📄 আবিসিনিয়াবাসী কর্তৃক নাজ্জাশীকে বিক্রয়
এরপর নাজাশী তাঁর চাচার পরিবারে লালিত - পালিত হতে লাগলেন । তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ ব্যক্তি । ফলে তিনি তাঁর চাচার প্রশাসনের ব্যাপারে প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন এবং তাঁর সংগে সব জায়গায় যেতে থাকেন । আবিসিনিয়াবাসী চাচার ওপর তাঁর প্রভাব দেখে পরস্পর বলাবলি করতে লাগল , আল্লাহ্র কসম ! এ ছেলেটি তো তার চাচার . প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে । আমরা আশংকা করছি যে , তার চাচা তাকে আমাদের রাজা বানিয়ে দেয় কিনা ! তিনি যদি তাকে আমাদের রাজা বানান , তবে সে আমাদের সকলকে হত্যা করে ফেলবে । কারণ সে জানে যে , আমরাই তার পিতাকে হত্যা করেছি । এসব কথা ভেবেচিন্তে তারা নাজাশীর চাচার কাছে গেল এবং বলল : “ হয় আপনি এ ছেলেটাকে হত্যা করুন , নয়তো তাকে আমাদের ভেতর থেকে বের করে দিন । কেননা সে বেঁচে থাকলে আমাদের প্রাণনাশের আশংকা রয়েছে ।
নাজাশীর চাচা বললেন : তোমরা এ কী বলছ ! সে দিন তোমরা তার পিতাকে হত্যা করেছ , আর আজ আমি তাকে হত্যা করব ? বরং আমি তাকে তোমাদের দেশ থেকে বের করে দিচ্ছি । উম্মে সালামা ( রা ) বলেন : এরপর লোকেরা তাকে বাজারে নিয়ে গেল এবং একজন ব্যবসায়ীর কাছে ছয়শ দিরহামের বিনিময়ে বিক্রি করে দিল । ব্যবসায়ী লোকটি তাকে একটি নৌকায় নিয়ে রওয়ানা হল । ঐ দিন বিকালে আকাশে শরৎকালীন মেঘ পূঞ্জীভূত হল । নাজাশীর চাচা বৃষ্টির আশায় যখন সে মেঘের নীচে গেল , তখন হঠাৎ বজ্রপাতে তার মৃত্যু হল । রাবী বলেন : তখন আবিসিনিয়াবাসী হতবুদ্ধি হয়ে তার ছেলেদের কাছে গিয়ে দেখল যে , তারা সবাই অপদার্থ , এদের একজনও সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী নয় । ফলে আবিসিনিয়ার শাসন ব্যবস্থায় বিশৃংখলা দেখা দিল ।
📄 নাজাশীর হাতে রাজত্ব সমর্পণ
দেশ পরিচালনার ব্যাপারে তারা যখন সংকটের সম্মুখীন হল , তখন তারা পরস্পর বলতে লাগল : “ আল্লাহ্র কসম ! তোমরা জেনে রাখ , যে লোকটিকে তোমরা বিক্রি করে ফেলেছ , সে - ই তোমাদের রাজা হওয়ার যোগ্য ব্যক্তি । সে ছাড়া আর কেউ তোমাদের সমস্যার সমাধান করতে পারবে না । কাজেই তোমরা যদি আবিসিনিয়ার রাজত্বকে রক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব কর , তাহলে তাকে এক্ষুণি খুঁজে আন । এরপর তারা তার সন্ধানে এবং যার কাছে তাকে বিক্রি করেছিল , তার সন্ধানে বেরিয়ে পড়ল । অবশেষে তারা তাকে পেল এবং সেই ব্যবসায়ীর কাছে থেকে ফিরিয়ে এনে তার মাথার মুকুট পরিয়ে দিল । আর তাকে রাজ - সিংহাসনে বসিয়ে রাজ্যের শাসনভার তার ওপর ন্যস্ত করল ।
📄 নাজাশীর ক্রেতা ব্যবসায়ীটির ঘটনা
এরপর সেই ব্যবসায়ী আবিসিনিয়াবাসীর কাছে এল , যারা তার কছে নাজাশীকে বিক্রি করে দিয়েছিল । সে বলল , হয় তোমরা আমার অর্থ ফেরত দেবে , নয় আমি নিজে এ ব্যাপারে নাজাশীর সাথে কথা বলব । তারা বলল , আমরা তোমাকে কিছুই দেব না । তখন সে বলল , আল্লাহ্র কসম ! এখন আমি তাঁর সংগে অবশ্যই কথা বলব ।
তারা বলল , তা তোমার আর নাজাশীর ব্যাপার । রাবী বলেন , এরপর সে নাজাশীর কাছে এসে বলল , হে রাজা ! আমি বাজারে একদল লোক থেকে ছয়শ দিরহামে অমুককে কিনেছি । তারা গোলামকে আমার হাতে সমর্পণ করে এবং দিরহাম নিয়ে নেয় । অবশেষে যখন আমি গোলামটিকে নিয়ে রওয়ানা হই , অমনি তারা গিয়ে আমাকে ধরে ফেলে এবং গোলামকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নেয় । আর দিরহামও তারা ফেরত দেয়নি । রাবী বলেন , তখন নাজাশী তাদের বললেন , হয় তোমরা তার দিরহাম দিবে , নচেৎ তার ক্রীত গোলাম ক্রেতার হাতে হাত রেখে যেখানে সে নিয়ে যায় সেখানে চলে যাবে । তখন তারা বলল , বরং আমরা তার দিরহাম দিয়ে দিচ্ছি । উম্মে সালামা ( রা ) বলেন : এজন্য নাজাশী বলতেন : “ আল্লাহ্ যখন আমার রাজত্ব আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন , তখন আমার কাছ থেকে ঘুষ নেননি । কাজেই এ রাজ্যে . আমার ঘুষ নেয়ার প্রশ্ন ওঠে না । আর লোকেরা আমার বিরুদ্ধে যা করতে চেয়েছিল , আল্লাহ্ তা করেননি । কাজেই আমি আল্লাহ্ দীনের ব্যাপারে না বুঝে কেমনে মানুষের কথা মেনে নেব ? ” বস্তুত এটা ছিল স্বীয় ধর্মের ব্যাপারে তাঁর অনমনীয়তা এবং স্বীয় শাসনে তার ন্যায়বিচারের স্বাক্ষর ।
ইবন ইসহাক বলেন : ইয়াযীদ ইব্ন রুমান উরওয়া ইবন যুবায়র ( রা ) থেকে এবং তিনি আয়েশা ( রা ) থেকে বর্ণনা করেন যে , নাজাশীর মৃত্যুর পর তাঁর কবরের ওপর সর্বক্ষণ একটা আলো থাকতে দেখা গেছে বলে জনশ্রুতি রয়েছে ।
📄 নাজাশীর ইসলাম গ্রহণ, তাঁর বিরুদ্ধে আবিসিনিয়াবাসীদের বিদ্রোহ ও তাঁর প্রতি গায়েবানা জানাযার সালাত
ইবন ইসহাক বলেন : জা'ফর ইব্ন মুহাম্মদ তাঁর পিতার বরাতে আমার কাছে বর্ণনা করেছেন । তিনি বলেন , একবার আবিসিনিয়াবাসী নাজাশীর কাছে জমায়েত হয়ে বলল : “ তুমি আমাদের ধর্ম ত্যাগ করেছ । এই বলে তারা তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করল । তখন নাজাশী জা'ফর ( রা ) ও তাঁর সংগীদেরকে ডেকে তাদের জন্য কয়েকখানা নৌকার ব্যবস্থা করে বললেন : আপনারা এতে আরোহণ করুন এবং যেমন আছেন তেমন থাকুন ( অর্থাৎ নৌকায় উঠে বসে থাকুন ) । আমি যদি বিদ্রোহীদের কাছে পরাজিত হই , তা হলে আপনারা নৌকা চালিয়ে যেখানে খুশি চলে যাবেন । আর যদি আমি জয়লাভ করি , তাহলে আপনারা এখানেই থাকবেন । এরপর তিনি একখানা কাগজে লিখলেন : “ সে ( নাজাশী ) সাক্ষ্য দেয় যে , আল্লাহ্ ছাড়া আর কোন ইলাহ্ নেই । মুহাম্মদ (সা:) তাঁর বান্দা ও রাসূল এবং সে এরূপও সাক্ষ্য দেয় যে , ঈসা ইবন মারইয়াম ( আ ) তাঁর বান্দা , তাঁর রাসূল ও তাঁর রূহ এবং তাঁর প্রেরিত বাণী , যা তিনি মারইয়ামের প্রতি নিক্ষেপ করেন । এরপর তিনি এ কাগজকে তাঁর জামার ভেতরে ডান কাঁধের কাছে ঢুকিয়ে রাখলেন । তারপর তিনি বিদ্রোহী হাবশীদের দিকে রওয়ানা হলেন এবং তাদের কাছে গিয়ে বললেন : “ হে আবিসিনিয়াবাসী ! আমি কি তোমাদের শাসনের অধিক যোগ্য নই । তারা বলল হ্যাঁ , অবশ্যই । তিনি বললেন , তোমরা আমার স্বভাব - চরিত্র কেমন পেয়েছ ? তারা বলল , উত্তম । তিনি বললেন , তাহলে তোমাদের হয়েছে কী ? তারা বলল : তুমি আমাদের ধর্ম ত্যাগ করেছ এবং ঈসাকে নিছক একজন বান্দা বলে মনে কর । নাজাশী বললেন : আচ্ছা , তোমরা ঈসা সম্পর্কে কি বল ? তারা বললো : আমরা বলি , তিনি আল্লাহ্র পুত্র । তখন নাজাশী তাঁর বুকের ওপর জামায় হাত রেখে বললেন : সে ( নাজাশী ) সাক্ষ্য দেয় যে , ‘ ঈসা মারইয়ামের পুত্র । এরপর আর একটি কথাও তিনি বাড়ালেন না এবং যা কাগজে লিখেছিলেন , মনে মনে সেদিকেই ইংগিত করলেন । এতে তারা সন্তুষ্ট হয়ে ফিরে গেল । এ খবর নবী (সা:) -এর কাছে পৌঁছল । এরপর নাজাশী যখন ইন্তিকাল করেন , তখন তিনি তাঁর ওপর গায়েবানা জানাযার সালাত আদায় করেন এবং তাঁর জন্য আল্লাহ্র দরবারে ক্ষমা চান ।
**টিকাঃ**
১. হিজরী নবম সনের রজব মাসে নাজাশী ইন্তিকাল করেন । যেদিন তিনি ইন্তিকাল করেন , সেদিন রাসূলুল্লাহ (সা:) তাঁর মৃত্যুর খবর লোকদের জানান এবং যখন মিসরে খাটের উপর তার লাশ উঠানো হলো , তখন মদীনায় থেকেও তিনি তাঁকে দেখতে পেলেন এবং তাঁর ওপর ' জান্নাতুল বাকীতে ' গায়েবানা জানাযার সালাত আদায় করেন ।