📄 আবিসিনিয়া হিজরত প্রসংগে আবদুল্লাহ্ ইবন হারিসের কবিতা
মুসলমান হিজরতকারিগণ যখন আবিসিনিয়ায় নিরাপত্তা লাভ করেন , নাজাশীর প্রতিবেশী হওয়ায় তাঁর প্রশংসামুখর হন , নির্ভয়ে আল্লাহ্র ইবাদত করার সুযোগ লাভ করেন এবং সেখানে উপস্থিত হওয়ার পর নাজাশী তাদের সংগে অতিশয় সৌজন্যমূলক আচরণ করেন , তখন আবদুল্লাহ্ ইব্ন হারিস ইবন কায়স ইব্ন আদী ইব্ন সা'দ ইব্ন সাহম একটি কবিতা রচনা করেন । এটা ছিল আবিসিনিয়ায় রচিত ।
“ হে আরোহী ! আল্লাহর কথা ও তাঁর দীনের কথা প্রচলিত হোক এটা যারা আকাঙ্ক্ষা করে , তাদের কাছে আমার বাণী পৌঁছে দাও ।
“ আল্লাহ্ প্রতিটি বান্দাকে আমার বাণী পৌঁছে দাও , যে মক্কার সমভূমিতে অত্যাচারিত , নির্যাতিত ও অবদমিত ।
“ আমরা আল্লাহ্র যমীন এত প্রশস্ত পেয়েছি যে , তা লাঞ্ছনা - গঞ্জনা ও অপমান থেকে নিষ্কৃতি দেয় ।
“ অতএব , তোমরা অবমাননাকর জীবন , লাঞ্ছনাকর মৃত্যু ও নিরাপত্তাহীন অবস্থানকে মেনে নিও না । আমরা রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর অনুসরণ করেছি , আর মক্কাবাসীরা নবীর কথাকে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং হক আদায়ের ব্যাপারে খিয়ানত করেছে ।
“ অতএব , হে আল্লাহ্ ! যে জাতি তোমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে , তাদের ওপর তোমার আযাব নাযিল কর । আর আমি তোমার পানাহ চাই , যাতে তারা আমার ওপর প্রভাব বিস্তার করে আমাকে বিপথগামী করতে না পারে । ”
কুরায়শরা যেভাবে মুসলামানদের স্বদেশ থেকে বিতাড়িত করেছিল তার উল্লেখ ও স্বজাতির কতিপয় ব্যক্তিকে ভর্ৎসনা করে আবদুল্লাহ্ ইব্ন হারিস আরো একটি কবিতা রচনা করেন :
“ আমি তোমার কাছে মিথ্যা বলব না , তাদের সাথে যুদ্ধ করতে আমার হৃদয় ও আংগুল অস্বীকার করছে । আর এমন লোকদের বিরুদ্ধে আমার যুদ্ধ কিভাবে হতে পারে , যারা তোমাদের সত্যের ওপর থাকতে এবং সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত না করতে শিক্ষা দিয়েছে ? তাদের ( মুসলমানদের ) পবিত্র স্বদেশ থেকে জিনের পূজারীরা বিতাড়িত করেছে । ফলে তারা কঠিন বিপদাপদে নিপতিত হয়েছে । আদী ইব্ন সা'দ গোত্রে যদি তাকওয়া ও সম্প্রীতির আমানত থাকত , তাহলে আমি প্রত্যাশা করতাম যে , এ গুণ তোমাদের মাঝেও পাওয়া যাবে । আর সেই সত্তার শোকর আদায় করতাম , যাঁর থেকে কিছুর বিনিময়ে কিছুই চাওয়া যায় না ।
“ ভ্রষ্টা নারীদের সন্তানের পরিবর্তে আমাকে এমন কিছু সংখ্যক নওজোয়ান দেয়া হয়েছে — যারা দানশীল এবং অসহায় বিধবাদের আশ্রয়স্থল । ”
আবদুল্লাহ্ ইবন হারিস অন্য একটি কবিতায় বলেন :
“ কুরায়শের অবস্থা এই যে , তারা আল্লাহ্র হক অস্বীকার করছে , যেমন আদ , মাদয়ান ও হিজরের অধিবাসীরা অস্বীকার করেছিল । যদি আমি ( আল্লাহকে ) ভয় না করি , তাহলে , প্রশস্ত যমীনে কিংবা সাগরে আমার স্থান হবে না । তবে সে যমীনে আমার স্থান হবে , যেখানে আল্লাহ্ বান্দা মুহাম্মদ (সা:) রয়েছেন । আর বক্তব্য পেশের সুযোগ যখন এসেছে , তখন আমার মনে যা কিছু আছে তা স্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দিচ্ছি । ”
বস্তুত আবদুল্লাহ্ ইব্ন হারিস ( রা ) তাঁর ঐ কবিতার কারণে , ( যাতে তিনি ‘ আবৃরিক ' শব্দ ব্যবহার করেছেন , ) তাঁর নাম ' মুবরিক ' হিসাবে মশহূর হয়ে যায় ।
উমায়া ইবন খালাফ ইবন ওয়াহাব ইবন হুযাফা ইবন জুমাহকে ভর্ৎসনা করে উসমান ইবন মাযউন নিম্নোক্ত কবিতা আবৃত্তি করেন । তিনি ছিলেন উমায়্যার চাচাতো ভাই এবং ইসলাম গ্রহণ করার পর তিনি তার হাতে অনেক নির্যাতন ভোগ করেছিলেন । জাহিলী যুগে উমায়্যা তার গোত্রে খুবই গণ্যমান্য ব্যক্তি ছিল :
“ হে তায়ম ইব্ন আমর ! ঐ ব্যক্তির জন্য তাজ্জব ! যে আমার সংগে শত্রুতা পোষণ করে , অথচ তার ও আমার মাঝে রয়েছে লবণাক্ত ও মিষ্টি দু'সাগরের ব্যবধান ( অর্থাৎ দুস্তর ব্যবধান ) ।
“ তুমি কি নিরাপদে থাকার জন্য আমাকে মক্কা উপত্যকা থেকে বের করে দিলে , আর আমাকে আবিসিনিয়ায় নির্বাসিত করলে , যাকে তুমি নিজে অপসন্দ কর ?
“ তুমি এমন সব তীর দুরস্ত কর , যেগুলো ঠিক করা তোমার অনুকূলে নয় । আর তুমি সে তীরগুলো কেটে ফেল , যেগুলো ঠিক করা তোমার জন্য খুবই উপকারী ।
📄 হিজরতকারীদের ফিরিয়ে আনতে কুরায়শ কর্তৃক আবিসিনিয়ায় দূত প্রেরণ
“ তুমি শরীফ ও মর্যাদাবান লোকদের সংগে যুদ্ধ বাধিয়ে রেখেছ , আর তুমি তাদের ধ্বংস করেছ , যাদের তুমি আশ্রয় নিতে ।
“ যখন তোমার উপর কোন বিপদ আপতিত হবে এবং অসৎ প্রকৃতির দুর্বল লোকেরা তোমাকে শত্রুর হাতে সোপর্দ করবে , তখন তুমি বুঝতে পারবে যে , তুমি কি করছিলে । ”
এ কবিতায় উসমান যাকে তায়ম ইব্ন আমর বলে সম্বোধন করেছেন , সে জুমাহ গোত্রের । তার নাম ছিল তায়ম ।
ইবন ইসহাক বলেন : কুরায়শরা যখন দেখল যে , রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর সাহাবীরা আবিসিনিয়ায় গিয়ে শান্তিতে বসবাস করছে এবং তারা সেখানে নিরাপদ আবাসস্থল ও আশ্রয়স্থল পেয়ে গেছে , তখন তারা পরামর্শক্রমে স্থির করল যে , তারা কুরায়শের দু'জন বিচক্ষণ ব্যক্তিকে নাজাশীর কাছে পাঠাবে , যাতে তিনি তাদেরকে মক্কায় ফেরত পাঠান । এভাবে আবার তাদের ধর্মের ব্যাপারে কঠিন পরীক্ষায় নিক্ষেপ করবে এবং যে শান্তিপূর্ণ ও নিরাপদ আবাস তারা পেয়েছে , তা থেকে তাদের বের করে নিয়ে আসবে । এ উদ্দেশ্যে তারা আবদুল্লাহ্ ইব্ন আবূ রবীআ ও আমর ইব্ন আস ইব্ন ওয়ায়লকে পাঠাল । তারা নাজাশী ও তাঁর উযীরদের ( সেনাপতিদের ) উপঢৌকন স্বরূপ দেয়ার জন্য এ দু'জনের কাছে প্রচুর সম্পদ জমা করল । তারপর তারা এ দু'ব্যক্তিকে মুসলমানদের ফিরিয়ে আনার জন্য নাজাশীর কাছে পাঠাল ।
📄 নাজাশীর উদ্দেশ্যে আবূ তালিবের কবিতা
আবূ তালিব যখন কুরায়শদের এ সিদ্ধান্ত ও উপঢৌকন সম্পর্কে চিন্তা করলেন , যা তারা এ দুই ব্যক্তিকে দিয়ে নাজাশীর কাছে পাঠিয়েছিল , তখন তিনি নাজাশীকে প্রতিবেশী ( মুসলমান ) -দের সাথে ভাল আচরণ করার ও বিপদে তাদের রক্ষার জন্য উদ্বুদ্ধ করে তাঁর উদ্দেশে এ কবিতা রচনা করেন :
“ হায় ! যদি আমি জানতে পারতাম সুদূর প্রবাসে জা'ফর কেমন আছে , আর আমরই বা কেমন আছে , আর নিকট - আত্মীয়রাই চরম শত্রু হয়ে থাকে । নাজাশীর সদ্ব্যবহার কি জা'ফর ও তার সংগীরা পেয়েছে । না কোন ফিতনা সৃষ্টিকারী লোক এতে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে ? আপনি জেনে রাখুন যে , আপনি অতীব মহৎ ও মহানুভব । কাজেই আপনার কাছে আশ্রয় গ্রহণকারী ব্যক্তি বঞ্চিত হয় না । আল্লাহ্ আপনাকে বদনাম থেকে হিফাযত করুন । আপনি জেনে রাখুন যে , আল্লাহ্ আপনাকে অনেক সম্মান দান করেছেন এবং আপনাকে তিনি কল্যাণ ** ও মঙ্গলের সকল উপায় - উপকরণ দিয়েছেন ।
“ আর আপনি জেনে রাখুন যে , আপনি এমন কল্যাণস্রোতের উৎস , যা থেকে শত্রু - মিত্র নির্বিশেষে সবাই উপকৃত হয় । "
📄 নাজাশীর কাছে কুরায়শদের প্রেরিত দূতদ্বয় সম্পর্কে উম্মে সালামা (রা)-এর বর্ণনা
ইবন ইসহাক বলেন : মুহাম্মদ ইবন মুসলিম যুহরী আমাকে বলেছেন যে , তিনি আবূ বাকর ইবন আবদুর রহমান ইবন হারিস ইবন হিশাম মাখযূমী থেকে এবং তিনি রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর সহধর্মিণী উম্মে সালামা বিনত আবূ উমায়্যা ইবন মুগীরা থেকে এ ঘটনার বিবরণ শুনেছেন । উম্মে সালামা বলেন , আমরা যখন আবিসিনিয়ায় পৌঁছলাম , তখন নাজাশী আমাদের সংগে সর্বোত্তম প্রতিবেশীর মত ব্যবহার করলেন । আমরা নিরাপদে ধর্ম পালন করতে লাগলাম । আমরা আল্লাহ্র ইবাদত করতে লাগলাম এমন নিরুপদ্রব পরিবেশে যে , কেউ আমাদের কোন কষ্ট দিত না এবং অপ্রিয় কথাও শুনতাম না । কুরায়শরা এ খবর জানতে পেরে পরামর্শ করে স্থির করল যে , আমাদের ব্যাপারে আলোচনা করার জন্য নাজাশীর কাছে দু'জন বিচক্ষণ ব্যক্তি পাঠাবে । তারা মক্কার কিছু দুর্লভ বিলাস সামগ্রী নাজাশীর জন্য উপঢৌকন স্বরূপ পাঠাবে বলেও সিদ্ধান্ত নিল । নাজাশীর কাছে মক্কার চামড়াই ছিল সবচেয়ে পসন্দনীয় জিনিস । তাই তারা তাঁর জন্য প্রচুর পরিমাণে চামড়া সংগ্রহ করল । এমনকি নাজাশীর সেনাপতিদের জন্য উপঢৌকন পাঠাতেও কার্পণ্য করল না । এরপর তারা আবদুল্লাহ্ ইবন আৰু রবীআ এবং আমর ইবন আসকে ঐ সব উপঢৌকনসহ পাঠাল । তারা তাদের উভয়কে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে বলল : নাজাশীর সংগে কথা বলার আগে প্রত্যেক সেনাপতিকে তার উপঢৌকন দিয়ে দিবে । তারপর নাজাশীর কাছে তাঁর উপঢৌকন পৌছিয়ে দিবে । তারপর নাজাশীকে অনুরোধ করবে , তিনি যেন মুসলমানদের সংগে কোন আলাপ - আলোচনা করার আগেই তাদের তোমাদের হাতে সোপর্দ করেন । তারা নাজাশীর কাছে উপনীত হল । ( রাবী বলেন :) আর আমরা এ সময় পরম নিরাপদ বাসস্থানে উত্তম প্রতিবেশীর পাশে বসবাস করছিলাম । তারা প্রত্যেক সেনাপতিকে নাজাশীর সংগে কথা বলার আগেই উপঢৌকন দিয়ে দিল এবং প্রত্যেক সেনাপতিকে তারা এভাবে বলল : দেখুন , এই রাজার রাজ্যে আমাদের দেশের কিছু কমবয়স্ক নির্বোধ যুবক আশ্ৰয় নিয়েছে । তারা তাদের স্বজাতির ধর্ম ত্যাগ করেছে । অপরদিকে তারা আপনাদের ধর্মও গ্রহণ করেনি । তারা একটা অভিনব ধর্ম উদ্ভাবন করেছে । সে ধর্ম আমাদেরও অজানা , আপনাদেরও অপরিচিত । তাদের কাওমের সবচেয়ে গণ্যমান্য মুরব্বীরা আমাদেরকে আপনাদের রাজার কাছে এজন্য পাঠিয়েছেন যে , তিনি যেন এদেরকে তাঁদের কাছে ফেরত পাঠিয়ে দেন । অতএব , আমরা যখন রাজার সংগে তাদের ব্যাপারে আলোচনা করব , তখন আপনারা রাজাকে পরামর্শ দেবেন , তিনি যেন এদেরকে আমাদের হাতে সোপর্দ করে দেন এবং তাদের সংগে কোন কথা না বলেন ।
কেননা তাদের সম্প্রদায় , তাদের ব্যাপারে অন্যের তুলনায় অধিক জ্ঞান রাখে । ( সেনাপতিরা ) সবাই এতে সম্মতি জানাল । তারপর তারা উভয়ে নাজাশীর কাছে উপঢৌকন পেশ করল এবং তিনি তা তাদের থেকে গ্রহণ করলেন । তারপর এরা নাজাশীর সংগে এরূপ কথা বলল : “ হে রাজা ! আপনার দেশে আমাদের সম্প্রদায়ের কিছু অজ্ঞ বোকা যুবক আশ্রয় নিয়েছে । তারা তাদের সম্প্রদায়ের ধর্ম ত্যাগ করেছে এবং আপনাদের ধর্মও গ্রহণ করেনি । তারা একটা নুতন ধর্ম উদ্ভাবন করেছে । সে ধর্ম আপনার কাছে অজানা এবং আমাদের কাছেও । তাদের জাতির সবচেয়ে গণ্যমান্য ব্যক্তিরা ওদের ব্যাপারে আপনার কাছে আমাদের পাঠিয়েছেন । এমনকি তাদের বাপ , চাচা , মামা ও অন্যান্য আত্মীয় - স্বজন আমাদের পাঠিয়েছে , যেন আপনি ওদেরকে তাদের কাছে ফেরত পাঠান । তারা ওদের ব্যাপারে সবচেয়ে ভালো জানে ও ভালো বোঝে । আর তাদের দোষত্রুটি সম্পর্কে তারা সবচেয়ে বেশি ওয়াকিবহাল । রাবী বলেন : আবদুল্লাহ্ ইবন আবু রাবীআ ও আমর ইবন আসের কাছে যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশি অপসন্দনীয় ছিল তা হলো , নাজাশী কর্তৃক মুসলমানদের বক্তব্য শোনা । রাবী বলেন : এ সময় রাজার পাশে উপবিষ্ট উযীররা বলল : “ হে রাজা ! ওরা দু'জন ঠিকই বলেছে । তাদের ব্যাপার তাদের জাতিই বোঝে এবং তাদের দোষত্রুটি সম্পর্কে তারাই বেশি অবহিত । সুতরাং আপনি তাদেরকে এদের দু'জনের হাতে সমর্পণ করুন , যাতে তারা ওদের দেশ ও জাতির কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারে । ” এ কথা শুনে নাজাশী রেগে গেলেন । তিনি বললেন , আল্লাহ্র কসম , না । আমি এদের এ দু'জনের হাতে সোপর্দ করব না । একদল মানুষ আমার সান্নিধ্যে অবস্থান করছে , আমার দেশে বসবাস করছে । অন্য কোন দেশে না গিয়ে আমার দেশে এসেছে । তাদেরকে আগে আমি ডাকব এবং জিজ্ঞেস করব যে , এই দুই ব্যক্তি যা বলছে , সে ব্যাপারে তাদের বক্তব্য কি ? যদি দেখা যায় যে , এরা দু'জন যে রকম বলছে , তারা সেই রকমই , তাহলে আমি এদের সকলকে তাদের হাতে সমর্পণ করব এবং তাদের দেশবাসীর কাছে ফেরত পাঠাব । আর যদি অন্য রকম ..হয় , তা হলে আমি তাদের এ দু'জনের হাত থেকে রক্ষা করব এবং যতদিন তারা আমার রাজ্যে শান্তিপ্রিয় নাগরিক হিসাবে বাস করবে , ততদিন আমিও তাদের সাথে সদাচার করব ।