📄 কুরআন শোনার ব্যাপারে কুরায়শদের ধৃষ্টতাপূর্ণ উক্তি
ইবন ইসহাক বলেন : যখনই রাসূলুল্লাহ্ (সা:) কুরায়শদের সামনে কুরআন পাঠ করতেন "এবং তাদের আল্লাহ্র দিকে দাওয়াত দিতেন , তখন তারা তাঁকে উপহাস করে বলত : তুমি যার প্রতি আমাদের আহবান করছ , সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আবরণ আচ্ছাদিত । কাজেই তুমি যা বলছ তা আমরা বুঝতে পারছি না । আর আমাদের কানে আছে বধিরতা , তুমি যা বলছ তার কিছুই আমরা শুনতে পাচ্ছি না এবং তোমার ও আমাদের মাঝে রয়েছে একটি পর্দা , যা অন্তরায় সৃষ্টি করে রেখেছে । সুতরাং তুমি তোমার কাজ করে যাও , আর আমরাও আমাদের কাজ করে যাই । আমরা তোমার কোন কথাই বুঝি না ।
তাদের এ বক্তব্যের প্রেক্ষিতে মহান আল্লাহ্ তাঁর রাসূলের ওপর এ আয়াত নাযিল করেন : “ আর তুমি যখন কুরআন পাঠ কর , তখন তোমার ও যারা আখিরাতে বিশ্বাস করে না , তাদের মাঝে একটা প্রচ্ছন্ন পর্দা রেখে দিই । ” ... “ তোমার প্রতিপালক এক , এ কথা যখন তুমি কুরআন থেকে আবৃত্তি কর , তখন পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে তারা সরে পড়ে । " ( ১৭ : ৪৫-৪৬ ) । আমি যদি তাদের কথামত সত্যিই তাদের অন্তর ঢাকনা দিয়ে বন্ধ করে রাখতাম , তাদের কানে ছিপি এঁটে দিতাম এবং তাদের ও তোমার মাঝে পর্দা ঝুলিয়ে রাখতাম , তাহলে তারা তোমার প্রতিপালকের একত্ব কিভাবে বুঝত ? অর্থাৎ আমি এ কাজ করিনি । আল্লাহ্ বলেন , যখন তারা কান পেতে তোমার কথা শোনে , তখন তারা কেন কান পেতে শোনে তা আমি ডাল জার্নি এবং এও জানি , গোপনে আলোচনাকালে যালিমরা বলে , তোমরা তো এক জানুান্ত ব্যক্তির অনুসরণ করছো । ” ( ১৭ : ৪৭ ) । অর্থাৎ আমি তোমাকে তাদের কাছে যে বাণী দিয়ে পাঠিয়েছি , তা বর্জন করা তাদের পারস্পরিক আলোচনাক্রমে গৃহীত সিদ্ধান্তের ফল । দেখ , তারা তোমার কী উপমা দেয় ! তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না । ” ( ১৭ : ৪৮ ) । অর্থাৎ তারা তোমার ভুল উপমা দেয় । ফলে তারা এ কুরআন থেকে হিদায়াত লাভ করতে পারে না এবং এ সম্পর্কে তাদের কোন মন্তব্যই সঠিক নয় । তারা বলে , “ আমরা অস্থিতে পরিণত ও চূর্ণ - বিচূর্ণ হলেও কি মুন সৃষ্টিরূপে পুনরুপিত হব । ” ( ১৭:৪৯ )
অর্থাৎ তুমি আমাদের একথা জানাতে এসেছ যে , আমরা মরার পর যখন অস্থিতে পরিণত ও চূর্ণ - বিচূর্ণ হব , তখন আমাদের পুনরুত্থিত করা হবে ; এটা হতেই পারে না । বল , তোমরা হয়ে যাও পাথর অথবা লোহা , অথবা এমন কিছু , যা তোমাদের ধারণায় খুবই কঠিন ; তার বলবে , কে আমাদের পুনরুত্বিত করবে ? বল , তিনি - ই , যিনি তোমাদের প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন । ” ( ১৭ : ২০-২১ )
অর্থাৎ তিনি তোমাদের যা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন , তা তোমরা জান । সুতরাং তোমাদের মাটি থেকে সৃষ্টি করা আল্লাহর নিকট তার চেয়ে কঠিন নয় ।
ইবন ইসহাক বলেন : আবদুল্লাহ্ ইবন আবূ নুজায়হ মুজাহিদ থেকে এবং মুজাহিদ ইবন আব্বাস ( রা ) থেকে বর্ণনা করেছেন । মুজাহিদ বলেন , আমি ইবন আব্বাস ( রা ) -কে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে , আল্লাহ্ তা'আলা “ অথবা এমন কিছু , যা তোমাদের ধারণায় খুবই কঠিন ” এ কথা দিয়ে কি বুঝিয়েছেন ? তখন ইবন আব্বাস ( রা ) বললেন তিনি এ থেকে মৃত্যু বুঝিয়েছেন ।
📄 ইসলাম গ্রহণকারী দুর্বল লোকদের ওপর মুশরিকদের নির্যাতন
ইবন ইসহাক বলেন এরপর যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর অনুসারী হয়েছিলেন , সেই সাহাবীদের ওপর মুশরিকরা নিপীড়ন - নির্যাতন শুরু করল । আর প্রত্যেক গোত্র তার ভেতরকার মুসলমানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল ও নির্যাতন চালাতে লাগল এবং তাদের ধর্ম থেকে তাদেরকে বল প্রয়োগে ফেরাতে উদ্যত হল । কিন্তু আল্লাহ্ তাঁদেরকে ওদের হাত থেকে রক্ষা করলেন ।
📄 বিলাল (রা)-এর ওপর নির্যাতন এবং আবূ বকর (রা) কর্তৃক তাঁর মুক্তি
আবূ বকর ( রা ) -এর আযাদকৃত গোলাম বিলাল বনু জুমাহ গোত্রের এক ব্যক্তির ক্রীতদাস ছিলেন । তিনি তাদেরই দাসীর গর্ভজাত দাস ছিলেন । তাঁর পিতার নাম রাবাহ এবং তাঁর মাতার নাম ছিল হামামা । বিলাল ( রা ) ছিলেন একনিষ্ঠ মুসলিম এবং পবিত্র মনের অধিকারী । বনু জুমাহ গোত্রের উমায়্যা ইবন ওহ ইবন হুযাফা ইবন জুমাহ দুপুরের তপ্ত রোদে তাঁকে মক্কার মরুভূমিতে টেনে নিয়ে চিৎ করে শুইয়ে দিত । এরপর সে একটি বড় পাথর আনার নির্দেশ দিত , যা তার বুকের ওপর রাখা হত । তারপর তাঁকে সে বলত , মুহাম্মদকে অস্বীকার করে লাত ও উযযার পূজা কর , নতুবা তোর ওপর মৃত্যু পর্যন্ত এরূপ নির্যাতন চলতে থাকবে । কিন্তু সেই কঠিন অমানুষিক নির্যাতন ভোগরত অবস্থায়ও তিনি বলতে থাকেতেন আহাদ , আহাদ অর্থাৎ আল্লাহ্ এক ।
ইবন ইসহাক বলেন : হিশাম ইবন উরওয়া তাঁর পিতা থেকে শুনে আমাকে বলেছেন যে , বিলাল এভাবে নির্যাতন ভোগ করার সময় ওয়ারাকা ইবন নাওফল তাঁর কাছ দিয়ে যেতেন এবং বিলাল ( রা ) -এর আহাদ , আহাদ শব্দ শুনে বলতেন আল্লাহর কসম , হে বিলাল । তিনিই আহাদ , আহাদ । তারপর তিনি উমায়্যা ইবন খালাফ এবং জুমাহ গোত্রের সেই অত্যাচারী লোকদের , যারা তাঁর উপর নির্যাতন চালাত তাদের কাছে গিয়ে বলতেন :
আল্লাহ্র কসম ! তোমরা যদি তাঁকে এভাবে হত্যা করে ফেল , তবে আমি তাঁর কবরকে বরকতময় স্থানে পরিণত করব । এভাবে বিলাল ( রা ) -এর ওপর যখন নির্যাতন চলছিল , তখন একদিন আবু বকর সিদ্দীক ( রা ) ইবন আবু কুহাফা তাঁর কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন । আবু বকরের বাড়ি ছিল জুমাহ গোত্রের পাড়ার মধ্যেই । তিনি উমায়্যা ইবন খালাকে বললেন , এ অসহায় লোকটার ব্যাপারে তুমি কি আল্লাহকে ভয় কর না ? আর কতদিন এভাবে চলবে ? সে বলল : তুমিই তো তাকে নষ্ট করেছ । এখন যে অবস্থায় তাকে দেখতে পাচ্ছ , তা থেকে তুমিই তাকে উদ্ধার কর । আবূ বকর ( রা ) বলল : আচ্ছা , আমি তা - ই করব । আমার কাছে তাঁর চাইতে একজন হৃষ্টপুষ্ট ও শক্তিশালী হাবশী দাস আছে , যে তোমারই ধর্মের অনুসারী । বিলালের বদলে আমি তাকে তোমাকে দিয়ে দেব । উমায়্যা বলল : ঠিক আছে । আমি রাযী । আবূ বকর ( রা ) বললেন : “ সে এখন তোমার । ” এ বলে আবূ বকর ( রা ) বিলাল ( রা ) -এর বদলে সেই গোলাম তাকে দিয়ে দিলেন এবং বিলাল ( রা ) - কে নিয়ে আযাদ করে দিলেন ।
📄 আবূ বকর (রা) যাদের আযাদ করেন
তিনি মদীনায় হিজরত করার আগে বিলাল ( রা ) ছাড়া আরো ছয়জন ইসলাম গ্রহণকারী গোলামকে আযাদ করেন । বিলাল ( রা ) ছিলেন এদের সপ্তম ব্যক্তি । তিনি আমির ইবন ফুহায়রা ( রা ) -কে আযাদ করেন , যিনি বদর ও উহুদ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং বীরে মাউনার যুদ্ধে শহীদ হন । তিনি উম্মে উবায়স ও যিন্নীরা দাসীদ্বয়কেও আযাদ করেন । যিন্নীরা আযাদ হওয়ার সময় তার দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেছিলেন । এ অবস্থা দেখে কুরায়শরা বলল : লাত ও উয্যার অভিশাপেই সে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছে । তখন যিন্নীরা ( রা ) তাদের এ কথা শুনে বললেন : ওরা মিথ্যে বলেছে । আল্লাহ্র ঘরের কসম ! লাত ও উয্যা কোন ক্ষতিও করতে পারে না , আর উপকারও করতে পারে না । আল্লাহ্ তৎক্ষণাৎ তার দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দিলেন । আবূ বকর ( রা ) নাহদিয়া নাম্নী এক মহিলা ও তার কন্যাকেও আযাদ করেন । তাঁর উভয়ে আবদুদদার গোত্রের এক মহিলার দাসী ছিলেন । ঐ মহিলা তাদের ( যাতাসহ ) আটা পেষণের জন্য পাঠিয়েছিল এবং সে সময় বলছিল : আল্লাহ্র কসম ! আমি ওদের কখনও আযাদ করব না । এ সময় আবূ বকর ( রা ) সে দাসীদ্বয়ের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন । ঐ মহিলার কথা শুনে তিনি বললেন , হে অমুকের মা ! তুমি তোমার কসম ভেঙে ফেল এবং এর কাফ্ফারা আদায় কর । তখন সে মহিলা বলল : আমি শপথমুক্ত ! তুমি - ই তো ওদের নষ্ট করেছ । কাজেই তুমি ওদের আযাদ করে নাও । আবূ বকর ( রা ) জিজ্ঞেস করলেন : বেশ , তুমি ওদের কত দামে বিক্রি করবে ? সে মহিলা দামের একটা পরিমাণ বলল । তখন আবূ বাকর ( রা ) বললেন : ঠিক আছে , আমি ওদের কিনে নিলাম এবং ওরা এখন থেকেই আযাদ । তোমরা মহিলার যাঁতাকল ফিরিয়ে দাও । তাঁরা বললেন : হে আবূ বকর ! এখন - ই ফিরিয়ে দেব , না কাজটি শেষ করে তা তাকে ফিরিয়ে দেব ? আবূ বকর ( রা ) বললেন : সেটা তোমাদের ইচ্ছা ।
একদা মুয়াম্মাল গোত্রের এক দাসীর কাছ দিয়ে আবূ বকর ( রা ) যাচ্ছিলেন । এটি কা'ব গোত্রের একটি শাখা । এ দাসীটি ইসলাম গ্রহণ করেছিল । উমর ইবন খাত্তাব ইসলাম ত্যাগ করতে বাধ্য করার জন্য তার ওপর নির্যাতন করছিলেন । এ সময় তিনি মুশরিক ছিলেন । তিনি তাকে পেটাচ্ছিলেন । যখন তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়লেন , তখন বললেন : আমি তোর কাছে ওযর পেশ করছি । ক্লান্ত হওয়া ছাড়া আর কোন কারণে আমি তোকে পেটানো বন্ধ করিনি । দাসীটি বললো : আল্লাহ্ - ই তোমাকে এরূপ ক্লান্ত করেছেন । পরে আবূ বকর ( রা ) দাসীটিকে কিনে আযাদ করে দিলেন ।