📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কুরআন পাঠ শুনে আখনাসের মনে প্রশ্ন

📄 রাসূলুল্লাহ্ (সা)-এর কুরআন পাঠ শুনে আখনাসের মনে প্রশ্ন


ইবন ইসহাক বলেন : মুহাম্মদ ইব্‌ন মুসলিম ইন শিহাব যুহরী আমাকে বলেছেন যে , তিনি শুনেছেন , একদিন রাতে আবু সুফিয়ান ইবন হারব , আবূ জাহল ইবন হিশাম এবং বনু যুহার মিত্র আখনাস ইবন শুরায়ক ইবন আমর ইবন ওয়াহ্ব সাকাফী - রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর কুরআন পাঠ শুনতে বেরিয়ে পড়ল । এ সময় তিনি নিজের ঘরে রাতের নামায আদায় করছিলেন । এ তিনজনের প্রত্যেকে এক - একটা জায়গা বেছে নিয়ে সেখানে বসে এবং তাঁর অর্থাৎ রাসূল (সা:) -এর কুরআন পাঠ শুনতে লাগল । তিনজনের কেউই তার অপর সাথীর উপস্থিতির কথা জানতে পারেনি । কুরআন শুনতে শুনতে তারা সারারাত কাটিয়ে দিল । যখন ভোর হল , তখন প্রত্যেকে নিজ নিজ স্থান থেকে বেরিয়ে পড়ল । কিন্তু পথিমধ্যে সকলের দেখা হয়ে গেল । তখন তারা একে অপরকে তিরস্কার করে বলল , খবরদার ! এমন কাজ আর কখনো করবে না । যদি তোমাদের নির্বোধ লোকেরা এভাবে তোমাদের দেখে ফেলে ; তাহলে তাদের মনে তোমাদের সম্পর্কে খারাপ ধারণার সৃষ্টি হবে । তারপর তারা সবাই চলে গেল । পরদিন রাতে আবার তিনজনই নিজ নিজ গোপন জায়গায় গিয়ে বসল এবং সারারাত ধরে রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর কুরআন পড়া শুনল । ভোর হলে তারা স্ব - স্ব স্থান থেকে বেরিয়ে পড়ল , কিন্তু পথিমধ্যে সকলের দেখা হয়ে গেল । তারপর তারা আগের দিনের মত পরস্পর কথাবার্তা বলল । তারপর চলে গেল । তৃতীয় দিনও একই ঘটনা ঘটল । এবার তারা এ মর্মে অঙ্গীকার করল যে , ভবিষ্যতে তারা আর এরূপ করবে না । এ বলে তারা যার যার পথে চলে গেল ।
পরদিন সকালে আখনাস ইবন ওবায়ক তার লাঠি নিয়ে রওয়ানা হল এবং আবু সুফিয়ানের কাছে এসে বলল , হে আবূ হানযালা ! তুমি মুহাম্মদের কাছ থেকে যা শুনলে , সে সম্পর্কে তোমার মতামত আমাকে জানাও । সে বলল , হে আবূ সা'লাবা ! শোনো , আল্লাহ্র কসম ! কিছু কথা এমন শুনলাম যা আমি জানি এবং তার অর্থও বুঝি । আবার কিছু কথা এমনও শুনলাম যার অর্থ ও মর্ম আমার জানা নেই । তখন আখনাস বলল : “ আল্লাহ্র কসম ! আমার অবস্থাও তথৈবচ ।
এরপর আখনাস তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবূ জাহলের বাড়িতে গিয়ে তার সাথে দেখা করে বলল : “ হে আবুল হিকাম ! মুহাম্মাদের কাছ থেকে যা শুনলে , সে সম্পর্কে তোমার অভিমত কি ? ” সে বলল : আমি কি শুনলাম ! আমরা এবং বনূ আব্দ মানাফ কুরায়শ বংশের এ দু'টি শাখাগোত্র দীর্ঘকাল ধরে মর্যাদার শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এসেছি । আপ্যায়ন ও ভোজের আয়োজন তারাও করেছে , আমরাও করেছি । সামাজিক দায় - দায়িত্ব তারাও বহন করেছে , আমরাও করেছি । সব কিছুতে তারাও বদান্যতা দেখিয়েছে , আর আমরাও দেখিয়েছি । এভাবে যখন আমরা সমান তালে চলেছি , তখন হঠাৎ তারা দাবি করল , আমাদের মধ্যে একজন নবী আছেন , যার কাছে আসমান থেকে ওহী আসে । এ পর্যায়ে আমরা কিরূপে তাদের সমকক্ষ হব ? আল্লাহ্র কসম ! আমরা তার ওপর কখনো ঈমান আনব না এবং তাঁকে সত্যবাদী বলে স্বীকৃতি দেব না । রাবী বলেন , এ কথা শুনে আখনাস তার কাছে থেকে বিদায় নিল ।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 কুরআন শোনার ব্যাপারে কুরায়শদের ধৃষ্টতাপূর্ণ উক্তি

📄 কুরআন শোনার ব্যাপারে কুরায়শদের ধৃষ্টতাপূর্ণ উক্তি


ইবন ইসহাক বলেন : যখনই রাসূলুল্লাহ্ (সা:) কুরায়শদের সামনে কুরআন পাঠ করতেন "এবং তাদের আল্লাহ্র দিকে দাওয়াত দিতেন , তখন তারা তাঁকে উপহাস করে বলত : তুমি যার প্রতি আমাদের আহবান করছ , সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আবরণ আচ্ছাদিত । কাজেই তুমি যা বলছ তা আমরা বুঝতে পারছি না । আর আমাদের কানে আছে বধিরতা , তুমি যা বলছ তার কিছুই আমরা শুনতে পাচ্ছি না এবং তোমার ও আমাদের মাঝে রয়েছে একটি পর্দা , যা অন্তরায় সৃষ্টি করে রেখেছে । সুতরাং তুমি তোমার কাজ করে যাও , আর আমরাও আমাদের কাজ করে যাই । আমরা তোমার কোন কথাই বুঝি না ।
তাদের এ বক্তব্যের প্রেক্ষিতে মহান আল্লাহ্ তাঁর রাসূলের ওপর এ আয়াত নাযিল করেন : “ আর তুমি যখন কুরআন পাঠ কর , তখন তোমার ও যারা আখিরাতে বিশ্বাস করে না , তাদের মাঝে একটা প্রচ্ছন্ন পর্দা রেখে দিই । ” ... “ তোমার প্রতিপালক এক , এ কথা যখন তুমি কুরআন থেকে আবৃত্তি কর , তখন পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে তারা সরে পড়ে । " ( ১৭ : ৪৫-৪৬ ) । আমি যদি তাদের কথামত সত্যিই তাদের অন্তর ঢাকনা দিয়ে বন্ধ করে রাখতাম , তাদের কানে ছিপি এঁটে দিতাম এবং তাদের ও তোমার মাঝে পর্দা ঝুলিয়ে রাখতাম , তাহলে তারা তোমার প্রতিপালকের একত্ব কিভাবে বুঝত ? অর্থাৎ আমি এ কাজ করিনি । আল্লাহ্ বলেন , যখন তারা কান পেতে তোমার কথা শোনে , তখন তারা কেন কান পেতে শোনে তা আমি ডাল জার্নি এবং এও জানি , গোপনে আলোচনাকালে যালিমরা বলে , তোমরা তো এক জানুান্ত ব্যক্তির অনুসরণ করছো । ” ( ১৭ : ৪৭ ) । অর্থাৎ আমি তোমাকে তাদের কাছে যে বাণী দিয়ে পাঠিয়েছি , তা বর্জন করা তাদের পারস্পরিক আলোচনাক্রমে গৃহীত সিদ্ধান্তের ফল । দেখ , তারা তোমার কী উপমা দেয় ! তারা পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং তারা পথ পাবে না । ” ( ১৭ : ৪৮ ) । অর্থাৎ তারা তোমার ভুল উপমা দেয় । ফলে তারা এ কুরআন থেকে হিদায়াত লাভ করতে পারে না এবং এ সম্পর্কে তাদের কোন মন্তব্যই সঠিক নয় । তারা বলে , “ আমরা অস্থিতে পরিণত ও চূর্ণ - বিচূর্ণ হলেও কি মুন সৃষ্টিরূপে পুনরুপিত হব । ” ( ১৭:৪৯ )
অর্থাৎ তুমি আমাদের একথা জানাতে এসেছ যে , আমরা মরার পর যখন অস্থিতে পরিণত ও চূর্ণ - বিচূর্ণ হব , তখন আমাদের পুনরুত্থিত করা হবে ; এটা হতেই পারে না । বল , তোমরা হয়ে যাও পাথর অথবা লোহা , অথবা এমন কিছু , যা তোমাদের ধারণায় খুবই কঠিন ; তার বলবে , কে আমাদের পুনরুত্বিত করবে ? বল , তিনি - ই , যিনি তোমাদের প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন । ” ( ১৭ : ২০-২১ )
অর্থাৎ তিনি তোমাদের যা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন , তা তোমরা জান । সুতরাং তোমাদের মাটি থেকে সৃষ্টি করা আল্লাহর নিকট তার চেয়ে কঠিন নয় ।
ইবন ইসহাক বলেন : আবদুল্লাহ্ ইবন আবূ নুজায়হ মুজাহিদ থেকে এবং মুজাহিদ ইবন আব্বাস ( রা ) থেকে বর্ণনা করেছেন । মুজাহিদ বলেন , আমি ইবন আব্বাস ( রা ) -কে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে , আল্লাহ্ তা'আলা “ অথবা এমন কিছু , যা তোমাদের ধারণায় খুবই কঠিন ” এ কথা দিয়ে কি বুঝিয়েছেন ? তখন ইবন আব্বাস ( রা ) বললেন তিনি এ থেকে মৃত্যু বুঝিয়েছেন ।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 ইসলাম গ্রহণকারী দুর্বল লোকদের ওপর মুশরিকদের নির্যাতন

📄 ইসলাম গ্রহণকারী দুর্বল লোকদের ওপর মুশরিকদের নির্যাতন


ইবন ইসহাক বলেন এরপর যারা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং রাসূলুল্লাহ্ (সা:) -এর অনুসারী হয়েছিলেন , সেই সাহাবীদের ওপর মুশরিকরা নিপীড়ন - নির্যাতন শুরু করল । আর প্রত্যেক গোত্র তার ভেতরকার মুসলমানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল ও নির্যাতন চালাতে লাগল এবং তাদের ধর্ম থেকে তাদেরকে বল প্রয়োগে ফেরাতে উদ্যত হল । কিন্তু আল্লাহ্ তাঁদেরকে ওদের হাত থেকে রক্ষা করলেন ।

📘 সিরাতে ইবন হিশাম > 📄 বিলাল (রা)-এর ওপর নির্যাতন এবং আবূ বকর (রা) কর্তৃক তাঁর মুক্তি

📄 বিলাল (রা)-এর ওপর নির্যাতন এবং আবূ বকর (রা) কর্তৃক তাঁর মুক্তি


আবূ বকর ( রা ) -এর আযাদকৃত গোলাম বিলাল বনু জুমাহ গোত্রের এক ব্যক্তির ক্রীতদাস ছিলেন । তিনি তাদেরই দাসীর গর্ভজাত দাস ছিলেন । তাঁর পিতার নাম রাবাহ এবং তাঁর মাতার নাম ছিল হামামা । বিলাল ( রা ) ছিলেন একনিষ্ঠ মুসলিম এবং পবিত্র মনের অধিকারী । বনু জুমাহ গোত্রের উমায়্যা ইবন ওহ ইবন হুযাফা ইবন জুমাহ দুপুরের তপ্ত রোদে তাঁকে মক্কার মরুভূমিতে টেনে নিয়ে চিৎ করে শুইয়ে দিত । এরপর সে একটি বড় পাথর আনার নির্দেশ দিত , যা তার বুকের ওপর রাখা হত । তারপর তাঁকে সে বলত , মুহাম্মদকে অস্বীকার করে লাত ও উযযার পূজা কর , নতুবা তোর ওপর মৃত্যু পর্যন্ত এরূপ নির্যাতন চলতে থাকবে । কিন্তু সেই কঠিন অমানুষিক নির্যাতন ভোগরত অবস্থায়ও তিনি বলতে থাকেতেন আহাদ , আহাদ অর্থাৎ আল্লাহ্ এক ।
ইবন ইসহাক বলেন : হিশাম ইবন উরওয়া তাঁর পিতা থেকে শুনে আমাকে বলেছেন যে , বিলাল এভাবে নির্যাতন ভোগ করার সময় ওয়ারাকা ইবন নাওফল তাঁর কাছ দিয়ে যেতেন এবং বিলাল ( রা ) -এর আহাদ , আহাদ শব্দ শুনে বলতেন আল্লাহর কসম , হে বিলাল । তিনিই আহাদ , আহাদ । তারপর তিনি উমায়্যা ইবন খালাফ এবং জুমাহ গোত্রের সেই অত্যাচারী লোকদের , যারা তাঁর উপর নির্যাতন চালাত তাদের কাছে গিয়ে বলতেন :
আল্লাহ্র কসম ! তোমরা যদি তাঁকে এভাবে হত্যা করে ফেল , তবে আমি তাঁর কবরকে বরকতময় স্থানে পরিণত করব । এভাবে বিলাল ( রা ) -এর ওপর যখন নির্যাতন চলছিল , তখন একদিন আবু বকর সিদ্দীক ( রা ) ইবন আবু কুহাফা তাঁর কাছ দিয়ে যাচ্ছিলেন । আবু বকরের বাড়ি ছিল জুমাহ গোত্রের পাড়ার মধ্যেই । তিনি উমায়্যা ইবন খালাকে বললেন , এ অসহায় লোকটার ব্যাপারে তুমি কি আল্লাহকে ভয় কর না ? আর কতদিন এভাবে চলবে ? সে বলল : তুমিই তো তাকে নষ্ট করেছ । এখন যে অবস্থায় তাকে দেখতে পাচ্ছ , তা থেকে তুমিই তাকে উদ্ধার কর । আবূ বকর ( রা ) বলল : আচ্ছা , আমি তা - ই করব । আমার কাছে তাঁর চাইতে একজন হৃষ্টপুষ্ট ও শক্তিশালী হাবশী দাস আছে , যে তোমারই ধর্মের অনুসারী । বিলালের বদলে আমি তাকে তোমাকে দিয়ে দেব । উমায়্যা বলল : ঠিক আছে । আমি রাযী । আবূ বকর ( রা ) বললেন : “ সে এখন তোমার । ” এ বলে আবূ বকর ( রা ) বিলাল ( রা ) -এর বদলে সেই গোলাম তাকে দিয়ে দিলেন এবং বিলাল ( রা ) - কে নিয়ে আযাদ করে দিলেন ।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00