিকট কোনো প্রতিশ্রুতি নেই। ইচ্ছা করলে তিনি শাস্তি দিতে পারেন। আর চাইলে তাকে জান্নাতেও প্রবেশ করাতে পারেন।
দ্বিতীয়ত : ইমাম মুহাম্মাদ বিন আব্দুল ওয়াহহাব 'আদ্-দুরারুস সুন্নিয়াহ' নামক গ্রন্থে (১/৭০) সে সব ব্যক্তিদের প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন যারা তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিল, কোন্ আমলের কারণে মানুষ কাফের হয়ে যায় এবং তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা ওয়াজিব হয়?
উত্তরে তিনি বলেন, ইসলামের রুকন হচ্ছে পাঁচটি। তন্মধ্যে প্রথমটি হল কালিমায়ে শাহাদাহ। অতঃপর অবশিষ্ট চারটি। যখন কোন মুসলিম উপর্যুক্ত রুকনগুলোর স্বীকৃতি দেয় এবং অলসতাবশত তা পালন না করে, তবে আমরা তার বিরুদ্ধে লড়াই করলেও তাকে সরাসরি কাফের বলবো না।
আর যে ব্যক্তি অস্বীকার করে নয় বরং অলসতা করে তা পরিত্যাগ করে- সেই ব্যক্তিকে কাফের বলা যাবে কিনা তা নিয়ে উলামায়ে কেরামগণ ইখতেলাফ (মতবিরোধ) করেছেন।
হ্যাঁ, তবে 'কালিমায়ে শাহাদাহ'কে যদি কেউ অবজ্ঞা বা তুচ্ছ করে; তাহলে সমস্ত আলেমের ঐক্যমতে সে ব্যক্তি কাফের হয়ে যাবে।
তৃতীয়ত : কতিপয় বিদ্বান কুরআনের আয়াতকে দলীল হিসেবে ভিত্তি করে সলাত বা নামায ত্যাগকারীকে কাফের সাব্যস্ত করেছেন। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেন-
فَإِنْ تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلوةَ وَاتَوُا الزَّكُوةَ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّينِ)
“এখন যদি তারা তাওবাহ করে, সলাত প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত আদায় করে তাহলে তার। তোমাদের দ্বীনী ভাই।”
তারা বলেন, আলোচ্য আয়াত দ্বারা বুঝা যায়, আল্লাহ তা'আলা শর্ত আরোপ করেছেন, আমাদের মাঝে এবং মুশরিকদের মাঝে পরস্পর ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক তখনই প্রতিষ্ঠা হবে যখন তারা সলাত আদায় করবে। সুতরাং যদি সলাত আদায় না করে তাহলে তারা আমাদের দ্বীনী ভাই হিসেবে গণ্য হবে না।
উল্লেখিত দলীলের দু'টি জবাব রয়েছে :
১ম জবাব : ইমাম ইবনু আতিয়‍্যাহ 'আল-মুহাররারুল ওয়াজীয' (খণ্ড ৮, পৃষ্ঠা ১৩৯) গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন :
تَابُوا : رَجَعُوْا عَنْ حَالِهِمْ وَالتَّوْبَةُ مِنْهُمْ تَتَضَمَّنُ الْإِيْمَانَ»
অর্থাৎ “তওবা করা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, তারা পূর্বের অবস্থা থেকে ফিরে আসবে। আর তাদের তওবা হল, ঈমান আনয়ন করা।"
সুতরাং সলাত কায়েমের শর্ত হল তাকে প্রথমে তাওবা করতে হবে, আর সে তাওবার অন্তর্ভুক্ত হল ঈমান আনয়ন করা। এ জন্য আল্লাহ তা'আলা সলাত কায়েম অথবা যাকাত প্রদানের কথা উল্লেখ করার পূর্বে তওবার কথা উল্লেখ করেছেন।
সুতরাং বুঝা গেল, দ্বীনী ভাই হওয়ার ক্ষেত্রে মূলনীতি হল তওবা করে ঈমান আনয়ান করা। এ জন্য ইমাম ত্ববারী তার বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থ জামেউল বায়ানে (খণ্ড ১৮ পৃষ্ঠা ৮৬) বলেছেন, আল্লাহ তা'আলা বলেন : হে মু'মিনগণ! যদি এই সমস্ত মুশরিকগণ যাদেরকে আমি হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছি তারা যদি কুফরি করা এবং শিরক করা থেকে ফিরে আসে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান আনে এবং আনুগত্য করে, ফরয সলাত কায়েম করে এবং তা সঠিকভাবে আদায় করে, যাকাত সঠিকভাবে দেয়- তাহলে তারা তোমাদের দ্বীনী ভাই। অর্থাৎ তারা তোমার মুসলিম ভাই। এ কথাটি পূর্বের কথাকে সমর্থন করে।
২য় জবাব : উল্লেখিত আয়াতে সলাত শব্দের সঙ্গে যাকাত শব্দটি এসেছে। সুতরাং যে ব্যক্তি সলাত কায়েম করে কিন্তু যাকাত দেয় না, তাহলে তো সে দ্বীনী ভাই হিসেবে গণ্য হওয়ার কথা নয়। কারণ সলাতের ক্ষেত্রে যে বিধানটি মুসলিমদের উপর বর্তাবে ঠিক একই বিধান যাকাতের ক্ষেত্রেও বর্তাবে; তাই কিনা? এখন উত্তরে কেউ যদি বলেন, যাকাত না দিলেও সে দ্বীনী ভাই হিসেবে গণ্য হবে তাহলে আমরা বলব, আয়াতে কারীমায় সলাত এবং যাকাতের মাঝে পার্থক্যের দলীল কোথায়? অথচ কুরআনে তওবা শব্দের পর সলাত ও যাকাতের দু'টি শব্দ পাশাপাশি ধারাবাহিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আর যদি বলা হয় যে, দীনী ভাই হিসেবে সে গণ্য হবেনা। তাহলে আমরা বলব, এ কথাটি নিঃসন্দেহে বাতিল। কারণ, এর ব্যাপারে কোনো দলীল-প্রমাণ নেই।
চতুর্থত : হুযায়ফা ইবনু আল-ইয়ামান হতে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূলুল্লাহ এরশাদ করেছেন : ইসলাম পুরাতন হয়ে যাবে, যেমন কাপড়ের উপরের কারুকার্য পুরাতন হয়ে যায়। শেষে এমন অবস্থা হবে যে কেউ জানবেনা- সিয়াম (রোজা) কী, সলাত (নামায) কী, কুরবানী কী, যাকাত কী? একরাতে পৃথিবী থেকে মহান আল্লাহর কিতাব বিলুপ্ত হয়ে যাবে এবং একটি আয়াতও অবশিষ্ট থাকবে না। মানুষের (মুসলমানদের) কতক দল অবশিষ্ট থাকবে। তাদের বৃদ্ধ ও বৃদ্ধারা বলবে, আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদেরকে “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” কালিমার উপর পেয়েছি। সুতরাং আমরাও সেই বাক্য বলতে থাকবো।
তবে কেউ কেউ এ হাদীসকে ত্রুটিযুক্ত বলেছেন এবং রাবী আবূ মুয়াবিয়ার ব্যাপারে সমালোচনা থাকায় হাদীসটিকে যঈফ বলেছেন। অথচ তাতে সমস্যা নেই। এতদসত্ত্বেও যারা হাদীসটির ব্যাপারে সমালোচনা করেছেন তাদের নিকট একটি বিষয় গোপন রয়েছে, সেটা হল- হাদীসটির মুতাবা‘আহ রয়েছে।
হাদীসটি আবূ মালেক হতে বর্ণিত। আবূ আওয়ানা তার সনদ এবং মতন দ্বারা বর্ণনা করেছেন, যেমনটি বুসীরী তার 'আল-মিসবাহ' গ্রন্থে বলেছেন। আর আবূ আওয়ানা একজন নির্ভরযোগ্য রাবী। আল্লামা আলবানী তাঁর সিলসিলাহ সহীহাহ (১/১৩০-১৩২) গ্রন্থে তালীক সূত্রে হাদীসটি সহীহ বলেছেন।
আলোচ্য হাদীসে গুরুত্বপূর্ণ 'ফিকহী' ফায়দা রয়েছে। তা হচ্ছে- কেউ যদি “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এর সাক্ষ্য দেয় তাহলে সে কিয়ামত দিবসে জাহান্নামের আগুনে চিরস্থায়ী থাকবে না। যদিও সে ইসলামের অন্যান্য রুকনগুলো যেমন : সলাত, যাকাত ইত্যাদি আদায় না করে থাকে।
আর এটা সবাই অবগত আছে যে, সলাত ইসলামের অন্যতম একটি ফরয বিধান; এ বিশ্বাস থাকা অবস্থায় কোন ব্যক্তি সলাত পরিত্যাগ করলে তার বিধান সম্পর্কে আলেমদের মধ্যে ইখতেলাফ (মতবিরোধ) রয়েছে। অধিকাংশ বিদ্বানের মতে সলাত পরিত্যাগ করার কারণে সে কাফের হবে না, বরং সে ফাসেক পাপিষ্ট বলে গণ্য হবে। তবে ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলের মতে সে কাফের হয়ে যাবে। তাকে মুরতাদের শাস্তিস্বরূপ হত্যা করতে হবে: হদস্বরূপ নয়।
অবশ্য সাহাবীদের থেকে নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত: কোন মুসলিম ব্যক্তি ইসলামের কোন আমল ছেড়ে দিলে কাফের হয়ে যাবে; এটা তারা মনে করতেন না, তবে সলাত ত্যাগ করলে কাফের মনে করতেন।
আর আমার মতে, জমহুর বিদ্বানদের অভিমতটিই সঠিক। কেননা, সাহাবীদের থেকে যা বর্ণিত সে ব্যাপারে এমন কোনো 'নস' (দলীল) নেই যে, তাঁরা সলাত পরিত্যাগ করার কুফর দ্বারা এমন কুফর উদ্দেশ্য নিতেন যে কুফরী কাজ করার কারণে বান্দা চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে; আর এ উদ্দেশ্য গ্রহণ করাও সম্ভব নয় যে, তাকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। এটা কী করে সম্ভব? অথচ হুযায়ফা ইবনু আল-ইয়ামান ঐ সমস্ত সাহাবীদের মধ্যে একজন বড় এবং প্রবীণ সাহাবী। তিনি সিলাহ ইবনু যুফারের কথাকে প্রত্যাখ্যান করেন। কেননা, সিলাহ ইবনু যুফার তিনি বিষয়টি আহমাদ ইবনু হাম্বালের ন্যায় বুঝেছিলেন। এজন্য সিলাহ ইবনু যুফার বলেন (সলাত পরিত্যাগকারীর জন্য) “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” কালিমাটি কোনো কাজে আসবেনা। তারা জানে না সলাত কী জিনিস?
হুযায়ফা প্রত্যুত্তরে বলেন, হে সিলাহ! তবে কি তুমি তাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি দেবে! তিনবার উক্ত বাক্যটি বলেছেন।
হুযায়ফা হতে বর্ণিত এ কথাটি প্রমাণ করে যে, সলাত এবং ইসলামের অন্যান্য রুকন পরিত্যাগকারীগণ কাফের নয়। বরং সে মুসলিম এবং কিয়ামত দিবসে জাহান্নামের আগুনে চিরস্থায়ী থাকবেনা। (অতএব এ বিষয়টি ভালভাবে স্মরণ রাখতে হবে। কারণ এ স্থান ছাড়া অন্য কোথাও আপনি উক্ত বিষয়টি পাবেন না।)
হাফেয সাখাবীর ফাতাওয়া হাদীসিয়্যাহ (২/৮৪) কিতাব পাঠ করে দেখেছি, তিনি সলাত ত্যাগকারীকে কাফের হওয়ার ব্যাপারে কতিপয় হাদীস উল্লেখপূর্বক বলেন, হাদীসগুলো মাশহুর এবং পরিচিত। কিন্তু বাহ্যিকভাবে এর প্রত্যেকটি হাদীস সলাত অস্বীকারকারীকেই কেবল কাফের হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে। কেননা, যখন কোনো ব্যক্তি কাফের হয়ে যায় তখন সমস্ত মুসলিমের ঐক্যমতে সে মুরতাদ।
সুতরাং যদি সে এর আগেই ইসলামে ফিরে আসে, তাহলে মুক্তি পাবে। নতুবা তাকে মুরতাদের শাস্তিস্বরূপ হত্যা করতে হবে। আর যে ব্যক্তি বিনা ওযরে অলসতা করে ছেড়ে দেয় এবং বিশ্বাস রাখে যে, এটা পালন করা ফরয, তাহলে নির্ভরযোগ্য কথা হলো, জমহুরের মতে সে কাফের হবেনা। এবং তার ব্যাপারে এটাও বিশুদ্ধ কথা হল, এক ওয়াক্ত সলাতের যে সময়সীমা শরীয়ত নির্ধারণ করে দিয়েছে সেই সময় যদি অতিবাহিত হয়ে যায় (যেমন যুহরের সলাত ছেড়ে দিল এমন কি সূর্য ডুবে গেল কিংবা মাগরিবের সলাত ছেড়ে দিল ফজর উদিত হয়ে গেল) তাহলে সে তওবা করবে যেমনটি মুরতাদ তওবা করে। যদি তওবা না করে তাহলে হত্যা করবে, গোসল দেবে, জানাযা পড়াবে এবং মুসলমানদের পার্শ্বে দাফন করাবে; পাশাপাশি মুসলিমদের অন্যান্য যাবতীয় নিয়মাবলী তার উপর প্রযোজ্য হবে। তার উপর কুফর শব্দটি বর্তাবে। কেননা, সে কতক বিধানে কাফেরদের দলে শরীক হয়েছে। (কাফেররা যেমন ইসলামের বিধান মানে না তেমনি সে কাফেরদের মত একটি বিধানকে মানেনি)। কিন্তু সে শরীয়ত থেকে সম্পূর্ণ বের হয়ে যায়নি। আর হাদীসগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধন করে আমল করা অতীব জরুরি। যেমন রাসূলুল্লাহ বলেছেন, আল্লাহ বান্দার উপর পাঁচ ওয়াক্ত সলাত ফরজ করে দিয়েছেন..... হাদীসটির শেষাংশে এসেছে- আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাকে শাস্তি দিতে পারেন আবার ক্ষমাও করে দিতে পারেন এবং রাসূলুল্লাহ আরো বলেছেন-
مَنْ مَاتَ وَهُوَ يَعْلَمُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ دَخَلَ الْجَنَّةَ»
“যে ব্যক্তি 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' কালিমার উপর বিশ্বাস রেখে মারা গেল, সে জান্নাতে প্রবেশ করল।” এ সকল বর্ণনা সমন্বয় করে আমল করা ওয়াজিব।
তাই মুসলিমগণ এখনো সলাত বর্জনকারীদের মেরাস তথা উত্তরাধিকার হয়। আর তারাও উত্তরাধিকার বানায়। আর যদি সলাত তাগ্যকারী কাফেরই হতো তাহলে তাকে ক্ষমা করা হতো না, এমতাবস্থায় তাকে মেরাস (উত্তরাধিকার সম্পত্তি) দেয়া হতো না এবং তার থেকে মিরাস বা উত্তরাধিকার সম্পত্তি গ্রহণ করাও হতো না।
পঞ্চমত: কতিপয় আলেম এ মাসআলায় বর্ণিত হাদীসের সংখ্যার উপর ভিত্তি করে জবাব দিয়েছেন। তারা বলেছেন, উক্ত হাদীসগুলো থেকে এ কথা বুঝা যায় যে, সলাত পরিত্যাগকারীদের মধ্যে কিছু সংখ্যক লোককে আল্লাহ ক্ষমা ও রহম করবেন, যারা শিরক করেনি। যেমন আল্লাহ তা'আলা বলেছেন :
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُوْنَ ذُلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ )
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে শরীক করা ক্ষমা করবেন না। এটা ছাড়া অন্য সব যাকে ইচ্ছে মাফ করবেন”
অনুরূপভাবে আমলনামা এবং শাফা'আতের হাদীস, এ ছাড়াও আরো কিছু হাদীস রয়েছে যা প্রমাণ করে কতক সলাত ত্যাগকারীকে আল্লাহ ক্ষমার আচলে ঢেকে নিবেন। এ সকল হাদীসের আলোকে তারা বলেন : উক্ত হাদীসগুলোকে 'আম (সাধারণ), আর সলাত বর্জনকারীকে কাফের বলা হয়েছে এমন হাদীসগুলো খাস (নির্দিষ্ট)।
আমার মতে, এই আলেমগণ যদিও বিপরীতমুখী কথা বলেছেন (আল্লাহ তাদের বুঝার তাওফীক দান করুন!) তবে তারা সঠিক বিষয় অনুধাবণ করার নিকটবর্তী হয়েছেন যেমন আহলুস সুন্নাহদের নিকট “প্রতিশ্রুতি এবং শাস্তির” নিয়মনীতিটি পরিচিত। এ ব্যাপারে শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়্যাহ মাজমু ফাতাওয়া (৪/৪৮৪), (৮/২৭০) (১১/৬৪৮), (২৩/৩০৫) কিতাবে কয়েক স্থানে ব্যক্ত করেছেন। এ নিয়মনীতির সারকথা হলো, আল্লাহ তা'আলা শাস্তি দিবেন বলে যে ধমক দিয়েছেন তা তাঁর ইচ্ছাধীন। তিনি ইচ্ছা করলে ক্ষমা করতে পারেন অথবা শাস্তিও দিতে পারেন।
আর নিয়ামত দেয়ার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তা আল্লাহ তা'আলা ততটুকু বাস্তবায়ন করবেন যতটুকু তিনি নিজের উপর আবশ্যক করে নিয়েছেন।
বেনামাযীর উপর কুফরের বিশেষণ এজন্যই আরোপিত হয়, সে সলাত না পড়ে কাফেরের অনুসরণ করে এবং শরীয়তের এমন একটি কাজ বর্জন করে যা অবশ্য পালনীয়। কেননা, হাদীস শরীফের উদ্ধৃতি এ ব্যাপারে সুস্পষ্ট। এখানে উল্লেখ হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা ইচ্ছে করলে শাস্তিও দিতে পারেন, আবার ক্ষমাও করতে পারেন।
রাসূলুল্লাহ আরো বলেছেন: যে ব্যক্তি لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ “আল্লাহ ছাড়া (সত্য) কোনো মা'বুদ নেই” স্বীকার করা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে সে জান্নাতে যাবে।
এ কারণেই আজ পর্যন্ত বেনামাযী মুসলিমরা অন্যের ওয়ারিস হয় এবং অন্যরাও তাদের ওয়ারিস হয়। সে কাফের হলে এরূপ হতো না।
পূর্বোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে আমরা অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে ও স্পষ্টভাবে বলতে পারি যে, সলাত বর্জনকারী পাপী ও ফাসিক্ব। সে যদি দ্রুত তওবা করে ফিরে না আসে এবং হিদায়াত লাভ না করে কিংবা আল্লাহ যদি তাকে সাহায্য ও ক্ষমার দ্বারা আচ্ছাদিত না করেন তবে তার মুরতাদ হয়ে যাওয়া, কুফরী ও শির্কে লিপ্ত হওয়া এমনকি ইসলাম থেকে বের হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আল্লাহ তা'আলার কাছে মুরতাদ, কুফর এবং ইসলাম থেকে বহিস্কার হওয়া থেকে পানাহ চাই।
পরিশেষে যে বিষয়টি বলবো তা হলো : এ মাসআলাটি গভীর জ্ঞানের মাসআলাহ। সালাফ (পূর্ববর্তী) এবং খালাফ (পরবর্তী) আলেমগণ এ নিয়ে ইখতেলাফ করেছেন। সুতরাং এ বিষয়ের আলোচনা করার জন্য অত্যন্ত সূক্ষ্ম দৃষ্টি, বিবেকপূর্ণ জ্ঞান এবং তাক্বলীদ ও সাম্প্রদায়িকতা থেকে দূরে থাকা আবশ্যক। কেননা, এটা সত্যকে চিনতে সাহায্য করবে, সত্যের দিকে আহ্বান করবে এবং সত্যের উপর অটল রাখবে।
আল্লামা নাসিরুদ্দীন আলবানী এ কিতাবটি সুন্দরভাবে সাজিয়েছেন। আমরা তাঁর কিতাবটি পাঠক ভাইদের নিকট উপস্থাপন করছি যাতে করে আরো বেশি জ্ঞান অর্জন করার জন্য উৎসাহী হন এবং সওয়াব অর্জনের আশা রাখেন আর যখন কোনো মতবিরোধ দেখা দেয় তখন আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের কথানুযায়ী উত্তর প্রদান করেন। আল্লাহ বলেন :
فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللهِ وَالرَّسُوْلِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُوْنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلًا)
“যদি কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতভেদ ঘটে, তাহলে সেই বিষয়কে আল্লাহ এবং রসূলের (নির্দেশের) দিকে ফিরিয়ে দাও যদি তোমরা আল্লাহ এবং আখিরাত দিবসের প্রতি ঈমান এনে থাক; এটাই উত্তম এবং সুন্দরতম মর্মকথা।”
সুতরাং এ পুস্তকের পাঠককে মতভেদপূর্ণ বিষয়ের প্রতি মুহাব্বত, তার অভ্যাস বা যে বিশ্বাসের উপর সে বড় হয়েছে বা তার পূর্বের শিক্ষা যেন তাকে সত্য গ্রহণে ও সত্যকে মান্য করতে বাধা প্রদান না করে। সে যেন অন্যদিকে প্রচেষ্টা না করে যেহেতু সত্যই সর্বোচ্চ কাঙ্ক্ষিত ও মূল্যবান বিষয়, তাই মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করছি- তিনি যেন হিদায়াত, সরল ও সঠিক পথ গ্রহণের তাওফীক দেন। আর সঠিক পথের প্রার্থনা করছি তার জন্য, যে পথ হারিয়েছে এবং সলাত পরিত্যাগকারীকে কাফের বলার ক্ষেত্রে যার মতামত গোলমাল হয়ে গেছে।
وَآخِرُ دَعْوَانَا أَنِ الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ

টিকাঃ
৩. মুসনাদ আহমাদ ৫ম খণ্ড, হা. ৩৪৬; তিরমিযী হা. ২৬২৩; ইবনু মাজাহ হা. ১০৭৯
৪. ইবনু মাজাহ হা. ৪০৩৪; ইমাম বুখারীর আল-আদাবুল মুফরাদ ১৮ পৃ.। এর সনদটি দুর্বল, তবে শাওয়াহেদ থাকার কারণে হাদীসটি শক্তিশালী হয়েছে। দেখুন- ইবনু হাজার আসকালানীর আত্-তালখীসুল হাবীর ২য় খণ্ড ১৪৮ পৃ.; আল্লামা আলবানীর ইরওয়াউল গালীল ৭ম খণ্ড ৮৯-৯১ পৃ.।
৫. এটি রাসূল এর যুগের কথা। রাসূল এর যুগেই যদি এমন হয়ে থাকে, তাহলে বর্তমানে অবস্থা কেমন হতে পারে!
৬. আবূ দাউদ হা. ৪৬০৩, আহমাদ (২/৫২৮), ইবনু আবূ শায়বাহ (১০/৫২), হাকিম (২/২২৩) ইত্যাদি। হাদীসটির সনদ হাসান। দেখুন মিশকাতুল মাসাবীহ ৩৩৬, সহীহ তারগীব ১৩৯।
৭. উক্ত বাক্যটি ইমাম শাওকানী-এর আস-সায়লুল যারার (৪/৫৭৮) নামক গ্রন্থ থেকে নেয়া হয়েছে।
৮. বুখারী ১০/৪২৭, মুসলিম হা. ৬০; রাবী 'উমার হতে বর্ণিত। আর বুখারীতে (১০/৩৮৮) উক্ত অধ্যায়ে আবূ যার হতে বর্ণিত।
৯. সূরা নাহল ১৬ : ১০৬
১০. উক্তিটি ইমাম শাওকানী রে হতে নেয়া হয়েছে।
১১. যেমন : তাবাকাতু হানাবিলা (১/৩৪৩) নামক গ্রন্থে রয়েছে।
১২. ইবনু তাইমিয়া প্রণীত 'আল-ঈমান' নামক গ্রন্থের ২৪৫ পৃষ্ঠা।
১৩. সূরাহ আন্-নিসা ৪:৪৮
১৪. আবু দাউদ হাঃ ৪২৫; নাসাঈ ১ম খণ্ড হাঃ ২৩০; দেখুন সহীহ আত-তারগীব (৩৬৬) আলবানী। (আত্-তামহীদ খণ্ড ২৩, পৃ. ২৮৯-৩০১) ইবনু আবদিল বার্র। উক্ত কিতাবে এ ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা রয়েছে।
১৫. সূরাহ আত্-তাওবাহ ৯ : ১১
১৬. ইবনু মাজাহ হাঃ ৪০৪৯; হাকিম (৪/৪৭৩); আবূ মুয়াবিয়া আবূ মালেক আল-আশজায়ী হতে তিনি ইবনু হিরাশ হতে তিনি হুযায়ফা ইবনুল-ইয়ামানী থেকে মারফু' সূত্রে বর্ণনা করেন। ইমাম হাকেম এটিকে সহীহ বলেছেন, ইমাম যাহাবী অনুরূপ বলেছেন। আল-বুসিরী মিসবাহুয যুজাযা গ্রন্থে অনুরূপ সহীহ বলেছেন। ইবনু হাজার ফাতহুল বারীতে (১৩/১৬) শক্তিশালী বলেছেন।
১৭. মুতাবা'আহ হচ্ছে- কোন রাবীর বর্ণিত একাধিক হাদীসের শব্দে হুবহু মিল থাকা অথবা এক রাবীর বর্ণিত হাদীসের শব্দের সাথে অন্য রাবী কর্তৃক বর্ণিত হাদীসের শব্দের হুবহু মিল থাকাকে বলা হয়। -অনুবাদক
১৮. তিরমিযী, হাকেম
১৯. সূরাহ আন্-নিসা ৪:৪৮
২০. অর্থাৎ যারা অলসতা করেসলাত ছেড়ে দেয় শাফাআতের আম হাদীস দ্বারা আল্লাহ তাদের ক্ষমা করতে পারেন।
২১. সূরাহ আন-নিসা ৪:৫৯

إِنَّ الْحَمْدُ للهِ، نَحْمَدُهُ وَنَسْتَعِيْنُهُ وَنَسْتَغْفِرُهُ، وَنَعُوْذُ بِاللَّهِ مِنْ شُرُوْرِ أَنْفُسِنَا، وَمِنْ سَيِّئَاتِ أَعْمَالِنَا، مَنْ يَهْدِهِ اللهُ فَلا مُضِلَّ لَهُ ، وَمَنْ يُضْلِلِ اللَّهُ فَلَا هَادِيَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنْ لا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ، وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ

নিশ্চয় সকল প্রশংসা আল্লাহ তা'আলার জন্য। আমরা সবাই তাঁরই প্রশংসা করছি, তাঁরই নিকট সাহায্য ও ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তাঁরই নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি প্রবৃত্তির অনিষ্ট ও খারাপ আমল থেকে। যাকে আল্লাহ তা'আলা হিদায়াত দিবেন তাকে পথভ্রষ্ট করার আর কেউ নেই এবং যাকে আল্লাহ তা'আলা পথভ্রষ্ট করবেন তাকে হিদায়াত দেওয়ারও আর কেউ নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ তা'আলা ছাড়া সত্য কোনো মা'বুদ নেই। তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয় মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা'আলার বান্দা ও একমাত্র তাঁরই প্রেরিত রাসূল।

বর্তমান বস্তুবাদী মুসলিম সমাজে আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার ব্যাপারটি খুব একটা ব্যাপকতা পেয়েছে। পরস্পরকে ভালো কাজের পরামর্শ দেওয়া এবং পরস্পরের মধ্যকার পবিত্র সুসম্পর্কটুকু অটুট রাখার জন্য পরস্পর দেখা-সাক্ষাৎ চালু রাখা খুব একটা বেশি চোখে পড়ে না। যা কিছু রয়েছে তাও দুনিয়ার ক্ষুদ্র স্বার্থ উদ্ধারের লক্ষ্যে।

আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্নের আবার কয়েকটি ধরনও রয়েছে। আত্মীয়-স্বজনদের কেউ তো এমনও রয়েছেন যে, তার আত্মীয়ের কোনো খবরই রাখেন না। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর চলে যাচ্ছে; অথচ পরস্পরের মধ্যে কোনো দেখা-সাক্ষাতই হচ্ছে না। একে অন্যের মধ্যে কোনো দান বা উপঢৌকন আদান-প্রদান হচ্ছে না, তাদের কোনো বিশেষ প্রয়োজন পূরণ করা হচ্ছে না, একে অপরকে কোনো বিপদ থেকে উদ্ধার করছেন না, ভালো ব্যবহার দেখিয়ে তাদেরকে সন্তুষ্ট করা হচ্ছে না; বরং তাদেরকে সময় সময় কথা বা কাজে কষ্ট দেওয়া হচ্ছে।

আবার আত্মীয়-স্বজনদের কেউ তো এমনও রয়েছেন যে, তার আত্মীয়-স্বজনের কোনো অনুষ্ঠানেই তিনি যোগ দেন না। তাদের কোনো দুঃখ-বেদনার তিনি শরীক হন না। বরং তাদেরকে কোনো কিছু দান না করে অন্যকে দান করেন; অথচ তারাই তার দানের সর্বপ্রথম হকদার।

আবার আত্মীয়-স্বজনদের কেউ তো এমনও রয়েছেন যে, তার আত্মীয়-স্বজনের সাথে তিনি তখনই সুসম্পর্ক বজায় রাখেন যখন তারাও তার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখে। আর যখনই তারা তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে তখন তিনিও তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। এমন আচরণকে বাস্তবিক অর্থে আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা বলা যায় না। কারণ, সমপ্রতিদান তো যে কোনো কারোর সাথেই হতে পারে। এতে আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করার বিশেষ কোনো বৈশিষ্ট্যই বিদ্যমান নেই। বস্তুতঃ আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করা মানে আপনি একমাত্র আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টির জন্যই আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করবেন। তারা আপনার সাথে আত্মীয়তার বন্ধন রক্ষা করুক বা নাই করুক।

আবার আত্মীয়-স্বজনদের কেউ তো এমনও রয়েছেন যে, তার আত্মীয়-স্বজনকে তিনি দীন-ধর্মের সঠিক আকীদা-বিশ্বাস ও যাবতীয় প্রয়োজনীয় জ্ঞান শিক্ষা দেন না এবং তাদেরকে ইসলামের সকল ধর্মীয় অনুশাসন নিজ জীবনে বাস্তবায়নের প্রতি দাওয়াতও দেন না; অথচ তিনি সর্বদা অন্যদেরকে ইসলামের খাঁটি আকীদা-বিশ্বাস ও যাবতীয় ধর্মীয় জ্ঞান শিক্ষা দিতে এতটুকুও কোতাহী করেন না। বস্তুতঃ এরাই তো উক্ত দাওয়াতের সর্বপ্রথম হকদার।

পক্ষান্তরে অনেক বংশে ইসলামের সঠিক আকীদা-বিশ্বাস ও খাঁটি ধর্মীয় জ্ঞান বহনকারী অনেক আলিমে দীন, ধর্ম প্রচারক ও সমাজ সংস্কারক রয়েছেন যাদের সাথে তাদের বংশের লোকেরা পারতপক্ষে ভালো ব্যবহার দেখায় না। তাদেরকে যথাযোগ্য সম্মান দেয় না। তাদের কাছ থেকে আল্লাহ প্রদত্ত ইসলামের খাঁটি জ্ঞানের আলো তারা আহরণ করে না। যা তাদের সাথে শুধু আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করারই শামিল নয় বরং এতে করে মানুষের মাঝে তাদের সম্মান ধীরে ধীরে হ্রাস পায় এবং সমাজে তাদের প্রভাবও কমে যায়।

আবার আত্মীয়-স্বজনদের কেউ তো এমনও রয়েছেন যে, তিনি নিজেই তার আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে ফাটল ধরাতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। যে কোনো ছুতা-নাতা নিয়েই একেক জনকে অন্যের ওপর ক্ষেপিয়ে তোলেন।

একদিন মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে কুরাইশেরা আলোচনায় বসল। তারা জানতে চাইল, ‘মুহাম্মাদকে কে হত্যা করতে পারবে?’ উমর ইবনুল খাত্তাব বললেন, ‘আমি পারব।’ তারা উৎসাহ দিয়ে বলল, ‘তুমিই পারবে, উমর!’ গ্রীষ্মের ভরদুপুরে খোলা তরবারিহাতে তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার সাহাবীদের খোঁজে বের হলেন। তখন আবু বকর, আলী এবং হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহুম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথেই চলাফেরা করতেন। তারা অন্যদের সাথে আবিসিনয়ায় চলে যাননি। তিনি খবর পেলেন যে তারা সবাই সাফা পাহাড়ের পাদদেশে দারুল আরকামে একত্র হয়েছেন। পথে নুআইম ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে নাহহামের সাথে দেখা হলো। সে জানতে চাইল, ‘কোথায় চললে, উমর?’ তিনি বললেন, ‘আমি সাবিকে (যে ধর্ম পরিবর্তন করেছে) খুঁজছি। সে কুরাইশদের বিভক্ত করেছে, তাদের জ্ঞানকে হেয় করেছে, ধর্মকে তাচ্ছিল্য করেছে আর দেবতাদের নিন্দা করেছে। আমি তাকে হত্যা করব।’ নুআইম তাকে বলল, ‘উমর, ভুল পথ ধরলে! আল্লাহর কসম, তুমি বোকা বনে গেছ, বিপদগ্রস্ত হয়ে আছ। তুমি কিন্তু বনু আদিয়্যির ধ্বংসের কারণ হবে। তুমি কি মনে কর, মুহাম্মাদকে হত্যার পর বনু আব্দ মানাফ তোমাকে দুনিয়ার মাটিতে হাঁটার জন্য ছেড়ে দেবে?’ তর্কাতর্কির এক পর্যায়ে তাদের কণ্ঠ চড়ে গেল। তখন উমর বললেন, ‘আমার মনে হয় তুমি তোমার ধর্ম পরিবর্তন (মুসলিম হওয়া) করেছ। আমি যদি এর সত্যতা পাই আমি তোমাকে দিয়েই শুরু করব।’ আল নাহহাম যখন বুঝতে পারল, তাকে কোনোভাবেই থামানো যাবে না। তখন সে বলল, ‘তবে শোনো, তোমার এবং তোমার ভগ্নিপতির পরিবার মুসলিম হয়ে গেছে। তারা তোমাকে এবং তোমার ভুল পথ ত্যাগ করেছে।’ [cite: ৬২] এ কথা শুনে উমর জানতে চাইলেন, ‘কে কে এ কাজ করেছে?’ সে বলল, ‘তোমার ভগ্নিপতি, বোন আর তোমার চাচাত ভাই।’ [cite: ৬২]

২.১.২। বোনের বাড়িতে উমরের হামলা এবং ভাইয়ের সামনে ফাতিমা বিনতে আল-খাত্তাবের দৃঢ়তা
উমর যখন শুনলেন তার বোন এবং ভগ্নিপতি মুসলিম হয়ে গেছেন তিনি রাগে ফেটে পড়েন। তাদের বাড়িতে চলে যান। দরজায় করাঘাত শুনে তারা জানতে চাইলেন, ‘কে?’ তিনি বললেন, ‘আল-খাত্তাবের পুত্র।’ তারা একটা কাগজ হাতে নিয়ে পড়ছিলেন। তারা যখন বুঝতে পারলেন যে, উমর এসে গেছেন, তখন তাড়াতাড়ি কাগজটিকে লুকাতে চাইলেন। ঘরে ঢোকামাত্রই তার চেহারা দেখে তার বোন বুঝতে পারলেন যে তার মধ্যে কোনো অশুভ উদ্দেশ্য কাজ করছে। তিনি কাগজটাকে দুই পায়ের মধ্যে লুকিয়ে রাখলেন। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কী নিয়ে বিড়বিড় করছিলে? ফিসফিস করে কী পড়ছিলে তোমরা? আমি তোমাদের বাড়িতে ঢোকার সময় শুনতে পেয়েছি।’ তারা তখন সুরা ত-হা পড়ছিলেন। তারা উত্তর দিলেন, ‘আমরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছিলাম।’ উমর বললেন, ‘সম্ভবত তোমরা ধর্ম পরিবর্তন করেছ?’ তার ভগ্নিপতি বললেন, ‘হে উমর, যদি আপনার ধর্ম ছাড়া অন্যকিছুর মধ্যে সত্য থেকে থাকে তাহলে কী হবে?’ উমর তখনই তার ভগ্নিপতি সাঈদকে আক্রমণ করে বসেন। তিনি তার দাড়ি ধরে টান দিলে তাদের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়ে যায়। উমর ছিলেন প্রচণ্ড শক্তিশালী। তিনি সাঈদকে ধরাশায়ী করে তার বুকে চেপে বসলেন। তার বোন স্বামীকে বাঁচাতে এগিয়ে আসলেন। উমর তাকে দূরে ছুঁড়ে ফেললেন। তার মুখ ফেটে রক্ত পড়তে লাগল। ফাতিমা রেগে চিৎকার করতে লাগলেন, ‘ও আল্লাহর শত্রু, আমি একমাত্র আল্লাহর ওপরে ঈমান এনেছি বলে কি এভাবে আঘাত করছ?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’ তার বোন বললেন, ‘তবে তোমার যা ইচ্ছা কর। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই আর মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসূল। আমরা মুসলিম হয়ে গেছি। তোমার ভালো লাগুক আর নাই লাগুক।’
এ কথা শুনে উমর হঠাৎ করে কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হতে লাগলেন। ফলে ভগ্নিপতির উপর থেকে সরে বসেন। অতঃপর বললেন, ‘তোমাদের কাগজটি আমাকে দাও।’ তার বোন বললেন, ‘দেব না।’ তিনি বললেন, ‘অভিশাপ তোমাকে! তোমার কথা আমাকে নাড়া দিয়েছে। ওটা আমাকে দেখতে দাও। কথা দিচ্ছি, আমি তোমার সাথে প্রতারণা করব না। তোমাকে ওটা ফিরিয়ে দেব, তুমি যেখানে খুশি রেখে দিও। সেখানে রাখতে পারবে ওটাকে।’ ফাতিমা বললেন, ‘তুমি নাপাক হয়ে আছ, আর : ‘যারা পাক-পবিত্র, তারা ব্যতীত অন্য কেউ একে স্পর্শ করবে না।’ [cite: ৬৩] ওঠ, পাক হয়ে এসো।’ উমর বাইরে গেলেন, হাত-পা ধুয়ে আসলেন। তারপরে বোনের কাছ থেকে কাগজটি নিলেন। সেখানে সূরা ত-হাসহ বেশ কয়েকটি সূরা লেখা ছিল। কাগজে-বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম (পরম করুণাময় ও অসীম দয়ালু আল্লাহর নামে)-লেখা ছিল। আর-রাহমান এবং আর-রাহীম শব্দ দুটি পড়ে তিনি একেবারে অস্থির হয়ে পড়লেন। কাগজটি ফেলে দিলেন। কিছুটা ধাতস্থ হয়ে কাগজটা আবার তুলে নিয়ে পড়তে লাগলেন,

طهُ مَا أَنْزَلْنَا عَلَيْكَ الْقُرْآنَ لِتَشْقَى إِلَّا تَذْكِرَةً لِمَنْ يَخْشُونَ تَنْزِيلًا مِمَّنْ خَلَقَ الْأَرْضَ وَ السَّمَوَاتِ الْعُلَى الرَّحْمَنُ عَلَى الْعَرْشِ اسْتَوَى لَهُ مَا فِي السَّمَوَاتِ وَمَا فِي الْأَرْضِ وَمَا بَيْنَهُمَا وَ مَا تَحْتَ الثَّرَى وَإِنْ تَجْهَرُ بِالْقَوْلِ فَإِنَّهُ يَعْلَمُ السِّرَّ وَ اَخْفَى اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ لَهُ الْأَسْمَاءُ الْحُسْنَى
ত্ব-হা। আপনাকে ক্লেশ দেবার জন্য আমি আপনার প্রতি কুরআন অবতীর্ণ করিনি। কিন্তু তাদেরই উপদেশের জন্য যারা ভয় করে। এটা তাঁর কাছ থেকে অবতীর্ণ, যিনি ভূমণ্ডল ও সমুচ্চ নভোমণ্ডল সৃষ্টি করেছেন। তিনি পরম দয়াময়, আরশে সমাসীন হয়েছেন। নভোমণ্ডলে, ভূমণ্ডলে, এতদুভয়ের মধ্যবর্তী স্থানে এবং সিক্ত ভূগর্ভে যা আছে, তা তাঁরই। যদি তুমি উচ্চকণ্ঠেও কথা বলো, তিনি তো গুপ্ত ও তদপেক্ষাও গুপ্ত বিষয়বস্তু জানেন। আল্লাহ, তিনি ব্যতীত কোনো উপাস্য ইলাহ নেই। সব সৌন্দর্যমণ্ডিত নাম তাঁরই। [cite: ৬৪]
তিনি এর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা অনুভব করলেন। বললেন, ‘এই জিনিস থেকেই কি কুরাইশেরা পালিয়ে বেড়াচ্ছে?’ এরপর কাগজটা থেকে আরও একটু পড়লেন, এই শব্দগুলো তার চোখে পড়ল,

انَّنِي أَنَا اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا أَنَا فَاعْبُدُنِي وَأَقِمِ الصَّلُوةَ لِذِكْرِي إِنَّ السَّاعَةَ آتِيَةٌ أَكَادُ أُخْفِيْهَا لِتُجْزَى كُلُّ نَفْسٍ بِمَا تَسْعَى فَلَا يَصُدَّنَّكَ عَنْهَا مَنْ لَّا يُؤْمِنُ بِهَا وَ اتَّبَعَ هَوَاهُ فَتَرْدَى
আমিই আল্লাহ, আমি ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই। অতএব, আমার ইবাদত করো এবং আমার স্মরণার্থে নামায কায়েম করো। কেয়ামত অবশ্যই আসবে, আমি তা গোপন রাখতে চাই; যাতে প্রত্যেকেই তার কর্মানুযায়ী ফল লাভ করে। সুতরাং যে ব্যক্তি কেয়ামতে বিশ্বাস রাখে না এবং নিজ খাহেশের অনুসরণ করে, সে যেন তোমাকে তা থেকে নিবৃত্ত না করে। নিবৃত্ত হলে তুমি ধবংস হয়ে যাবে। [cite: ৬৫]
উমর বললেন, ‘তিনি বলেছেন যে, তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। মুহম্মাদ কোথায়?’ [cite: ৬৬]

২.১.৩। উমর মুহাম্মাদ সা.-এর কাছে গেলেন এবং তার ইসলাম গ্রহণের ঘোষণা দিলেন
খাব্বাব রাযিয়াল্লাহু আনহু একটি বাড়িতে লুকিয়ে ছিলেন। এই ঘটনা শুনে বেরিয়ে এসে বললেন, উমর, আনন্দিত হও। সোমবার মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে দুআ করেছিলেন এ বুঝি সেই দুআর ফল। তিনি বলেছিলেন, ‘হে আল্লাহ, আবু জাহেল ইবনে হিশাম আর উমর ইবনুল খাত্তাব, এই দুই ব্যক্তির মধ্যে যাকে তোমার বেশি পছন্দ তার মাধ্যমে ইসলামকে সাহায্য করো।’ [cite: ৬৭]
উমর জিজ্ঞেস করলেন, ‘আল্লাহর রাসূল মুহাম্মাদ এখন কোথায়?’ উমরের এ জিজ্ঞাসার মধ্যে কোনো কপটতা ছিল না। তারা এটা বুঝতে পেরে বলে দিলেন, ‘তিনি সাফা পাহাড়ের পাদদেশে আছেন।’ উমর তরবারি হাতে রওনা দিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তার সাহাবীরা যেখানে ছিলেন, সেখানে পৌঁছে দরজায় করাঘাত করলেন। উমরের কণ্ঠ শুনে ভয়ে কেউ দরজা খুলতে সাহস পাচ্ছিলেন না। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রতি তার বিরূপ মনোভাবের কথা সবার জানা ছিল। সবাইকে ভয় পেতে দেখে হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘তোমাদের কী হয়েছে?’ তারা জবাব দিলেন, ‘উমর ইবনুল খাত্তাব এসেছে।’ হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘উমর ইবনুল খাত্তাব? দরজা খুলে দাও। আল্লাহ তার ভালো চাইলে সে মুসলিম হবে। আর যদি তিনি অন্যকিছু চান, তাহলে আমরা তাকে সহজেই হত্যা করতে পারব।’ [cite: ৬৮] তারা দরজা খুলে দিলেন। হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং আরেকজন উমরের বাহু ধরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে হাজির করলেন। তিনি বললেন, ‘তাকে ছেড়ে দাও।’ [cite: ৬৮] তিনি উমরের তার কাপড়ের গিঁট জোরে টান দিয়ে বললেন, ‘হে আল-খাত্তাবের পুত্র, কোন জিনিস তোমাকে এখানে টেনে আনল? আল্লাহর কসম, তোমার ওপর আল্লাহর গজব না নামা পর্যন্ত মনে হয় থামবে না।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, আমি আল্লাহ আর তার রাসূলের প্রতি এবং আপনি আল্লাহর কাছ থেকে যা পেয়েছেন তার প্রতি ঈমান এনেছি।’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘আল্লাহু আকবর’ বলে উঠলেন। সাহাবা রাযিয়াল্লাহু আনহুমের বুঝতে বাকি রইল না যে, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসলিম হয়ে গেছেন। হামযা ইবনে আব্দুল মুত্তালিব রাযিয়াল্লাহু আনহুর মতো উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসলিম হয়ে গেলেন বলে সাহাবায়ে কেরামের আনন্দের সীমা ছিল না। কারণ, এই দুজন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের হেফাযতের পাশাপাশি শত্রুদের সাথে বোঝাপড়া করতে পারবেন। [cite: ৬৯]

২.১.৪। উমর রা.-এর প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াতের উদ্যোগ এবং এ কাজে কষ্ট সহ্য করে যাওয়া
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তীব্র আন্তরিকতার সঙ্গে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ফলে ইসলামের ভিত মজবুত করার জন্য তিনি সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে তিনি বলেছিলেন, ‘ইয়া রসুল্লাহ, আমরা বাঁচি আর মরি, সত্যকেই তো অনুসরণ করছি, তাই না?’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। আমার প্রাণ যে সত্তার হাতে তার কসম, তুমি বাঁচ অথবা মর, সত্যের পথেই আছ।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, ‘তাহলে আমরা কেন লুকোচুরি করছি? যিনি আপনাকে সত্যের দিশা দিয়েছেন সেই সত্তার কসম, আপনার এখন বেরিয়ে পড়া উচিত (এবং প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত দিন)।’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেও এ কথা ভাবছিলেন। প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের সময় এসে গেছে। দাওয়াত যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। সুতরাং তিনি প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের অনুমতি দিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দু-টি দল গঠন করলেন। একটির দায়িত্ব দিলেন হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহুকে, আরেকটির দায়িত্বে থাকলেন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু। দুটি দলের সামনে ছিলেন স্বয়ং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। তিনি ধূলো উড়িয়ে সদলবলে মসজিদে প্রবেশ করলেন। কুরাইশেরা উমর এবং হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহুমকে একসাথে দেখে হতবাক হয়ে গেল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঐদিন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে আল-ফারুক উপাধি দেন। [cite: ৭০]
উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুকে ধর্মান্তরিত করে আল্লাহ তা’আলা ইসলাম এবং মুসলিমদের শক্তিশালী করেন। আগে-পিছে কী হবে তিনি তার পরোয়া করতেন না, এমন অদম্য ছিলেন। তার এবং হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহুমার কারণে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবায়ে কেরাম নিরাপদ বোধ করতেন। [cite: ৭১]
কুরাইশ মুশরিকদের দিকে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেন। কাবায় নামায পড়ার অধিকার আদায়ের আগ পর্যন্ত তিনি তাদের সাথে লড়াই করে গেছেন। [cite: ৭২] মুসলিমরাও তার সাথে নামায পড়তে শুরু করে। ইসলামের শত্রুদের যতভাবে বিরক্ত করা যায়, তার সবই করতেন। তিনি নিজে এই ঘটনা বর্ণনা করেছেন:
‘আমি চাচ্ছিলাম মুসলিম হিসেবে যেন আমার ওপরে মানুষ বিরক্ত হয়ে যায়। আমি আমার মামা আবু জাহেল এর কাছে গেলাম। তিনি খুব সম্ভ্রান্ত কুরাইশ ছিলেন। তার দরজায় টোকা দিলাম পরে সে বলল, ‘কে?’ আমি বললাম, ‘আল-খাত্তাবের ছেলে।’ সে বের হয়ে এলে তাকে বললাম, ‘আপনি কি শুনেছেন, আমি ধর্ম বদলে ফেলেছি?’ সে বলল, ‘তাই নাকি?’ বললাম, ‘হ্যাঁ।’ সে বলল, ‘ও কাজ করো না।’ জবাব দিলাম আমি, ‘করে ফেলেছি।’ সে আবারো বলল, ‘ও কাজ করো না।’ তারপর সে দড়াম করে আমার মুখের উপর দরজা দিয়ে দিল। আমি ‘ব্যাপার না’ বলে চলে এলাম। তারপর আমি কুরাইশদের আরেক সম্ভ্রান্ত লোকের বাড়িতে গেলাম। সে বলল, ‘কে?’ আমি বললাম, ‘আল-খাত্তাবের ছেলে।’ সে বের হলো। তাকে বললাম, ‘আপনি কি বুঝতে পারছেন, আমি ধর্ম পরিবর্তন করেছি?’ সে বলল, ‘তাই নাকি?’ বললাম, ‘হ্যাঁ।’ সেও বলল, ‘ও কাজ করো না।’ জবাব দিলাম আমি, ‘করে ফেলেছি।’ সেও দড়াম করে আমার মুখের উপর লাগিয়ে দিল। আমি বললাম, ‘ব্যাপার না।’ এক লোক আমাকে বলতে লাগল, ‘তুমি যে মুসলিম হয়ে গেছ, তুমি চাও এ কথা লোকজন জানুক?’ আমি ‘হ্যাঁ’ বললাম। সে বলল, ‘যখন লোকজন আল-হিজরের মেলায় জড়ো হবে তখন তুমি জামীল ইবনে মুআম্মার আল-জুমাহির পাশে বসে তাকে বলবে, ‘তুমি কি জান আমি আমার ধর্ম ত্যাগ করেছি?’ আমি ঠিক তাই করলাম। আর সাথে সাথে লোকটা দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলতে লাগল, ‘আল-খাত্তাবের ছেলে তার ধর্ম পরিবর্তন করেছে!’ লোকজন আমার উপরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমিও তাদেরকে পাল্টা মার দিলাম।’ [cite: ৭৩]
এক বর্ণনায় আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু যে মুসলিম হয়ে গেছেন কুরাইশেরা তা জানত না। তিনি একবার জিজ্ঞেস করলেন, ‘মক্কাবাসীর মধ্যে কথা ছড়ানোয় কে সবচেয়ে পটু?’ তাকে জামিল ইবনে মুআম্মার আল-জুমাহির নাম বলা হলো। তিনি তার কাছে গেলেন। তিনি কী করেন দেখার জন্য আমিও তার পেছনে গেলাম। তখন আমি ছোট। কিন্তু কিছু দেখলে বা শুনলে বোঝার মতো বুদ্ধি হয়েছিল। তিনি লোকটার কাছে গিয়ে বললেন, ‘জামীল শোন, আমি মুসলিম হয়েছি।’ আল্লাহর কসম, লোকটি কিছু না বলে উঠে দাঁড়াল। তার কাপড় টেনেটুনে ঠিক করল। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে অনুসরণ করলেন আর আমি আমার বাবাকে। লোকটি মসজিদের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল, তারপরে জোরে চিৎকার করে কাবার চারপাশে জড়ো হয়ে থাকা কুরাইশদের বলতে লাগল: ‘হে কুরাইশগণ, উমর ইবনুল খাত্তাব স্বধর্ম ত্যাগ করেছে।’ উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার পেছন থেকে বলে উঠলেন, ‘সে মিথ্যা বলছে। আমি মুসলিম হয়েছি। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।’ লোকজন আক্রমণ করে বসল। কিন্তু উমর লাফ দিয়ে উতবা ইবনে রাবীয়ার উপর চেপে বসলেন। তিনি উতবাকে মারতে শুরু করলেন। এক পর্যায়ে আংগুল দিয়ে তার দুইচোখ খোঁচাতে লাগলেন। উতবা ব্যথায় কঁকিয়ে উঠল। এই দৃশ্য দেখে লোকজন ভয়ে সরে যেতে লাগল। উমর উঠে দাঁড়ালেন। জাহেলীয়াতের সময় যাদের সাথে তার ওঠাবসা করতেন তাদের কাছে গিয়ে ঘোষণা দিতে লাগলেন যে, তিনি মুসলিম হয়ে গেছেন। [cite: ৭৪]
তিনি সূর্য মধ্যগগণে না ওঠা পর্যন্ত, ক্লান্ত না হওয়া পর্যন্ত তিনি এভাবে ইসলামের প্রচার করে লড়াই করতেন। তার চারপাশে লোকজন জড়ো হলে তিনি বলে উঠতেন, ‘কী চাও তোমরা?’ এমন অবস্থা চলছিল। একদিন একজন লোক এলেন। তার পরনে কারুকাজ করা রেশমী পোশাক। তিনি লোকজনকে বললেন, ‘কী শুরু করেছ তোমরা?’ তারা বলল, ‘আল-খাত্তাবের পুত্র ধর্ম ত্যাগ করেছে।’ লোকটা বলল, ‘তাতে কী? একজন মানুষ যে কোনো ধর্ম গ্রহণ করতে পারে। আর বনু আদিয়্যির কোনো সাথীকে মেরে ফেললে তারা মনে হয় তোমাদের ছেড়ে দেবে?’ তার কথা শুনে সবাই চলে গেল।
আমি (ইবনে উমর) একবার মদীনায় বসে তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম, ‘বাবা, সেদিন কে আপনার কাছ থেকে লোকদের সরিয়ে দিয়েছিলেন?’ তিনি বললেন, ‘তিনি ছিলেন আল-আস ইবনে ওয়াইল আস-সাহমি।’ [cite: ৭৫]

২.১.৫। ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে উমর রা.-এর মুসলিম হওয়ার প্রভাব
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, ‘উমর মুসলিম হওয়ায় আমরা গর্ববোধ করছিলাম। কারণ, তিনি মুসলিম না হওয়া পর্যন্ত আমরা কাবাঘর তাওয়াফ করতে বা সেখানে নামায পড়তে পারছিলাম না। আমাদের ছেড়ে না দেওয়া পর্যন্ত উমর লড়াই করে গেছেন। তারপর থেকে আমরা কাবাঘর তাওয়াফ করতাম, নামায পড়তাম।’ [cite: ৭৬]
সুহাইব ইবনে সিনান উদ্ধৃত করেছেন, ‘উমর ইবনুল খাত্তাব মুসলিম হওয়ার পরে ইসলাম প্রকাশ্যে চলে এলো। প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার হতে লাগল। আমরা কাবা ঘিরে বসতে শুরু করলাম। কাবার তাওয়াফ শুরু করলাম। যারা আমাদের বিরোধিতা করত তাদের সাথে সমস্যা মেটাতে লাগলাম। প্রয়োজনে পাল্টা আঘাত করতে লাগলাম।’ [cite: ৭৭]

২.১.৬। উমর রা.-এর ইসলাম গ্রহণের দিন-তারিখ এবং ধর্মান্তরের সময় মুসলমানের সংখ্যা
নবুওতের ষষ্ঠ বছর যিলহজ মাসে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মুসলিম হন। তার বয়স তখন সাতাশ বছর। [cite: ৭৮] তিনি হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহুর মুসলিম হওয়ার তিনদিন পরে ইসলাম গ্রহণ করেন। [cite: ৭৯] তখন মুসলমানের সংখ্যা দাঁড়ায় ঊনচল্লিশে। উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুর ভাষায়, ‘আমার মনে আছে, আমি যখন মুসলিম হলাম তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে ঊনচল্লিশ জন লোক ছিলেন। আর আমার মাধ্যমে চল্লিশ জন পূর্ণ হলো।’ আল্লাহ তা’আলা এভাবে তাঁর দ্বীনকে বিজয়ী করলেন, ইসলামকে মহিমান্বিত করলেন। [cite: ৮০]
কথিত আছে, তখন চল্লিশ বা একচল্লিশ জন পুরুষ আর এগারোজন নারী মুসলিম হয়েছিলেন। তবে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তখন সবার কথা জানতেন না। কারণ, মুশরিকদের, বিশেষ করে উমরের ভয়ে সবাই তখন লুকিয়ে দ্বীন পালন করতেন। উমর তাদের সাথে কঠিন আচরণ করতেন। তাই উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু তার জানামতে বলেছেন, তিনি চল্লিশতম মুসলিম ছিলেন। ফলে স্বভাবতই তিনি নারীদের কথা উল্লেখ করেননি, তারা খুব দুর্বল ক্ষমতাহীন মানুষ ছিলেন। [cite: ৮০]

ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, জাহেলি যুগে উমর (রা.) নবীজিকে হত্যার উদ্দেশে খোলা তরবারি হাতে নিয়ে বের হন। পথিমধ্যে এক লোকের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়। সে তাঁকে বলে, 'আগে তোমার বোনের খবর নাও।' উমর জিজ্ঞেস করলেন, এর মানে কী? লোকটি তাঁকে তাঁরই বোন ফাতেমা বিনতে খাত্তাব ও ভগ্নিপতি সাঈদ ইবনে জায়েদের ইসলাম গ্রহণের কথা ফাঁস করে দেয়।
উমর রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বোনের বাড়িতে ছুটে যান। গিয়ে দেখেন, ফাতেমা ও তাঁর স্বামী সাঈদ কোরআনের সুরা ত্বহার আয়াত তেলাওয়াত করছেন। বোনকে তিনি ইসলাম গ্রহণের কথা জিজ্ঞেস করলে ফাতেমা তা স্বীকার করেন। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে উমর তাঁর বোনকে চড় মারেন।
ইবনে ইসহাকের সূত্রে ইউনুস ইবনে বুকাইরের বর্ণনায় আছে, কুরাইশ গোত্রের কয়েক নেতা উমরকে নবীজির খোঁজে প্রেরণ করেছিল। নবীজি তখন আস-সাফা পাহাড়ের পাদদেশে একটি ঘরে অবস্থান করছিলেন (ইসলামের প্রাথমিক যুগে নবীজি তাঁর নবমুসলিম সঙ্গীদের নিয়ে এই ঘরে অবস্থান করতেন)। পথিমধ্যে উমরের সঙ্গে নুআইম ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আসাদের সাক্ষাৎ হয়। উমর তখন তরবারি কাঁধে ঝুলিয়ে নবীজির খোঁজে যাচ্ছিলেন। নুআইম অবশ্য আগেই নবীজির কাছে ইসলাম গ্রহণ করেন।
আমার (মূল গ্রন্থকারের) জানামতে, উমরের ইসলাম গ্রহণের এ ঘটনা ব্যাপক প্রসিদ্ধ হলেও ধারাবাহিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হয়নি। এখানে কয়েকটি সূত্র উল্লেখ করা হলো, যেগুলো শাইখ মুহাম্মদ ইবনে রিজিক তারহুনি উল্লেখ করেছেন।
১. ইবনে আসাকির সাঈদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে কায়েসের সূত্রে কাসেম থেকে বর্ণনা করেন।
২. ইবনে সা'আদ, দারা কুতনি, হাকিম, ইবনে আসাকির এবং ইমাম বায়হাকি দালায়েল গ্রন্থে ইসহাক ইবনে ইউসুফ আজরাক থেকে কাসেমের সূত্রে বর্ণনা করেন। শাইখ তারহুনি বলেন, 'এ সূত্রে কাসেম ছাড়া সকলেই নির্ভরযোগ্য।'
ইমাম বুখারি কাসেমের বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, 'কাসেম থেকে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে; কিন্তু তাঁর বর্ণনাগুলোর সমার্থক কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না।' শাইখ উকাইলিও তা-ই বলেছেন। ইমাম দারা কুতনি কাসেমকে দুর্বল বর্ণনাকারী বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে ইবনে হিব্বান তাঁকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন।
৩. ইবনে ইসহাকের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, যা প্রথমেই উল্লেখ করা হয়েছে।
৪. বাজ্জার ইসহাক ইবনে ইবরাহিম হুনাইনির সূত্রে বর্ণনা করেন।
৫. ইবনে আয়েদ তাঁর মাগাযিতে ওয়ালিদ ইবনে মুসলিমের সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
৬. আবু নুআইম দালায়েল গ্রন্থে এবং হুলইয়া গ্রন্থে মুহাম্মদ ইবনে উসমান ইবনে আবু শাইবার সূত্রে সাহাবি ইবনে আব্বাসের সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'আমি উমরকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার নাম ফারুক কে রেখেছে? তখন তিনি হামজা ও তাঁর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা আমাকে শোনান। হামজার তিন দিন পরে উমর ইসলাম গ্রহণ করেন।' তবে এই সূত্রে ইসহাক ইবনে আবু ফারওয়া রয়েছেন, যাঁর ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের মধ্যে দুই ধরনের মন্তব্য পাওয়া যায়। কেউ তাঁকে দুর্বল বলেছেন। আবার অনেকে তাঁর বর্ণনাকে পরিপূর্ণ প্রত্যাখ্যাত বলে মত দিয়েছেন।
৭. ইমাম তাবারানি সাওবানের সূত্রে বর্ণনা করেন। হাইসামি এই সনদের বর্ণনাকারী ইয়াজিদ ইবনে রাবিআ রাহবিকে পরিত্যক্ত বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে ইবনে আদি বলেন, 'তার বর্ণনা গ্রহণ করতে তেমন সমস্যা নেই।'
৮. আবদুর রাজ্জাক জুহরির সূত্রে সহিহ সনদে বর্ণনা করেন।
৯. আবদুর রাজ্জাক অপর সূত্রে এ ঘটনা ইমাম সুযুতি থেকে বর্ণনা করেন, যা ইমাম সুযুতি তাঁর খাছায়েদুল কুবরা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তবে এ সূত্র সম্পর্কে তিনি বলেন, 'আমি ইমাম সুযুতির সনদের খোঁজ পাইনি।' তবে উমরের ইসলাম গ্রহণের ঘটনায় তাঁর বোন ফাতেমা ও ভগ্নিপতি সাঈদ ইবনে জায়েদের সুরা ত্বহা তেলাওয়াত করার যে কথা বলা হয়েছে, এর কোনো সহিহ সনদ খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ইমাম বুখারি তাঁর সহিহ বুখারি গ্রন্থে 'উমরের ইসলাম গ্রহণ' সম্পর্কে আলাদা অধ্যায় এনেছেন, যাতে তিনি উপরিউক্ত বিষয়টির কিছুই উল্লেখ করেননি।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া এবং ড. আকরাম উমরি প্রমুখ মনীষীও এ ব্যাপারে সহিহ সনদ না পাওয়ার কথা বলেছেন।
ইমাম আহমাদ তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে আবুল মুগিরার সূত্রে উমরের ইসলাম গ্রহণ করার অন্য এক প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, শুরাইহ ইবনে উবাইদের সূত্রে সাফওয়ান কর্তৃক আবুল মুগিরা বর্ণনা করেন, উমর বলেন, 'আমি একবার নবীজির খোঁজে বের হই। দেখি, তিনি আমার আগেই মসজিদুল হারামে চলে এসেছেন। আমি তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে রইলাম। তিনি সুরা হাক্কাহ তেলাওয়াত শুরু করলেন। আমি তাঁর তেলাওয়াত শুনছি আর কোরআনের গদ্যছন্দের ধরন দেখে বিস্মিত হচ্ছিলাম।
'মনে মনে ভাবলাম, নিশ্চিতভাবে এটা কোনো কবির রচনা; যেমন কুরাইশরা দাবি করে থাকে। কিন্তু একটু পরে নবীজি দুটি আয়াত তেলাওয়াত করতে শুরু করলেন; যার অর্থ হলো, “এটা কোনো কবির রচনা নয়; কিন্তু তোমরা খুব কম লোকই এর প্রতি ইমান আনছ এবং এটা কোনো জ্যোতিষীও কথা নয়; অথচ সামান্য কয়েক লোক ছাড়া কেউই তা বোঝার চেষ্টা করে না।”'
অতঃপর উমর বলেন, 'এই আয়াতগুলো শোনার পর আমার অন্তরে ইসলামের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে যায়।'
হাইসামি বলেন, 'এ ঘটনা ইমাম তাবারানিও মুজামুল আওসাত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তাঁর সনদের সকল বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য। তবে শুরাইহ ইবনে উবাইদ উমরের সাক্ষাৎ লাভ করেননি।'
ইমাম জাহবি তাঁর তারিখুল ইসলাম গ্রন্থে সিরাতের অধ্যায়ে উমরের ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে আলোচনা করার সময় ইমাম আহমাদ কর্তৃক বর্ণিত উপরিউক্ত ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তবে এর সঙ্গে আরেকটু মিলিয়েছেন। যার সারমর্ম হলো, উমর বলেন, 'আমি স্বীয় বোনের বাড়ি থেকে বের হয়ে নবীজির খোঁজে যাই। তখন রাত ছিল। আমি কাবাঘরের গেলাফের কাছে এসে দেখি নবীজি কাবাঘরের দিকে আসছেন। হাজরে আসওয়াদের কাছে এসে তিনি অনেকক্ষণ নামাজ আদায় করলেন। নামাজে তিনি কোরআন থেকে এ আয়াত পড়ছিলেন, যা শুনে আমি হতবাক হয়ে যাই। এমন কথা কস্মিনকালে আমি কারও কাছে শুনিনি।'
এরপর উমর আরও বলেন, 'নামাজ শেষে নবীজি বাড়ির পথ ধরলেন, আমি তাঁর পিছু নিই। তিনি আমার দিকে ফিরে তাকালেন। অন্ধকারে চিনতে না পেরে জিজ্ঞেস করলেন, "কে তুমি?” উত্তর দিলাম, "আমি উমর।”'
বললেন, “তুমি! কী উদ্দেশ্যে এখানে আসছ? রাতদিন শুধু আমার পিছেই লেগে থাকো?”
'আমার আশঙ্কা হচ্ছিল, তিনি আমার বিরুদ্ধে বদ-দোয়া করে ফেলেন কি না! আমি তাঁকে বললাম, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নেই এবং আপনিই তাঁর রাসুল।" নবীজি বললেন, “উমর, আস্তে বলো।” আমি বললাম, “না, হে আল্লাহর রাসুল! কাফেররা যেভাবে প্রকাশ্যে শিকের ঘোষণা দিয়েছে, ঠিক সেভাবে আমিও ইসলামের ঘোষণা দিতে চাই।"'

ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, জাহেলি যুগে উমর (রা.) নবীজি উদ্দেশে খোলা তরবারি হাতে নিয়ে বের হন। পথিমধ্যে এক লোকের সাক্ষাৎ হয়। সে তাঁকে বলে, 'আগে তোমার বোনের খবর নাও।' উমর করলেন, এর মানে কী? লোকটি তাঁকে তাঁরই বোন ফাতেমা বিনতে খাত্তাব ও ভগ্নিপতি সাঈদ ইবনে জায়েদের ইসলাম গ্রহণের কথা ফাঁস করে দেয়।
উমর রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বোনের বাড়িতে ছুটে যান। গিয়ে দেখেন ফাতেমা ও তাঁর স্বামী সাঈদ কোরআনের সুরা ত্বহার আয়াত তিলাওয়াত করছেন। বোনকে তিনি ইসলাম গ্রহণের কথা জিজ্ঞেস করলে ফাতেমা স্বীকার করেন। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে উমর তাঁর বোনকে চড় মারেন।
ইবনে ইসহাকের সূত্রে ইউনুস ইবনে বুকাইরের বর্ণনায় আছে, কুরাইশ গোত্রের কয়েক নেতা উমরকে নবীজির খোঁজে প্রেরণ করেছিল। নবীজি তখন সাফা পাহাড়ের পাদদেশে একটি ঘরে অবস্থান করছিলেন (ইসলামের প্রাথমিক যুগে নবীজি তাঁর নবমুসলিম সঙ্গীদের নিয়ে এই ঘরে অবস্থান করতেন)। পথিমধ্যে উমরের সঙ্গে নুআইম ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আসাদের সাক্ষাৎ হয়। উমর তখন তরবারি কাঁধে ঝুলিয়ে নবীজির খোঁজে যাচ্ছিলেন। নুআইম এর আগেই নবীজির কাছে ইসলাম গ্রহণ করেন।
আমার (মূল গ্রন্থকারের) জানামতে, উমরের ইসলাম গ্রহণের ঘটনা ব্যাপক প্রসিদ্ধ হলেও ধারাবাহিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হয়নি। নিচে কয়েকটি সূত্র উল্লেখ করা হলো, যেগুলো শাইখ মুহাম্মদ ইবনে রিযিক তারহুনি উল্লেখ করেছেন।
১. ইবনে আসাকির সাঈদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে কায়েসের সূত্রে আসলাম থেকে বর্ণনা করেন।
২. ইবনে সা'আদ, দারা কুতনি, হাকিম, ইবনে আসাকির ও বায়হাকি দালায়েল গ্রন্থে ইসহাক ইবনে ইউসুফ আজরাকের সূত্রে কাসেম থেকে বর্ণনা করেন। শাইখ তারহুনি বলেন, 'এ সূত্রে কাসেম ছাড়া সকলেই নির্ভরযোগ্য।'
ইমাম বুখারি কাসেমের বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, 'কাসেম থেকে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে; কিন্তু তাঁর বর্ণনাগুলোর সমার্থক কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না।' শাইখ উকাইলিও তা-ই বলেছেন। ইমাম দারা কুতনি কাসেমকে দুর্বল বর্ণনাকারী বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে ইবনে হিব্বান তাঁকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন।
৩. ইবনে ইসহাকের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, যা প্রথমেই উল্লেখ করা হয়েছে।
৪. বাজ্জার ইসহাক ইবনে ইবরাহিম হুনাইনির সূত্রে বর্ণনা করেন।
৫. ইবনে আয়েদ তাঁর মাগাযিতে ওয়ালিদ ইবনে মুসলিমের সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
৬. আবু নুআইম দালায়েল গ্রন্থে এবং হুলইয়া গ্রন্থে মুহাম্মদ ইবনে উসমান ইবনে আবু শাইবার সূত্রে সাহাবি ইবনে আব্বাসের সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'আমি উমরকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার নাম ফারুক কে রেখেছে? তখন তিনি হামজা ও তাঁর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা আমাকে শোনান। হামজার তিন দিন পরে উমর ইসলাম গ্রহণ করেন।' তবে এই সূত্রে ইসহাক ইবনে আবু ফারওয়া রয়েছেন, যাঁর ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের মধ্যে দুই ধরনের মন্তব্য পাওয়া যায়। কেউ তাঁকে দুর্বল বলেছেন। আবার অনেকে তাঁর বর্ণনাকে পরিপূর্ণ প্রত্যাখ্যাত বলে মত দিয়েছেন।
৭. ইমাম তাবারানি সাওবানের সূত্রে বর্ণনা করেন। হাইসামি এই সনদের বর্ণনাকারী ইয়াজিদ ইবনে রাবিআ রাহবিকে পরিত্যক্ত বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে ইবনে আদি বলেন, 'তার বর্ণনা গ্রহণ করতে তেমন সমস্যা নেই।'
৮. আবদুর রাজ্জাক জুহরির সূত্রে সহিহ সনদে বর্ণনা করেন।
৯. আবদুর রাজ্জাক অপর সূত্রে এ ঘটনা ইমাম সুযুতি থেকে বর্ণনা করেন, যা ইমাম সুযুতি তাঁর খাছায়েদুল কুবরা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তবে এ সূত্র সম্পর্কে তিনি বলেন, 'আমি ইমাম সুযুতির সনদের খোঁজ পাইনি।' তবে উমরের ইসলাম গ্রহণের ঘটনায় তাঁর বোন ফাতেমা ও ভগ্নিপতি সাঈদ ইবনে জায়েদের সুরা ত্বহা তেলাওয়াত করার যে কথা বলা হয়েছে, এর কোনো সহিহ সনদ খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ইমাম বুখারি তাঁর সহিহ বুখারি গ্রন্থে 'উমরের ইসলাম গ্রহণ' সম্পর্কে আলাদা অধ্যায় এনেছেন, যাতে তিনি উপরিউক্ত বিষয়টির কিছুই উল্লেখ করেননি।

بسم الله الرحمن الرحيم
ভূমিকা
الحمد لله وكفى وسلام على عباده الذين اصطفى
মানুষ নামক প্রাণীটি কঠোর পরিশ্রম করে, হাড়ভাঙা খাটুনি খেটে, এমনকি সামর্থ্যের সবটুকু বিলীন করে দিয়ে এই ক্ষণস্থায়ী পৃথিবীতে সাফল্য ও অগ্রগতির শিখরে আরোহণ করার প্রয়াস পায়। অথচ তুচ্ছ এই পৃথিবীর ভিতই গড়ে উঠেছে নানা বাধা-বিপত্তি, রোগ-শোক ও বালা-মুসিবতের ওপর। মানবজাতির আয়ুষ্কাল কত অল্প! ষাট কি সত্তর বছরের ছোট্ট একটি জীবন। সময়ের এই স্বল্প পুঁজিতে চিরসুখের জান্নাতে মর্যাদার শিখরে আরোহণের জন্য তার বলতে গেলে কিছুই করা হয়ে ওঠে না। অথচ আখিরাতের জীবন অনন্ত অসীম; যার কোনো সমাপ্তি নেই।
• বক্ষ্যমাণ রচনাটি হৃদয়ের গভীর থেকে উৎসারিত কিছু ভাবনা, ইঙ্গিত ও শব্দমালার যোগফল, যা আমি বিচিত্র সব উৎস থেকে সঞ্চয় করেছি। আর যা আল্লাহ আমার অন্তরে ঢেলে দিয়েছেন, তাও এতে সংযোজন করে দিয়েছি। যাঁরা আল্লাহর পথের পথিকদের সুউচ্চ মর্যাদায় উন্নীত হতে চায়, এই সংকলনে তাদের জন্য রয়েছে অমূল্য পাথেয়।
• আমি দাবি করব না যে, আলোচ্য বিষয়ের খুঁটিনাটি সবকিছুই এখানে এসে গেছে। বরং বাস্তব কথা হলো, যা সংকলিত হয়েছে, তার তুলনায় অসংকলিত বিষয়াদির পরিমাণই বেশি। আপাতত যেটুকুর ওপরই নিবিষ্ট হয়েছে আমার দৃষ্টি আর যা রেখাপাত করেছে আমার অন্তরে; এটুকুই আমি সাজানোর চেষ্টা করেছি কলমের তুলিতে। পুণ্যের শক্তি আর পাপ থেকে মুক্তি-দুটোই আল্লাহর তরফ থেকে। তিনিই সাহায্যকারী, ভরসা কেবল তাঁর ওপরই।
- খালিদ আল-হুসাইনান

টিকাঃ
১. সুরা আল-হজ: ১৮

ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, জাহেলি যুগে উমর (রা.) নবীজি উদ্দেশে খোলা তরবারি হাতে নিয়ে বের হন। পথিমধ্যে এক লোকের সাক্ষাৎ হয়। সে তাঁকে বলে, 'আগে তোমার বোনের খবর নাও।' উমর জিজ্ঞাসা করলেন, এর মানে কী? লোকটি তাঁকে তাঁরই বোন ফাতেমা বিনতে খাত্তাব ও ভগ্নিপতি সাঈদ ইবনে জায়েদের ইসলাম গ্রহণের কথা ফাঁস করে দেয়।

উমর রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বোনের বাড়িতে ছুটে যান। গিয়ে দেখেন ফাতেমা ও তাঁর স্বামী সাঈদ কোরআনের সুরা ত্বহার আয়াত তেলাওয়াত করছেন। বোনকে তিনি ইসলাম গ্রহণের কথা জিজ্ঞেস করলে ফাতেমা স্বীকার করেন। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে উমর তাঁর বোনকে চড় মারেন।

ইবনে ইসহাকের সূত্রে ইউনুস ইবনে বুকাইরের বর্ণনায় আছে, গোত্রের কয়েক নেতা উমরকে নবীজির খোঁজে প্রেরণ করেছিল। নবীজি সাফা পাহাড়ের পাদদেশে একটি ঘরে অবস্থান করছিলেন (ইসলামের প্রাথমিক যুগে নবীজি তাঁর নবমুসলিম সঙ্গীদের নিয়ে এই ঘরে অবস্থান করতেন)। পথিমধ্যে উমরের সঙ্গে নুআইম ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আসাদের সাক্ষাৎ হয়। উমর তখন তরবারি কাঁধে ঝুলিয়ে নবীজির খোঁজে যাচ্ছিলেন। নুআইম আগেই নবীজির কাছে ইসলাম গ্রহণ করেন।

আমার (মূল গ্রন্থকারের) জানামতে, উমরের ইসলাম গ্রহণের ঘটনা ব্যাপক প্রসিদ্ধ হলেও ধারাবাহিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হয়নি। কয়েকটি সূত্র উল্লেখ করা হলো, যেগুলো শাইখ মুহাম্মদ ইবনে রিযিক উল্লেখ করেছেন।

১. ইবনে আসাকির সাঈদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে কায়েসের সূত্রে কাসেম থেকে বর্ণনা করেন।
২. ইবনে সা'আদ, দারা কুতনি, হাকিম, ইবনে আসাকির ও বায়হাকি দালায়েল গ্রন্থে ইসহাক ইবনে ইউসুফ আজরাক থেকে কাসেমের সূত্রে বর্ণনা করেন। শাইখ তারহুনি বলেন, 'এ সূত্রে কাসেম ছাড়া সকলেই নির্ভরযোগ্য।'

ইমাম বুখারি কাসেমের বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, 'কাসেম থেকে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে; কিন্তু তাঁর বর্ণনাগুলোর সমার্থক কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না।' শাইখ উকাইলিও তা-ই বলেছেন। ইমাম দারা কুতনি কাসেমকে দুর্বল বর্ণনাকারী বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে ইবনে হিব্বان তাঁকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন।

৩. ইবনে ইসহাকের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, যা প্রথমেই উল্লেখ করা হয়েছে।

৪. বাজ্জার ইসহাক ইবনে ইবরাহিম হুনাইনির সূত্রে বর্ণনা করেন।

৫. ইবনে আয়েদ তাঁর মাগাযিতে ওয়ালিদ ইবনে মুসলিমের সূত্রে বর্ণনা করেছেন।

৬. আবু নুআইম দালায়েল গ্রন্থে এবং হুলইয়া গ্রন্থে মুহাম্মদ ইবনে উসমান ইবনে আবু শাইবার সূত্রে সাহাবি ইবনে আব্বাসের সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'আমি উমরকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার নাম ফারুক কে রেখেছে? তখন তিনি হামজা ও তাঁর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা আমাকে শোনান। হামজার তিন দিন পরে উমর ইসলাম গ্রহণ করেন।' তবে এই সূত্রে ইসহাক ইবনে আবু ফারওয়া রয়েছেন, যাঁর ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের মধ্যে দুই ধরনের মন্তব্য পাওয়া যায়। কেউ তাঁকে দুর্বল বলেছেন। আবার অনেকে তাঁর বর্ণনাকে পরিপূর্ণ প্রত্যাখ্যাত বলে মত দিয়েছেন।

৭. ইমাম তাবারানি সাওবানের সূত্রে বর্ণনা করেন। হাইসামি এই সনদের বর্ণনাকারী ইয়াজিদ ইবনে রাবিআ রাহবিকে পরিত্যক্ত বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে ইবনে আদি বলেন, 'তার বর্ণনা গ্রহণ করতে তেমন সমস্যা নেই।'

৮. আবদুর রাজ্জাক জুহরির সূত্রে সহিহ সনদে বর্ণনা করেন।

৯. আবদুর রাজ্জাক অপর সূত্রে এ ঘটনা ইমাম সুযুতি থেকে বর্ণনা করেন, যা ইমাম সুযুতি তাঁর খাছায়েদুল কুবরা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তবে এ সূত্র সম্পর্কে তিনি বলেন, 'আমি ইমাম সুযুতির সনদের খোঁজ পাইনি।' তবে উমরের ইসলাম গ্রহণের ঘটনায় তাঁর বোন ফাতেমা ও ভগ্নিপতি সাঈদ ইবনে জায়েদের সুরা ত্বহা তেলাওয়াত করার যে কথা বলা হয়েছে, এর কোনো সহিহ সনদ খুঁজে পাওয়া যায়নি।

ইমাম বুখারি তাঁর সহিহ বুখারি গ্রন্থে 'উমরের ইসলাম গ্রহণ' সম্পর্কে আলাদা অধ্যায় এনেছেন, যাতে তিনি উপরিউক্ত বিষয়টির কিছুই উল্লেখ করেননি।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া এবং ড. আকরাম উমরি প্রমুখ মনীষীও এ ব্যাপারে সহিহ সনদ না পাওয়ার কথা বলেছেন।

ইমাম আহমাদ তাঁর মুসনাদ গ্রন্থে আবুল মুগিরার সূত্রে উমরের ইসলাম গ্রহণ করার অন্য এক প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, শুরাইহ ইবনে উবাইদের সূত্রে সাফওয়ান কর্তৃক আবুল মুগিরা বর্ণনা করেন, উমর বলেন, 'আমি একবার নবীজির খোঁজে বের হই। দেখি, তিনি আমার আগেই মসজিদুল হারামে চলে এসেছেন। আমি তাঁর পেছনে দাঁড়িয়ে রইলাম। তিনি সুরা হাক্কাহ তেলাওয়াত শুরু করলেন। আমি তাঁর তেলাওয়াত শুনছি আর কোরআনের গদ্যছন্দের ধরন দেখে বিস্মিত হচ্ছিলাম।

'মনে মনে ভাবলাম, নিশ্চিতভাবে এটা কোনো কবির রচনা; যেমন কুরাইশরা দাবি করে থাকে। কিন্তু একটু পরে নবীজি দুটি আয়াত তেলাওয়াত করতে শুরু করলেন; যার অর্থ হলো, “এটা কোনো কবির রচনা নয়; কিন্তু তোমরা খুব কম লোকই এর প্রতি ইমান আনছ এবং এটা কোনো জ্যোতিষীরও কথা নয়; অথচ সামান্য কয়েক লোক ছাড়া কেউই তা বোঝার চেষ্টা করে না।”'

অতঃপর উমর বলেন, 'এই আয়াতগুলো শোনার পর আমার অন্তরে ইসলামের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে যায়।'

হাইসামি বলেন, 'এ ঘটনা ইমাম তাবারানিও মুজামুল আওসাত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তাঁর সনদের সকল বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য। তবে শুরাইহ ইবনে উবাইদ উমরের সাক্ষাৎ লাভ করেননি।'

ইমাম জাহবি তাঁর তারিখুল ইসলাম গ্রন্থে সিরাতের অধ্যায়ে উমরের ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে আলোচনা করার সময় ইমাম আহমাদ কর্তৃক বর্ণিত উপরিউক্ত ঘটনা উল্লেখ করেছেন। তবে এর সঙ্গে আরেকটু মিলিয়েছেন। যার সারমর্ম হলো, উমর বলেন, 'আমি স্বীয় বোনের বাড়ি থেকে বের হয়ে নবীজির খোঁজে যাই। তখন রাত ছিল। আমি কাবাঘরের গেলাফের কাছে এসে দেখি নবীজি কাবাঘরের দিকে আসছেন। হাজরে আসওয়াদের কাছে এসে তিনি অনেকক্ষণ নামাজ আদায় করলেন। নামাজে তিনি কোরআন থেকে এ আয়াত পড়ছিলেন, যা শুনে আমি হতবাক হয়ে যাই। এমন কথা কস্মিনকালে আমি কারও কাছে শুনিনি।'

এরপর উমর আরও বলেন, 'নামাজ শেষে নবীজি বাড়ির পথ ধরলেন, আমি তাঁর পিছু নিই। তিনি আমার দিকে ফিরে তাকালেন। অন্ধকারে চিনতে না পেরে জিজ্ঞেস করলেন, "কে তুমি?” উত্তর দিলাম, "আমি উমর।”'

বললেন, “তুমি! কী উদ্দেশ্যে এখানে আসছ? রাতদিন শুধু আমার পিছেই লেগে থাকো?”

'আমার আশঙ্কা হচ্ছিল, তিনি আমার বিরুদ্ধে বদ-দোয়া করে ফেলেন কি না! আমি তাঁকে বললাম, "আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো ইলাহ নেই এবং আপনিই তাঁর রাসুল।" নবীজি বললেন, “উমর, আস্তে বলো।” আমি বললাম, “না, হে আল্লাহর রাসুল! কাফেররা যেভাবে প্রকাশ্যে শিরকের ঘোষণা দিয়েছে, ঠিক সেভাবে আমিও ইসলামের ঘোষণা দিতে চাই।"'

ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, জাহেলি যুগে উমর (রা.) নবীজি উদ্দেশে খোলা তরবারি হাতে নিয়ে বের হন। পথিমধ্যে এক লোকের সাক্ষাৎ হয়। সে তাঁকে বলে, 'আগে তোমার বোনের খবর নাও।' উমর করলেন, এর মানে কী? লোকটি তাঁকে তাঁরই বোন ফাতেমা বিনতে ভগ্নিপতি সাঈদ ইবনে জায়েদের ইসলাম গ্রহণের কথা ফাঁস করে দেয়।
উমর রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে বোনের বাড়িতে ছুটে যান। গিয়ে দেখেন ফাতেমা ও তাঁর স্বামী সাঈদ কোরআনের সুরা ত্বহার আয়াত তেলাওয়াত করছিলেন। বোনকে তিনি ইসলাম গ্রহণের কথা জিজ্ঞেস করলে ফাতেমা স্বীকার করেন। হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে উমর তাঁর বোনকে চড় মারেন।
ইবনে ইসহাকের সূত্রে ইউনুস ইবনে বুকাইরের বর্ণনায় আদি গোত্রের কয়েক নেতা উমরকে নবীজির খোঁজে প্রেরণ করেছিল। নবীজি সাফা পাহাড়ের পাদদেশে একটি ঘরে অবস্থান করছিলেন (ইসলামের প্রাথমিক যুগে নবীজি তাঁর নবমুসলিম সঙ্গীদের নিয়ে এই ঘরে অবস্থান করতেন)। পথিমধ্যে উমরের সঙ্গে নুআইম ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আসাদের সাক্ষাৎ হয়। উমর তখন তরবারি কাঁধে ঝুলিয়ে নবীজির খোঁজে যাচ্ছিলেন। নুআইম আগেই নবীজির কাছে ইসলাম গ্রহণ করেন।
আমার (মূল গ্রন্থকারের) জানামতে, উমরের ইসলাম গ্রহণের ঘটনা ব্যাপক প্রসিদ্ধ হলেও ধারাবাহিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে বর্ণিত হয়নি। কয়েকটি সূত্র উল্লেখ করা হলো, যেগুলো শাইখ মুহাম্মদ ইবনে রিযিক উল্লেখ করেছেন।
১. ইবনে আসাকির সাঈদ ইবনে ইয়াহইয়া ইবনে কায়েসের সূত্রে কাসেম থেকে বর্ণনা করেন।
২. ইবনে সা'আদ, দারা কুতনি, হাকিম, ইবনে আসাকির ও বায়হাকি দালায়েল গ্রন্থে ইসহাক ইবনে ইউসুফ আজরাক থেকে কাসেম সূত্রে বর্ণনা করেন। শাইখ তারহুনি বলেন, 'এ সূত্রে বর্ণনাকারীরা সকলেই নির্ভরযোগ্য।'
ইমাম বুখারি কাসেমের বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন, 'কাসেম থেকে একাধিক হাদিস বর্ণিত হয়েছে; কিন্তু তাঁর বর্ণনাগুলোর সমার্থক কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না।' শাইख উকাইলিও তা-ই বলেছেন। ইমাম দারা কুতনি কাসেমকে দুর্বল বর্ণনাকারী বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে ইবনে হিব্বান তাঁকে নির্ভরযোগ্য বলেছেন।
৩. ইবনে ইসহাকের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, যা প্রথমেই উল্লেখ করা হয়েছে।
৪. বাজ্জার ইসহাক ইবনে ইবরাহিম হুনাইনির সূত্রে বর্ণনা করেন।
৫. ইবনে আয়েদ তাঁর মাগাযিতে ওয়ালিদ ইবনে মুসলিমের সূত্রে বর্ণনা করেছেন।
৬. আবু নুআইম দালায়েল গ্রন্থে এবং হুলইয়া গ্রন্থে মুহাম্মদ ইবনে উসমান ইবনে আবু শাইবার সূত্রে সাহাবি ইবনে আব্বাসের সূত্রে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'আমি উমরকে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার নাম ফারুক কে রেখেছে? তখন তিনি হামজা ও তাঁর ইসলাম গ্রহণের ঘটনা আমাকে শোনান। হামজার তিন দিন পরে উমর ইসলাম গ্রহণ করেন।' তবে এই সূত্রে ইসহাক ইবনে আবু ফারওয়া রয়েছেন, যাঁর ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের মধ্যে দুই ধরনের মন্তব্য পাওয়া যায়। কেউ তাঁকে দুর্বল বলেছেন। আবার অনেকে তাঁর বর্ণনাকে পরিপূর্ণ প্রত্যাখ্যাত বলে মত দিয়েছেন।
৭. ইমাম তাবারানি সাওবানের সূত্রে বর্ণনা করেন। হাইসামি এই সনদের বর্ণনাকারী ইয়াজিদ ইবনে রাবিআ রাহবিকে পরিত্যক্ত বলে আখ্যায়িত করেছেন। তবে ইবনে আদি বলেন, 'তার বর্ণনা গ্রহণ করতে তেমন সমস্যা নেই।'
৮. আবদুর রাজ্জাক জুহরির সূত্রে সহিহ সনদে বর্ণনা করেন।
৯. আবদুর রাজ্জাক অপর সূত্রে এ ঘটনা ইমাম সুযুতি থেকে বর্ণনা করেন, যা ইমাম সুযুতি তাঁর খাছায়েদুল কুবরা গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন। তবে এ সূত্র সম্পর্কে তিনি বলেন, 'আমি ইমাম সুযুতির সনদের খোঁজ পাইনি।' তবে উমরের ইসলাম গ্রহণের ঘটনায় তাঁর বোন ফাতেমা ও ভগ্নিপতি সাঈদ ইবনে জায়েদের সুরা ত্বহা তেলাওয়াত করার যে কথা বলা হয়েছে, এর কোনো সহিহ সনদ খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ইমাম বুখারি তাঁর সহিহ বুখারি গ্রন্থে 'উমরের ইসলাম গ্রহণ' সম্পর্কে আলাদা অধ্যায় এনেছেন, যাতে তিনি উপরিউক্ত বিষয়টির কিছুই উল্লেখ করেননি।

একদিন হযরত ওমর ﷺ মদ পান করার জন্যে মদ বিক্রেতার কাছে গেলেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে মদ বিক্রেতাকে না পেয়ে মদ পান করা আর হলো না। তিনি মনে মনে বললেন, আমি কা’বঘরের গিয়ে তাওয়াফ করব। ইতমোতো তিনি কা’বঘরের দিকে রওনা দিলেন। সেখানে গিয়ে দেখলেন তাঁর আগেই রাসূল ﷺ কা’বা ঘরে প্রবেশ করেছেন। তখন হযরত ওমর ﷺ ভাবলেন যে, আমি লুকিয়ে লুকিয়ে যা পাঠ করছে তা শুনব। ওইদিকে রাসূল ﷺ হালকা কণ্ঠে কুরআন তেলাওয়াত করছিলেন। কুরআন তেলাওয়াতও আওয়াজ দিয়ে হযরত ওমর ﷺ-এর অন্তরে গেঁথে গেল। তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনতে লাগলেন। কোরাইশের মিথ্যা তার মনকে ভরে দিল। তিনি বলতে লাগলেন, আল্লাহ শপথ! কোরাইশদের কথা ঠিক, মুখযবান অবশ্যই একজন কবি। রাসূল ﷺ তাঁকে দেখতে পাননি, তিনি ধারাবাহিকভাবে একের পর এক আয়াত তেলাওয়াত করছিলেন। তিনি বলছিলেন.......... إِنَّهُ لَقَوْلُ رَسُوْلٍ كَرِيْمٍ – وَمَا هُوَ بِقَوْلِ شَاعِرٍ قَلِيْلًا مَا تُؤْمِنُوْنَ “নিশ্চয়ই এই কোরআন একজন সম্মানিত রাসূলের আনীত। এবং এটা কোনো কবির বাণী নয়, তোমরা কমই বিশ্বাস কর।” (সুরা হাক্কাহ্ : ৪০,৪১)
এ আয়াত শুনে হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন, তাহলে অবশ্যই মুহাম্মাদ একজন গণক হবে। ঐ দিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তেলাওয়াত করে যাচ্ছিলেন.......
وَلَا يَقُولُوا كَانَ قَلِيلًا مَا كَرَّهْتُ
কমই অনুমান কর। (সূরা যাকাহ্ব : ৪২) এ আয়াত হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু -এর হৃদয়কে নাড়া দিল। এরপরই ঘটে গেল অন্য স্মরণীয় এক ঘটনা.........। হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তরবারি নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে হত্যা করতে বের হলেন। তিনি এক দল লোকের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন যারা একটি বাছুর জবাই করছিল। তখন ওই বাছুর থেকে আওয়াজ আসছিল, হে কঠিন শত্রুতা পোষণকারী! এক স্পষ্টবাদী মুক্তির কথা বলছে, আল্লাহু ইল্লা ইল্লা মুহাম্মাদ ব্যতীত অন্য কোনো উপাস্য নেই। ওই আওয়াজটি একজন জিনের ছিল। তখন হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন, আল্লাহর শপথ! সে আমাকে ছাড়া অন্য কাউকে উদ্দেশ্য করেনি। এ আওয়াজ শোনার পর তাঁর অন্তরে ইসলাম গেঁথে গেল, কিন্তু তিনি তখনো ইসলাম গ্রহণের কথা ঘোষণা করেননি। তখনো তাঁর অন্তর থেকে কুফরি ও জাহিলী যুগের প্রভাব দূর হয়নি। কীভাবে দূর হবে তিনি তো এ সকল কাজে তাঁর গোত্রের প্রধান ছিলেন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর পবিত্র জবানে কোরআন তেলাওয়াত শোনার পর থেকে হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু -এর অন্তরে ইসলাম জায়গা করে নিয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -ও তাঁর হেদায়েতের জন্য দোয়া করেছেন। তাছাড়া তিনি জিনের মুখে যে কথা শুনেছেন তা তাঁর মন থেকে যাচ্ছিল না। ওদিকে তিনি ইসলামের ঘোর বিরোধী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর অজ্ঞাতেই তাঁর ঘরেই ইসলাম চলে এসেছে যা তিনি কখনো কল্পনাও করেননি। তাঁর ভাই যায়েদ বিন খাত্তাব, তাঁর বোন ফাতিমা বিনতে খাত্তাব, ও তাঁর ভগ্নিপতি সাইদ বিন যায়েদ যিনি রক্তের সম্পর্কে তাঁর চাচাতো ভাই, এ তিনজন গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেন, কিন্তু তাঁরা তাঁর ভয়ে ইসলামকে প্রকাশ করেননি। তাঁর গোত্র বনু আদীর আরো কিছু মানুষ গোপনে গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। সবাই তাঁর ভয়ে তাঁদের ইসলামের কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করেননি।
একদিন ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু জানতে পারলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চল্লিশজন সাহাবীসহ সাফা পাহাড়ের নিকটবর্তী এক বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। তখন তিনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে হত্যা করতে কাঁধে তরবারি ঝুলিয়ে সেদিকে ছুটে গেলেন। তাঁর চেহারায় রাগ ও ক্ষোভের আগুন জ্বলছিল। যাওয়ার পথে তাঁর সাথে বনু জহুরা গোত্রের এক লোকের দেখা হয়। যিনি সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর মামা হবেন। তিনি ও অবস্থা দেখে লোকটি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, ওমর! কোথায় যাচ্ছ? ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন, আমি মুহাম্মাদের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছি, যে ধর্মত্যাগ করেছে, কোরাইশদের মাঝে ফাটল সৃষ্টি করেছে, কোরাইশদের ধর্মের দোষ বর্ণনা করে, তাদের দেবতাদের গালি দেয়। আমি তাকে হত্যা করব। তখন লোকটি বললেন, ওমর! তোমার ব্যক্তিগত তোমাকে ধোঁকা দিয়েছে। তুমি মুহাম্মাদকে হত্যা করবে? তুমি কি বনু হাশিম ও বনু জহুরাকে দেখ না। অর্থাৎ বনু হাশিম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গোত্র আর বনু জহুরা তাঁর মায়ের গোত্র, সুতরাং তিনি যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে হত্যা করেন তাহলে বনু হাশিম ও বনু জহুরা উভয়ে তাঁর থেকে প্রতিশোধ নিবে। তাঁর কথা শুনে ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলেন, আল্লাহর শপথ! আমি দেখছি তুমিও ধর্ম ত্যাগ করেছ! লোকটি বললেন, ওমর! আমি কি তোমাকে এর থেকে আশ্চর্যজনক সংবাদ জানাব না? তোমার বোন, তোমার ভগ্নিপতি, তারাও তোমার ধর্ম ত্যাগ করেছে। খবরটি শোনার পর ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু -এর মাথায় যেন পাহাড় ভেঙে পড়ল, মনে হচ্ছিল আকাশ থেকে বজ্র এসে তাঁর মাথায় আঘাত করেছে। তিনি তাৎক্ষণিক তাঁর বোনের বাড়ির দিকে রওনা দিলেন। উদ্দেশ্য তাকে ও তাঁর স্বামীকে হত্যা করবেন। তাঁর বোন ফাতেমা ও ভগ্নিপতি সাইদ তখন ঘরেই ছিলেন। হযরত খাব্বাব বিন আরাতও তাদেরকে কোরআন তেলাওয়াত করাচ্ছিলেন। ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বোনের ঘরের দরজায় এসে ভেতরে কোরআন তেলাওয়াতের আওয়াজ শুনতে পেলেন, কিন্তু আওয়াজ ক্ষীণ হওয়ার কারণে স্পষ্ট বুঝলেন না। তিনি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ডাক দিলেন। তাঁর আওয়াজ শোনার সাথে সাথে তাঁর বোন ফাতেমা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু কোরআন লিখিত মাসহাফটি লুকিয়ে ফেলেন এবং খাব্বাব বিন আরাতও ঘরের ভেতরে এক জায়গায় আড়াল করে রাখলেন। ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ঘরে প্রবেশ করে জিজ্ঞেস করলেন- আমি যা শুনেছি তা কিসের আওয়াজ। তাঁরা বললেন, আমরা কথাবার্তা বলছিলাম। তিনি বললেন, বরং তোমরা মুহাম্মাদের ধর্ম অনুসরণ করেছ। এরপর তিনি সাইদের দিকে ছুটে গিয়ে তাকে বেদম প্রহার করেন।
হযরত সাঈদ তখন বলছিলেন, ওমর! তোমার অভিমত কি? যদি সত্য তোমার ধর্ম না থেকে অন্য ধর্মে থাকে? হযরত ফাতেমা তাঁর স্বামী সাইদকে রক্ষা করার জন্য এগিয়ে গেলেন। ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু তাঁকেও আঘাত করলেন। এতে তাঁর চেহারায় রক্ত লেগে গেল। তাঁর চেহারায় রক্ত দেখে ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু থেমে গেলেন। তাঁর বোন বললেন, ওমর! সত্য যদি তোমার ধর্মে না থেকে অন্য ধর্মে থাকে? ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন, তোমরা যে সহিফা পাঠ করছিলে তা আমার কাছে দাও। তাঁরা বললেন, তুমি অপবিত্র, তুমি শিরকের ওপর আছ, এ সহিফা অপবিত্র ব্যক্তিরা স্পর্শ করতে পারে না। তুমি গিয়ে গোসল করে আসো না হয় অযু করে আসো। তাঁর কথামত তিনি গিয়ে অযু করে আসলেন। এরপর সহিফা হাতে নিলেন। হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু পড়ামাত্র জানলেন। তিনি তা হাতে নিয়ে তেলাওয়াত করতে লাগলেন। আয়াতগুলো তেলাওয়াত করার পর তাঁর মাঝে ঈমানের নূর জ্বলে উঠল। কোরআনের মর্মার্থ তিনি ভালোভাবে বুঝতে পেরেছেন। কেননা তিনি তৎকালীন শিক্ষিত ব্যক্তিদের একজন ছিলেন। কোরআনের ভাবগত অলংকার ও মাধুর্যতা তাঁকে মুগ্ধ করেছে। তিনি বুঝতে পেরেছেন এ বাণী কোনো মানুষের রচিত নয়। তিনি বলতে লাগলেন, আমাকে মুহাম্মাদের কাছে নিয়ে যাও। তাঁরা মুখে এ কথা শোনার সাথে সাথে খাব্বাব বিন আরাতও আড়াল থেকে বের হয়ে বললেন, ওমর! সুসংবাদ গ্রহণ কর। আল্লাহর শপথ! আমি আশা করেছি আল্লাহ তাআলা তাঁর নবীর দোয়া কবুল করবেন। আমি শুনেছি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দোয়া করেছিলেন, হে আল্লাহ ওমর বিন খাত্তাব অথবা আমর বিন হিশামের দ্বারা তুমি ইসলামকে শক্তিশালী কর। তখন ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন, খাব্বাব! তাঁর কাছে নিয়ে যাও যাতেও আমি ইসলাম গ্রহণ করতে পারি। হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু খাব্বাব রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু-এর সাথে চলতে লাগলেন। তাঁর কাছে মনে হচ্ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাঝে তাঁর এক বিশাল পাহাড় ছিল তিনি তা অতি দ্রুত তার হাত দিয়ে তাঁর কাছে পৌঁছতে চাচ্ছিলেন। হযরত ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু যখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর কাছে গিয়ে পৌঁছলেন তখনো তাঁর তরবারি কাঁধে ঝুলানো ছিল। তাঁকে এ অবস্থায় দেখে মুসলমানগণ ভয় পেয়ে গেছেন। তাঁরা বলতে লাগলেন, কাঁধে তরবারি ঝুলিয়ে ওমর এসেছেন।
তখন হযরত হামযা রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বলছিলেন, হে আল্লাহ রাসূল অনুমতি দিন, যদি সে ভালোর জন্যে আসে তবে তো ভালো আর যদি খারাপ কোনো উদ্দেশ্যে আসে তবে তার তরবারি দিয়ে তাকে হত্যা করব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে প্রবেশ করার অনুমতি দিলেন। অনুমতি পেয়ে তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দরবারে প্রবেশ করলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কে ধমকের সুরে বললেন, খাত্তাবের ছেলে! তোমাকে কিসে নিয়ে এসেছে? আল্লাহর শপথ! আমি তো দেখছি আল্লাহর শাস্তি না আসার আগে তুমি কুফরি থেকে ফিরে আসবে না। তখন ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও তিনি যা নিয়ে এসেছেন এর ওপর ঈমান আনাতে এসেছি। তাঁর মুখে এমন কথা শুনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকবির দিলেন। তাকবিরের আওয়াজ শুনে মুসলমানগণ বুঝতে পেরেছেন, ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু ইসলাম গ্রহণ করেছেন। এতে তাঁরা এত জোরে তাকবির দিলেন যে, তা মক্কার অধিবাসী সবাই শুনেছে। আল্লাহ তাআলা ওমর রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু -কে হেদায়েত দিয়েছেন এবং মুসলমানদেরকে বিজয় দিয়েছেন। কেননা তাঁকে মক্কার সবাই ভয় করত। তাঁর ইসলাম গ্রহণের পর মুসলমানগণ একে অপরকে সুসংবাদ দিতে লাগলেন।

টিকাঃ
২২৪ বুখারীর রাশিদীর দিন আজকাল।
২২৫ খলীফাদের রাশিদীর দিন আল-আফযাল।

উমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের কারণ নিয়ে বিভিন্ন বর্ণনা পাওয়া যায়। একটি বর্ণনায় রয়েছে, নবুয়তের ষষ্ঠ বছরে যুলুম-নির্যাতনের এক পর্যায়ে আল্লাহর রাসুল (সা) দোয়া করেছিলেন, 'হে আল্লাহ, উমর ইবনে খাত্তাব এবং আবু জাহেলের মধ্যে তোমার কাছে যে ব্যক্তি বেশি পছন্দনীয়, তাকে ইসলাম গ্রহণের সুযোগ দিয়ে ইসলামের শক্তি বৃদ্ধি করো'।[[1](https://www.google.com/url?sa=E&q=https%3A%2F%2Fvertexaisearch.cloud.google.com%2Fgrounding-api-redirect%2FAUZIYQGDhfal10Ow8OXnqIWUJPym7vtdMvfub7xTGJQtpSUIql1NK-85NMvbW1YATOvblIAs-s_ArniME6f9Wz5SBd17TF6J5YFJZcrXgVausKKiFU21GZFdy964ROHhelLJR48DK_QnTyu4b5SGVe_uz1-r2OxKJ4luo3UH7ltmsvrHD5_Bp-QlhDShApsWWsfPsPumNS6DonLqs0IHwFnXazfUwU1K4oMj46dZa3-fpV2t2ueevu8nUqexZwlRDzbMMWU3LwVoeYwfloTXFZKA2HRqNWaUkHBnZR9nMHhUCJM7dEemcOQVL-LYq39o7WJ1JlkH_XJKPH8JwR7WGYKpwdVTg5zv157N425Vw_TLwNDL4Q6_xFuo_SqkeYD5osBTrBGquY81ScQ%3D)][[2](https://www.google.com/url?sa=E&q=https%3A%2F%2Fvertexaisearch.cloud.google.com%2Fgrounding-api-redirect%2FAUZIYQGcnN0hSKzyKS1K9uG9vrCWNWwjRZQvnBh8re9_d14067K9h8AZ2Fv0YIeeLcW6sdkglm9Szy-qUhKp3ZF5yAI1AZUvam1M_qwtqvzfhCOOukm-gxjyputadrQ7loDVshogxufFOQvERcD4KcGA3A%3D%3D)] আল্লাহর কাছে উমর (রা) অধিক প্রিয় ছিলেন এবং এই দোয়া কবুল হয়েছিল।[[1](https://www.google.com/url?sa=E&q=https%3A%2F%2Fvertexaisearch.cloud.google.com%2Fgrounding-api-redirect%2FAUZIYQGDhfal10Ow8OXnqIWUJPym7vtdMvfub7xTGJQtpSUIql1NK-85NMvbW1YATOvblIAs-s_ArniME6f9Wz5SBd17TF6J5YFJZcrXgVausKKiFU21GZFdy964ROHhelLJR48DK_QnTyu4b5SGVe_uz1-r2OxKJ4luo3UH7ltmsvrHD5_Bp-QlhDShApsWWsfPsPumNS6DonLqs0IHwFnXazfUwU1K4oMj46dZa3-fpV2t2ueevu8nUqexZwlRDzbMMWU3LwVoeYwfloTXFZKA2HRqNWaUkHBnZR9nMHhUCJM7dEemcOQVL-LYq39o7WJ1JlkH_XJKPH8JwR7WGYKpwdVTg5zv157N425Vw_TLwNDL4Q6_xFuo_SqkeYD5osBTrBGquY81ScQ%3D)]

অন্য একটি ঘটনা অনুসারে, একদিন উমর (রা) রাসুল (সা)-কে হত্যা করার উদ্দেশ্যে খোলা তলোয়ার নিয়ে বেরিয়ে পড়েন।[[2](https://www.google.com/url?sa=E&q=https%3A%2F%2Fvertexaisearch.cloud.google.com%2Fgrounding-api-redirect%2FAUZIYQGcnN0hSKzyKS1K9uG9vrCWNWwjRZQvnBh8re9_d14067K9h8AZ2Fv0YIeeLcW6sdkglm9Szy-qUhKp3ZF5yAI1AZUvam1M_qwtqvzfhCOOukm-gxjyputadrQ7loDVshogxufFOQvERcD4KcGA3A%3D%3D)][[3](https://www.google.com/url?sa=E&q=https%3A%2F%2Fvertexaisearch.cloud.google.com%2Fgrounding-api-redirect%2FAUZIYQFHJpPptog8aLr2We-rxgeTqY135VXVPB01XJg-lckQGD2L_UIsVJWAoe13G6jM56LOkw7fhCjoXYfHgMFlz6U6X8cYQPynUVHKl1oWxWUlF2kd-VCx6CyHGd_TJcdmNmL57EynPb7UTs602tqz7nk%3D)][[4](https://www.google.com/url?sa=E&q=https%3A%2F%2Fvertexaisearch.cloud.google.com%2Fgrounding-api-redirect%2FAUZIYQEljclexZpUjaN5epyaRh0rYP2jxL_twKIcpEqFQHN_gnJbiY0_bARLBImdMDswg9_w21jih8UTahtNJOQGXHC1US_xCyjpq6OVwAi4FjNDVf6sLxrhESQbxKrcVJLnR03CoXi8D-K8gEg_HMofuRGAVUywylzT0mypWeTKplUx)] পথে নুয়াইম ইবনে আবদুল্লাহর সাথে তাঁর দেখা হয়।[[3](https://www.google.com/url?sa=E&q=https%3A%2F%2Fvertexaisearch.cloud.google.com%2Fgrounding-api-redirect%2FAUZIYQFHJpPptog8aLr2We-rxgeTqY135VXVPB01XJg-lckQGD2L_UIsVJWAoe13G6jM56LOkw7fhCjoXYfHgMFlz6U6X8cYQPynUVHKl1oWxWUlF2kd-VCx6CyHGd_TJcdmNmL57EynPb7UTs602tqz7nk%3D)][[5](https://www.google.com/url?sa=E&q=https%3A%2F%2Fvertexaisearch.cloud.google.com%2Fgrounding-api-redirect%2FAUZIYQEpAi7Sc2UFA67k9MF-RCqn3Atfz8Kc4J4jPVpe9fmaFivNwVxh2HSX8DkqJY7Pok-EK5gkO17m3hlmlKibXyhZZtwwSxAox_50GDcWH2ueLfmvCyuFwMsmskfx_btk0G5LNAovRefG_WGkx4lfs2y0rtj_XUHIYiVbKu0VHcCTbl2FaqbOn1pYUoxw9Ovv3YW2LyVEOE0zoYDZXYLQ0Qbd_1r1y2xIiES4ThgNyvekPAF1l8PO5GVbvfkSiV6_YKy_UkhN8IJ1ILUQfcI0P_2wdY6eB70zDlzBxZJwwOYfwKaAmqIauQfC6RFgNu7XQicJsYzWCFRVctM0CtnFGWJy)] নুয়াইম উমরের উদ্দেশ্য জানতে পেরে তাঁকে প্রথমে নিজের বোন ফাতিমা ও ভগ্নিপতি সাঈদের খবর নিতে বলেন, যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।[[3](https://www.google.com/url?sa=E&q=https%3A%2F%2Fvertexaisearch.cloud.google.com%2Fgrounding-api-redirect%2FAUZIYQFHJpPptog8aLr2We-rxgeTqY135VXVPB01XJg-lckQGD2L_UIsVJWAoe13G6jM56LOkw7fhCjoXYfHgMFlz6U6X8cYQPynUVHKl1oWxWUlF2kd-VCx6CyHGd_TJcdmNmL57EynPb7UTs602tqz7nk%3D)][[5](https://www.google.com/url?sa=E&q=https%3A%2F%2Fvertexaisearch.cloud.google.com%2Fgrounding-api-redirect%2FAUZIYQEpAi7Sc2UFA67k9MF-RCqn3Atfz8Kc4J4jPVpe9fmaFivNwVxh2HSX8DkqJY7Pok-EK5gkO17m3hlmlKibXyhZZtwwSxAox_50GDcWH2ueLfmvCyuFwMsmskfx_btk0G5LNAovRefG_WGkx4lfs2y0rtj_XUHIYiVbKu0VHcCTbl2FaqbOn1pYUoxw9Ovv3YW2LyVEOE0zoYDZXYLQ0Qbd_1r1y2xIiES4ThgNyvekPAF1l8PO5GVbvfkSiV6_YKy_UkhN8IJ1ILUQfcI0P_2wdY6eB70zDlzBxZJwwOYfwKaAmqIauQfC6RFgNu7XQicJsYzWCFRVctM0CtnFGWJy)] উমর রেগে গিয়ে বোনের বাড়িতে যান এবং সেখানে খাব্বাব (রা)-কে কুরআন পাঠ করতে শোনেন। ঘরে ঢুকে তিনি বোন ও ভগ্নিপতিকে মারধর করেন।[[2](https://www.google.com/url?sa=E&q=https%3A%2F%2Fvertexaisearch.cloud.google.com%2Fgrounding-api-redirect%2FAUZIYQGcnN0hSKzyKS1K9uG9vrCWNWwjRZQvnBh8re9_d14067K9h8AZ2Fv0YIeeLcW6sdkglm9Szy-qUhKp3ZF5yAI1AZUvam1M_qwtqvzfhCOOukm-gxjyputadrQ7loDVshogxufFOQvERcD4KcGA3A%3D%3D)] কিন্তু বোনের দৃঢ়তা এবং কুরআনের প্রতি তাঁর ভালোবাসা দেখে উমরের মন নরম হয়।[[2](https://www.google.com/url?sa=E&q=https%3A%2F%2Fvertexaisearch.cloud.google.com%2Fgrounding-api-redirect%2FAUZIYQGcnN0hSKzyKS1K9uG9vrCWNWwjRZQvnBh8re9_d14067K9h8AZ2Fv0YIeeLcW6sdkglm9Szy-qUhKp3ZF5yAI1AZUvam1M_qwtqvzfhCOOukm-gxjyputadrQ7loDVshogxufFOQvERcD4KcGA3A%3D%3D)] তিনি গোসল করে পবিত্র হয়ে সূরা ত্বোয়া-হা পাঠ করেন এবং এর ভাষাশৈলীতে মুগ্ধ হয়ে যান।[[1](https://www.google.com/url?sa=E&q=https%3A%2F%2Fvertexaisearch.cloud.google.com%2Fgrounding-api-redirect%2FAUZIYQGDhfal10Ow8OXnqIWUJPym7vtdMvfub7xTGJQtpSUIql1NK-85NMvbW1YATOvblIAs-s_ArniME6f9Wz5SBd17TF6J5YFJZcrXgVausKKiFU21GZFdy964ROHhelLJR48DK_QnTyu4b5SGVe_uz1-r2OxKJ4luo3UH7ltmsvrHD5_Bp-QlhDShApsWWsfPsPumNS6DonLqs0IHwFnXazfUwU1K4oMj46dZa3-fpV2t2ueevu8nUqexZwlRDzbMMWU3LwVoeYwfloTXFZKA2HRqNWaUkHBnZR9nMHhUCJM7dEemcOQVL-LYq39o7WJ1JlkH_XJKPH8JwR7WGYKpwdVTg5zv157N425Vw_TLwNDL4Q6_xFuo_SqkeYD5osBTrBGquY81ScQ%3D)][[3](https://www.google.com/url?sa=E&q=https%3A%2F%2Fvertexaisearch.cloud.google.com%2Fgrounding-api-redirect%2FAUZIYQFHJpPptog8aLr2We-rxgeTqY135VXVPB01XJg-lckQGD2L_UIsVJWAoe13G6jM56LOkw7fhCjoXYfHgMFlz6U6X8cYQPynUVHKl1oWxWUlF2kd-VCx6CyHGd_TJcdmNmL57EynPb7UTs602tqz7nk%3D)] এরপর তিনি রাসুল (সা)-এর কাছে গিয়ে ইসলাম গ্রহণ করেন।[[1](https://www.google.com/url?sa=E&q=https%3A%2F%2Fvertexaisearch.cloud.google.com%2Fgrounding-api-redirect%2FAUZIYQGDhfal10Ow8OXnqIWUJPym7vtdMvfub7xTGJQtpSUIql1NK-85NMvbW1YATOvblIAs-s_ArniME6f9Wz5SBd17TF6J5YFJZcrXgVausKKiFU21GZFdy964ROHhelLJR48DK_QnTyu4b5SGVe_uz1-r2OxKJ4luo3UH7ltmsvrHD5_Bp-QlhDShApsWWsfPsPumNS6DonLqs0IHwFnXazfUwU1K4oMj46dZa3-fpV2t2ueevu8nUqexZwlRDzbMMWU3LwVoeYwfloTXFZKA2HRqNWaUkHBnZR9nMHhUCJM7dEemcOQVL-LYq39o7WJ1JlkH_XJKPH8JwR7WGYKpwdVTg5zv157N425Vw_TLwNDL4Q6_xFuo_SqkeYD5osBTrBGquY81ScQ%3D)][[2](https://www.google.com/url?sa=E&q=https%3A%2F%2Fvertexaisearch.cloud.google.com%2Fgrounding-api-redirect%2FAUZIYQGcnN0hSKzyKS1K9uG9vrCWNWwjRZQvnBh8re9_d14067K9h8AZ2Fv0YIeeLcW6sdkglm9Szy-qUhKp3ZF5yAI1AZUvam1M_qwtqvzfhCOOukm-gxjyputadrQ7loDVshogxufFOQvERcD4KcGA3A%3D%3D)]

আরেকটি বর্ণনায় আছে, উমর (রা) নিজেই বলেছেন যে তিনি কাবা ঘরে রাসুল (সা)-এর নামাজে সূরা আল-হাক্কাহ-এর তিলাওয়াত শুনে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হন। কুরআনের বাণী তাঁর হৃদয়ে গভীরভাবে রেখাপাত করে এবং তিনি বুঝতে পারেন এটি কোনো কবি বা গণকের কথা নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিলকৃত।[[4](https://www.google.com/url?sa=E&q=https%3A%2F%2Fvertexaisearch.cloud.google.com%2Fgrounding-api-redirect%2FAUZIYQEljclexZpUjaN5epyaRh0rYP2jxL_twKIcpEqFQHN_gnJbiY0_bARLBImdMDswg9_w21jih8UTahtNJOQGXHC1US_xCyjpq6OVwAi4FjNDVf6sLxrhESQbxKrcVJLnR03CoXi8D-K8gEg_HMofuRGAVUywylzT0mypWeTKplUx)][[6](https://www.google.com/url?sa=E&q=https%3A%2F%2Fvertexaisearch.cloud.google.com%2Fgrounding-api-redirect%2FAUZIYQEG31bR_MPnmlUdrsFhJl6PUQOAE2Z9RMmPPJpV77ahEXY2EvFypedrLMzWhzYKeQCP4qAJeDpWSMDa2F6aifb2gCmW1O-FXNN7dBjm7UZcorndNr3Gg6NWLcWmSiAyA_WZDB41brtHmgY-aw%3D%3D)]

ইবন ইসহাক বলেন : আমি যতদূর জানতে পেরেছি , উমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের কারণ ছিল নিম্নরূপ :
উমরের বোন ফাতিমা বিনত খাত্তাব ও তাঁর স্বামী সাঈদ ইবন যায়দ ইবন আমর ইবন নুফায়ল ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন । কিন্তু তাঁরা তাঁদের ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটি উমরের কাছ থেকে গোপন রেখেছিলেন । মক্কার আর এক ব্যক্তি নাঈম ইবন আবদুল্লাহ্ নাহহামও একইভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন । উমরের স্বগোত্রীয় অর্থাৎ বনূ আদী ইবন কা'বের অন্তর্ভুক্ত এ ব্যক্তি নিজ গোত্রের অত্যাচারের ভয়ে নিজের ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করেন নি । খাব্বাব ইব্‌ন আরাত গোপনে ফাতিমা বিন্ত খাত্তাব (রা)-এর কাছে যাতায়াত করতেন এবং তাঁকে তিনি কুরআন পড়াতেন ।

ইবনে ইসহাক থেকে বর্ণিত আছে যে, ওমরের বোন ফাতিমা বিনতে খাত্তাব ও তাঁর স্বামী সাঈদ বিন যায়েদ বিন আমর বিন নুফায়েল ওমরের আগেই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তাঁরা তাঁদের ইসলাম গ্রহণের কথা ওমরের কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছিলেন। মক্কার আর এক ব্যক্তি নাঈম বিন আবদুল্লাহ আন নাহহামও একইভাবে গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। ওমরের স্বগোত্রীয় অর্থাৎ বনু আদি বিন কা'বের অন্তর্ভুক্ত এই ব্যক্তি নিজ গোত্রের অত্যাচারের ভয়ে নিজের ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করেননি। খাব্বাব ইবনুল আরাত¹ নামক এক নওমুসলিম গোপনে ফাতিমা বিনতে খাত্তাবকে কুরআন পড়িয়ে যেতেন। একদিন ওমর ইবনুল খাত্তাব উন্মুক্ত তরবারী হাতে নিয়ে রাসূল (সাঃ) ও তাঁর একদল সাহাবীর সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন। তিনি জানতে পেরেছিলেন যে, প্রায় ৪০ জন নারী ও পুরুষ সাহাবীসহ রাসূল (সাঃ) সাফা পাহাড়ের নিকটবর্তী একটা ঘরে সমবেত রয়েছেন। রাসূল (সাঃ) এর সাথে তাঁর চাচা হামযা ইবনে আবদুল মুতালিব, আবু বকর সিদ্দীক বিন আবু কুহাফা ও আলী বিন আবু তালেবসহ এমন কিছু সংখ্যক মুসলমান ছিলেন যারা রাসূল (সাঃ) এর সাথে মক্কায় অবস্থান করছিলেন এবং আবিসিনিয়ায় হিজরতকারীদের সাথে হিজরত করেননি।

পথে নাঈম বিন আবদুল্লাহর সাথে ওমরের দেখা হলো। তিনি বললেন, কোথায় চলেছ ওমর? ওমর বললেন, “ধর্মচ্যুত মুহাম্মদের সন্ধানে চলেছি, যে কুরাইশ বংশে বিভেদ সৃষ্টি করেছে, তাদের বুদ্ধিমানদেরকে বোকা সাব্যস্ত করেছে, তাদের অনুসৃত ধর্মের নিন্দা করেছে এবং তাদের দেবদেবীকে গালাগাল করেছে। আমি ওকে হত্যা করবো।" নাঈম বললেন, “ওহে ওমর, আল্লাহ্র কসম, তুমি আত্মপ্রবঞ্চনার শিকার হয়েছ। তুমি কি মনে কর, মুহাম্মদকে হত্যা করার পর বনু আবদ মানাফ তোমাকে ছেড়ে দেবে আর তুমি পৃথিবীর ওপর অবাধে বিচরণ করে বেড়াতে পারবে? তোমার কি উচিত নয় আগে নিজের পরিবার পরিজনের দিকে মনোনিবেশ করা এবং তাদেরকে শোধরানো?” ওমর বললেন: "আমার পরিবার পরিজনের কি হলো?" নাঈম বললেন, "তোমার ভগ্নিপতি ও চাচাতো ভাই সাঈদ বিন যায়েদ বিন আমর এবং তোমার বোন ফাতিমা বিনতে খাত্তাব। আল্লাহর কসম, তাঁরা উভয়ে ইসলাম গ্রহণ করেছে এবং মুহাম্মদের ধর্ম অনুসরণ করছে। পারলে তাদেরকে সামলাও।”

ওমর তৎক্ষণাৎ ফিরে গেলেন তাঁর বোন ও ভগ্নিপতির বাড়ির দিকে। যখন তিনি তাঁদের কাছে রওনা হলেন তখন তাঁদের কাছে খাব্বাব ইবনুল আরাত ছিলেন। তিনি তাঁদেরকে পবিত্র কুরআনের একটি অংশ হাতে নিয়ে পড়াচ্ছিলেন। এই অংশটিতে ছিল সূরা ত্বা-হা। ওমরের আওয়াজ শুনে খাব্বাব গা ঢাকা দিলেন। তিনি ঘরের কোন এক অংশে লুকিয়ে রইলেন। আর ফাতেমা কুরআনের অংশটি নিজের উরুর নিচে চাপা দিয়ে রাখলেন।

ঘরের কাছাকাছি পৌছাার পর ওমর খাব্বাবের পড়ার আওয়াজ শুনেছিলেন। ঘরে ঢুকে তিনি বললেন, “একটা দুর্বোধ্য বাণী আবৃত্তি করার আওয়াজ শুনছিলাম। ওটা কি?” তাঁরা উভয়ে বললেন, "না, আপনি কিছুই শোনেননি।” ওমর বললেন, "নিশ্চয়ই শুনেছি। আর আল্লাহর কসম, এটাও জেনেছি যে, তোমরা দু'জনে মুহাম্মাদের অনুসারী হয়ে গেছ।” কথাটা বলে ভগ্নিপতি সাঈদকে প্রবলভাবে জাপটে ধরলেন। তাঁর বোন ফাতিমা বিনতে খাত্তাব স্বামীকে বাঁচাতে ছুটে গেলে তিনি তাঁকে মেরে জখম করে দিলেন। এই কাণ্ড ঘটানোর পর তাঁর বোন ও ভগ্নিপতি একযোগে তাঁকে বললেন, “হাঁ, আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি। আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছি। এখন যা করতে চান করুন।” ওমর যখন দেখলেন তাঁর বোনের শরীর রক্তাক্ত, তখন অনুতপ্ত হলেন।

তিনি স্বীয় বোনকে বললেন, "আমাকে এই পুস্তিকাটি দাও, যা এইমাত্র তোমাদেরকে পড়তে শুনলাম। আমি একটু দেখবো মুহাম্মাদ কি জিনিস নিয়ে এসেছে।" ওমর লেখাপড়া জানতেন। তিনি এ কথা বললে তাঁর বোন তাঁকে বললো, "আমার ভয় হয় আপনি নষ্ট করে ফেলেন কিনা।" ওমর বললেন, "ভয় পেয়ো না!” অতঃপর তিনি নিজের দেবদেবীর শপথ করে বললেন, "ওটি আমি পড়েই তোমার কাছে ফিরিয়ে দেবো।” ওমরের এ কথাটা শুনে ফাতিমার মনে আশার সঞ্চার হলো যে, ওমর ইসলাম গ্রহণ করতে পারে। তিনি বললেন, "ভাইজান। আপনি যে অপবিত্র! কেননা আপনি এখনো মোশরেক। অথচ এই পবিত্র গ্রন্থকে পবিত্র ব্যক্তি ছাড়া স্পর্শ করতে পারে না।” ওমর তৎক্ষণাৎ উঠে চলে গেলেন এবং গোসল করে এলেন। এবার ফাতিমা তাঁকে পুস্তিকাখানি দিলেন। তাতে সূরা ত্বা-হা লিখিত ছিল। তিনি তা পড়লেন। প্রথম অংশটি পড়েই বললেনঃ "আহ্! কি সুন্দর কথা! কী মহৎ বাণী!” তাঁর এ উক্তি শুনে খাব্বাব তাঁর সামনে বেরিয়ে এলেন। তিনি তাঁকে বললেন, "হে ওমর! আল্লাহর কসম, আমার মনে আশার সঞ্চার হচ্ছে যে আল্লাহ হয়তো আপনাকে তাঁর নবীর দাওয়াত গ্রহণের জন্য মনোনীত করেছেন। আমি গতকাল শুনলাম রাসূল (সাঃ) দোয়া করছেন, “হে আল্লাহ! তুমি আবুল হিকাম বিন হিশাম অথবা ওমর ইবনুল খাত্তাবের দ্বারা ইসলামের শক্তি বৃদ্ধি কর। অতএব, আল্লাহর দিকে অগ্রসর হোন, আল্লাহর দিকে অগ্রসর হোন হে ওমর।"

ওমর বললেন, "হে খাব্বাব! আমাকে মুহাম্মাদের সন্ধান দাও। আমি তাঁর কাছে যেয়ে ইসলাম গ্রহণ করবো।” খাব্বাব বললেন, "তিনি সাফা পাহাড়ের নিকট একটি বাড়িতে আছেন। সেখানে তাঁর সাথে তাঁর একদল সাহাবী রয়েছেন।” ওমর তাঁর তরবারী আগের মতই খোলা অবস্থায় ধরে নিয়ে রাসূল (সাঃ) ও তাঁর সাহাবীদের কাছে চললেন। সেখানে গিয়ে দরজায় কড়া নাড়লেন। ভেতর থেকে তাঁর আওয়াজ শুনে রাসূল (সাঃ) এর জনৈক সাহাবী দরজার কাছে এগিয়ে গিয়ে ভেতর থেকে তাকালেন। দেখলেন ওমর মুক্ত তরবারী হাতে দাঁড়িয়ে। তিনি শংকিত চিত্তে রাসূল (সাঃ) এর কাছে ফিরে গিয়ে বললেনঃ “হে রাসূলুল্লাহ! এ যে ওমর ইবনুল খাত্তাব একেবারে নগ্ন তরবারী হাতে!” হামযা ইবনে আবদুল মুত্তালিব বললেন, “ওকে ভেতরে আসার অনুমতি দিন। সে যদি কোন শুভ কামনা নিয়ে এসে থাকে, আমরা তাঁর প্রতি বদান্যতা দেখাবে। আর যদি কোন কু-বাসনা নিয়ে এসে থাকে তাহলে ওর তরবারী দিয়েই ওকে হত্যা করবো।” রাসূল (সাঃ) বললেন, "ওকে ভেতরে আসতে দাও।” উক্ত সাহাবী তাকে ভেতরে আসতে দিলেন। রাসূল (সাঃ) নিজে উঠে তাঁর কাছে এগিয়ে গেলেন এবং নিজের কক্ষে নিয়ে গিয়ে তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করলেন।

রাসূল (সাঃ) তাঁর পাজামা বাঁধার জায়গা অথবা যেখানে চাদরের দুই কোণা মিলিত হয়, সেখানটা ধরে তাঁকে প্রবল জোরে আকর্ষণ করলেন এবং বললেন, "কি হে খাত্তাবের পুত্র! তোমার এখানে আগমন ঘটলো কিভাবে! আমার তো মনে হয়, আল্লাহ তোমার ওপর কোন বিপর্যয় না নামানো পর্যন্ত তুমি ফিরবে না।” ওমর বললেন, “হে রাসূলুল্লাহ! আমি আপনার কাছে এসেছি আল্লাহর ওপর, তাঁর রাসূলের ওপর ও আপনার কাছে আল্লাহর পক্ষ থেকে যা কিছু আসে তাঁর ওপর ঈমান আনবার জন্য।” এ কথা শোনামাত্র রাসূল (সাঃ) এমন জোরে "আল্লাহু আকবার" বলে উঠলেন যে, ঐ ঘরের ভেতরে রাসূল (সাঃ) এর যে কয়জন সাহাবী ছিলেন সবাই বুঝলেন যে, ওমর ইসলাম গ্রহণ করেছে।

এরপর রাসূল (সাঃ) এর সাহাবীগণ যার যার জায়গায় চলে গেলেন। হামযার পর ওমর (রাঃ) এর ইসলাম গ্রহণে তাঁদের মনোবল ও আত্মমর্যাদা বেড়ে গেল। তাঁরা নিশ্চিত হলেন যে, ওঁরা দুজন রাসূল (সাঃ) এর প্রতিরক্ষায় অবদান রাখবেন এবং ইসলামের দুশমনদের মোকাবিলায় মুসলমানদের সহযোগিতা করবেন।

ওমর ইবনুল খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে আতা ও মুজাহিদের বর্ণনা : ইবনে ইসহাক বলেন, আবদুল্লাহ ইবনে আবি নুজাইহ আল মাক্কী স্বীয় শিষ্য আতা, মুজাহিদ অথবা অন্যান্য বর্ণনাকারীদের থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ওমর (রাঃ) এর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে ব্যাপক জনশ্রুতি রয়েছে যে তিনি স্বয়ং নিম্নরূপ বলতেনঃ "আমি ইসলামের কট্টর বিরোধী ছিলাম। জাহেলী যুগে আমি মদের খুব ভক্ত ছিলাম। মদ পেলে খুবই আনন্দিত হতাম। আমাদের একটা মজলিশ বসতো উমার বিন আবদ বিন ইমরান আল মাখযুমীর পারিবারিক বাসস্থানের নিকটস্থ খাজওয়ারা নামক স্থানে। সেখানে কুরাইশের বহু লোক সমবেত হতো। একদিন রাতে ঐ আসরে আমার সহযোগীদের উদ্দেশ্যে গেলাম। কিন্তু তাঁদের কাউকেই পেলাম না। এরপর ভাবলাম, মক্কার অমুক মদ বিক্রেতার কাছে গেলে হয়তো মদ খেতে পারতাম। তাঁর উদ্দেশ্যে গেলাম। কিন্তু তাঁকে পেলাম না। এরপর মনে মনে বললাম, কা'বা শরীফে গিয়ে যদি সাতবার অথবা সত্তুরবার তওয়াফ করতাম, মন্দ হতো না। অতঃপর কা'বা শরীফে তওয়াফ করার জন্য মসজিদুল হারামে উপনীত হলাম। সেখানে দেখলাম, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) নামাযে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি তখনো সিরিয়ার দিকে মুখ করে নামায পড়তেন। নিজের ও সিরিয়ার মাঝখানে কা'বা শরীফকে রাখতেন। রূকনে আসওয়াদ ও রূকনে ইয়ামানীর মাঝে বসে তিনি নামায পড়তেন। তাঁকে দেখেই আপন মনে বললাম, আল্লাহর কসম, আজকের রাতটা যদি মুহাম্মাদের (সাঃ) আবৃত্তি শুনে কাটিয়ে দিতাম এবং সেকি বলে তা অবহিত হতাম, তাহলেও কাজ হতো। কিন্তু সেই সাথে এটাও ভাবলাম যে, মুহাম্মাদের (সাঃ) খুব কাছে গিয়ে যদি শুনি তাহলে তিনি ভয় পেয়ে যাবেন। তাই হাজরে আসওয়াদের দিক থেকে এলাম, কা'বা শরীফের পর্দার আড়ালে লুকিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেলাম। রাসূল (সাঃ) তখনো যথারীতি দাঁড়িয়ে নামাযে কুরআন পাঠ করে যাচ্ছেন। অবশেষে আমি তাঁর ঠিক সামনে কা'বার পর্দার আড়ালে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।

যখন কুরআন শুনলাম, আমার মন নরম হয়ে গেল। আমি কেঁদে দিলাম। ইসলাম আমার মনমগজ দখল করে ফেললো। রাসূল (সাঃ) নামায শেষ করে চলে না যাওয়া পর্যন্ত আমি ওখানেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। তিনি যখন কা'বা থেকে যেতেন, ইবনে আবি হুসাইনের বাড়ির কাছ দিয়ে যেতেন। এই বাড়ী ছিল তাঁর সাফা ও মারওয়ার দৌড়েরও শেষ সীমা। সেখান থেকে আব্বাস ইবনে আব্দুল মুত্তালিবের বাড়ী এবং আজহার বিন আবদ আওফ আযযুহরীর বাড়ির মাঝখান দিয়ে, তারপর আখনাস বিন শুরাইকের বাড়ী হয়ে নিজের বাড়ীতে চলে যেতেন। দারুর রাকতাতে ছিল রাসূল (সাঃ) এর বাড়ী। ওমর (রাঃ) বলেন, আমি রাসূল (সাঃ) এর পিছু পিছু চলতে লাগলাম। যখন তিনি আব্বাসের বাড়ী ও ইবনে আযহারের বাড়ীর মাঝখানে পৌছলেন, তখন তাঁকে গিয়ে ধরলাম। আমার আওয়ায শুনেই রাসূল (সাঃ) আমাকে চিনে ফেললেন। রাসূল (সাঃ) মনে করলেন আমি তাঁকে কষ্ট দিতে এসেছি। তাই তিনি আমাকে একটা ধমক দিলেন। ধমক দিয়েই আবার জিজ্ঞাসা করলেন, “ওহে খাত্তাবের পুত্র! এ মুহূর্তে তুমি কি উদ্দেশ্যে এসেছ?” আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি এবং তাঁর কাছে যা কিছু আল্লাহর কাছ থেকে আসে, তাঁর প্রতি ঈমান আনার উদ্দেশ্যে।” এ কথা শুনে রাসূল (সাঃ) আল্লাহর প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলেন। তারপর বললেন, "হে ওমর! আল্লাহ তোমাকে হেদায়েত করেছেন।” তারপর তিনি আমার বুকে হাত বুলালেন এবং আমি যাতে ইসলামের ওপর অবিচল থাকি সে জন্য দোয়া করলেন। অতঃপর রাসূল (সাঃ) এর কাছ থেকে বিদায় হলাম এবং তিনি নিজের বাড়ীতে প্রবেশ করলেন।"

টিকাঃ
১. বনু তামীম বংশোদ্ভূত এই সাহাবী জাহেলিয়াতের যুগে তরবারী তৈরির পেশায় নিয়োজিত ছিলেন এবং বনু খোযায়া গোত্রের উম্মে আনমার নাম্মী মহিলার মুক্ত গোলাম ছিলেন।

ইবন ইসহাক বলেন : আমি যতদূর জানতে পেরেছি , উমর ( রা ) -এর ইসলাম গ্রহণের কারণ ছিল নিম্নরূপ :
উমরের বোন ফাতিমা বিনত খাত্তাব ও তাঁর স্বামী সাঈদ ইবন যায়দ ইবন আমর ইবন নুফায়ল ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন । কিন্তু তাঁরা তাঁদের ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটি উমরের কাছ থেকে গোপন রেখেছিলেন । মক্কার আর এক ব্যক্তি নাঈম ইবন আবদুল্লাহ্ নাহহামও একইভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন । উমরের স্বগোত্রীয় অর্থাৎ বনূ আদী ইবন কা'বের অন্তর্ভুক্ত এ ব্যক্তি নিজ গোত্রের অত্যাচারের ভয়ে নিজের ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করেন নি । খাব্বাব ইব্‌ন আরাত গোপনে ফাতিমা বিন্ত খাত্তাব ( রা ) -এর কাছে যাতায়াত করতেন এবং তাঁকে তিনি কুরআন পড়াতেন ।

টিকাঃ
১. বনূ তামীম বংশোদ্ভূত এ সাহাবী জাহিলী যুগে তরবারি তৈরির পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। তিনি ছিলেন উম্মে আন্মার নাম্নী এক মহিলার দাস। ইসলাম গ্রহণের অপরাধে মুশরিকরা তাঁর ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালাত। কখনো কখনো তাঁকে জ্বলন্ত কয়লার ওপর শুইয়ে বুকে পাথর চাপা দিয়ে রাখা হতো। এতে তাঁর পিঠের চামড়া ও গোশত গলে যেত। তিনি বদর, উহুদ, খন্দকসহ সকল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। ৩৭ হিজরীতে ৭৩ বছর বয়সে তিনি কূফায় ইন্তিকাল করেন।

ইবন ইসহাক বলেন : আমি যতদূর জানতে পেয়েছি, উমর (রা)-এর ইসলাম গ্রহণের কারণ ছিল নিম্নরূপ : উমরের বোন ফাতিমা বিন্ত খাত্তাব ও তাঁর স্বামী সাঈদ ইবন যায়দ ইবন আমর ইবন নুফায়ল ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। কিন্তু তাঁরা তাঁদের ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারটি উমরের কাছ থেকে গোপন রেখেছিলেন। মক্কার আর এক ব্যক্তি নাঈম ইবন আবদুল্লাহ্ নাহহামও একইভাবে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। উমরের স্বগোত্রীয় অর্থাৎ বনূ আদী ইবন কা'বের অন্তর্ভুক্ত এ ব্যক্তি নিজ গোত্রের অত্যাচারের ভয়ে নিজের ইসলাম গ্রহণের কথা প্রকাশ করেন নি। খাব্বাব ইব্‌ন আরাত গোপনে ফাতিমা বিন্ত খাত্তাব (রা)-এর কাছে যাতায়াত করতেন এবং তাঁকে তিনি কুরআন পড়াতেন।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 উমর ইবন খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে আতা ও মুজাহিদের বর্ণনা

📄 উমর ইবন খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে আতা ও মুজাহিদের বর্ণনা


ইবন ইসহাক বলেন : আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবূ নুজায়হ মাক্কী তাঁর সংগী আতা , মুজাহিদ অথবা অন্যান্য বর্ণনাকারীদের থেকে আমার কাছে বর্ণনা করেছেন । উমর ( রা ) -এর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে ব্যাপক জনশ্রুতি রয়েছে যে , তিনি নিজে এরূপ বলতেন : “ আমি ইসলামের কট্টর বিরোধী ছিলাম । জাহিলী যুগে আমি মদের খুব ভক্ত ছিলাম । মদ পেলে খুবই আনন্দিত হতাম । আমাদের একটা মজলিস বসত , যেখানে কুরায়শ নেতারা একত্র হত । উমর ইব্‌ন আব্দ ইব্‌ন ইমরান মাখযুমীর বাড়ির নিকট হাযওয়ারা নামক স্থানে । রাবী বলেন , এক রাতে আমি ঐ আসরে আমার সহযোগীদের উদ্দেশ্যে বের হলাম । কিন্তু সেখানে তাদের কাউকেই পেলাম না । এরপর ভাবলাম , মক্কায় অমুক মদ বিক্রেতার কাছে গেলে হয়ত মদ খেতে পারতাম । তার

উদ্দেশে গেলাম কিন্তু তাকে পেলাম না । এরপর মনে মনে বললাম , কা'বা শরীফে গিয়ে যদি সাতবার অথবা সত্তরবার তওয়াফ করতাম তা মন্দ হয় না । অবশেষে আমি কা'বা শরীফের তওয়াফ করার জন্য মাসজিদুল হারামে উপনীত হলাম । সেখানে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -কে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করতে দেখলাম । তিনি তখনো সিরিয়ার দিকে মুখ করে সালাত আদায় করতেন এবং কা'বাকে নিজের ও সিরিয়ার মাঝখানে রাখতেন । রুকনে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানীর মাঝে তাঁর সালাত আদায়ের স্থান ছিল । রাবী বলেন ; তাকে দেখেই আমি আপন মনে বললাম , আল্লাহর কসম ! আজকের রাতটা যদি মুহাম্মদ (সা:) -এর আবৃত্তি শুনে কাটিয়ে দিতাম এবং তিনি কি বলেন তা যদি শুনতাম , তাহলেও একটা কাজ হত । কিন্তু সেই সাথে এটাও ভাবলাম যে , মুহাম্মদ (সা:) -এর খুব কাছে গিয়ে যদি শুনি , তাহলে তিনি ভয় পেয়ে যাবেন । তাই হাজরে আসওয়াদের দিক থেকে এলাম , কা'বা শরীফের পর্দার আড়ালে লুকিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে যেতে লাগলাম । রাসূলুল্লাহ্ তখনো যথারীতি দাঁড়িয়ে সালাতে কুরআন পাঠ করছিলেন । অবশেষে আমি তাঁর ঠিক সামনে , কা'বার পর্দার আড়ালে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম । যখন কুরআন শুনলাম , তখন আমার মন নরম হয়ে গেল । আমি কেঁদে ফেললাম । আমার ওপর ইসলাম প্রভাব বিস্তার করল । রাসূলুল্লাহ্ সালাত শেষ করে চলে না যাওয়া পর্যন্ত আমি সেখানেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম । তিনি যখন কা'বা থেকে ফিরে যেতেন , তখন তিনি ইবন আবূ হুসায়নের বাড়ির কাছ দিয়ে যেতেন । এটা ছিল তাঁর যাতায়াতের পথ । এরপর তিনি সাফা ও মারওয়ার মধ্যস্থিত দৌড়ের জায়গা অতিক্রম করতেন । সেখান থেকে আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালib এবং ইবন আযহার ইবন আবদ আওফ যুহরীর বাড়ির মাঝখান দিয়ে আখনাস ইবন তরায়কের বাড়ি হয়ে নিজের বাড়িতে চলে যেতেন । ' দারুর রাকতায় ' ছিল রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর বাড়ি । এ জায়গাটা ছিল আবূ সুফিয়ানের ছেলে মুআবিয়ার মালিকানাধীন । উমর ( রা ) বলেন , আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর পিছু পিছু চলতে লাগলাম । যখন তিনি আব্বাসের বাড়ি ও ইব্‌ন আযহারের বাড়ির মাঝখানে পৌঁছলেন , তখন আমি তাঁকে পেয়ে গেলাম । আমার আওয়াজ শুনেই রাসূলুল্লাহ্ (সা:) আমাকে চিনে ফেললেন । তিনি মনে করলেন যে , আমি তাঁকে কষ্ট দিতে এসেছি । তাই তিনি আমাকে একটা ধমক দিলেন । ধমক দিয়েই আবার জিজ্ঞেস করলেন হে খাস্তাবের পুত্র । এ মুহূর্তে তুমি কি উদ্দেশ্য এসেছ ? আমি বললাম : আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি এবং তাঁর কাছে যা কিছু আল্লাহ্র কাছ থেকে এসেছে , তার প্রতি ঈমান আনার উদ্দেশ্যে । রাবী বলেন : এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) আল্লাহ্ প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলেন । তারপর বললেন : “ হে উমর ! আল্লাহ্ তোমাকে হিদায়াত করেছেন । ” তারপর তিনি আমার বুকে হাত বুলালেন এবং আমি যাতে ইসলামের ওপর অবিচল থাকি , সেজন্য দু'আ করলেন । এরপর আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর কাছ থেকে ফিরে এলাম এবং তিনি নিজের ঘরে প্রবেশ করলেন । ”

ইবন ইসহাক বলেন : আবদুল্লাহ্ ইব্‌ন আবূ নুজায়হ মাক্কী তাঁর সংগী আতা , মুজাহিদ অথবা অন্যান্য বর্ণনাকারীদের থেকে আমার কাছে বর্ণনা করেছেন । উমর ( রা ) -এর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে ব্যাপক জনশ্রুতি রয়েছে যে , তিনি নিজে এরূপ বলতেন : “ আমি ইসলামের কট্টর বিরোধী ছিলাম । জাহিলী যুগে আমি মদের খুব ভক্ত ছিলাম । মদ পেলে খুবই আনন্দিত হতাম । আমাদের একটা মজলিস বসত , যেখানে কুরায়শ নেতারা একত্র হত । উমর ইব্‌ন আব্দ ইব্‌ন ইমরান মাখযুমীর বাড়ির নিকট হাযওয়ারা নামক স্থানে । রাবী বলেন , এক রাতে আমি ঐ আসরে আমার সহযোগীদের উদ্দেশ্যে বের হলাম । কিন্তু সেখানে তাদের কাউকেই পেলাম না । এরপর ভাবলাম , মক্কার অমুক মদ বিক্রেতার কাছে গেলে হয়ত মদ খেতে পারতাম । তার উদ্দেশ্যে গেলাম কিন্তু তাকে পেলাম না । এরপর মনে মনে বললাম , কা'বা শরীফে গিয়ে যদি সাতবার অথবা সত্তরবার তওয়াফ করতাম তা মন্দ হয় না । অবশেষে আমি কা'বা শরীফের তওয়াফ করার জন্য মাসজিদুল হারামে উপনীত হলাম । সেখানে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -কে দাঁড়িয়ে সালাত আদায় করতে দেখলাম । তিনি তখনো সিরিয়ার দিকে মুখ করে সালাত আদায় করতেন এবং কা'বাকে নিজের ও সিরিয়ার মাঝখানে রাখতেন । রুকনে আসওয়াদ ও রুকনে ইয়ামানীর মাঝে তাঁর সালাত আদায়ের স্থান ছিল । রাবী বলেন ; তাকে দেখেই আমি আপন মনে বললাম , আল্লাহর কসম ! আজকের রাতটা যদি মুহাম্মদ (সা:) -এর আবৃত্তি শুনে কাটিয়ে দিতাম এবং তিনি কি বলেন তা যদি শুনতাম , তাহলেও একটা কাজ হত । কিন্তু সেই সাথে এটাও ভাবলাম যে , মুহাম্মদ (সা:) -এর খুব কাছে গিয়ে যদি শুনি , তাহলে তিনি ভয় পেয়ে যাবেন । তাই হাজরে আসওয়াদের দিক থেকে এলাম , কা'বা শরীফের পর্দার আড়ালে লুকিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে যেতে লাগলাম । রাসূলুল্লাহ্ তখনো যথারীতি দাঁড়িয়ে সালাতে কুরআন পাঠ করছিলেন । অবশেষে আমি তাঁর ঠিক সামনে , কা'বার পর্দার আড়ালে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম । যখন কুরআন শুনলাম , তখন আমার মন নরম হয়ে গেল । আমি কেঁদে ফেললাম । আমার ওপর ইসলাম প্রভাব বিস্তার করল । রাসূলুল্লাহ্ সালাত শেষ করে চলে না যাওয়া পর্যন্ত আমি সেখানেই চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম । তিনি যখন কা'বা থেকে ফিরে যেতেন , তখন তিনি ইবন আবূ হুসায়নের বাড়ির কাছ দিয়ে যেতেন । এটা ছিল তাঁর যাতায়াতের পথ । এরপর তিনি সাফা ও মারওয়ার মধ্যস্থিত দৌড়ের জায়গা অতিক্রম করতেন । সেখান থেকে আব্বাস ইবন আবদুল মুত্তালিব এবং ইবন আযহার ইবন আবদ আওফ যুহরীর বাড়ির মাঝখান দিয়ে আখনাস ইবন তরায়কের বাড়ি হয়ে নিজের বাড়িতে চলে যেতেন । ' দারুর রাকতায় ' ছিল রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর বাড়ি । এ জায়গাটা ছিল আবূ সুফিয়ানের ছেলে মুআবিয়ার মালিকানাধীন । উমর ( রা ) বলেন , আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর পিছু পিছু চলতে লাগলাম । যখন তিনি আব্বাসের বাড়ি ও ইব্‌ন আযহারের বাড়ির মাঝখানে পৌঁছলেন , তখন আমি তাঁকে পেয়ে গেলাম । আমার আওয়াজ শুনেই রাসূলুল্লাহ্ (সা:) আমাকে চিনে ফেললেন । তিনি মনে করলেন যে , আমি তাঁকে কষ্ট দিতে এসেছি । তাই তিনি আমাকে একটা ধমক দিলেন । ধমক দিয়েই আবার জিজ্ঞেস করলেন হে খাস্তাবের পুত্র । এ মুহূর্তে তুমি কি উদ্দেশ্য এসেছ ? আমি বললাম : আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি এবং তাঁর কাছে যা কিছু আল্লাহ্র কাছ থেকে এসেছে , তার প্রতি ঈমান আনার উদ্দেশ্যে । রাবী বলেন : এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) আল্লাহ্ প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলেন । তারপর বললেন : “ হে উমর ! আল্লাহ্ তোমাকে হিদায়াত করেছেন । ” তারপর তিনি আমার বুকে হাত বুলালেন এবং আমি যাতে ইসলামের ওপর অবিচল থাকি , সেজন্য দু'আ করলেন । এরপর আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর কাছ থেকে ফিরে এলাম এবং তিনি নিজের ঘরে প্রবেশ করলেন ।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 ইসলামের ওপর উমর (রা)-এর দৃঢ়তা

📄 ইসলামের ওপর উমর (রা)-এর দৃঢ়তা


ইবন ইসহাক বলেন উমর ( রা ) -এর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে উপরোক্ত ঘটনা দু'টির কোটি সঠিক , তা আল্লাহ্ই ভালো জানেন ।
ইবন ইসহাক বলেন : আবদুল্লাহ্ ইবন উমর ( রা ) -এর আযাদকৃত গোলাম নাফে ' উমর ( রা ) থেকে আমার কাছে বর্ণনা করেন । তিনি বলেন : আমার পিতা উমর ( রা ) যখন ইসলাম গ্রহণ করেন , তখন তিনি জিজ্ঞেস করেন যে , কুরায়ণের কোন ব্যক্তি সর্বাধিক প্রচারমুখরা তাকে বলা হল , জামীল ইবন মা'মার জুমহী । তিনি তৎক্ষণাৎ তার উদ্দেশ্যে বের হলেন । আবদুল্লাহ্ ইবন উমর ( রা ) বলেন , আমি তাঁর পেছনে ছুটলাম এবং তিনি কি করেন তা দেখতে লাগলাম । তখন আমি বালক হলেও , যা কিছু দেখতাম সবই বুঝতে পারতাম । উমর ( রা ) জামীলের কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন , “ হে জামীল । তুমি কি জান , আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি এবং মুহাম্মদ (সা:) -এর দীন কবুল করেছি । ” ইবন উমর বলেন : আল্লাহর কসম ! আমার পিতা দ্বিতীয়বার এ কথা বলার আগেই আমিল তার চাদর ঘটিয়ে হাঁটা শুরু করল । উমর ( রা ) তার পিছু পিছু চললেন । আমিও আমার পিতার পিছু পিছু চললাম । সে ( জামীল ) চলতে চলতে মাসজিদুল হারামের দরজার কাছে পৌঁছে বিকট চিৎকার করে বলল : “ হে কুরায়শ জনমণ্ডলী শুনে নাও , উমর স্বধর্মত্যাগী হয়ে গেছে । এ সময় কুরায়শ নেতৃবৃন্দ । কা'বার চত্বরে তাদের আড্ডায় বসে ছিল । উমর ( রা ) তার পেছনে দাঁড়িয়ে বললেন : জামীল মিথ্যা বলেছে আমি ধর্মচ্যুত হইনি ; তবে আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি । আমি সাক্ষ্য দিয়েছি যে , আল্লাহ্ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ (সা:) তাঁর বান্দা ও রাসূল । সংগে সংগে সকলে তাঁর দিকে মারমুখী হয়ে ছুটে এলো । উমর ( রা ) ও কুরায়শদের মধ্যে দুপুর পর্যন্ত লড়াই চলল । রাবী বলেন : এক সময় উমর ( রা ) ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে বসে পড়লেন । কুরায়শরা তখনো তাঁর কাছে দাঁড়িয়ে ছিল । উমর ( রা ) বলতে লাগলেন : “ তোমরা যা খুশি কর । আল্লাহ্র কসম ! আমরা যদি তিনশ লোক হতাম , তাহলে আমরা তোমাদের জন্য মক্কা ছেড়ে দিতাম অথবা তোমরা আমাদের জন্য মক্কা ছেড়ে দিতে । ” রাবী বলেন : উভয় পক্ষ যখন এ পর্যায়ে , তখন সহসা সেখানে একজন প্রবীণ কুরায়শ সরদারের আবির্ভাব ঘটল , যার গায়ে মূল্যবান ইয়ামানী চাদর ও নকশাদার জামা ছিল । তিনি তাদের কাছে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন , তোমাদের কি হয়েছে ? সকলে বলল : উমর স্বধর্মত্যাগী হয়ে গেছে । বৃদ্ধ বললেন : তাতে কি হয়েছে , থামো ! একজন মানুষ নিজের ইচ্ছায় একটা জিনিস গ্রহণ করেছে , তোমরা তার কি করতে চাও ? তোমরা কি ভেবেছ যে , বন্ আদী ইবন কা'ব [ উমুর ( রা ) -এর গোত্র ) তাদের সদস্যকে তোমাদের হাতে এভাবেই ছেড়ে দেবে ? ওকে ছেড়ে দাও । ইবন উমর ( রা ) বলেন , আল্লাহ্র শপথ ! এ কথার পর তারা গুটিয়ে নেয়া কাপড়ের মত নিজেদের ভাবাবেগকে সংযত করল । পরে মদীনায় হিজরত করার পর আমি আমার পিতাকে জিজ্ঞেস করেছিলোম : আ :

বৃদ্ধটি কে ছিলেন , যিনি আপনার ইসলাম গ্রহণের দিন বিক্ষুব্ধ জনতাকে ধমক দিয়ে আপনার কাছ থেকে হটিয়ে দিয়েছিলেন ? তিনি বললেন : হে আমার পুত্র । তিনি ছিলেন আস ইবন ওয়ায়ল সামী ।
ইবন হিশাম বলেন : আমাকে কোন কোন বিদ্বান ব্যক্তি বলেছেন যে , আবদুল্লাহ্ ইবন উমর ( রা ) তাঁর পিতাকে জিজ্ঞেস করেন : হে আমার পিতা ! আপনার ইসলাম গ্রহণের দিন ক্ষুব্ধ জনতাকে যিনি ধমক দিয়ে আপনার কাছ থেকে হটিয়ে দেন , তিনি কে ছিলেন ? আল্লাহ্ তাঁকে উত্তম বিনিময় দান করুন । উমর ( রা ) বলেন , হে আমার প্রিয় পুত্র । তিনি ছিলেন আস ইবন ওয়ারল । আল্লাহ তাঁকে উত্তম প্রতিদান না নিন ।
ইবন ইসহাক বলেন উমর ( রা ) -এর পরিবারের অথবা আত্মীয় - স্বজনের মধ্য থেকে কোন একজনের বরাতে আবদুর রহমান ইবন হারিস আমাকে বলেছেন যে , উমর ( রা ) বলেন : সেই রাতে ইসলাম গ্রহণ করার পর আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে , মক্কাবাসীদের মধ্যে যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর সবচেয়ে কট্টর দুশমন , আমি তার কাছে যাব এবং তাকে জানাব যে , আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি । তিনি বলেন আমি ভেবে দেখলাম , সে তো আৰু জাহল ছাড়া আর কেউ নয় । উল্লেখ্য যে , উমর ( রা ) ছিলেন আবূ জাহলের বোন হান্তামা বিনৃত হিশাম ইব্‌ন মুগীরার পুত্র । উমর ( রা ) বলেন : পরদিন সকালে আমি তার দরজায় গিয়ে করাঘাত করলাম । তখন আবূ জাহল আমার কাছে বেরিয়ে এলো এবং বলল : আমার ভাগ্নেকে স্বাগতম ! তুমি কি খবর নিয়ে এসেছ উমর ? আমি বললাম : “ আমি আপনাকে জানাতে এসেছি যে , আমি আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূল মুহাম্মদ (সা:) -এর প্রতি ঈমান এনেছি এবং তিনি যে বিধান নিয়ে এসেছেন , তাও সত্য বলে মেনে নিয়েছি । ” উমর ( রা ) বলেন : তখন সে আমার মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিল এবং বলল , আল্লাহ্ তোমাকে এবং তুমি যে খবর নিয়ে এসেছ , তা বরবাদ করুন !

টিকাঃ
১. কারণ ইসলাম কবুল করা ব্যতীত ভাল কাজের প্রতিদান পাওয়া যায় না , আস ইবন ওয়ায়ল মুশরিক অবস্থায় এ কাজটি করেন এবং তিনি ইসলাম কবুল করেন নি ।

ইবন ইসহাক বলেন উমর ( রা ) -এর ইসলাম গ্রহণ সম্পর্কে উপরোক্ত ঘটনা দু'টির কোটি সঠিক , তা আল্লাহ্ই ভালো জানেন ।
ইবন ইসহাক বলেন : আবদুল্লাহ্ ইবন উমর ( রা ) -এর আযাদকৃত গোলাম নাফে ' উমর ( রা ) থেকে আমার কাছে বর্ণনা করেন । তিনি বলেন : আমার পিতা উমর ( রা ) যখন ইসলাম গ্রহণ করেন , তখন তিনি জিজ্ঞেস করেন যে , কুরায়ণের কোন ব্যক্তি সর্বাধিক প্রচারমুখরা তাকে বলা হল , জামীল ইবন মা'মার জুমহী । তিনি তৎক্ষণাৎ তার উদ্দেশ্যে বের হলেন । আবদুল্লাহ্ ইবন উমর ( রা ) বলেন , আমি তাঁর পেছনে ছুটলাম এবং তিনি কি করেন তা দেখতে লাগলাম । তখন আমি বালক হলেও , যা কিছু দেখতাম সবই বুঝতে পারতাম । উমর ( রা ) জামীলের কাছে উপস্থিত হয়ে বললেন , “ হে জামীল । তুমি কি জান , আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি এবং মুহাম্মদ (সা:) -এর দীন কবুল করেছি । ” ইবন উমর বলেন : আল্লাহর কসম ! আমার পিতা দ্বিতীয়বার এ কথা বলার আগেই আমিল তার চাদর ঘটিয়ে হাঁটা শুরু করল । উমর ( রা ) তার পিছু পিছু চললেন । আমিও আমার পিতার পিছু পিছু চললাম । সে ( জামীল ) চলতে চলতে মাসজিদুল হারামের দরজার কাছে পৌঁছে বিকট চিৎকার করে বলল : “ হে কুরায়শ জনমণ্ডলী শুনে নাও , উমর স্বধর্মত্যাগী হয়ে গেছে । এ সময় কুরায়শ নেতৃবৃন্দ । কা'বার চত্বরে তাদের আড্ডায় বসে ছিল । উমর ( রা ) তার পেছনে দাঁড়িয়ে বললেন : জামীল মিথ্যা বলেছে আমি ধর্মচ্যুত হইনি ; তবে আমি ইসলাম গ্রহণ করেছি । আমি সাক্ষ্য দিয়েছি যে , আল্লাহ্ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই এবং মুহাম্মদ (সা:) তাঁর বান্দা ও রাসূল । সংগে সংগে সকলে তাঁর দিকে মারমুখী হয়ে ছুটে এলো । উমর ( রা ) ও কুরায়শদের মধ্যে দুপুর পর্যন্ত লড়াই চলল । রাবী বলেন : এক সময় উমর ( রা ) ক্লান্ত ও অবসন্ন হয়ে বসে পড়লেন । কুরায়শরা তখনো তাঁর কাছে দাঁড়িয়ে ছিল । উমর ( রা ) বলতে লাগলেন : “ তোমরা যা খুশি কর । আল্লাহ্র কসম ! আমরা যদি তিনশ লোক হতাম , তাহলে আমরা তোমাদের জন্য মক্কা ছেড়ে দিতাম অথবা তোমরা আমাদের জন্য মক্কা ছেড়ে দিতে । ” রাবী বলেন : উভয় পক্ষ যখন এ পর্যায়ে , তখন সহসা সেখানে একজন প্রবীণ কুরায়শ সরদারের আবির্ভাব ঘটল , যার গায়ে মূল্যবান ইয়ামানী চাদর ও নকশাদার জামা ছিল । তিনি তাদের কাছে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন , তোমাদের কি হয়েছে ? সকলে বলল : উমর স্বধর্মত্যাগী হয়ে গেছে । বৃদ্ধ বললেন : তাতে কি হয়েছে , থামো ! একজন মানুষ নিজের ইচ্ছায় একটা জিনিস গ্রহণ করেছে , তোমরা তার কি করতে চাও ? তোমরা কি ভেবেছ যে , বন্ আদী ইবন কা'ব [ উমুর ( রা ) -এর গোত্র ) তাদের সদস্যকে তোমাদের হাতে এভাবেই ছেড়ে দেবে ? ওকে ছেড়ে দাও । ইবন উমর ( রা ) বলেন , আল্লাহ্র শপথ ! এ কথার পর তারা গুটিয়ে নেয়া কাপড়ের মত নিজেদের ভাবাবেগকে সংযত করল । পরে মদীনায় হিজরত করার পর আমি আমার পিতাকে জিজ্ঞেস করেছিলোম : আ : ! বৃদ্ধটি কে ছিলেন , যিনি আপনার ইসলাম গ্রহণের দিন বিক্ষুব্ধ জনতাকে ধমক দিয়ে আপনার কাছ থেকে হটিয়ে দিয়েছিলেন ? তিনি বললেন : হে আমার পুত্র । তিনি ছিলেন আস ইবন ওয়ায়ল সামী ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00