📄 নাজাশীর বিজয়ে মুসলমানদের আনন্দ প্রকাশ
উম্মে সালামা ( রা ) বলেন : আমরা যখন এরূপ নিরাপদ পরিবেশে অবস্থান করছিলাম , তখন হঠাৎ আবিসিনিয়ায় এক উচ্চাভিলাষী ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটে , যে ঐ দেশটির রাজত্ব নিয়ে নাজাশীর সাথে বিবাদে লিপ্ত হয় । আল্লাহ্র কসম ! আমরা ঐ সময় যেরূপ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ও উদ্বিগ্ন হয়েছিলাম , ইতিপূর্বে আর কখনো সেরূপ হইনি । আমাদের ভয় ছিল , ঐ লোকটি নাজাশীর ওপর বিজয়ী হলে সে নাজাশীর মত আমাদের অধিকার স্বীকার নাও করতে পারে । রাবী বলেন , নাজাশী সসৈন্যে তার মুকাবিলা করার জন্য রওয়ানা হলেন । উভয় পক্ষের মাঝখানে ছিল নীলনদ । রাবী বলেন , এ সময় রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর সাহাবীগণ পরস্পর বলাবলি করলেন , আমাদের মধ্যে এমন কে আছে , যে বের হয়ে তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে ফিরে এসে আমাদের খবর দিতে পার ? তখন যুবায়র ইবন আওয়াম ( রা ) বললেন , আমি পারব । তাঁরা বললেন : তুমি পারবে ? আর তিনি ছিলেন তাঁদের মধ্যে সব চাইতে কম বয়সের । তাঁরা একটি চামড়ার মশকে বাতাস ভরে যুবায়র ( রা ) -কে দিলেন , যা তিনি নিজের বুকের নিচে রাখলেন এবং এর উপর ভর করে তিনি সাঁতার কেটে নীলনদের অপর পাড়ে পৌঁছলেন , যেখানে উভয় পক্ষ মুখোমুখি হয়েছিল । রাবী বলেন , এদিকে আমরা আল্লাহর কাছে দু'আ করছিলাম , যাতে নাজাশী তাঁর শত্রুর ওপর জয়লাভ করতে পারেন এবং তাঁর দেশের ওপর তাঁর সার্বিক কর্তৃত্ব বহাল থাকে । রাবী বলেন , আল্লাহ্র কসম ! আমরা যে খবরের জন্য অধীরভাবে অপেক্ষা করছিলাম , তা একটু পরেই পাওয়া গেল । সহসা যুবায়রকে ছুটে আসতে দেখা গেল । তিনি কাপড় উড়িয়ে বলছিলেন , তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ কর । নাজাশী বিজয়ী হয়েছেন এবং আল্লাহ্ তাঁর শত্রকে ধ্বংস করেছেন এবং তাঁর কর্তৃত্ব রাজ্যে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে । রাবী বলেন : আল্লাহ্র কসম ! আমরা ইতিপূর্বে আর কখনো এতো আনন্দিত হইনি ।
রাবী বলেন : নাজাশী বিজয়ীর বেশে ফিরে আসলেন । আল্লাহ্ তাঁর শত্রুকে ধ্বংস করলেন এবং আবিসিনিয়ার ওপর তাঁর শাসনকে সুদৃঢ় করলেন । আর আমরা মক্কায় রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর কাছে ফিরে না আসা পর্যন্ত তাঁর নিকট অতি সম্মানের সংগে অবস্থান করতে থাকি ।
📄 নাজাশী কর্তৃক আবিসিনিয়ার কর্তৃত্ব লাভের কাহিনী
নাজাশী পিতার নিহত হওয়া এবং তাঁর চাচার রাজত্ব লাভ
ইবন ইসহাক বলেন যুহরী বলেছেন যে , নবী (সা:) -এর সহধর্মিণী উম্মে সালামা ( রা ) থেকে আবূ বাকর ইবন আবদুর রহমান ( রা ) কর্তৃক বর্ণিত ঘটনাটি আমাকে উরওয়া ইবন যুবায়র ( রা ) অবহিত করেন । তিনি বলেন : নাজাশীর এ কথাটার তাৎপর্য কি জান যে , “ আল্লাহ্ আমাকে আমার রাজত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার সময় আমার কাছ থেকে ঘুষ নেননি । সুতরাং আমার নেয়ার প্রশ্নই ওঠে না এবং মানুষ আমার বিরুদ্ধে যা করতে চাইত , আল্লাহ্ তা করেননি । কাজেই আমি আল্লাহ্ দীনের ব্যাপারে না বুঝে মানুষের কথা কেন মেনে নেব ? ” যুহরী ( রা ) বললেন , না । উরওয়া ( রা ) বললেন , উন্মুল মু'মিনীন আয়েশা ( রা ) আমাকে বলেছেন যে , নাজাশীর পিতা ছিলেন সে সম্প্রদায়ের রাজা এবং নাজাশী ছাড়া তাঁর আর কোন সন্তান ছিল না । নাজাশীর এক চাচা ছিল । যার বারটি পুত্র সন্তান ছিল । তারা আবিসিনিয়ার রাজ - পরিবারের অন্তর্ভুক্ত ছিল । আবিসিনিয়ার জনগণ বলাবলি করল , আমরা যদি নাজাশীর পিতাকে হত্যা করি এবং তার ভাইকে সিংহাসনে বসাই , তাহলে তা উত্তম হবে । কেননা নাজাশী ছাড়া তার আর কোন সন্তান নেই , অথচ তাঁর ভাইয়ের বারটি ছেলে রয়েছে । এরা পরবর্তীতে রাজ্যের উত্তরাধিকারী হবে এবং এভাবে আবিসিনিয়ার রাজত্ব দীর্ঘকাল টিকে থাকবে । এরপর তারা একদিন অতি প্রত্যুষে নাজাশীর পিতার ওপর হামলা করে তাকে হত্যা করল এবং তাঁর ভাইকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করল । এভাবে তারা কিছুকাল অতিবাহিত করল ।
📄 আবিসিনিয়াবাসী কর্তৃক নাজ্জাশীকে বিক্রয়
এরপর নাজাশী তাঁর চাচার পরিবারে লালিত - পালিত হতে লাগলেন । তিনি ছিলেন একজন অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও বিচক্ষণ ব্যক্তি । ফলে তিনি তাঁর চাচার প্রশাসনের ব্যাপারে প্রভাব বিস্তার করতে থাকেন এবং তাঁর সংগে সব জায়গায় যেতে থাকেন । আবিসিনিয়াবাসী চাচার ওপর তাঁর প্রভাব দেখে পরস্পর বলাবলি করতে লাগল , আল্লাহ্র কসম ! এ ছেলেটি তো তার চাচার . প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে । আমরা আশংকা করছি যে , তার চাচা তাকে আমাদের রাজা বানিয়ে দেয় কিনা ! তিনি যদি তাকে আমাদের রাজা বানান , তবে সে আমাদের সকলকে হত্যা করে ফেলবে । কারণ সে জানে যে , আমরাই তার পিতাকে হত্যা করেছি । এসব কথা ভেবেচিন্তে তারা নাজাশীর চাচার কাছে গেল এবং বলল : “ হয় আপনি এ ছেলেটাকে হত্যা করুন , নয়তো তাকে আমাদের ভেতর থেকে বের করে দিন । কেননা সে বেঁচে থাকলে আমাদের প্রাণনাশের আশংকা রয়েছে ।
নাজাশীর চাচা বললেন : তোমরা এ কী বলছ ! সে দিন তোমরা তার পিতাকে হত্যা করেছ , আর আজ আমি তাকে হত্যা করব ? বরং আমি তাকে তোমাদের দেশ থেকে বের করে দিচ্ছি । উম্মে সালামা ( রা ) বলেন : এরপর লোকেরা তাকে বাজারে নিয়ে গেল এবং একজন ব্যবসায়ীর কাছে ছয়শ দিরহামের বিনিময়ে বিক্রি করে দিল । ব্যবসায়ী লোকটি তাকে একটি নৌকায় নিয়ে রওয়ানা হল । ঐ দিন বিকালে আকাশে শরৎকালীন মেঘ পূঞ্জীভূত হল । নাজাশীর চাচা বৃষ্টির আশায় যখন সে মেঘের নীচে গেল , তখন হঠাৎ বজ্রপাতে তার মৃত্যু হল । রাবী বলেন : তখন আবিসিনিয়াবাসী হতবুদ্ধি হয়ে তার ছেলেদের কাছে গিয়ে দেখল যে , তারা সবাই অপদার্থ , এদের একজনও সুস্থ মস্তিষ্কের অধিকারী নয় । ফলে আবিসিনিয়ার শাসন ব্যবস্থায় বিশৃংখলা দেখা দিল ।
📄 নাজাশীর হাতে রাজত্ব সমর্পণ
দেশ পরিচালনার ব্যাপারে তারা যখন সংকটের সম্মুখীন হল , তখন তারা পরস্পর বলতে লাগল : “ আল্লাহ্র কসম ! তোমরা জেনে রাখ , যে লোকটিকে তোমরা বিক্রি করে ফেলেছ , সে - ই তোমাদের রাজা হওয়ার যোগ্য ব্যক্তি । সে ছাড়া আর কেউ তোমাদের সমস্যার সমাধান করতে পারবে না । কাজেই তোমরা যদি আবিসিনিয়ার রাজত্বকে রক্ষা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব কর , তাহলে তাকে এক্ষুণি খুঁজে আন । এরপর তারা তার সন্ধানে এবং যার কাছে তাকে বিক্রি করেছিল , তার সন্ধানে বেরিয়ে পড়ল । অবশেষে তারা তাকে পেল এবং সেই ব্যবসায়ীর কাছে থেকে ফিরিয়ে এনে তার মাথার মুকুট পরিয়ে দিল । আর তাকে রাজ - সিংহাসনে বসিয়ে রাজ্যের শাসনভার তার ওপর ন্যস্ত করল ।